অন্য উত্তম

Comments

বাঙালির নিজস্ব মেজাজ, চরিত্রের ষোলো আনা দাবিদার উত্তম কুমার। কখনো রোমান্টিক, কখনো বদমেজাজি, কখনো কমিক মেজাজে খামখেয়ালি, আবার কখনো ষড়যন্ত্রী। এমন কোনো চরিত্রচিত্রণ নেই, যেখানে আমরা উত্তম কুমারকে পাইনি। পাঁচ ফুট এগারো ইঞ্চির এই মানুষটি কখনো ধুতি, কখনো ট্রাউজার, কখনো স্যুট, কখনো পাঞ্জাবি আবার কখনো বা গ্রামবাংলার আটপৌরে রূপে যেন বহুরূপী। অরুণ কুমার চ্যাটার্জি থেকে জীবন-সংগ্রামে ক্রমাগত চড়াই-উতরাই পেরিয়ে উত্তম কুমার হন তিনি।

১৯২৬ সালের ৩ সেপ্টেম্বর কলকাতায় তার জন্ম। বাবা সাতকড়ি চট্টোপাধ্যায় আর মা চপলা দেবী গৃহিণী। অভাব-অনটনের সংসার; কোনওমতে দিন কেটে যায়। গিরিশ মুখোপাধ্যায় রোডের একটিমাত্র ঘরে তাঁরা থাকেন ৷ ভরসা বাড়িটি নিজের। সংসার চালানোর জন্য অরুণ শুরু করেন গান শেখানো। আজ আমরা সবাই জানি সেই সূত্রেই ধনী প্রতিবেশীর কন্যা গৌরী গাঙ্গুলির সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়।

থিয়েটারের নেশা ছিল ছোট থেকেই, পরে ঝোঁক হল রূপোলী পর্দার ওপর। শুরু করেছিলেন পাঁচ সিকের এক্সট্রার চরিত্র দিয়ে। পরে ছোটখাটো পার্শ্বচরিত্র। তারও পরে নায়ক, কিন্তু সবেতেই ফ্লপ। এর মধ্যে পাহাড়ি সান্যালের পরামর্শে নাম পালটে অরুণ হলেন উত্তম। প্রথম প্রশংসার মুখ দেখলেন, ব্রেক পেলেন ‘বসু পরিবার’ ছবিতে অভিনয়ের পর। পাঠক নিশ্চয় এবার ভাবছেন এসব জানা কথার পুনরাবৃত্তি করার মানে কি! না, পুনরাবৃত্তি ছেড়ে বরং একটু তলিয়ে দেখা যাক উত্তম উত্তম হয়ে উঠলেন কি করে? কি ভাবতেন তাঁর সহকর্মীরা তাঁর সম্বন্ধে? আর মহানায়ক উত্তম, কেমন ছিল ষ্টুডিও টেকনিশিয়ানদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক?

প্রিয় বন্ধু ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় উত্তমের ‘ভানুদা’র স্মৃতি থেকে শোনা যাক সেই গল্প। তখনকার ‘তরুণ তুর্কি’ অভিনেতা ব্রিগেডের অনেকেই যেমন, নেপাল নাগ, সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়, সলিল সেন, বানী গাঙ্গুলি এবং ভানু অনেকেই আছেন ছবিতে। নামকরাদের মধ্যে পাহাড়ি সান্যাল। পরিচালক নির্মল দে নায়কের ভাইএর চরিত্রে নিলেন উত্তমকে, বললেন, বাকিরা কিন্তু দারুণ অ্যাক্টর, লড়ে নিজের জায়গা করতে হবে। এর পরে উত্তমের নিজেকে প্রমাণের দুর্দান্ত অধ্যবসায়ের গল্প আমরা বরং ভানুদার নিজের জবানিতে শুনি।

‘লাঞ্চের পর একটা সিন ছিল, আমি বলছি, ‘টাকাটা তো আপনি শোধ দেবেন বলেছিলেন’। উত্তমের ডায়লগ ছিল, ‘বলেছি’, তারপর কাঁধ ঝাঁকিয়ে জোরে বলতে হবে, ‘সো হোয়াট’?…

‘লাঞ্চে ক্যান্টিনে গিয়ে দেখি উত্তম নেই, মাঠের মধ্যে সমানে নিজের মনে বিড়বিড় করছে আর কাঁধ ঝাঁকাচ্ছে, আমি গিয়ে দেখি ডায়লগ আওড়াচ্ছে। আমি বলি, ‘খাবি না?’ ও বলে, ‘আসছি, তুই যা’।…

‘আমি যে ঘটনাটা বলছি সেটা ৪০-৪৫ মিনিটের ব্যাপার, ও সেদিন লাঞ্চ না খেয়েই ওই দু-মিনিটের শটটা দিল।…

‘উত্তমকে আমি দিনের পর দিন উচ্চারণ, বিশেষ করে ইংরাজি উচ্চারণ পারফেক্ট করতে দেখেছি। প্রথম দিকে ওর বাংলার ‘স’, ইংরাজি ‘S’ এর উচ্চারণে গোলমাল ছিল। … আমরা ওকে খ্যাপাতাম, ‘উত্তম বাশে চড়ে বাসদ্রোণীতে যাবি?’ অথচ পরে মাস্টার রেখে ও কী ভালো ইংরাজি উচ্চারণ করত। ময়রা স্ট্রিট থাকাকালে ও রেগুলার চৌরঙ্গী পাড়ায় হলিউডের সিনেমা দেখত’।

আমরা বাঙালিরা কিন্তু আমাদের হার্ট থ্রব উত্তমের এই পরিশ্রমের ক্ষমতা, ধৈর্য এবং নিখুঁত হয়ে ওঠার নাছোড় প্রচেষ্টার কথা খুব একটা খেয়াল রাখি না। তাঁকে নিয়ে মূলধারার প্রচার মাধ্যমের নানা মুখরোচক সংবাদ এই দিকটির কথা খুব একটা তুলে ধরে নি, কারণ তাতে মহানায়কের ম্যাজিক ফিকে হয়ে যায়।

আরোও পড়ুন:
বাঙালীর মহানায়ক উত্তম

১৯৫৩ সালে  ‘সাড়ে ৭৪’ মুক্তির পর কমেডি ছবিটি নিয়ে সবার কী উল্লাস, এক নতুন জুটি এসেছে পর্দায়, যে উত্তম সুচিত্রা জুটি বাংলা সিনেমার স্বর্ণ যুগের অন্যতম পরিচায়ক। একের পর এক সফল ছবির নায়ক, অন্তত হাফ ডজন ছবির প্রযোজক উত্তম ছিলেন এক কাজ পাগল মানুষ। যাকে তাঁর সহকর্মীরা জানতেন উদার হৃদয় সরল মানুষ হিসেবে। এখনও টালিগঞ্জ পাড়ায় টেকনিশিয়ানস বা নিউ টেকনিশিয়ানস স্টুডিওতে কান পাতলে পুরনো কলাকুশলীদের কাছে শোনা যাবে গল্প, কিভাবে মহানায়ক প্রতিটি শটের পরে পরিচালক তো ছেড়েই দিন, তাঁদের অ্যাসিস্ট্যান্ট, এমনকি ক্যামেরা অ্যাসিস্ট্যান্টদেরও জিগ্যেস করতেন কেমন হল শট! কেউ উত্তর দিতে এতটুকু দ্বিধা করলে পরিচালককে অনুরোধ করতেন রিটেকএর জন্য। এতটাই সিরিয়াস ছিলেন তিনি নিজের অভিনয় নিয়ে। অন্যদিকে এ গল্পও শোনা যাবে যে কত শিল্পী বিশেষত কলাকুশলীদের দুঃসময়ে তিনি আর্থিক সাহায্য করেছেন, পাশে দাঁড়িয়েছেন।  সহজভাবে মিশতেন তাঁদের সঙ্গে।

আবার অন্যদিকে এই প্রথম আমরা বাংলা সিনেমায় দেখেছি স্টার সুলভ গ্ল্যামার সচেতন নায়ক। মনোতোষ রায়ের কাছে যোগব্যায়াম শিখেছেন। সাধারণ মানুষের থেকে মাপা দূরত্ব তৈরি করেছেন। শোনা যায়, একবার বসুশ্রী সিনেমার সামনে দিয়ে যাচ্ছেন, দেখেন অনিল চ্যাটারজি পানের দোকান থেকে পান কিনে খাচ্ছেন। অতঃপর ‘ভানুদার’ অনবদ্য ভাষায়, ‘উত্তম… হঠাৎ গাড়ি ব্যাক করে ফুটপাথের সামনে গাড়িটা নিয়ে জানালা খুলে বলে, ‘এই যে অনিল, রাস্তায় দাঁড়িয়ে যে ঘ্যাচর ঘ্যাচর চিবিয়ে পান খাচ্ছিস, ট্রামে বাসে যত লোক যাচ্ছে তোকে দেখছে, কোন ব্যাটা উজবুক আছে পয়সা দিয়ে তোর সিনেমা দেখতে যাবে!’ অথচ, সেইসময় উত্তম ও অনিলের মধ্যে অঘোষিত প্রতিযোগিতা ছিল।

একবার দেখে নেব অভিনেতা কিংবা প্রযোজক ছাড়াও বাংলা ছবিতে কত বিভিন্ন পরিচয়ে  কাজ করেছিলেন উত্তম কুমার৷‌ তিনি প্রযোজনা করেছেন ৭টি ছবি। এর বাইরে ৬টি ছবিতে কাজ করেছেন গায়ক, সুরকার, চিত্রনাট্যকার এবং পরিচালক পরিচয়ে৷‌ ১৯৫৬ সালে ‘নবজন্ম’ ছবিতে প্রথম এবং শেষবারের মতো উত্তমকুমার স্বকন্ঠে গান গেয়েছেন, ‘গৌরাঙ্গ’র ভূমিকায় নচিকেতা ঘোষের সুরে।  ১৯৬৬ সালে শচীন মুখার্জি পরিচালিত ‘কাল তুমি আলেয়া’ ছবির গীতিকার পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে প্রথম জুটি গড়েন সুরকার উত্তম৷‌ তার সুরে হেমন্ত মুখোপাধ্যায় গাইলেন ‘যাই চলে যাই’৷‌ আশা ভোসলের কন্ঠে শোনা গেল দুটি গান, ‘আমার মনের মানুষ ফিরল ঘরে একটু বেশি রাতে’ এবং ‘পাতা কেটে চুল বেঁধে সে টায়রা পড়েছে’৷‌ ছবি সুপারহিট হলো৷ এই বছরেই উত্তম ‘শুধু একটি বছর’ ছবির চিত্রনাট্য তৈরি করেন।

১৯৭৩ সালের‌ শিল্পী সংসদ প্রযোজিত রমাপদ চৌধুরীর উপন্যাস অবলম্বনে ‘বনপলাশীর পদাবলী’ছবির চিত্রনাট্য লেখেন উত্তম, তিনি তখন শিল্পী সংসদের সভাপতি৷‌ এই দুটি ছবির পরিচালনাও করেছিলেন তিনি। ‘বনপলাশীর পদাবলী’ সুবর্ণজয়ন্তী পেরিয়ে সুপারহিট হয়।

১৯৬১ সালে ‘সপ্তপদী’ সিনেমায় উত্তম রিনা ব্রাউনকে নিয়ে অভিনয় করেছিলেন সেই চিরস্মরণীয় দৃশ্যে, ‘এই পথ যদি না শেষ হয়, তবে কেমন হতো তুমি বলো তো’; মনে হয় আজও বাঙালির মনে তাঁর পথ চলা শেষ হয়নি। প্রতিটি ক্ষণে আছেন, থাকবেন অনন্তকাল।

‘তথ্যসূত্র: ভানু সমগ্র। সৌজন্য: বাসবী ঘটক, গৌতম বন্দ্যোপাধ্যায়।

বাঙালীয়ানা/এসসি/এসএল

মন্তব্য করুন (Comments)

comments

Share.