। সুলতানা শিরীন।
এখন রাত দুটো, চারিদিকে সুনসান, কীবোর্ডের খটখট আওয়াজ ছাড়া আর কোনো শব্দ নেই। এশট্রেতে আধপোড়া সিগারেট, জ্বলতে জ্বলতে এসে শেষ পর্যন্ত থেমে গিয়েছে; অনেকটা আমার মতো। আমি এক মনে টাইপ করে যাচ্ছি। একটা লেখার বায়না আছে, সময় মতো শেষ করতে হবে, কথা দিয়েছি, তাই কথার বরখেলাপ হোক এটা চাই না। এই সময়টায়, মানে শুনশান এই মধ্যরাতে, আমি অন্য কেউ; আমার কোনো পরিচয় নেই, না আমি কারও স্ত্রী, বা কারও মা। এখন আমি– শুধুই আমার আমি।
এই দুপুর রাতে কেউ আমার সঙ্গী হয়ে জেগে নেই, হ্যাঁ যে মানুষটি নাক ডেকে ঘুমাচ্ছে সে ইচ্ছে করলে জেগে থাকতে পারত, এই নেশালু রাতে একটু রোমান্টিক হতে পারত। না, আমি মোটেও বাধা দিতাম না, হয়তো আমিও এটাই চাইতাম, অনেকটা নাটক সিনেমার মতো। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে তেমন কোনো ঘটনা কদাচিৎও ঘটেনি। নিজের প্রত্যাশায় নিজেই হেসে উঠি। শেষ প্রহরের আগে যে কাকটি ডেকে ওঠে আমি ওর ডাকের অপেক্ষায় থাকি কারণ তখন আমার ঘুমের সময়। এই ঘুমটাকেও হয়তো ত্যাগ করতাম কিন্তু ওই স্বপ্নটা দেখার লোভ আজও কাটিয়ে উঠতে পারিনি।
এই নিশুতি রাতে লিখতে লিখতে আমার অনেক কিছুই ইচ্ছে করে, এই যেমন এখন আমার খুব কড়া লিকারের এক কাপ দুধ চা খেতে ইচ্ছে করছে গরম গরম। না খুব গরম না, আমি খুব গরম চা কখনোই খেতে পারি না। আমার স্কুল বেলার এক বান্ধবী আছে, হল জীবনেরও সাথী ছিল, ওকে দেখেছি সাংঘাতিক গরম চা খেতে। আমাদের কাপ হাতে নিতে নিতেই ও শেষ চুমুক দিয়ে দিত। আমি অবাক হতাম যে এত গরম চা ও খায় কী করে!
ঘড়ির কাঁটা দুটো ছাড়িয়ে গেছে, লেখা এক তৃতীয়াংশ বাকি, গল্পের মূল চরিত্র নেহা সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না যে শশ্রুমণ্ডিত ডাক্তার পাত্রকে নির্বাচন করবে নাকি একজন সহজ সরল সরকারি চাকুরেকে বিয়ে করবে। এই পর্যায়ে এসে আমি নিজেও সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগতে থাকি, কারণ আমি চাচ্ছি যে নেহা তার উপযুক্ত জীবনসঙ্গী খুঁজে নিক যে তাকে সত্যিকারের ভালোবাসবে। আচ্ছা নেহার জাগায় আমি হলে কী করতাম? হঠাৎ কিছু মনে হতেই আমি দুটো কাগজের টুকরো নিই, ছেলেবেলায় খেলার সময় এমন অনেক করেছি আসন্ন সমস্যার মীমাংসা করার জন্য। আমি কাগজের টুকরো দুটোতে পাত্রদের নাম লিখি, ভাঁজ করে চোখ বন্ধ করে টেবিলে ছড়িয়ে দিই, তারপর একটা কাগজের টুকরো দু’আঙুলে তুলে ধরি। কাগজটা হাতে নিয়ে বসে থাকি, খুলতে ইচ্ছে করছে না, মনে হচ্ছে খুললেই সব রহস্য শেষ হয়ে যাবে।
এদিকে চায়ের তেষ্টা তীব্র হচ্ছে। আমি দুধ চায়ের সুঘ্রাণ পাচ্ছি, একদম তাজা। রান্নাঘরে খুট করে আওয়াজ হলো, পানির কল ছাড়ার আওয়াজ পেলাম। কেউ একজন চুলা জ্বালিয়েছে, পোড়া বারুদের গন্ধ নাকে এসে লাগে। ভাবলাম মানুষটা কী উঠে গেল? আজান কী হয়েছে? কিন্তু সে তো রান্নাঘরে যাবে না, আজ পর্যন্ত এমন কোনো নজির নেই যে সে আমাকে এক কাপ চা বানিয়ে দিয়েছে। কীজানি, মানুষের মনে কখন কী উদয় হয়, হয়তো আজ সে আমাকে রীতিমতো চমকে দেবে। মানুষ রহস্য করতে খুব ভালোবাসে, আমিও বাসি, আমিও মাঝে মাঝে তাকে চমকে দিই।
আহ কী সুন্দর গন্ধ! এই চায়ের পাতিটা আমার ছোটো বোন সিলেটে বেড়াতে যেয়ে এনেছিল। আমাকেও এক প্যাকেট দিয়েছে, প্রথম পাতার চা, খুবই এক্সপেন্সিভ। টম এন্ড জেরি কার্টুনের টমের মতো আমার নাকে চায়ের খুশবু ভেসে ভেসে আসতে থাকে। আমার অপেক্ষার বাঁধ ভেঙে যায়, আমি পায়ে পায়ে রান্নাঘরের দিকে এগিয়ে যাই তাকে চমকে দেবার জন্য। যতই হাঁটছি ততই ঘ্রাণ তীব্র হচ্ছে। আমার চায়ের আকাঙ্খা তীব্র থেকে তীব্রতর হতে থাকে। ভাবছি পেছন থেকে তাকে জোরে শব্দ করে চমকে দেবো।
রান্নাঘরে ঢুকে আমি নিজেই চমকে গেলাম, বাতি নেভানো, কেউ নেই, সুনসান। পানির কল, চুলা সব চুপচাপ। ভোজবাজির মতো চায়ের গন্ধটাও মিলিয়ে গেছে, সেখানে চায়ের বদলে তীব্র সিগারেটের গন্ধ। না শুধু সিগারেটের গন্ধ না সাথে একটা পারফিউম, অনলি ফর ম্যান। চেনা, অনেক পুরাতন, আমার মস্তিষ্কে এখনো জমাট বেঁধে আছে সেই ঘ্রাণ, খুব আপন আর গভীর ছিল। শরীর জাগানো তীব্র মাদকতাময় ছিল সেই ঘ্রাণ, হারিয়ে গেছে কয়েক যুগ হলো!
আমি বিদ্যুত্স্পৃষ্টের মতো ছিটকে বেরিয়ে আসি। ওর ঘরে যেয়ে দেখি তাকে, নাক ডেকে ঘুমাচ্ছে, ভালো করে চেক করি, সত্যিই ঘুমিয়েছে কিনা। আমি লেখার টেবিলে ফিরে আসতে যেয়ে পানির ফোটা পড়ার শব্দ পাই। রান্নাঘরের আলো জ্বালি, চা ছাকনিটা ঠিক যেখানে ঝুলানো ছিল সেখানে নেই, অন্য জায়গায়। ছাঁকনির আগায় এক ফোটা পানি জমে আছে। হাত দিয়ে স্পর্শ করে দেখি ছাকনিটা ভেজা।
শেষ প্রহরে কাক ডেকে ওঠে, এখন আমার ঘুমের সময়। দেয়ালের দিকে পিঠ দিয়ে আমি শুয়ে পড়ি, আমার কানের পাশ দিয়ে সেই মাতাল গন্ধ ভেসে আসতে থাকে। আমি স্বপ্নের অতলে তলিয়ে যেতে যেতে অনুভব করতে থাকি দুটো ছায়া হাত গভীর আলিঙ্গনে আমাকে জড়িয়ে ধরে আছে। কাকগুলো এখন আর ডাকছে না ভীষণ মৌন হয়ে আছে।
লেখক:
সুলতানা শিরীন
কবি ও লেখক; ঢাকা