অপারেশন মোনেম খান ও কিশোর মোজাম্মেল

Comments

১৯৫৬ সালের ১২ ডিসেম্বর ঢাকা শহরের নিকটবর্তী ভাটারায় মোজাম্মেল হকের জন্ম। রাজধানীর ছোলমাইদে তার বেড়ে ওঠা। ১৯৭১ সালে তিনি ছিলেন শাহীনবাগের স্টাফ ওয়েলফেয়ার স্কুলের নবম শ্রেণীর ছাত্র। পাকিস্তানী দুঃশাসন বুঝবার মতো বয়স তার হয়েছে। ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের খুব কাছে বসবাসের কারণে তিনি প্রত্যক্ষ করেছেন বাঙালীর উপর পাকিস্তানী সৈন্যবাহিনীর অত্যাচার এমনকি অবাঙালীদের (বিহারী) বাঙালীর উপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন। ভেতরে ভেতরে ক্রোধ জমতে থাকে তার।

২৫ মার্চের রাতে তার বাবা যখন ধানি জমিতে সেচ দিচ্ছিলেন আর তিনি বাবার জন্য খাবার নিয়ে এসেছেন তখনই হঠাৎ ক্যান্টনমেন্টের দিক থেকে গুলির শব্দ। মর্টারের ফায়ার আর ফ্লেয়ার গানের আলোয় পুরো আকাশ মাঝে মাঝে ঝলসে ওঠে। দ্রুত বাবা তাকে নিয়ে বাড়ী ফিরে এসেছেন। কিছুদিনের মধ্যেই মোজাম্মেল বুঝতে পারলেন যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে, পাকিস্তানীদের বিতাড়িত করতে যুদ্ধ। অন্তরে জমে থাকা ক্রোধ যেন রক্তে প্রলয় জাগালো।

সিদ্ধান্ত নিলেন যুদ্ধে যাবার। পার্শ্ববর্তী গ্রামের রহিমুদ্দীনের সাথে সলাপরামর্শ করে তিন চাচাতো ভাইসহ তৈরী হলেন যুদ্ধে যোগ দেয়ার। পরিবারের নানা বাধা-বিঘ্ন পেরিয়ে একদিন রওয়ানাও হলেন কিন্তু নির্ভয়পুর ক্যাম্পে রোগাক্রান্ত মানুষের মুখোমুখি হয়ে হতবিহ্বল মোজাম্মেল চাচাতো ভাইয়ের প্ররোচনায় ফিরে এলেন ছোলমাইদে। কিন্তু মনকে মানাতে পারলেন না কোনভাবেই। যুদ্ধ করে পাকিস্তানীদের কবল থেকে দেশমুক্তির চেতনা যেন গেঁড়ে বসেছে অন্তরে। কিছুতেই স্বস্তি পাচ্ছেন না এই কিশোর মোজাম্মেল।

1971_Guerilla_Mozammel Huq04

মোজাম্মেল হক বীর প্রতীক

জুলাই মাসের এক সময় গ্রামে এলেন মুক্তিযোদ্ধা রহিমুদ্দীন। ক্যাম্প থেকে গ্রামে ফিরে আসার জন্যে রহিমুদ্দীনের ভর্ৎসনা সত্ত্বেও তিনি আকুতিমিনতি করলে রহিমুদ্দীন তার অপারেশনে সাহায্যের প্রস্তাব দিলেন এবং বললেন এটা মোজাম্মেলের জন্যে হবে পরীক্ষা। এ পরীক্ষায় উৎরে গেলে তিনি মোজাম্মেলকে নিয়ে যাবেন ট্রেনিং ক্যাম্পে। মোজাম্মেল হকের তখন এমনই অবস্থা যে যেকোন শর্তেই তিনি রাজি।

রহিমুদ্দীন এক সন্ধ্যায় মোজাম্মেলকে একটি ৩৬ হ্যান্ড গ্রেনেড হাতে দিয়ে এর ব্যবহার শিখিয়ে দিয়ে বললেন, “এই বোমার ৩৬ টি টুকরো আছে। এটি ফাটলে ৩০ গজের মধ্যে যারা আছে, তারা সবাই মারা যাবে। তোমাকে এটি বিদেশীদের মার্কেটে মারতে হবে। পারলে সাহসিকতার পরীক্ষায় পাস।”

এরপর গ্রেনেডটিকে পকেটে নিয়ে রহিমুদ্দীনসহ গুলশান ২ নম্বর ব্রিজ পার হয়ে দুজনে একটা বেবী ট্যাক্সি নিয়ে গুলশান ১ নম্বর ডিআইটি মার্কেটে গেলেন। সেখানে বিদেশীদের আনাগোনা থাকে সবসময়। রহিমুদ্দীন ‘রেকি’ করে বললেন, এখানে সুবিধা হবে না, প্রচুর মিলিটারির পাহারা।” তাই দুজনে আরেকটি বেবী ট্যাক্সি নিয়ে মহাখালি টিবি হাসপাতাল গেটের দিকে যাবার পথে বিদেশী পতাকা ওড়ানো একটি বাসা দেখে রহিমুদ্দীন সিদ্ধান্ত নিলেন এখানেই গ্রেনেড চার্জ করবার। ট্যাক্সি ঘুরিয়ে ফিরতি পথে রহিমুদ্দীন ইশারা দিতেই মোজাম্মেল চলন্ত বেবী ট্যাক্সি থেকে গ্রেনেডটির পিন খুলে ওই বাড়ির ভেতর ছুঁড়ে মারলেন। ট্যাক্সি কিছুদূর যাওয়ার পরেই বিকট শব্দে গ্রেনেডটি বিস্ফোরিত হল। 

পরদিন পত্রিকায় মোজাম্মেল বড় বড় হেডলাইনে খবর দেখলেন, দুস্কৃতকারীরা বিদেশী দূতাবাসে গ্রেনেড হামলা করেছে!

ব্যাস আর কী! রহিমুদ্দীনের পরীক্ষায় পাস। একদিন রাতে বাড়িতে মায়ের বানানো কাঁঠালের পিঠা খেতে খেতে মাকে মোজাম্মেল জানিয়ে দিলেন পরদিন সকালে তিনি ভারতে ক্যাম্পে যাবেন।

পরদিন ভোরে মা’র ধার করা ২৪৬ টাকা নিয়ে মোজাম্মেল গুলশান ২ নম্বর বাস স্ট্যান্ডে পৌঁছুলেন, যেখানে মুক্তিযোদ্ধা রহিমুদ্দীন আগে থেকেই তার জন্যে অপেক্ষা করছিলেন। দুজনে গুলিস্তান থেকে ইপিআরটিসির বাস ধরে কুমিল্লা, সেখান থেকে আবার সেই গোমতি নদী পার হয়ে পৌঁছলেন মেলাঘর ট্রেনিং ক্যাম্পে। সেখানে ২ নম্বর সেক্টরের সেকেন্ড ইন কমান্ড মেজর এটিএম হায়দার তাকে দেখেই রহিমুদ্দীনকে ধমক দিয়ে বললেন, কী সব পোলাপাইন নিয়ে এসেছো! এই সব দিয়ে কী যুদ্ধ করা যায়? রহিমুদ্দীন তাকে জানালেন, “স্যার, ও ছোট হলেও খুব সাহসী। ঢাকার বিদেশী দূতাবাসে হ্যান্ড গ্রেনেড চার্জ করেছে!”

মেজর হায়দার মোজাম্মেলের দেশপ্রেম আর বীরত্বের এই অপারেশনের কথা শুনে তাকে ট্রেনিঙে নিতে সম্মতি দিলেন। শুরু হল ১৪ বছরের কিশোর মোজাম্মেলের গেরিলা ট্রেনিং। ২১ দিনের সেই ট্রেনিঙে তিনি লাইট মেশিন গান (এলএমজি), কয়েক ধরনের রাইফেল, স্টেনগান, প্লাস্টিক এক্সপ্লোসিভ, এন্টি ট্যাংক মাইন, ১৬ ইঞ্চি মাইন, ফসফরাস বোমা, গ্রেনেড নিক্ষেপ, অ্যামবুশ প্রশিক্ষণ পেলেন।

1971_Guerilla_Mozammel Huq05

মোজাম্মেল হক বীর প্রতীক

২১ দিন পর ১৫ জন নিয়ে ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট গেরিলা গ্রুপ তৈরি হলো যার অন্যতম সদস্য হলেন মোজাম্মেল হক। এ গ্রুপের কমান্ডার হলেন এম এ লতিফ। আর সেই রহিমুদ্দীনকে করা হলো ডেপুটি কমান্ডার।

কিন্তু দুর্ভাগ্য বোধহয় একেই বলে। ঢাকার উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিয়ে ১৫ জন যোদ্ধা কুমিল্লা সিএনবি রোডে উঠতেই পাকসেনাদের অ্যামবুশের মুখে পড়লো। ৩/৪টা বাঙ্কার থেকে শুরু হলো ক্রমাগত মেশিনগানের গুলি। বাধ্য হয়ে পাট ক্ষেতে পালিয়ে থেকে পরদিন বুকে ভর দিয়ে ফিরে আসতে হল মেলাঘরে।

মোজাম্মেলের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়লো যেন। মেজর হায়দার বেঁকে বসলেন, বললেন, “এদের মর‌্যাল ডাউন হয়ে গেছে। এদের দিয়ে আর যুদ্ধ হবে না! এদের কোনো একটি গেরিলা ইউনিটে গোলা বারুদ বহনকারী হিসেবে যোগানদারের দায়িত্ব দাও!”

দেশমাতৃকাকে মুক্ত করবার উদগ্র বাসনায় যে জীবন উৎসর্গ করতে মনঃস্থ করেছেন তা পূর্ণ করবার সুযোগ খুঁজতে মেজর হায়দারের মনযোগ আকর্ষণের চেষ্টায় প্রতিদিন রুটিন করে মেজর হায়দারের অফিসের সামনে অ্যাটেনশন হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে শুরু করলেন। সপ্তাহ দুয়েকের মধ্যেই ফল মিলল।

মেজর তাকে ডেকে বললেন, “এই তোর কী হয়েছে? প্রত্যেক দিন এখানে দাঁড়িয়ে থাকিস কোনো?”
উত্তরে মোজাম্মেল বললেন, “স্যার আমাদের যুদ্ধে পাঠান। আমরা মরতে ভয় পাই না।”
মেজর বললেন, “তোদের দিয়ে তো যুদ্ধ হবে না। তোদের মর‌্যাল বলতে আর কিচ্ছু নেই।”
নাছোড়বান্দা মোজাম্মেল বললেন, “না স্যার, আমরা পারবো। আমাদের একটা অপারেশন দিয়েই দেখুন না!”
মেজর হায়দার বললেন, “তুই কাউকে মারতে পারবি?”
এক মুহুর্ত অপেক্ষা না করেই মোজাম্মেল বললেন, “স্যার, পাকিস্তানের স্পীকার আব্দুল জব্বার খানকে মারতে পারবো। আমি ওনার গুলশানের বাসা চিনি”
মেজর হেসে ফেললেন সহযোগী মুক্তিযোদ্ধাকে দেখিয়ে বললেন, “বেয়াদব, জানিস, ইনি কে?”
উত্তর এলো, “জি স্যার, ইনি বাদল (শহিদুল্লাহ খান) স্যার।”
হাসতে হাসতে হায়দার বললেন, “আব্দুল জব্বার খান বাদল স্যারের আব্বা।”
বিচলিত মোজাম্মেল নিজেকে সামলে নিয়ে বললেন, “স্যার আপনি যাকে বলবেন আমি তাকেই মারতে পারবো।”
কমান্ডার বললেন, “আচ্ছা, তুই ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় থাকিস, গভর্নর মোনেম খানকে মারতে পারবি?”
“স্যার, এটা আমার জন্য অনেক সহজ। আমি তার বাসা চিনি। ছোট বেলায় তার বাসার ওখানে খেলতে গেছি। বনানী কবরস্থানে আমাদের লাউয়ের ক্ষেত আছে। আমার এক দূর সম্পর্কের জব্বার চাচা মোনেম খানের বাসার গোয়ালা।” এক দমে কথাগুলো বলে ফেললেন মোজাম্মেল।
মেজর হায়দার হেসে হুকুম দিলেন, “গেট টেন, উল্লুক কা পাঁঠা।”
মোজাম্মেল হকের ভাষায়:
“সঙ্গে সঙ্গে আমি ১০ টা বুক ডন দিতে লেগে যাই। বুঝতে পারি, আমাকে মোনেম খান কিলিং অপারেশনের দায়িত্ব দেয়া হচ্ছে! এবার আমি তাকে পাল্টা প্রশ্ন করি, স্যার, যদি অপারেশন করতে পারি তবে আমাকে কী পুরস্কার দেবেন?”
মেজর বললেন, “তুইই বল, তুই কী চাস?”
কিশোর মোজাম্মেল মেজর হায়দারের সামনে টান টান হয়ে বললেন, “অপারেশন শেষে আমি আপনার কোমরের রিভলবারটা চাই!”
মেজর শ্লেষাত্মক হুংকার দিয়ে উঠলেন, “গেট লস্ট! উল্লুক কা পাঁঠা!”

ক্যাম্পে ফিরে মোজাম্মেল যখন গ্রুপকে খবরটি শোনালেন তখন কেউ বিশ্বাস করল না। কিন্তু কিছুক্ষণ পরে যখন অর্ডার এলো যে ঢাকায় অপারেশনের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে তখন খুশীতে সবাই চিৎকার করে উঠল।

এত কিছুর পরেও সীমান্তে একটা ছোটখাট অপারেশনে সাহসের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হল তাদের। আর তার পরেই ১৫ জনের সেই গ্রুপ নারায়নগঞ্জের রূপগঞ্জ হয়ে গ্রুপের আস্তানায়।

মোজাম্মেলের মাথায় তখন একটাই চিন্তা — অপারেশন মোনেম খান।

মোজাম্মেল হক বলছিলেন:

“আমি মোনেম খানের গোয়ালা জব্বার চাচাকে খুঁজে বের করে তাকে সব কিছু বললাম। তিনি আমাকে বলেন, ‘তুই মোনেম খানের রাখাল শাজাহানের সঙ্গে খাতির কর। তোর কাজ হয়ে যাবে। কিন্তু খবরদার, আমার কথা কিছু বলবি না!’ এর দুয়েকদিন পর জব্বার চাচা দূর থেকে শাজাহানকে চিনিয়ে দেন। শাহজাহান তখন বনানীতে মোনেম খানের বাসার পাশে গরু চড়াচ্ছে। আমি তার সঙ্গে এটা সেটা গল্প জুড়ে দিলাম। বুঝলাম মোনেম খানের উপর রাখালের খুব রাগ।
শাজাহান আমাকে জানালো, ‘মোনেম খান একটা জানোয়ার! আমাকে বেতন তো দেয়ই না, উল্টো নানান নির্যাতন করে। একেকটা সিন্ধী গাই ২০/২৫ সের দুধ দেয়। গাই দোয়ানোর সময় মোড়া পেতে সে নিজেই বসে থাকে, যেনো দুধ চুরি না হয়। পাঁচবার এ কাজ থেকে পালিয়েছি। প্রত্যেকবার পুলিশ দিয়ে আমাকে ধরে এনেছে। মুক্তিরা এতো মানুষকে মারে, এই ব্যাটাকে মারতে পারে না!’
আরেকটু খাতির হওয়ার পর একদিন শাজাহানকে আমি বলি, আমার সঙ্গে মুক্তিদের যোগাযোগ আছে। আপনি যদি সহায়তা করেন, তাহলে আমি তাদের খবর দেই, আপনি মোনেম খানকে মারার ব্যবস্থা করুন। শাজাহান রাজী হয়। আমার সাথে পরিচয় করিয়ে দিল মোনেম খানের বাড়ীর কেয়ারটেকার মোখলেসুর রহমানের সাথে। স্বল্পভাষী মোখলেসও মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে সাক্ষাৎ করতে চায়। সেও খুব চটা মোনেম খানের উপর। ওদের দুজনকে বুঝবার জন্যে আরও দু’একদিন ঘোরানোর পর শাজাহান অস্থির হয়ে বলে, ‘কই, আপনার মুক্তিরা তো আসে না!’
একদিন বিকালে আমি একটি চটের ব্যাগে আমার স্টেনগান, দুটি ম্যাগজিন, একটি হ্যান্ড গ্রেনেড আর একটি ফসফরাস বোমা নিয়ে শাজাহান ভাইয়ের কাছে হাজির হই। তাকে বলি, আজ সন্ধ্যায় একটু দেরীতে গরুগুলোকে মোনেম খানের বাসায় ঢোকাতে হবে। আর আমাকে লুকিয়ে নিয়ে যেতে হবে বাসার ভেতর। সেই প্রথম শাজাহান আর মোখলেস ভাই বুঝতে পারেন, এতোদিন আমার কাছে মুক্তিবাহিনীর যে গল্প তারা শুনেছেন, আমিই সেই মুক্তিবাহিনী! ওরা আমার প্রস্তাবে রাজী হন।”

মোনেম খানের বাড়ী বনানীর ২৭ নং রোডের পশ্চিম প্রান্তের শেষ অংশে ছিল যার একপাশ দিয়ে তখন চলে গেছে ময়মনসিংহ রোড যা বর্তমানে এয়ারপোর্ট রোড, ঐ রাস্তা পেরুলেই রেললাইন ঘেঁষে ঢাকা সেনানিবাস ছিল তখনও। উত্তর পাশে ছিল কিছু জলাভূমি এবং চাষাবাদের জমি। মোনেম খানের বাড়ীর পূর্ব পাশে বনানী কবরস্থান যার কোন সীমানা প্রাচীর ছিল না। নতুন কবরস্থান হওয়ায় অল্প কয়েকটা কবর তখন ছিল বাকি অংশ লিজ নিয়ে স্থানীয়রা চাষাবাদ করত। একাত্তরের উন্মাতাল সেই সময়ে মোনেম খানের বাড়ী পাহারায় নিয়োজিত ছিল পাক সেনাবাহিনীর বেলুচ রেজিমেন্টের একটি প্লাটুন যারা বাড়ীটির প্রবেশ পথে বাঙ্কার বানিয়ে পাহারা দিত।

মোজাম্মেল সেদিন সন্ধ্যায় মোনেম খানের বাড়ীতে গরু প্রবেশের পথ দিয়ে ঢুকে পাশের কলাবাগানের ঝোঁপে ঘাপটি মেরে বসে থাকার পর মোখলেস আর শাহজাহান এসে খবর দেয় যে মোনেম খানের শরীর খারাপ তাই সে দোতলায় শোবার ঘরে চলে গেছে। দোতলায় যেতে গেলে তার ছেলে আর মেয়ের ঘরের সামনে দিয়ে যেতে হবে তাছাড়াও বাড়িতে আরো অতিরিক্ত লোকজন রয়েছে। সেদিনের অপারেশন স্থগিত করার সিদ্ধান্ত নিয়ে সন্তর্পণে সেখান থেকে বের হয়ে পাশের বনানী কবরস্থানের পাশে খ্রিস্টানদের যে বড় প্লটটি সেখানে ইটের পাঁজায় হাতিয়ারের ব্যাগটি লুকিয়ে রেখে ফিরে যান মোজাম্মেল।

দুয়েকদিন পরে আরেক সন্ধ্যায় স্টেন ও গ্রেনেডসহ ব্যাগ নিয়ে শাজাহান আর মোখলেসের সহযোগিতায় মোনেম খানের বাসায় যান। আবার সেই কলাবাগানে ঘাপটি মেরে বসে থাকা। কিন্তু এদিন একটি উজ্জ্বল বৈদ্যুতিক বাল্বের আলোয় চারপাশের সব কিছু বেশ পরিস্কার থাকায় অন্ধকারের আড়াল পেতে মোজাম্মেল সেই বাতিটি ইট মেরে ভেঙে ফেলেন। আর বিপত্তি দেখা দেয় তখনই। বাড়ীর একজন গৃহভৃত্য ভাঙা বাল্ব দেখে চোর ঢূকেছে ভেবে চিৎকার – চেঁচামেচি শুরু করে দিলে মোনেম খানের বাসা পাহারারত বেলুচ রেজিমেন্টের সৈন্যরা হুইসেল বাজিয়ে, টর্চ আলোয় চোর খোঁজাখুঁজি শুরু করে। বিপদ বুঝে মোজাম্মেল দ্রুত দেয়াল টপকে বের হয়ে আসে কলাবাগান থেকে আর সেই আগের জায়গায় অস্ত্রগুলো লুকিয়ে ফিরে যান গ্রামে।

কিশোর মোজাম্মেলের মন খুব খারাপ হয়ে যায়। দু-দু’বার অপারেশনে বাধা, আর বুঝি মোনেম খানকে হত্যা করা হবেনা! বিষণ্ণ হয়ে পড়েন তিনি। হতাশায় উদ্যম থমকে যায়। একদিন শাজাহান আর মোখলেস ভাটারায় এসে মোজাম্মেলকে বলে, ‘কী ভাই, যুদ্ধ হবে না?’ শাহজাহানের এ কথায় মনোবল ফিরে পান মোজাম্মেল।

আবারও পরিকল্পনা বাস্তবায়নে নেমে পড়েন তিনি। এবার তিনি সহযোগী হিসেবে সঙ্গে নেন আনোয়ার হোসেনকে। ১৩ অক্টোবর সন্ধ্যার পর মোনেম খানের বাসার ভেতরের সেই কলাবাগানে দু’জন লুকিয়ে অপেক্ষায় থাকেন। কিচ্ছুক্ষণ পরে শাজাহান আর মোখলেসের গ্রিন সিগন্যাল আসে। তারা জানায়, ‘আজকে অপারেশন সম্ভব। মোনেম খান, তার মেয়ের জামাই (জাহাঙ্গীর মো. আদেল) আর শিক্ষামন্ত্রীসহ (আমজাদ হোসেন) বাসার নীচ তলার ড্রইং রুমে বসে কথা বলছেন।’
মোনেম খানকে চিনবার উপায় বাতলে মোখলেস জানালেন, ‘এক সোফায় তিনজনই একসঙ্গে বসে আছে। মাঝের জনই মোনেম খান, তার মাথায় গোল টুপি আছে।’
অপারেশন পরবর্তী পরিস্থিতি আঁচ করে মোখলেস আর শাজাহানকে জামা–কাপড় নিয়ে ঐ বাসা থেকে পালাবার জন্যে সময় দিয়ে সন্ধ্যার নিস্তব্ধতার মাঝে স্টেনগান বাগিয়ে মোজাম্মেল ড্রয়িং রুমের দিকে অগ্রসর হলেন সঙ্গে গ্রেনেডসহ আনোয়ার হোসেন।
১৪ বছরের কিশোর মোজাম্মেলের মনে মনে প্ল্যান, স্টেনগানের একটা গোটা ম্যাগজিন খরচ করবে মোনেম খানের উপর। বাকি দু’জনকে জন্যে বরাদ্দ আরেকটি ম্যাগজিন।
বাড়ীর ড্রইং রুমের খোলা দরজায় ক্ষিপ্রগতিতে পৌঁছে মোজাম্মেল দেখলেন দরজার দিকে মুখ করে তিনজন একটি সোফায় ঘনিষ্টভাবে বসে মাথা নীচু করে শলা-পরামর্শে মগ্ন। মাঝখানে গোল টুপি মাথায় মোনেম খান বসা। ড্রয়িং রুমে ঢুকেই স্টেন দিয়ে ব্রাশ ফায়ার করলেন। কিন্তু একটি মাত্র গুলি ফায়ার হয়ে স্টেন লক হয়ে গেলো। ঐ একমাত্র গুলিটি মোনেম খানের পেটে বিদ্ধ হল। পাকিস্তানের দোর্দন্ড প্রতাপশালী মুসলিম লীগ নেতা, দীর্ঘ প্রায় ৭ বছর পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর এবং পাকিস্তানের তথাকথিত ‘লৌহমানব’ আইয়ুব খানের ঘনিষ্ট সহচর আব্দুল মোনেম খান ‘ও মা গো’ বলে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। অন্য দু’জন, মোনেম খানের মেয়ের জামাই জাহাঙ্গীর মো. আদেল এবং শিক্ষামন্ত্রী আমজাদ হোসেন ভয়ে চিৎকার শুরু করে দিল।
এদিকে স্টেন থেকে ফায়ার না হওয়ার কারণ খুঁজে পাচ্ছেন না মোজাম্মেল। অবস্থা বুঝে এবার মোজাম্মেল ছুঁড়ে মারলেন হ্যান্ড গ্রেনেডটি। দেয়ালে আছড়ে পড়ল গ্রেনেড কিন্তু বিস্ফোরণ ঘটলো না।
বাইরে গুলি আর চিৎকারের শব্দে বাঙ্কারে বাড়ী পাহারারত বেলুচ সৈনিকেরা লাগাতার ব্ল্যাঙ্ক ফায়ার করতে শুরু করে দিয়েছে।
গ্রেনেড কাজ না করার সাথে সাথেই আনোয়ার দৌড়ে পাঁচিল টপকালেন আর মোজাম্মেল ম্যাগাজিন পালটে দ্বিতীয় ম্যাগাজিন লাগিয়ে ফায়ার করলেন। কিন্তু এবারও গুলি বের হলো না। কিশোর বুঝতে পারলেন তার স্টেন লক হয়ে গেছে, সম্ভবত ইটের গাদায় রাখাকালে বৃষ্টির ফল।
কালবিলম্ব না করে মোজাম্মেল বেরিয়ে এলেন ড্রয়িং রুম থেকে, শুনতে পেলেন বাড়ীর অন্যান্যদের চিৎকার, দেখলেন অনেকেই ছুটে আসছে এদিকেই। দেয়াল টপকে বেরিয়ে এলেন বনানী কবরস্থানে, নিজেদের চাষ করা লাউ ক্ষেতের ভেতর দিয়ে ছুটে বনানী-গুলশান লেকে পৌঁছলেন যেখানে অপারেশন শেষে সকলের মিলিত হবার কথা। সেখানে পেয়ে গেলেন আনোয়ার, মোখলেস আর শাজাহানকে।

পরবর্তী মিলিত হবার স্থান জেনে নিয়ে ওরা তিনজন লেক সাঁতরে ওপারে চলে গেলেন। মোজাম্মেল কিছু দূরে পেয়ে গেলেন একটি কোষা নৌকা, তা নিয়ে বনানী লেক থেকে গুলশান লেকে এসে, কিছুদূর পায়ে হেঁটে গুলশান লেকের পাড় ধরে গুলশান ২ নম্বর ব্রিজের কাছাকাছি এলেন , দেখলেন ব্রিজ পাহারারত পাকসেনাদের মধ্যে চাঞ্চল্য, ঐ রাস্তা দিয়ে দুয়েকটি গাড়ীও ছুটে যেতে দেখলেন বনানীর দিকে। ধরা পড়ার ঝুঁকি আছে কিন্তু প্রহরীরা ব্যস্ত পথের দিকেই এই সুযোগ নিয়ে ক্রলিং করে এবং ব্রিজের নিচ দিয়ে গলা জলে হেঁটে বাড্ডা বর্তমান বারিধারা (মার্কিন দুতাবাস) হয়ে পূর্ব দিকে খানে খোদাই মসজিদের কাছে রকু হাজির টং দোকানের সামনে পৌঁছলেন। এখানে চা পানরত কয়েকজন স্টেনগান কাঁধে মোজাম্মেলকে দেখে ভয়ে সবাই দৌড়ে পালাল। মোজাম্মেল আরও পূর্বে এগিয়ে বর্তমান হাজি মার্কেটের স্থানে ফ্লাইট সার্জেন্ট এম এ রশীদের স্টেশনারী দোকানে এলেন তিনি। মোজাম্মেল অপারেশনের উত্তেজনা, অবসাদ আর ভেজা শরীরে শীতে কাঁপতে কাঁপতে কোন রকমে স্টেনগানটা রশীদ সাহেবের হাতে দিয়ে অজ্ঞান হয়ে পড়লেন।

কিছুক্ষণ পর জ্ঞান ফিরে পেয়ে দেখলেন তিনি ফ্লাইট সার্জেন্ট রশীদের বাসায়। সেখানে দেখা হলো আনোয়ার, শাহজাহান ও মোখলেসে সাথে। এরপর সকলেই যে যার মতো নিজের ডেরায় ফিরে গেলেন।

পরদিন সকালের মধ্যেই গ্রামে রটে গেল মোজাম্মেল মুক্তিযোদ্ধা এবং গতরাতে যুদ্ধ করে ফিরেছে বাড়ী। মোজাম্মেলের ঘুম ভাঙল চাচার ধমকে, বললেন, ‘রাতে আকাম করে এসে এখনও তুই বাড়িতে! রেডিও খবরে বলছে, মোনেম খান মারা গেছে। এখনই তুই পালা।’

রূপগঞ্জের ইছাপুরা বাজারে মুক্তিযোদ্ধাদের হাইডআউটে চলে গেলেন মোজাম্মেল হক। সেখানে পেলেন আনোয়ার হোসেন, মো. শাহজাহান, মোখলেসুর রহমান আর ‘ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট গ্রুপ’ এর উপনেতা রহিমুদ্দীনকে। রহিমুদ্দীন ফিরে গেলেন মেলাঘরে মোনেম খানের বাড়ীর কেয়ারটেকার মোখলেসুর রহমান আর রাখাল মো. শাহজাহানকে সঙ্গে নিয়ে। রূপগঞ্জেই রয়ে গেলেন মোজাম্মেল এবং সেখানেই খবর পেলেন মোনেম খানের গোয়ালা জব্বার চাচাকে মিলিটারি তুলে নিয়ে গেছে। আব্দুল জব্বার পাকসেনা আর পুলিশী নিপীড়ন, নির্যাতন শ’য়ে প্রাণে বেঁচে গেছিলেন, বন্দি দশা থেকে মুক্ত হয়েছিলেন বিজয়ের পর।

এই বীরত্বপূর্ণ সাহসী অপারেশনের জন্যে কিশোর মুক্তিযোদ্ধা মোজাম্মেল হক পেয়েছেন ‘বীর প্রতীক’। তার সাথী আনোয়ার হোসেনও এ অপারেশনের ফলে পেয়েছেন ‘বীর প্রতীক’। কিন্তু দুর্ভাগ্য, যে দু’জন মানুষ এ অপারেশনে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলেন অপারেশনস্থলে, যাদের সহায়তা বিনা এ অপারেশন কখনই সম্ভব হতো না, যাদের বিবরণ অনুসারে মেজর এটিএম হায়দার এ অপারেশনের সাইটেশন/রিপোর্ট হেড কোয়ার্টারে পাঠিয়েছিলেন, তাদের কথা ইতিহাসে লেখা হয়নি কখনই। তারা মেডেল তো দূরের কথা পাননি মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতিও। 

কিশোর মুক্তিযোদ্ধা মোজাম্মেল হক কি কেবলই একজন ‘মোনেম খান’কে হত্যা করেছিলেন? না তা তো নয়? এ হত্যাকান্ডে পাকিস্তানি হানাদার ও তাদের এদেশীও দালালদের হৃদকম্প শুরু হয়েছিল। মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে এ অপারেশন কতটা অনুপ্রেরণাদায়ক ছিল আজ তা অনুমান করাও দুঃসাধ্য। বাংলার সাড়ে ৬ কোটি বন্দি মানুষ পেয়েছিলেন বেঁচে থেকে মুক্ত বাংলায় শ্বাস নেবার সাহস। বিদেশী গণমাধ্যম আর দূতাবাসের গোপন দলিলগুলোর দিকে তাকালে বুঝা যায় এ অপারেশন কতটা গুরুত্ববহ ছিল।

এ দেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের কপালে দুর্ভাগ্যের কালিমা এখানেই শেষ নয়। এই অপারেশনে পরবর্তীকালে নিজের নাম এমনকি অপরের নাম যুক্ত করতে ইতিহাসকে বিকৃত করেছেন কেউ কেউ। এ অপারেশনের শেষ অধ্যায়ে যিনি যুক্ত হয়েছিলেন সেই আনোয়ার হোসেন বীর প্রতীকও এ অপারেশনের সম্পূর্ণ কৃতিত্ব নিজের নামে চালাবার প্রয়াসে ‘সাপ্তাহিক ঢাকা’ নামের পত্রিকায় প্রতিবেদন প্রকাশ করেন। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে মোজাম্মেল হক বীর প্রতীক ঐ সাপ্তাহিক ও আনোয়ার হোসেন বীর প্রতীকের বিরুদ্ধে ঢাকার আদালতে অভিযোগ দায়ের করেন। আনোয়ার হোসেনের অনুপস্থিতিতে আদালত সম্পাদকের ক্ষমা প্রার্থনার ভিত্তিতে এবং মোজাম্মেল হকের কৃতিত্বের প্রতিবেদন প্রকাশের আদেশ দিয়ে অভিযোগের নিস্পত্তি করেন। এ অপারেশন নিয়ে এমনতর বিকৃতি প্রকাশের দায় অন্যতম সর্বাধিক প্রচারিত দৈনিক প্রথম আলোও এড়াতে পারবে না। এ পত্রিকায় স্বাধীনতার ৪০ বছর উপলক্ষ্যে প্রকাশিত ধারবাহিক প্রতিবেদন “তোমাদের এ ঋণ শোধ হবে না” তে প্রকাশিত নিবন্ধেও ইতিহাসের এ ব্যত্যয় দেখা যায়।

1971_Guerilla_Mozammel Huq_Anwar Hossein_PA02

প্রথম আলো, ১৯ আগস্ট, ২০১১

শুধু কি তাই? একসময়, সেই মুক্তিযোদ্ধা মোজাম্মেল হক বীর প্রতীকের বিরুদ্ধে অসংখ্য মিথ্যা মামলা দায়ের করা হয়। এসব মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে তাকে জেলে পাঠানো হয়। কেন জানেন? তাঁর অপরাধ তিনি মোনেম খানকে হত্যা করেছিলেন। কি বিশ্বাস হচ্ছে না? এটাই সত্যি! সে সময়ে মোনেম খানের মেয়ে, মেয়ের জামাই জাহাঙ্গীর মো আদেল ছিলেন প্রবল ক্ষমতাশালী। আদেল একাধারে সংসদ সদস্য এবং ডেপুটি মেয়র ছিলেন। তিনি শ্বশুর হত্যার প্রতিশোধ নিতে মিথ্যা মামলায় জড়িয়ে মুক্ত স্বাধীন বাংলায় মোজাম্মেলকে জেলের ভাত খাইয়েছেন।

আজ যদি সেদিনের সেই অসম সাহসী কিশোর মুক্তিযোদ্ধা মোজাম্মেল জীবনের অর্ধশত বছর কাটিয়ে দিয়ে বলেন “আমরা কি সেদিন ভুল করেছিলাম”, তবে কি তা অত্যুক্তি হবে? আমার মনে হয় না। আসলে ঘুণে ধরা এ সমাজে আমরা সব কিছু মেনে নেয়ার এক চরম বিলাসিতা উপভোগ করছি। যারা জীবন তুচ্ছ করে জান বাজি রেখে আমাদের এ দেশ উপহার দিয়েছেন তাদের ন্যুনতম সম্মান দিতে তো পারিইনি বরং জীবদ্দশায় তাদের প্রাণ ওষ্ঠাগত হয়েছে আমাদের পীড়নে।

“বন্ধু গো, আর বলিতে পারি না, বড় বিষ-জ্বালা এই বুকে!
দেখিয়া শুনিয়া ক্ষেপিয়া গিয়াছি, তাই যাহা আসে কই মুখে।
রক্ত ঝরাতে পারি না ত একা,
তাই লিখে যাই এ রক্ত-লেখা,
বড় কথা বড় ভাব আসে না ক’ মাথায়, বন্ধু, বড় দুখে!
অমর কাব্য তোমরা লিখিও, বন্ধু, যাহারা আছ সুখে!”

গবেষণা ও লেখনী: সাগর লোহানী, সম্পাদক, বাঙালীয়ানা

মন্তব্য করুন (Comments)

comments

Share.