অধিবর্ষ বা লিপইয়ার । সুজন কুমার দেব

Comments

অধিবর্ষ নিয়ে আলোচনার আগে প্রথমেই ক্যালেন্ডার বা পঞ্জিকা নিয়ে আলোচনা করা যাক। সভ্যতার উষালগ্নে অসীম বিস্ময়ে মানুষের আকাশ দেখা এবং গ্রহ-নক্ষত্রের গতির নিয়ম অনুসন্ধানই পরিণতি লাভ করে পরবর্তী মায়া, ভারতীয়, মিশরীয়, মেসোপটেমিয়, চীনা, আরবীয় প্রভৃতি সভ্যতায়। প্রাচীন গুহাবাসী মানুষ প্রতিদিনের নতুন সূর্য দেখে গাছের শাখায় বা পশুর হাড়ে দাগ কেটে চিহ্ন দিয়ে দিনের হিসাব রাখতো। এভাবেই দিন ও রাতের পরিবর্তন প্রাকৃতিক নিয়মে ছন্দবদ্ধ হয়ে পঞ্জিকার রূপ পরিগ্রহ করে। বিস্ময়করভাবে পঞ্জিকার উন্নয়ন ঘটে রোমান ও গ্রীক সভ্যতায়।

পঞ্জিকা হলো সময় পরিমাপের একটি প্রথাবদ্ধ ব্যবস্থা। ক্যালেন্ডার শব্দটি একটি ল্যাটিন শব্দ। Kalendae -এর পরিবর্তীত রূপ Kalendarium থেকে ফরাসী Calendier শব্দে রূপান্তরিত হয়। যার থেকে ইংরেজী Calends শব্দটি আসে। এরপর Calends থেকে Calendar শব্দটির উদ্ভব। সময়কে বছর, মাস, সপ্তাহ ও দিনে ভাগ করে নিয়ে কাজ করা হয়। পঞ্জিকার ভিত্তি হলো মহাকাশে পৃথিবী, সূর্য ও চাঁদের গতিপথ এবং তা থেকে সঠিক সময় নির্ধারণ। প্রাচীন মানুষ বসবাস করতো প্রতিকুল প্রাকৃতিক পরিবেশ ও হিংস্র পশুর সাথে। তাই প্রতিকুল পরিবেশে টিকে থাকার জন্য মানুষ প্রকৃতির নিয়ম অনুসন্ধান করতো। তারা দেখতো দিনের পর রাত হয়। এর কারণ অনুসন্ধান করে তারা জানতে পারল এটা সূর্যের সাথে সম্পর্কযুক্ত।

সম্ভবত এই তথ্য আবিস্কারের মাধ্যমে সর্বপ্রথম জ্যোতির্বিদ্যার সূচনা ঘটে। দিন-রাত্রির পরিবর্তনের পরে ঋতুর পরিবর্তন মানুষের নজরে আসে। তারা এটা উপলব্ধি করে ঋতু পরিবর্তন মানুষের জীবন যাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে। মানুষ ঋতুর সাথে দিনের সম্পর্ক নির্ণয়ের পর লক্ষ্য করে এর পুনরাবৃত্তিও। এসব জানা তখন প্রয়োজনীয় হয়ে উঠে, কারণ ফসল বোনার কাল জানার জন্য। আর এভাবেই বছর ও দিনের মধ্যে সম্পর্ক নির্ণয়ের জন্যই মানুষ পঞ্জিকা প্রণয়ন করে।

চাঁদ ছিল প্রাথমিক পঞ্জিকাগুলোর মূল ভিত্তি। কারণ রাতের আকাশে গ্রহ-তারা ছাড়াও চাঁদের কলার হ্রাস বৃদ্ধির মত একটি ঘটনা প্রাচীন মানুষের নজর এড়াইনি। তাই আদিম সভ্যতায় পঞ্জিকার হিসাব করতে চাঁদের ভুমিকাই ছিল অগ্রগণ্য। মিশরীয়রা প্রথম সৌর বছরের পরিকল্পনা করেন। জুলাইয়ের শেষের দিকে তাদের বছর শুরু হতো এবং তখন নীল নদে বন্যা হতো। তারা বছরকে ১২ মাসে এবং প্রতি মাসকে ৩০ দিনে ভাগ করেছিল। বছরের শেষে তারা অতিরিক্ত ৫ দিন যোগ করতো। সম্ভবত তাদের এই বছর-গণনা শুরু হয় খ্রি.পূ. ৪২৪১ সালে। প্রাচীন গ্রীসে মিশরীয় পঞ্জিকাই অনুসৃত হতো।

পৃথিবীর নিজ অক্ষে ঘোরার সাথে সাথে সুর্যের চারদিকে পরিভ্রমণ করে। এই পরিভ্রমণকাল ৩৬৫.২৫৬৪ দিন বা ৩৬৫ দিন ৬ ঘন্টা ৯ মিনিট ১০ সেকেন্ড। এই সময়কে সাইডেরিয়াল বছর বলে। সূর্যের চারদিকে পৃথিবীর অবস্থান অনুযায়ী ঋতু পরিবর্তিত হয় এবং মহাবিষুবণ বিন্দু থেকে পুনরায় এই বিন্দুতে আগমনের সময়টুকুকে বলা হয় ট্রাপিক্যাল বছর। সাইডেরিয়াল বছরের তুলনায় ট্রপিক্যাল বছর ছোট। ট্রাপিক্যাল বছরের সময় ৩৬৫.২৪২১৯৯ বা ৩৬৫.২৪২২ দিন অথবা ৩৬৫ দিন ৫ ঘন্টা ৪৮ মিনিট ৪৬ সেকেন্ড। এই সময় স্বল্পতার কারণে অয়ন বিন্দুর চলনের জন্য বিষুবণ বিন্দু প্রতিবছর প্রায় ২০ মিনিট এগিয়ে যায়। ফলে প্রথিবী সাইডেরিয়াল বছরের তুলনায় ২০ মিনিট আগেই ট্রপিক্যাল বছর পূর্ণ করে।

আবার আকাশের কোন নক্ষত্রের তুলনায় পৃথিবীর চারদিকে চাঁদের একবার ঘুরে আসতে লাগে ২৭ দিন, ৭ ঘন্টা, ৪৩ মিনিট, ১১.৫ সেকেন্ড। একে চাঁদের সাইডেরিয়াল মাস বলে। এদিকে এই সময়টুকুতে পৃথিবী নিজ কক্ষপথে প্রায় ২৭ ডিগ্রি পথ অতিক্রম করে। এভাবে সুর্যের তুলনায় পৃথিবীর চারদিকে চাঁদের একবার পরিভ্রমণ করতে সময় লাগে ২৯ দিন ১২ ঘন্টা ৪৪ মিনিট ২.৪ সেকেন্ড বা ২৯.৫৩০৬ দিন। এই সময়কে চাঁদের সাইডোনিক মাস বলে। মূলত সাইডোনিক মাসের হিসেবেই চান্দ্রমাস গণনা করা হয়। মোট ১২টি চাঁন্দ্রমাস (২৯.৫ X১২= ৩৫৪) এক সৌরবৎসরের তুলনায় ১১ দিন কম।

মিশরীয়, মেসোপটেমিয় পঞ্জিকা ছাড়াও রয়েছে ভারতীয়, রোমক, গ্রীক, চৈনিক, ইহুদী ও ইসলামীক পঞ্জিকা।
আমাদের আধুনিক পঞ্জিকা তার আদিরূপ পরিগ্রহ করে রোমে। ৪৬ খ্রীষ্টপূর্বাব্দের আগে রোমের আশপাশের শহর গুলোতে বিভিন্ন পঞ্জিকা প্রচলিত ছিল। রোমে ৩৬৬.২৫ দিনের হিসেবে বছর গণনা করা হতো এবং অধিমাস নির্ণয়ে নানারকম জটিলতা দেখা দিত। বছরের সঠিক দৈর্ঘ্য নির্ণীত হবার পর পঞ্জিকা সংস্কারের এগিয়ে আসেন জুলিয়াস সিজার। আলেকজান্দ্রিয়ার জ্যোর্তিবিদ সোসিজিনিস এর সহায়তায় জুলিয়াস সিজার যে পঞ্জিকার সংস্কার করেন তাতে মিশরীয় পঞ্জিকার পদ্ধতি অনুসরণ করেন।

নতুন প্রবর্তিত পঞ্জিকার একক হিসেবে চাঁন্দ্রমাস বাতিল করা হয় এবং প্রতি বছরকে ৩০ বা ৩১ দিন বিশিষ্ট ১২ মাসে ভাগ করা হয়। শুধু ফেব্রুয়ারীতে দিন সংখ্যা ২৯।

পঞ্জিকার ট্র্যাপিক্যাল বছর অনুযায়ী দৈর্ঘ্য নির্ণয় করা হয়েছিল ৩৬৫.২৫ দিন। এই ০.২৫ চার বছর শেষে যোগ করে ৩৬৬ দিনে অধিবর্ষ গণনা করা হয়। প্রচলিত রোকম পঞ্জিকাগুলোতে স্থানচ্যুত মহাবিষুবনের তারিখটিকে পুনরায় প্রথাবদ্ধ ২৫ মার্চ তারিখে সংস্থাপন করেন। এটা করতে গিয়ে জুলিয়াস সিজারকে ৪৬ খ্রীর্ষ্টপূব্দের বছরটিতে অতিরিক্ত ৩ মাস যোগ করতে হয়। এরফলে খ্রী.পূ. ৪৬ সালের দিন সংখ্যা দাড়ায় ৪৪৫। তাই এই সময়কে বলা হয় “বিভ্রান্তির বছর”। জুলিয়ান বর্ষপঞ্জির যাত্রাকাল জানুয়ারী ১, ৪৫ খ্রি.পূ. সাল। এ বর্ষপঞ্জি জুলিয়ান ক্যালেন্ডার নামে পরিচিত।

রোমক পঞ্জিকার ১২ মাসের নামকরণের তাৎপর্য:

জানুয়ারী – দেবতা জনুস এর নাম অনুসারে।
ফেব্রুয়ারী – ফেব্রুয়ালীকা বা “প্রায়শ্চিত্তের ভোজ” এ সময় বলি দেয়া হতো।
মার্চ – যুদ্ধের দেবতা “মারস” এর নাম অনুসারে।
এপ্রিল – ল্যাটিন এপ্যিরির অর্থাৎ প্রস্ফুটিত হওয়া
মে – উদ্ভিদ পরিচর্চার দেবী ‘মাইয়্যা’ এর নামানুসারে।
জুন – ল্যাটি জুভেনিস অর্থাৎ যৌবন কাল।
জুলাই (কুইন্টিলিস) ল্যাটিন কুইন্টিলিস যা পঞ্চম সিজারের মৃত্যুর পর নতুন নামকরণ হয় জুলিয়াস সিজারের সম্মানে জুলাই।
সেক্সটিলিস – আগষ্ট, ল্যাটিন অর্থ ষষ্ঠ
সেপ্টেম্বর- ল্যাটিন সেপ্টেম অর্থ সপ্তম
অক্টোবর- ল্যাটিন অকটেম অর্থ অষ্টম
নভেম্বর- ল্যাটিন নভেম অর্থ নবম
ডিসেম্বর- ল্যাটিন ডিসেম অর্থ দশম

জুলিয়াস সিজারের ব্যবহৃত বছরের দৈর্ঘ্য প্রকৃত ট্রপিক্যাল বছরের তুলনায় ১১ মি. ১৪ সে. বেশি ছিল। এতে ৩২৫ সাল নাগাদ মহাবিষুবনের তারিখটি মোট ৪ দিন এগিয়ে যায়। এ সমস্যার সমাধান করেন Council Of Nicaea। ৩২৫ সালে মহাবিষুবন তারিখটি ২৫ মার্চের বদলে ২১ মার্চ নির্দিষ্ট করা। Nicaea’র সভার অন্যতম প্রধান কাজ ছিল বিভিন্ন ছুটির দিন এবং অন্যান্য বিভিন্ন ধর্মীয় উৎসবের দিন নির্ধারণ করা। সেই অতিরিক্ত ১১ মিনিট ১৪ সেকেন্ড প্রতি বছর যোগ হতে হতে ১৫৮২ সাল নাগাদ অতিরিক্ত ১০ দিনের বিশৃংখলা সৃষ্টি করে। তাহলে বসন্তের প্রথম দিন বা মহাবিষুবন হয় ১১ মার্চ! যার দরুন অন্যান্য খ্রীষ্ট্রিয় উৎসব সমুহ শীতের প্রথমার্ধে অবস্থান নেয়। এ সমস্যার সমাধান করেন ত্রয়োদশ পোপ গ্রেগরী। এজন্য তিনি ২টি পদক্ষেপ নেন, প্রথমে তিনি পঞ্জিকা থেকে ১০ দিন বাদ দেন। ১৫৮২ সালের অক্টোবর ৪ এর পরবর্তী দিন ছিল অক্টোবর ১৫।

তাঁর দ্বিতীয় পদক্ষেপ ছিল অধিবর্ষের অসামঞ্জস্যতা সংস্কার করা। জুলিয়ান পঞ্জিকার প্রতি ৪ বছর শেষে অধিবর্ষসহ যে কোন বছরে যে গড় দিন সংখ্যা হয় তা প্রকৃত দিন সংখ্যার চেয়ে সামান্য কিছু বড়। দিনের এই সামান্য ভগ্নাংশ পূর্ণ ১ দিনে পরিণত হতে সময় নেয় ১২৮ বছর। এ কারণে প্রতি ১২৮ বছর শেষে একটি অতিরিক্ত দিন পঞ্জিকার সুষম অগ্রগমন পাওয়া যায়। তাই ১২৮ বছর পর ১ দিন বাদ দেওয়ার ব্যাপারটিকে গ্রেগরী একটু নিয়মতান্ত্রিক করলেন। এটাই গ্রেগরীয়ান বর্ষপঞ্জি। জুলিয়ান নিয়মে ৪ দ্বারা বিভাজ্য প্রত্যেক বছরই অধিবর্ষ বা লিপইয়ার।

কিন্তু গ্রেগরীয়ান নিয়মানুসারে যে সব শতববর্ষগুলো ৪০০ দ্বারা বিভাজ্য শুধু সে গুলোই অধিবর্ষ হিসেবে গণ্য করা হবে। অর্থাৎ ১৭০০, ১৮০০ এবং ১৯০০ সাল জুলিয়ান নিয়মানুসারে অধিবর্ষ কিন্তু গ্রেগরিয়ান নিয়মানুসারে সেগুলো অধিবর্ষ নয়। আবার ১৬০০ এবং ২০০০ সাল উভয নিয়মেই অধিবর্ষ।

গ্রেগরিয়ান নিয়মে প্রতি ৩৩০০ বছর শেষে ১ দিনের সংশোধনী প্রয়োজন। এ কারণে আমরা ২৯শ শতাব্দী পর্যন্ত নিশ্চিন্তে সময় কাটাতে পারি।

মানুষ সব কিছুই নিয়মতান্ত্রিক ভাবে করতে চায়। যার দরুন বর্ষ গণনার ক্ষেত্রে হয়তো ভবিষ্যতে Perpetual Calendar (চিরস্থায়ী বর্ষপঞ্জি) সনাতন ঐতিহ্যবাহী বর্ষপঞ্জিকার স্থান দখল করবে।

লেখক:
Sujan Kumar Deb
সুজন কুমার দেব, জীবন সদস্য, বাংলাদেশ অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল এসোসিয়েশন

*এই বিভাগে প্রকাশিত লেখার মতামত এবং বানানরীতি লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাঙালীয়ানার সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকা অস্বাভাবিক নয়। তাই এখানে প্রকাশিত লেখা বা লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা সংক্রান্ত আইনগত বা বানানরীতি বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় বাঙালীয়ানার নেই। – সম্পাদক

মন্তব্য করুন (Comments)

comments

Share.