একাত্তরে এরশাদ এবং একজন শহীদ মুখতার ইলাহী । মারুফ আহমেদ

Comments
দু’জনই একই শহরের বাসিন্দা, একই শহরে জন্ম, বেড়ে ওঠা; শোনা যায় দুঃসম্পর্কের আত্মীয়তাও ছিল দু’জনের মধ্যে, মিল বলতে এটুকুই, বাকি পুরোটা অমিল। দুইজনের আদর্শে কয়েক যোজন ফারাক, মুক্তিযুদ্ধের লিটমাসে দুইজনের অবস্থানও বিপরীতমুখী।
একজন শহীদ হন একাত্তরেই, এক চিলতে স্বাধীনতা পেতে আমরা যে ক’জন কৃত্তিমানকে হারিয়েছি উনি তাদের একজন। আর বাকিজন?? তিনি একইসাথে জাতিকে পিঠ দেখিয়েছেন আবার সেই স্বাধীনতার বেনিফিশিয়ারীও হয়েছেন।
আমি শহীদ ছাত্রনেতা শহীদ মোখতার এলাহী ও সাবেক রাষ্ট্রপতি, স্বৈরশাসক হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের কথা বলছি।
এরশাদকে আমরা সবাই চিনি, শুধু স্বৈরশাসক হিসেবে নয়, শুধু সাবেক রাষ্ট্রপতি হিসেবে নয়, জোটের রাজনীতি নামক অদ্ভুতুড়ে এক নেগোসিয়েশনে পতিত স্বৈরশাসক এরশাদ আওয়ামী ইতিহাসেরও অংশ হতে যাচ্ছেন।
সেই সুত্র ধরে জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকীতে এরশাদ উদযাপন জাতীয় কমিটিরও গুরুত্বপূর্ণ পদে জায়গা করে নিয়েছেন!
কিন্তু মুখতার এলাহী? ৬৯-৭০-৭১ সালে রাজপথে, স্লোগানে, মিটিংয়ে আগুন ঝরানো সেই ছাত্রনেতাকে কতজন চিনি আমরা? যার রাজনীতির হাতেখড়ি হয়েছিল বড়ভাই, কারমাইকেল কলেজের আরেক ভিপি মুশতাক এলাহীর (মোশতাক এলাহী ৬৬-৬৭ সালে একই কলেজের ভিপি ছিলেন) হাত ধরে, যিনি শুধু তেজস্বী ছাত্রনেতাই ছিলেন না, ছিলেন তুখোর বক্তা, মেধাবী ছাত্র, সাহিত্যমনা।
খুবই কম মানুষই মুখতার এলাহীকে চিনি৷ ইতিহাস নিজেও মুখতার এলাহীর ব্যাপারে বিমাতাসুলভ আচরণ করেছে । যে মরে গেছে তার হিসেব বাদ টাইপ অবজ্ঞাসূচক বাণীটির মত আমরা মুখতার এলাহীকে খারিজ থিওরিতে ফেলে দিয়েছি।
যাক সেসব আক্ষেপের কথা, ইদানিং আর এসব বলতেও ইচ্ছে করে না, ভয়ে আবার কখনো কখনো হতাশায়!
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে শুরুর দিকে যখন প্রবাসী সরকার মুক্তিযুদ্ধকে গুছিয়ে একটা পরিকল্পিত রূপ দেয়ার চেষ্টা করছিলেন তখন সবার আগে ডাক পড়েছিল বাঙালী সামরিক অফিসারদের। বাংলার দামাল ছেলেদের জীবন দেয়ার মানসিকতা ছিল ঠিকই কিন্তু জীবন দিয়ে যুদ্ধ জেতা যায় না, বিশ্বের পঞ্চম শক্তিধর সেনাবাহিনীর সাথে অসম যুদ্ধে জিততে হলে জীবন বাজি রাখতে পারা অকুতোভয় সৈনিকের দরকার আছে, তবে তার থেকে বেশী দরকার সেই যোদ্ধাদের যথোপযুক্ত ট্রেনিং। দরকার অভিজ্ঞ সেনা অফিসারও।
রংপুর তখন ৬ নম্বর সেক্টরের অধীনে, সে সময়ের সেনাবাহিনীর গুটিকয়েক বাঙালী অফিসারদের মধ্যে অন্যতম মেজর এরশাদও তখন অবকাশ যাপনে রংপুরের বাসায়। সেক্টর ৬ এর কমান্ডার এম কে বাশারসহ সকলে সিদ্ধান্ত নিলেন রংপুরে একজন প্রতিনিধি পাঠাবেন এরশাদকে মুক্তিযুদ্ধে যোগদানের আহবান জানাতে। কিন্তু কাকে পাঠানো যায়? সবাই একমত হলেন যে এমন কাউকে পাঠাতে হবে যিনি এরশাদের বাড়ি চিনেন, চেনেন রংপুর শহরটাকেও, যিনি এরশাদের কাছে স্বাধীনতার প্রয়োজনীয়তা,  মুক্তিযুদ্ধে এরশাদের যোগদানের গুরুত্ব বোঝাতে পারবে ন৷
ছাত্রনেতা মুখতার এলাহী এগিয়ে এলেন, নিজে থেকেই আগ্রহ প্রকাশ করলেন। মুখতার এলাহী সেসময় রংপুরের জনপ্রিয় ছাত্রনেতা, উত্তরের অক্সফোর্ড খ্যাত কারমাইকেল কলেজের তিন তিনবারের নির্বাচিত ভিপি, বক্তব্য, প্রেজেন্টেশন সব দিক থেকে দারুণ স্মার্ট, এরশাদের দুঃসম্পর্কের আত্মীয়ও হোন। সব মিলিয়ে মুখতার এলাহীকে পাঠানো হল এরশাদকে মুক্তিযুদ্ধে যোগদানের আহবান জানাতে।
নভেম্বর মাসের শুরুর দিকে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে রংপুর আসেন মুখতার এলাহী, সঙ্গী আরো দুইজন মুক্তিযোদ্ধাসহ রংপুর শহরে আত্মগোপন করেন।  কয়েকদফা চেষ্টা করেও এরশাদের সাথে দেখা করতে ব্যর্থ হন, মোখতার এলাহী দেখা করতে চাইলে এরশাদ দেখা করতে রাজি হননি।
মিশন ফেইলড!
১৯৭১ সালের ৯ নভেম্বর দুইজন সঙ্গীসহ ব্যর্থ মনোরথে ফেরার পথ ধরেন মোখতার এলাহী, লক্ষ্য ফুলবাড়ি হয়ে সাহেবগঞ্জ সাব-সেক্টরে ফেরা। রংপুর তখন উত্তাল, একের পর এক ঝটিকা আক্রমণে বিপর্যস্ত পাকিস্তানি সেনাবাহিনী, ঢাকায় ক্র্যাক প্লাটুনের আক্রমণ, চিলমারীসহ রংপুরের বিভিন্ন স্থানে বারবার মার খেয়ে ক্ষুদ্ধ হায়েনার দল মুক্তিযোদ্ধাদের হন্যে হয়ে খুঁজছে। তিস্তায় আঁটসাঁট বেঁধে পাহারা। অনেক পথ ঘুরে নদী পার হয়ে লালমনিরহাট পৌঁছলেন মোখতার এলাহীর ছোট্ট দলটি। পথিমধ্যে রাত হয়ে যায়, বড়বাড়ির আইরখামারে এক বাড়িতে রাত্রিযাপনের সিদ্ধান্ত নেন।
শুরুতে বলেছিলাম, মুখতার এলাহী তখন গোটা উত্তরবঙ্গে ব্যাপক জনপ্রিয় ছাত্রনেতা, কারমাইকেল কলেজে ছাত্র সংসদের তিন-তিনবারের ভিপিই শুধু নয়, রংপুরে ব্যাপক গণ-আন্দোলনের অন্যতম ছাত্রনেতাও তিনি, ৩ মার্চ বিক্ষোভের অন্যতম রূপকার। বিএলএফ (রংপুর অঞ্চল) কমান্ডার মুখতার এলাহীর নাম তখন মুখে মুখে। এই জনপ্রিয়তাই কাল হয়েছিল সেদিন, মুখতার এলাহীর আইরখামারে অবস্থানের খবর দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে, শেষরাতে বেরিয়ে পড়ার আগেই লালমনিরহাট বিমানবন্দর থেকে একটি কনভয় আইরখামার আক্রমণ করে। সঙ্গী দুইজনের একজন পালিয়ে যেতে সক্ষম হলেও মুখতার এলাহী ও অপর সঙ্গী পাকিস্তানি বর্বর বাহিনীর হাতে ধরা পড়েন। সেদিন মুখতার এলাহীসহ আইরখামারের অনেকেই শহীদ হন, পুড়িয়ে দেয়া হয় পুরো গ্রাম৷
দেশ স্বাধীন হয়৷ শহীদ মুখতার এলাহীদের রক্তের দাঁড়িয়ে দেশে প্রতিষ্ঠিত হয় স্বাধীন রাষ্ট্র ব্যবস্থা৷ স্বাধীনতার পর পাকিস্তান ফেরত ১২০০ সেনাসদস্য চাকরীতে পুনর্বহাল হলেও প্রায় ৫০ জনকে সেনাবাহিনী চাকরী দিতে অস্বীকৃতি জানায়৷ এই ৫০ জনের ওপর যথেষ্ট সুযোগ থাকার পরও মুক্তিযুদ্ধে যোগ না দেয়ার শক্ত অভিযোগ ছিল৷ হুসেইন মোহাম্মদ এরশাদ সেই ৫০ জনের তালিকার অন্যতম একজন৷ অবশেষে এরশাদের মামা কুড়িগ্রামের আওয়ামী লীগ নেতা প্রতিমন্ত্রী রিয়াজউদ্দিন আহমেদ ভোলা মিয়ার বিশেষ অনুরোধে এরশাদকে চাকরীতে বহাল রাখেন বঙ্গবন্ধু।
এরপরের ইতিহাসটুকু আমাদের সবার জানা, বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পর সেনাশাসক জিয়াউর রহমানের আমলে আইনের তোয়াক্কা না করে এরশাদের রহস্যজনক ডাবল প্রমোশন থেকে শুরু করে জিয়া হত্যায় এরশাদের সম্পৃক্ততার গন্ধ, এরপর এরশাদের সেনাশাসক থেকে স্বৈরশাসক হওয়ার গল্পটা তো খুব বেশীদিন আগের কথা নয়৷ বাংলাদেশকে অন্তত একশ বছর পিছিয়ে দেয়ার কাজটা এরশাদ করেছেন এই কিছুদিন আগেই, মধ্যবয়সী যে কেউ বলতে পারবেন৷ এখনও বিশেষ ইস্যুগুলোতে যুবলীগ কর্মী নুর হোসেনের ছবি ভার্চুয়াল জগতে ভাসতে ভাসতে মনে করিয়ে দেয় কি ছিল এরশাদ!
কালের স্রোতে এরশাদ আজ জীবনসায়াহ্নে দাঁড়িয়ে৷ উপমহাদেশের ইতিহাস ব্রেক করা স্বৈরশাসক এরশাদের চিকিৎসার টাকা জোগাড় না হওয়ার খবর এই সেদিনও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেখা গেছে৷
সম্প্রতি গুজব উঠেছিল এরশাদ মারা গেছেন৷ আমার আফসোস হয়েছিল খুব৷ আমি চাই এরশাদ বেঁচে থাকুক, সুস্থ হোক৷ একবার অন্তত রংপুর যাক৷ মেডিকেল মোড়ের নতুন নামকরণ হয়েছে ‘শহীদ মুখতার এলাহী চত্বর’। সেই শহীদ মুখতার এলাহী যার শহীদানের ইতিহাসে এরশাদ জড়িয়ে আছে, সেই শহীদ মুখতার এলাহী যার অনুপস্থিতির আফসোস আমি এখনও করি৷
এরশাদের গাড়িবহর যখন জরুরী কাজ সেরে শহীদ মুখতার এলাহী চত্বর হয়ে শহরে প্রবেশ করবে, বড় বড় অক্ষরে লেখা “শহীদ মুখতার এলাহী চত্বর” দেখে এরশাদের চুপসে যাওয়া মুখটা দেখতে চাই আমি৷
স্বাধীনতার জয়ী শক্তি আর পরাজিত শক্তির পার্থক্য ঘুচিয়ে দিয়েছে রাজনৈতিক সমীকরণ নামক আজব বস্তুটি৷ অবশিষ্ট সুক্ষ্ম পার্থক্যটুকুর অস্তিত্ব আছে এই চুপসে যাওয়া চেহারায়৷
মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী নতুন প্রজন্মের একজন সন্তান হিসেবে আমি এই চুপসে যাওয়া মুখ দেখে স্বাধীনতার পক্ষের একজন হওয়ার সুখটা পেতে চাই৷
তথ্যসুত্র:
১. মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের খোঁজে কুড়িগ্রাম – তাজুল মোহাম্মদ
২.মুক্তিযুদ্ধের আঞ্চলিক ইতিহাসঃরংপুর – আব্রাহাম লিংকন
৩. বিরোধের প্রথম প্রহর – রফিকুল ইসলাম।

লেখক পরিচিতি:
মারুফ আহমেদ, লেখক, মুক্তিযুদ্ধ বিশ্লেষক

মন্তব্য করুন (Comments)

comments

Share.

About Author

বাঙালীয়ানা স্টাফ করসপন্ডেন্ট