অতঃপর চরম সত্যটি বললেন স্বাস্থ্য মহাপরিচালক । ডা. নাজমুল হাসান

Comments

সংক্রমণ বেশি হলে মোকাবিলা অসম্ভব: স্বাস্থ্য মহাপরিচালক

এই প্রথম দায়িত্বপূর্ণ পদে থাকা একজনের মুখ থেকে চরম সত্য কথাটা বের হলো। স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সব ঠিকঠাক আছে বলে এতোদিন যা শুনে এসেছি তা ছিলো রাজনৈতিক মিথ্যাচার।

আমাদের দেশের যে স্বাস্থ্যব্যবস্থা তাতে এ ব্যবস্থা স্বাভাবিক চাপ নিতেই অক্ষম, বাড়তি চাপ নেবার সক্ষমতা তার নাই, সে প্রশ্নই অবান্তর। আপনি করোনা আক্রান্ত হলে সেটা এই স্বাস্থ্যব্যবস্থার জন্য বাড়তি চাপ। সে চাপ তো এ স্বাস্থ্যব্যবস্থা নিতে পারবে না। তাহলে আপনি কী করবেন?

এমনিতেই শত শত রোগী হাসপাতালের ফ্লোরে, বারান্দায় শুয়ে থাকে। আপনি কোথায় ভর্তি হবেন এবং কোথায় সিট পাবেন? আপনার তো আইসোলেশন দরকার, জেনারেল বেডে, ফ্লোরে বা বারান্দায় তো আপনি থাকতে পারবেন না, তাহলে আপনি কী করবেন?

আইসোলেশন বা কোয়ারেন্টাইন যা-ই বলি না কেন, সেখানে একটি রুম একজনের জন্য। একজনের জন্য একটাই বাথরুম সে বাথরুম অন্য কেউ শেয়ার‌ও করতে পারবে না। সেই রুমের প্রটেকশন ব্যবস্থা এমনই যেন কোনোভাবেই ভাইরাস সেই রুম থেকে অন্যত্র ছড়িয়ে পড়তে না পারে। সর্বক্ষণ ডাক্তার এবং ডাক্তার যেন প্রটেক্টেড থেকে সার্বক্ষণিক মনিটরিং করতে পারে সে ব্যবস্থা থাকতে হবে। এরকম আইসোলেশন ব্যবস্থা আমাদের দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় প্রায় শূন্য। করোনা আক্রান্ত হলে আপনি কেমন করে বাঁচবেন?

সাধারণ প্যাথলজিক্যাল পরীক্ষা বা ইনভেস্টিগেশন করতে গেলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকতে হয়, একদিন স্যাম্পল দিয়ে আসলে দুই/তিন দিন পর ফলাফল পাওয়া যায়। কারণ, বর্তমান স্বাস্থ্যব্যবস্থার এই পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও ইনভেস্টিগেশনের সুবিধাদি অপ্রতুল। নির্দিষ্ট যে হাসপাতালগুলিতে আক্রান্ত অবস্থায় আপনি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে যাবেন সেটি এই সাধারণ ল্যাবরেটরিতে হবে না, তাহলে কি করবেন? স্পেশালাইজড ল্যাবরেটরি এতোই কম যে সেটা পাওয়ার সম্ভাবনা আপনার ক্ষেত্রে প্রায় শূন্য। তাহলে আপনি কী করবেন?

উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের অর্গানোগ্রামে কোনো ইএমও বা ইমার্জেন্সি মেডিকেল অফিসার পজিশন নাই। মানুষ ইমারজেন্সি স্বাস্থ্যসেবা নিতে সেখানে গিয়ে ডাক্তার পায় না, ভাঙচুর করে, ডাক্তারদের উপর দোষ চাপায়- ডাক্তার কেন নেই! অথচ সরকারি অর্গানোগ্রাম অনুযায়ী কোনো ইমার্জেন্সি মেডিকেল অফিসার থাকবে না এটাই স্বাভাবিক। মাত্র দুইজন মেডিকেল অফিসার পজিশন, তাও সবখানে নেই। একটা উপজেলায় যতো জনসংখ্যা তাতে কি করে এই চাপ নেওয়া সম্ভব? তাহলে করোনা আক্রান্তের সংখ্যা বৃদ্ধি পেলে কী হবে? তখন কী করবেন আপনি?

উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের অর্গানোগ্রামে কোনো নাইট ডাক্তার নাই, কোনো ইনডোর মেডিকেল অফিসার নাই। একজন মানুষ অসুস্থ হয়ে রাতে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গেলে সে ডাক্তার পাবে না, পাওয়ার কথা না- কারণ, অর্গানোগ্রাম অনুযায়ী ডাক্তারের পজিশন রাখাই হয়নি। কী করে স্বাস্থ্য সমস্যা মোকাবেলা হবে? করোনায় আক্রান্ত হয়ে বেশি অসুস্থ হয়ে পড়াটা দিন/রাতের উপর নির্ভর করবে না, তাহলে আপনার কী উপায় হবে?

ইতালির জনসংখ্যা ছয় কোটির মতো এবং এজন্য তাদের ভেন্টিলেটর এবং আইসিইউ বেডের সংখ্যা ১০ হাজারের বেশি। এখন তারা তাদের স্বাস্থ্য সমস্যা মোকাবেলা করতে পারছে না, পুরো স্বাস্থ্যব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। বাংলাদেশের জনসংখ্যা ১৬ কোটি, ভেন্টিলেটর ও আইসিইউ বেডের সংখ্যা থাকার কথা ২০ হাজারের বেশি, সেখানে আছে মাত্র ২৯টি, সবগুলোই ঢাকা শহরে। কী করে করোনা মোকাবেলা হবে? কী অবস্থা হবে আপনার?

দেশে ডাক্তার এবং স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সাথে জড়িত স্টাফ সংখ্যা সাড়ে পাঁচ লাখ। একটা পিপিই একবার ব্যবহার করে ফেলে দিতে হয়। সেজন্য প্রতিদিন সাড়ে পাঁচ লক্ষ পিপিই দরকার। সারাদেশে মোট পিপিই’র সংখ্যা দেড় লাখের কম। একজন ডাক্তার আক্রান্ত হলে সেই হাসপাতালের সমস্ত ডাক্তার ও স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীদের কোয়ারেন্টাইনে চলে যেতে হতে পারে, ইতোমধ্যে অনেক হাসপাতালে গিয়েছেও। করোনা আক্রান্ত রোগীর চাপ বাড়লে যে অবস্থায় ডাক্তার ও স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীরা কাজ করছে তাদের সকলকে কোয়ারেন্টাইনে চলে যেতে হতে পারে। করোনা আক্রান্ত হলে কে করবে আপনার চিকিৎসা ও দেখাশোনা? কী হবে আপনার?

আসুন ডাক্তার পিটিয়ে জনগণের স্বাস্থ্যসেবা সুনিশ্চিত করি এবং বুদ্ধিমান ও প্রতিবাদী হিসাবে সমাজে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করি। আর সব যেখানে যেমন‌ই আছে তেমন‌ই থাক।

লেখক:
Nazmul Hassan
ডা. নাজমুল হাসান, লেখক, গল্পকার, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ

*এই লেখার মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাঙালীয়ানার সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকা অস্বাভাবিক নয়। তাই এখানে প্রকাশিত লেখা বা লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা সংক্রান্ত আইনগত বা বানানরীতি বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় বাঙালীয়ানার নেই। – সম্পাদক

মন্তব্য করুন (Comments)

comments

Share.