অন্যের কাজ নিজের বলে চালিয়ে দেয়ার আকাঙ্ক্ষা বঙ্গবন্ধুর ছিল না । আরিফ রহমান

Comments


১.

সাংবাদিক এ.বি.এম. মূসা লিখিত “মুজিব ভাই” গ্রন্থে মাওলানা ভাসানির সম্পর্কিত একটা ঘটনার বিবরণ পাওয়া যায়। ১৯৭২ সাল, স্বাধীনতার পরের কথা। বঙ্গবন্ধু সেই সময়ে পিত্তথলির অপারেশন করানোর জন্য দেশের বাইরে, সারা দেশে তখন খাদ্যাভাব। মাওলানা ভাসানি ভুখা মিছিল নিয়ে গণভবনে এলেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মনসুর তাঁকে সসম্মানে ঘরে নিয়ে যান। তাকে এবং তার সহচরদের খাবার দাবার দিয়ে আপ্যায়ন করা হয়। পরদিন উদ্দেশ্যমূলকভাবে সংবাদপত্রে সেই ছবি ছাপানোর ব্যাবস্থা করা হয়। শিরোনাম করা হয়- “ভুখা মিছিলে নেতৃত্ব দেয়া মাওলানার আহার বিলাস”।

বঙ্গবন্ধু সেই সময় অপারেশন শেষে সুইজারল্যান্ডে বিশ্রামরত। ঘটনা জানা মাত্র তার দলের মানুষদের কর্মকাণ্ড দেখে তিনি উত্তেজিত হয়ে ওঠেন। অত্যন্ত ক্রোধান্বিত হয়ে তিনি সেই মুহূর্তে রাষ্ট্রদূত মারফত ঢাকায় যোগাযোগ করেন। রাষ্ট্রদূতকে তিনি বলেন-

“তারা পেয়েছে কি…?”
“কতটুকু জানে তারা মাওলানা সম্পর্কে…?”

১৫ই আগস্ট ২০১৬ সালে প্রথম আলো পত্রিকায় প্রকাশিত ফারুক চৌধুরীর “মনের মুকুরে বঙ্গবন্ধু” শিরোনামের দীর্ঘ লেখা থেকে একটা ছোট ঘটনা উল্লেখ করি।

সরকারপ্রধান হিসেবে সোভিয়েত ইউনিয়ন সফরই ছিল বঙ্গবন্ধুর প্রথম রাষ্ট্রীয় সফর। রাশিয়া থেকে ফিরে আসার পরপরই বাহাত্তরের ১৭ মার্চ ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী ঢাকা সফরে এলেন। ভয়ানক কর্মব্যস্ত ছিল তাঁর সফর। সফরসূচি বাস্তবায়নের সুবিধার জন্য বঙ্গভবনে বঙ্গবন্ধুর জন্য একটি স্যুইট রাখা হয়েছিল। সেদিনের সফরসূচিতে বঙ্গভবনেই আমাদের বুদ্ধিজীবীদের সঙ্গে ছিল ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষাৎকার। সেই এক ঘণ্টা সময় ছিল বঙ্গবন্ধুর বিশ্রামের অবকাশ।

ফারুক চৌধুরী দেখতে পেলেন বঙ্গবন্ধু বঙ্গভবনের দোতলায় তাঁর কামরায় একা বসে খবরের কাগজ পড়ছেন। সেই মুহূর্তে রাষ্ট্রপতি আবু সাঈদ চৌধুরী আছেন তাঁর একতলার অফিসকক্ষে। তিনি বঙ্গবন্ধুকে জিজ্ঞেস করলেন, তিনি কি তার সঙ্গে সময় কাটানোর জন্য কি রাষ্ট্রপতিকে নিয়ে আসবেন?

বঙ্গবন্ধু বললেন-

“তুমি কি ভুলে গেলে, প্রধানমন্ত্রীকে যেতে হয় রাষ্ট্রপতির কাছে। রাষ্ট্রপতি প্রধানমন্ত্রীর কাছে আসেন না। তবে তাঁর সঙ্গে গল্প-গুজব করার তোমার প্রস্তাবটি উত্তম। চলো, নিচে যাই।”

 

 

 

এরপর আরও একটু পেছনে যাই। ১৯৭১ সালের পাঁচ বছর আগে, ১৯৬৬ সালে ছয় দফার ব্যাখ্যা বিশ্লেষণের ওপর আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে একটা বই বেরিয়েছিল। বইয়ের নাম “আমাদের বাঁচার দাবী ছয় দফা কর্মসূচি”। বইতে লেখকের নাম লেখা ছিল শেখ মুজিবুর রহমান। সত্যিকার অর্থে বইটা লিখেছিলেন আবুল মনসুর আহমদের। পলিটিক্যাল প্রকাশনায় এমন সবসময়েই হয়ে থাকে। যেহেতু ছয়দফা বঙ্গবন্ধু দিয়েছিলেন সেহেতু এর ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করে লেখা পুস্তক বঙ্গবন্ধুর নামে যাওয়াটাই বাঞ্ছনীয়।

মজার বিষয় হচ্ছে বইটা প্রকাশের সময় বঙ্গবন্ধু ছিলেন জেলে। বইটা আবুল মনসুর সাহেব লিখছেন সেটা মানিক মিয়া আর তাজউদ্দিন আহমেদ ছাড়া আর কেউ জানেন না। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই কানাকানি হতে থাকলো বইটা আবুল মনসুর সাহেব লিখে দিয়েছেন। তবে আবুল মনসুর রাজনীতির বৃহত্তর স্বার্থে বলেছিলেন “এটা মুজিবের বিরুদ্ধে অপপ্রচার, বইটা বঙ্গবন্ধুই লিখেছেন”। পরে দেখা গেলো কারাগার থেকে বঙ্গবন্ধু নিজেই অন্যদের সাথে আলোচনার সময় উদার হস্তে বারবার করে বলতে থাকেন এটা আবুল মনসুর সাহেবের লেখা। কথাটা বঙ্গবন্ধুই তুলেছিলেন। বাইরে আলোচনার সুত্রপাত আসলে বঙ্গবন্ধুর কারণেই। উল্লেখ্য এই ঘটনাটি পাওয়া যাবে আবুল মনসুর আহমেদের লেখা “আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর” বইতে

এ প্রসঙ্গে প্রখ্যাত লেখক মহিউদ্দিন আহমেদ “আওয়ামীলীগ উত্থানপর্ব ১৯৪৮-১৯৭০” বইতে লেখেন-

“এ ঘটনা থেকে বোঝা যায় শেখ মুজিব ঋণ স্বীকার করতেন। অন্যের কাজ নিজের বলে চালিয়ে দিয়ে বাহবা নেয়ার স্থুল আকাঙ্ক্ষা ওনার ছিল না। তার অনুসারিরা অবশ্য এতো উদার ছিলেন না। তাদের অনেকেই দাবী করেছেন তিনিই সবকিছু করেছেন। তারা এটা বুঝতে অক্ষম যে একজন ব্যাক্তি একা সবকিছু করতে পারেন না।”

২.

উল্লেখিত তিনটা ঘটনা থেকে আমরা যেই তিনটা অনন্য জিনিস দেখতে পাই সেগুলো সোজা বাংলায় কি কি-

ক) বিরোধী শিবিরের ওপর নোংরা পলিট্যিকাল গেইমের বিরুদ্ধে বঙ্গবন্ধু সোচ্চার ছিলেন। ভাসানির ছবি নিয়ে করা শিরোনামের কারণে তিনি অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হয়ে ওঠেন। ক্রুদ্ধ হন নিজের দলের সদস্যদের ওপরেই।

খ) বঙ্গবন্ধু যখন জাতির পিতা, স্বাধীনতার নায়ক, বঙ্গবন্ধু এবং প্রধানমন্ত্রী একই সাথে তখনো তিনি প্রেসিডেন্টের প্রটোকল মেনে চলার ব্যাপারে বদ্ধ পরিকর। কোন অহং-বোধ নেই।

গ) তিনি ঋণ স্বীকার করতেন। চেপে যেতেন না। ঋণ রাখতেন না। অন্যের কাজ নিজের বলে চালিয়ে দেয়ার স্থুল আকাঙ্ক্ষা তাঁর ছিল না।

বঙ্গবন্ধুর চরিত্রের এই দিকগুলোর কারণেই বঙ্গবন্ধু হয়ে উঠতে পেরেছিলেন বঙ্গবন্ধু। আজকে যারা বঙ্গবন্ধুর আদর্শের কথা বলেন তাদের ভেতরে এই গুণ গুলোর বড় ঘাটতি দেখি। যারা আজ বঙ্গবন্ধুর আদর্শের চর্চা করার কথা বলেন তারা কি আদৌ বঙ্গবন্ধুকে জানতে পেরেছেন? এই প্রশ্ন গুলোর মিমাংসা হওয়া জরুরি।

আজকাল আমি বঙ্গবন্ধুর আদর্শের কথা খুব শুনতে পাই, বড় দুঃখ লাগে, দেখতে পাই না…

 

[এই  লেখার মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাঙালীয়ানার সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকা অস্বাভাবিক নয়। তাই এখানে প্রকাশিত লেখা বা লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা সংক্রান্ত আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় বাঙালীয়ানার নেই। -সম্পাদক]

মন্তব্য করুন (Comments)

comments

Share.