অমিত মল্লিক জয়ের কবিতা

Comments

কম্পাংক

শব্দ করো
তাতে কম্পন তৈরী হবে।
কেঁপে ওঠো
তাতে শব্দ তৈরী হবে।
শুধু তরঙ্গই সত্য,
যা কিছু ঢেউ তোলে না, তাতে ডোবে না শরীর।
নিস্তরঙ্গ পেয়ালা 
ততক্ষণ প্রাণ পায়না পানশালার টেবিলে,
যতক্ষণ না কম্পিত হাত প্রচন্ড তৃষ্ণায় 
তাকে তুলে নেয় ঠোঁটের আলিঙ্গনে
হৃদপিন্ডের গতিজড়তার মতো নিয়মিত স্পন্দনে।

জারিত জীবন এবং বিজারিত কল্পনার মত
সমস্ত সত্তা নিয়ে নড়ে ওঠো ওপর নীচ,
ভূমির মত ভেঙেচুরে গড়ে তোল 
পাহাড় অথবা সাগর।
নতুবা অতৃপ্ত সমতলের মতো স্থবির 
কেটে যাবে মহাকাল।

জাগো, বেঁচে ওঠো,
এমন ঢেউ তৈরী করো
যাতে ডুবে ভেসে ওঠে জনপদ।
হয় সশব্দে কেঁপে ওঠো
অথবা এমন কম্পন জাগাও
যাতে করে বরফের রাজ্যেও 
আন্দোলিত হয় নিনাদ!

এমন কাছে এসো,
যাতে কাঁপন জাগে,
যাতে জন্ম নেয় শব্দ।

#টেকনাফ_ডায়েরি 
১৪ ডিসেম্বর ২০২১

জ্যামিতি বাক্স

যুগ পেরিয়ে গেল গাণিতিক যুগলে।
আজ চোখে চশমার লব্ধ দৃষ্টিতে দেখলাম,
সেই সন্ধিক্ষণের জ্যামিতি বাক্স 
কোন কাজেই লাগেনি আমার। 
সাদা খাতায় নানা আঁকিবুকি করে 
নম্বর নিয়ে ফিরেছি ঘরে।
বড়োরা পিঠে চাপড় দিয়ে বলেছে, ‘সাবাশ !’
হাসিমুখ প্রতিবেশী ঘরে ফিরেই 
নিজের সন্তানকে ঠোনা মেরে, আমাকে দেখিয়ে বলেছে,
‘ওর মতো হতে পারিস না?’

কার মতো হতে হয়, কে জানে?
যে অংক মাস্টার আমাদের পরীক্ষার নম্বর দিতেন,
মাসকাবারি হিসাবে তাঁর আমদানি 
এতই অপ্রতুল ছিলো যে, উনি বাড়িতে মুরগি পালতেন।
আমাদের খাতার হিসাব মিলাতে মিলাতে
উনি কোনদিন নিজের রঙ্গমঞ্চে 
মুরগীর প্রস্থান আর আগমনের হিসাব মেলাতে পারেননি।
উনি যখন লাল কালি দিয়ে ঘ্যাঁচাং করে খাতা কাটতেন,
তখন তাঁর পোষা মুরগি চোর-বাজারে কাটা পড়তো
একই রঙে।
শেষ যেবার তাকে দেখেছি,
ক্ষয়ে যাওয়া মুখ আর শরীর নিয়ে তদ্বির করছেন
লাস্টবেঞ্চির কাছে।
যাকে গর্দভ সমতূল্য উদ্ভাসনে 
এককালে বেতিয়েছেন দুহাত খুলে।
সেই দুহাত করজোরে এনে, সেই ছাত্র,
আজকের নেতার কাছে 
ছেলের জন্য একটা করণিক চাকরির ভিক্ষায়।

জ্যামিতি বাক্স কোন কাজেই লাগেনি আমার।
সেই সোনালি ভোরে, 
সেই ভাতঘুম দুপুরে,
সেই স্কুলমাঠ বিকেলে,
সেই পড়ার টেবিল সন্ধ্যায়,
সেই চলতি গানের ডুবে যাওয়া রাতে
যখন আমি ভেসে যেতাম,
যখন এক পলক তোমাকে দেখার জন্য 
আমি মরে যেতাম,
কখন তুমি কোন পথে যাবে তার সমস্ত রুটিন মেনে 
খুব অন্যমনস্ক সেজে দাঁড়িয়ে থাকতাম,
তার কোন কিছুই নির্ণীত হলো না ফলাফলে।

ওই কম্পাস এমন কোন বৃত্ত আঁকতে পারেনি,
যে বলয়ে আমরা একটা সংসার গড়তে পেরেছি।
ওই স্কেল এমন কোন সরলরেখা আঁকতে পারেনি,
যে পথ ধরে তোমার কাছে পৌঁছে যাওয়া যায়।
শুধু কাঁটা কম্পাসে সমান্তরাল দূরত্ব মেপে 
কেটে গেলো তোমার আমার এক জীবন।
আধখানা চাঁদা হয়তো একই আকাশে ওঠে!

#টেকনাফ_ডায়েরি 
০৯ সেপ্টেম্বর ২০২১

পার্থক্য

আমি আজও কাচ আর আয়নায় মাঝে তফাৎ করতে পারলাম না।
দুটোতেই-হয় আমি নিজেকে দেখি 
অথবা ওপারের পৃথিবী,
আবার মাঝে মাঝে মনে হয় 
দুটো দেখার ভেতরই-বা পার্থক্য কই?

কেন আমি পৃথক করতে পারি না
বৃষ্টি থেকে শ্রম নির্গত ঘামকে?
অষ্টব্যঞ্জনের নিমন্ত্রণ থেকে ক্ষুধাকে,
ঝড় থেকে ভালবাসাকে,
দেনা থেকে পাওনাকে,
সাগর থেকে অশ্রুবিন্দুকে, যেখানে সবটাই নোনা;
একজন প্রেমিকা থেকে আরেকজনকে,
নিরন্তর প্লাবনে যেখানে সবাই নিজস্ব ঈশ্বরকে ডেকেছে 
একই সুর, তাল আর লয়ে?

আমি আজও উন্নয়ন আর অধঃপতনের 
ফারাক খুঁজে পেলাম না।
মানুষের অস্তিত্ব,
সে কি বেঁচে থাকার নাকি মরে যাবার অগ্রগতি
তা আমি নির্ণয় করতে পারলাম না অদ্যাবধি।
আমার এখনও মনে হয়
স্থাবর বলে আহরণের সকল স্বমেহন
নিতান্তই অস্থাবর আর অকেজো।
যেখানে বসে আছি, নিজের ভেবে নেওয়া সেই স্থান
একশো বছর আগে অন্য কারও ছিলো,
সে ভেবেছিলো তার।
একশো বছর পরে অন্য কারও থাকবে,
সে ভাববে তার।
সুলুক সন্ধানে দেখেছি,
রাজত্ব বদলে যায়
উত্তরাধিকার বদলে যায়
এই ছোট্ট জীবনে প্রেমও বদলায় বহুবার।

কি অদ্ভুত!
এত কিছু নিয়ে জীবনের দোকান খুলে বসেছি
অথচ কিছুই আমার নয়।
অনেক উড়েও,
আকাশ আর মেঘের মাঝে
পার্থক্য খুঁজে পেলাম না আজও!

#টেকনাফ_ডায়েরি
০২ জুলাই, ২০২১

স্ট্যাপলার

আমরা উড়ে যাচ্ছিলাম এদিক ওদিকে।
বাতাসের অচেনা তোড় 
আমাদের জোড় ভেঙে দিচ্ছিলো বারবার। 
আমরা প্রাণপণ চেষ্টা করছিলাম 
পারস্পরিক লেপ্টে থাকার সামাজিক কৌশল আয়ত্বে,
ঠিক যেভাবে আজন্ম আলয়গুলো 
আমাদের শিখিয়েছিলো জুড়ে থাকার ফন্দিফিকির। 

একবার মন্ত্রপাঠপূর্বক থাকতে হয়,
একবার ভালবাসার অভিজ্ঞান ব্যক্ত করে থাকতে হয়,
একবার শয়নের ভুলে থাকতে হয়,
বাঁচামরায় থাকতে হয়,
মরে বেঁচে থাকায় থাকতে হয়,
দম আটকে থাকতে হয়
আর প্রাতঃরাশের আলুর দমে থাকতে হয়!

নিজে না থাকতে পারলেও
সঞ্চয়ের হিসাবপত্রে থাকতে হয়,
উত্তরাধিকারে থাকতে হয়,
পদবীতে থাকতে হয়,
পল্লবিত থাকতে হয়।

জমিজমায় থাকতে হয়,
বাড়ির মার্বেল আঁকা নামফলকে থাকতে হয়,
সনদপত্রে থাকতে হয়,
প্রকাশিত আর অপ্রকাশিত আত্মজীবনীতে 
থাকতে হয়। 

শ্রমে থাকতে হয়, ঘামে থাকতে হয়,
লাঙলের ফলায় কিংবা উল্কিতে থাকতে হয়,
সন্তানের অস্তিত্বে বিগত যৌনতায়
হেরে যাওয়া মধ্যবিত্তের হেটমাথা মৌনতায়
যাপিত জীবনের উপলব্ধ গৌণতায়
থাকতে হয়, থাকতে হয়, থাকতে হয়! 

চাই বা না চাই, কোন এক করণিক এর 
ফেটে যাওয়া তালুর নিত্যপ্রয়োজনীয় চাপে 
ফুঁড়ে যাওয়া স্ট্যাপলারের পিনে,
আমাদের জুড়ে থাকতে হয়।
লেজ যতই উড়ুক,
ঘুড়ি কিংবা কাগজের মাথা 
ধাতব সুতোয় বেঁধে রাখে বাজিকর।

এই বাঁধন ছিঁড়ে ফেলা, এই না থাকতে চাওয়া
মহাপাপ! 
ছেঁড়া ঘুড়ি আর কাগজ খুব বারোয়ারি।
হয় বেপাড়ায় নয় ময়লার ঝুড়িতে ঠাঁই হয় তার
কলঙ্কভোগে!

#টেকনাফ_ডায়েরি 
০৫ জুন ২০২১

বোধিসত্ত্ব

যদি মানবজনম নিয়ে কেউ কিছু বলতে বলে,
আমি বলবো, বিষয়টা বোধের।
শিক্ষা নয়, সমর্পণের দীক্ষা নয় 
এমনকি ক্ষেত্রবিশেষে সংস্কৃতিও নয়;
মানুষ অনন্য হয়ে ওঠে বোধে।

গৃহ!
সে যেন খুব ছোটো ব্যপ্তির এক স্থাপনা।
মায়ার গন্ডি ছাড়ালে, তবে আপন হয় নিখিল,
আত্মস্থ হয় অসীম
আর সকল জানালা খুলে ভেসে আসে আলো।

হিংসা আর লোভ পেরুনো এক দেশ আছে,
খুব কাছেই আরশিনগরের মত অধরা সে দেশ।
যেখানে ব্যাধ তার সুনিপুণ নিশানায়
পাখিদের দিকে ছুঁড়ে দেয় জীবন,
হাত পাতলেই, মানুষ ঝুলি ভরে দেয় ভালবাসায়,
বেঁচে থাকার আনন্দ যেখানে আন্দোলিত হয়
গুল্মলতা থেকে মহীরূহের পত্রপল্লবে।
যেখানে, শ্রেষ্ঠত্ব বিবেচিত হয় স্বার্থহীন শান্তি দানে,
চৌর্যবৃত্তিতে নয়, লুন্ঠনের ক্লেদে নয়।

সে এমন এক দেশ, যেখানে জ্যোতির্ময় শ্রমণ
উন্মীলিত নেত্রে হেঁটে যায় ঊষার পথে,
দায়িত্ববোধ নয় বরং বোধের দায়িত্ব বুকে বেঁধে।
তার ইতিউতি চাহনিতে চলতি পথিকের ভ্রম হয়
হয়তো সে কিছু খুঁজছে!
কিন্তু কাছাকাছি এলে তার চোখের দীপ্তিতেই বোঝা যায়
সে পেয়েছে এমন কিছু, যার আর খুঁজে ফেরবার কিছু নেই!
বোধ যেন এক পদ্মের মতো;
সহস্র সাঁতারে শুদ্ধ হয়ে, জীবনের প্রতিটা জলকণায়
শিশিরের মতো সিঞ্চিত হয়ে
তবে সেই আসনে ঘটে অধিষ্ঠান।

যে সত্তা ছুঁতে পারেনি বোধ,
হাড়ের কাঠামোয় একতাল মাংস বয়ে
সে পার করে গেল এক অমূল্য আয়ুষ্কাল। 
কাঠ কয়লায় পুড়ে যেতে যেতে সে জানতেও পেলো না,
দরজার ওপাশেই স্বস্তির সমস্ত আশীর্বাদ নিয়ে
অপেক্ষা করে ছিলো নির্বাণ!

#টেকনাফ_ডায়েরি 
২৫ মে ২০২১

লেখক:
Amit Mallick Joy 1
অমিত মল্লিক জয়, কবি, সঙ্গীতশিল্পী ও যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ

মন্তব্য করুন (Comments)

comments

Share.

About Author

বাঙালীয়ানা স্টাফ করসপন্ডেন্ট