আঁধার খন্ডন

Comments

। মুর্শিদা জামান।

সবুরের ভাত মেখে খাওয়ার দৃশ্য আমার বেশ লাগে। একটা কাতর উচ্ছ্বাস জাগে মনের ভেতর। ঐ রকম পুলক ভরে খাওয়া আমার ভাগ্যে আর নেই। সবুর কোনোদিনও প্লেটে ভাত খেতে পারে না। ওর মাঝারি সাইজের গামলা লাগে। কব্জি ডুবিয়ে মনের মতো মেখে তরকারি রান্নার প্রশংসা করতে করতে রীতিমত উৎসবের আমেজ তৈরি করে ফেলে খাবার সময়। তাই সবুর এলে আমারও কাঁচামরিচ চটকে বেশ খানিকটা সময় ধরে খাওয়া হয়। আমার খাবার বলতে সব মাপা মাপা। রক্তে সুগার ধরা পড়েছে আজ তিন বছর হলো। বাড়ির সবাই মিলে আমার ওপর একটা বাড়তি নজর রেখে চলেছে সেই থেকে। আমার মেয়েটা সামারের ছুটিতে দেশে এসেছে এবার বেশ কয়েক বছর পর। সারাদিন হুটোপুটো লেগেই রয়েছে বাড়িতে। হবেনা আবার! কত্ত বছর পর এ বাড়িতে শিশুর আধো আধো বুলি আর কান্নার শব্দ! আহিরের বাচ্চার জন্ম ফিনল্যান্ডেই। এতদিন শুধু ফেসবুক আর ভিডিও কলেই নাতিকে আদর করা হতো। গত এক সপ্তাহ ধরে তো রেহানার ঘুম নেই, নাওয়া নেই; শুধু নাতি আর নাতি করে কাটিয়ে দিচ্ছে বেলা। 

সবুরকে আহির চাচা বলেই জানে। ছোটো থেকে খুব পছন্দ ওর এই চাচাকে। মেয়ে আমার হয়েছে ঠিক আমারই মতো। খুব গল্প শুনতে ভালোবাসে। আজ ওর বিশ্ববিদ্যালয়ে রি-ইউনিয়ন আছে। তাই মেয়েকে রেখে চটজলদি বের হয়ে গেল। আমার যেন মনে হলো ও বুঝি স্কুলে গেল। সেই একই ভঙ্গি! জুতো পরতে পরতে– বাবা আসছি বলে মিষ্টি একটা হাসি দেয়া। তারপর দরজা খুলে বের হয়ে আবার বলবে ও– বাবা আসছি। এই যে দ্বিতীয়বার মুখ বের করে আবার কথা বলা এটার জন্যই বাবা হবার সত্যিকারের মাধুর্য টের পাই। সংসারে নিরবিচ্ছিন্ন আনন্দ বলতে সন্তান। সন্তানের বেড়ে ওঠার সময়ই পিতা মাতার স্বর্গীয় বাস একথা আজ আবার লিখলাম নোটবুকের মাঝ বরাবর পাঁচটা তারা চিহ্ন এঁকে। সেদিন সেলিম আসেনি বলে আহিরের মাকে নিয়ে দাঁতের ডাক্তারের কাছে যেতে হলো উবারে চড়ে। দারুণ সে উবারের ড্রাইভার। হাতে ঝকঝক করছে ঘড়ি, সুগন্ধিও নামী কোম্পানির। মিতব্যয়ী শব্দের গড়া বাক্যে কথা বলা– সব মিলিয়ে পরে বুঝে নিয়েছিলাম ব্যাক্তিগত গাড়িই সে ব্যবসায় খাটিয়ে নিচ্ছে। নামার সময় তাঁকে ফাইভ স্টার দিলাম সানন্দে। 

নোটবুক থেকে চোখ সরিয়ে দরজার কোণে সবুরের জুতো জোড়ার দিকে তাকিয়ে মনে হলো এই মানুষটির কত কত ফাইভ স্টার পাওনা সে হিসেব কোনদিন রাখিনি। সেই যে ছেলেবেলায় স্কুল থেকে ফিরে সবুরের তিমি মাছের মতো তেলতেলে পিঠে চেপে পুকুরের কিনার ঘেঁষে সাঁতার শেখার দিনগুলোতে ডুবে যেতে যেতে ওর কব্জি চেপে ধরা, তারপর কবে কখন শিখে ফেলা সাঁতার! সবুরের পিঠে আমাদের বাড়ির সব ছেলে মেয়েদের কোনো না কোনো ভাবে চড়তে হয়েছে। কখনো ঘোড়া সেজে সারা উঠোন আবার কখনো মেলার মাঠে ওর ঘাড়ের দু’পাশে ঝুলেছে আমাদের পা। বাবা মরার প্রায় মাস খানেক আগে কত যে গল্প করতো! যুদ্ধের কথা খুব বেশি বলতে চাইতো। তখনো সবুর বাবার পায়ের কাছে বসে বসে কাঁদতো। ঐরকম ভাবে আমরা চার ভাই বোনও কাঁদিনি। আমার বড়ো ভাই শিল্পপতি। চিংড়ি রপ্তানিতে নাম-ধাম টাকা-পয়সা করার পরপরই রাজধানীতে গার্মেন্টস কারখানা বসায়। তার আশেপাশে শ’য়ে শ’য়ে লোক।

তবু সবুর সমান ভাবে নারকেল, ক্ষেতের ভাইটাল চাল সব ভাই বোনেদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে দিয়ে আসবে। বড়দা সবুরের যাওয়া আসার কোন খবরই রাখেনি কোনদিন। আমি নিজে যেমন বড়দার খবর পত্রিকার বাণিজ্য পাতায় দেখে-টেকে উল্টে রেখে দেই, আহির আবার তা কখনো করে না। বড় চাচার নির্লিপ্ত মুখই তাঁর সুখকর চিৎকারের কারণ। আজ রি-ইউনিয়ন সেরে গুলশানে সে যে ঢুঁ মারবে সেটা জানা কথা। রেহানাও যায় টায় পারিবারিক সঙ্গতগুলোয়। আমার কেবল বুক ভরা অভিমান জমা হয়। খুলনার বাড়িটার শাল কাঠের কালো সিন্দুকটার মতো আলগোছে অন্ধকারে আমার ক্ষোভ জমা হতে থাকে। ছোটো ভাই টেক্সাসে জাঁকিয়ে বসে টসে উইক এন্ড-এ তাঁবু খাটাতে গিয়ে ছবি পাঠায় হোয়াটস অ্যাপে। ওর মেয়ে নিশিথা আমার মেয়ের চেয়ে কয়েক বছরের ছোটো। কিন্তু সে পড়ছে লোহার মতো শক্ত বিদ্যে নৃতাত্বিক নিয়ে। বাংলাদেশ নিয়ে আগ্রহের সীমা নেই তার। খুব যে ভালো বাংলা জানে তাও না। তবু পারিবারিক ট্রি করেছে নিখুঁত ভাবে। সেখানে সবুরের নাম না থাকলেও সে আমার ভাই, রক্তঋণের ভাই! 

আহিরকে বলতে হবে নতুন একটা বংশলতিকা করার। সেখানে সবুরের বাবার ও সবুরের নাম থাকবে উজ্জ্বল অক্ষরে। রাত গভীর হলে সবুর আর আমি বেরিয়ে পড়লাম। কমলাপুর রেল ষ্টেশনের শান বাঁধানো চেয়ারগুলোতে খালি পা মানুষগুলোর মতো আমি আর সবুর শুয়ে শুয়ে আকাশ দেখতে লাগলাম। আমার পাগলামির সাথে পরিচিত সবুর। বলা যায় প্রশ্রয় দেয় ইচ্ছেগুলোকে। রেহানাও জানে না রেলষ্টেশনে অচেনা মানুষ আর তাদের ছুটন্ত পায়ের বিচিত্র ভঙ্গি আমার ভেতরের শূন্যতা গিলে ফেলে। আবার ভোরের মুখে ফিরি দু’জনে। সবুর সঙ্গ দেয়, পাহারা দেয় এমনকি ওর ব্যাক্তিত্ত্বের যে আভা সেটার পুরোটা বিলিয়ে দেয় আমাকে। সালভাদর ডালির একটা পোট্রেটের সাথে হবহু মিল আছে সবুরের। সেই বিস্ময়ে গোল পাকানো দৃষ্টি আর সারা মুখ ভর্তি দাড়ি গোফের কোকড়ানো অবয়বে মজবুত পেশির প্রতিটি ভাঁজে ধৈর্য্য, শান্ত কিন্তু তীক্ষ্ণসারল্য, বন্ধুবৎসল আর যুগ যুগান্তের ইতিহাস প্রস্ফুটিত। 

বুকের ভেতর মোচড় খেলে যায় ঐ মুখ দেখলে আমার। মনে হয় যা যা জীবনে আমরা ভাই বোনেরা ভোগ করেছি তার কোনো কিছুই আমাদের না। সবুরের বয়স বাড়ার সাথে সাথে আমারও বেড়েছে। ও যত হাসিখুশি হচ্ছে দিনদিন আমি তত নিশ্চুপ দায়গ্রস্থ এক মানুষের শিলালিপিতে পরিণত হচ্ছি। আহিরের বাচ্চাটা দু’দিন হলো অসুস্থ। হঠাৎ অন্য আবহাওয়ায় ধাতস্থ হতে গিয়ে সামান্য যা হয় সবার, কিন্তু রেহানার মুখ রক্তশূন্য। আহিরের চোখ থই থই কান্নায় নমিত। এসবের মাঝেও আমাকে যেতেই হবে, খুলনা– রক্তঋণের টানে। সবুরকে নিয়ে যশোর এয়ারপোর্টে নামার সাথে সাথে আহিরের মেসেজ,

“বাবা, মিস ইউ! ফিরে এসো সেইফলি।”

আমার মুখের ভাঁজেও খেলে উঠলো নির্ভার হাসি। দীর্ঘদিনের ড্রাইভার বশিরের দক্ষ দৃষ্টি চিনে ফেললো আমার হ্যাট, সানগ্লাসে ঢাকা মুখটাকে। নাকি আমার সমস্ত শরীর জুড়ে ওদের ভালোবাসার চক টানা; যে গন্ডিতে এলেই ধরা পড়ে যাই। গাড়ির স্টিয়ারিং এ হাত রেখে বশির পড়ে ফেললো আমার অনেক কথা। হেমন্তের আয় খুকু আয় গান চালিয়ে রিয়ারভিউ মিররে তাকিয়ে হাসলো। 

হ্যাঁ এই গানটি শুনতো আমার বাবা দীপা বাড়ি ছেড়ে পালোনর পর থেকে। মা তখন শয্যাশায়ী। বশিরের বউ, সবুরের বউ পালা করে মায়ের পায়ে রসুনের কোয়া চুবানো তেল মালিশ করতো। মা যেন সমস্ত ভালোবাসার পালা পার্বণ চুকিয়ে বিছানা নিয়েছেন। অন্য সন্তানেরা তখন দেয়ালে আলোর ছায়া কাটা রেখার মতো নির্বাক স্পর্শহীন বিলীয়মান তাঁর কাছে। আজ সবুর পথ চিনিয়ে নিয়ে চললো দীপার সেই ঘর পালানো পুতুল খেলা বাক্সের সংসার দেখতে। এতো কাছে থাকে এয়ারপোর্টের, আশ্চর্য! কতবার গিয়েছি এই পথ ধরে, কই কোনোদিন তো সবুর মুখ ফুটে বলেনি– “মেঝদা ঐ তো ওই শিমুল গাছটা পার হলেই দীপার বাড়ি! আমি সানগ্লাসের ভেতর দিয়ে পরখ করি সবুরের কোকড়ানো দাড়ি ভর্তি চোয়াল। এ তো সালভাদর ডালির আঁকা মুখ। একে চেনা এত সহজ মেহরাব খান। নিজের দিকে তাক করি বৃদ্ধাঙ্গুল। কালো গাড়িটা ঢুকলো যখন নাকে এসে মাধবীলতা ফুলের গন্ধ ঝাপটা দিল। সারা বাড়ি ছেয়ে আছে ফুলে। 

একতলা বাড়ির লাল মেঝে জুড়ে সাদা আলপনা। একটা মোরগ ঝুটি বাগিয়ে ধাওয়া করছে নিরীহ অন্য আরেকটি কম উচ্চতার ঝুটি সমেত মোরগকে। তাই দেখে দীপা আর আমার ছেলেবেলার কথা মনে পড়লো। বাড়ির সব থেকে আদরের বোন অথচ ওর সাথেই ছল করে ঝগড়া করা, হুটোপুটি করা আমাদের ভাইদের নিত্য খেলা ছিল। দীপার ভেতর একটা মিষ্টি সারল্য ছিল। মার মুখটা পেয়েছে বলেই বাবার আদরের সীমা ছিল না ওকে ঘিরে। আমি সবুরের হাতে মিষ্টির প্যাকেট দিয়ে একা ঢুকলাম বাড়িটায়। শান্ত দুপুর। পেঁপে গাছে হলদে পাখি লেজ নেড়ে নেড়ে কুটুম আলো, কুটুম আলো ডাকছে। উঠোনে তিল রোদে দেয়া। গোল করে অনেকটা জায়গা জুড়ে নরম তিলের ভেতর পায়ের ছাপ। দেখে বুকটা ব্যথায় কয়েকটা পালস মিস করলো। দীপা, আমার ছোট্ট খুকু সোনা বলে বাবার ডাকটাও বুঝি শুনতে পেলাম। চোখের ভেতর কিচ কিচ করে উঠলো বালু ফেলা ছটফটানি। কান্নার একটা চোরা স্রোতের ধারায় বাঁধ দিয়ে ফেললাম ততক্ষণাৎ।

দীপা টালি বসানো চালের রান্নাঘরে দুধ জ্বাল দিচ্ছিল। আমার দিকে চোখ পড়তেই অবিশ্বাস্য দৃষ্টি ফেলে বোবা হয়ে রইল মিনিট দু’য়েক। আমি হেসে বললাম, 

– দুধ উথলে পড়া ভালো না মন্দ বলতো খুকি!

চুলায় বুঝি শিমুলের শক্ত খোল পুড়ছিল পটাস পটাস ফুটছে আগুন। দীপা শাড়ির আঁচলে ধরে দুধের পাতিল নামিয়ে জল ছেটালো চুলার গনগনে মুখে।

– মেঝদা তোর মাথায় কালি লাগবে, চল বারান্দায় চল।  

কথা বলছে কিন্তু গলা ওর কাঁপছে। আমি টানা বারান্দাটাতে গিয়ে কাঠের চেয়ারে বসি। দীপার হাতে গরম দুধ। সাথে বাটিতে ছোটো বর্গাকৃতির মিছরি। বাড়িতে কেউ এলে মা-ও এমন মিছরি খেতে দিত। কিছুই ভোলেনি দেখছি। সবুরের এবাড়ির সব কোণ চেনা। সে নিজের মতো জায়গা করে নিয়ে নীরব দর্শক হয়ে থাকলো। আমার চোখ সেই মানুষটাকে খুঁজলো দীপার দেয়া দুধের গ্লাসে চুমুকের বিরতি মেপে মেপে।

একদিন তুমুল বৃষ্টির রাতে দরজায় প্রবল ধাক্কা। আমি তখন সবে ইন্টারমিডিয়েট শেষ করেছি, পড়ছিলাম বুদ্ধদেব দাসগুপ্তের বই। দরজা খুলতেই কাকভেজা প্রবালদা। বড়দার বন্ধু। ঘরে ঢুকেই বললো, পুলিশ খুঁজছে। সকালেই বর্ডার পার হবে। রাতটুকু থাকতে চায়। প্রবালদা ছিল আমাদের হিরো সে সময়। ইংরেজি নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তো। যশোহরে বাচ্চাদের গানের স্কুলের খন্ডকালীন মাষ্টারিও করতো। বব ডিলানের “নকিং অন হ্যাভেনস ডোর” গানটা প্রথম প্রবালদা’র কাছেই শোনা। টেবিলে আঙ্গুল দিয়ে দারুণ তাল তুলে গানটা যখন গাইতো, আমরা সব প্রবালদা’র মতো হতে চাইতাম। সেই বর্ডার যাওয়া হয়নি সেদিন ওর। মানুষটা বিপ্লব করে পাল্টে দিতে চেয়েছিল সমাজের অনায্য অস্থিরতা। কিন্তু ক্রমে গোড়া পঁচে যাওয়া গাছের মতো উপড়ে যাওয়া বিকট সমাজ থেকে পালালো প্রবালদা। সেই সঙ্গে দীপাও। বাবা আমাদের সব ভাইদের খুলনা থেকে সরিয়ে দিলেন। আমরাও প্রবালদাকে মুছে ছুঁড়ে ফেলে দিলাম অকেজো হাতিয়ারের মত।

আজ দীপার ভেতর পূর্ণ মায়ের প্রতিচ্ছবি দেখে মধ্য বয়সটাকে মুহূর্তে একটা গোলকধাঁধা থেকে বের হতে দেখলাম। এই তো মা……. এই তো……. ছোটো দীপা……. তবে কেন ছিল এত বছরের অদেখা, শব্দহীন দূরত্ব? দুপুরে ভাত খেতে বসে জানলাম দীপার একটাই মেয়ে। ফুটবল খেলে এখানকার কোন ক্লাবের হয়ে। বুঝলাম প্রবালদা’র বিপ্লব চলছে তাহলে।

– ওরা আসবে কখন?

– ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যে হবে মেঝদা। 

আমার দেরি করার উপায় নেই ফলে আর একটা দিন আসার ইচ্ছা পোষণ করে সবুরকে নিয়ে খুলনার দিকে ছুটলাম। দীপার সিদ্ধান্ত ওর জীবনের জন্য সঠিক এখন মানতে পারছি অনায়াসে। অথচ পঁচিশ বছর আগে পারিনি। যখন আমার বিপ্লব করার কথা ছিল। আমারও পিঠে পুলিশের ডান্ডা পড়ার কথা ছিল। কিন্তু সে সময় আমরা কম্পিউটারের কী বোর্ডে অন্য দুনিয়া দেখার নেশায়, ভালোভাবে বাঁচার জন্য রাতভর রসায়নের জটিল অঙ্ক করেছি। বাবা মা’র আদর খেয়েছি। এখন এই আমার মেয়ে আহির যখন বিদেশে পড়তে যেয়ে আর ফিরছে না ঘরে, অন্য ভাষায় বই পড়াচ্ছে অন্য দেশের মানুষদের– তখন আমার বুক কেন ভার হবে। এই যে গাড়ি, বশিরের হৃদয়, সবুরের হৃদয় এসব তো আমি অযাচিত ভোগ করছি। বাবাও বলে গিয়েছিল এ সত্যিটা মৃত্যুর আগে। ঘুমে চোখ বুজে আসছে আমার। 

– সবুর কতদূর?  

– চলে আইছি মেঝদা। 

আমি গভীর ঘুমের ডাকে চলে গেলাম। জানিনা কখন কি করে বিছানায় এলাম। সন্ধ্যের গাঢ় ছায়া ঘরের দেয়াল দখল করে আছে। শাল কাঠের সিন্দুকটা কালো হতে হতে এমন চকচকে আজ– যেন কষ্টি পাথরে গড়া ওটা। দীপার লুকানোর প্রিয় জায়গা ছিল ঐ সিন্দুকটা। বাবা অফিস থেকে ফিরে সারা টুটপাড়া খুঁজেও পাচ্ছিল না খুকিকে। যখন আমাদের ভাইদের ওপর মহাযুদ্ধ বয়ে গেল সেবার। সেদিনও সবুর যেয়ে ঘুমন্ত দীপাকে সিন্দুক থেকে বের করে। বাবার সে কি কান্না! ঘুম থেকে উঠেই সিন্দুকটাকে কথা বলা বাক্স বলে মনে হলো আমার। কত কথা যে ওর পেটে! আমার হার্টের অবস্থা দিন দিন কেমন বেলে মাছের মতো হয়ে যাচ্ছে। অল্পতেই ক্লান্ত হয়ে উঠছি। সবুর যেন আমার জাগার আশায় বসে ছিল।  

– মেঝদা, প্রফেসর সাহেব বসি আছে, তাকে কি কাল আসতি বলব? 

– না না, এক্ষুণি। আমি তাড়া দিলাম। ভীষণ ভদ্রগোছের মানুষ প্রফেসর হাকিম। এখানে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে গবেষণা করছেন, বই লিখছেন।  

বাবার ডাইরি আর ঐ সিন্দুকটা তাকে আজ দিতে চাই আমি। এ আর আমাদের কিছু না। বড়দা, ছোটো ভাই, দীপা সবার অনুমতি পেয়ে গেছি আমি। তবে আর অপেক্ষা কেন। চশমার ফ্রেমটাতে প্রফেসর হাকিমের মুখটা বেশ বড়ো বড়ো লাগে। কিন্তু কথা বলেন আলতো চেপে চেপে। শব্দরা যেন আঘাত না পায় এমনভাবে কথা বলা মানুষ খুব কম দেখেছি আমি। তিনি চায়ের কাপ হাতে বারবার সিন্দুকটা প্রদক্ষিণ করলেন চাপা আনন্দে। যেন গুপ্তধন পেয়েছেন হাতের নাগালে। 

– কি অদ্ভুত! এই সেই প্রাণদায়ী বাক্স! এখানেই লুকিয়ে ছিল সোনার ছেলেরা! 

আমার ক্লান্ত স্বরে কোথা থেকে প্রাণশক্তি পায় কে জানে, বলে উঠি আমিও,

– যুদ্ধের স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে একে রক্ষা করার দায়িত্ব আজ থেকে আপনার।

এরপর সিন্দুক থেকে বহুযত্নে রাখা বাবার অ্যালবাম বের করি। একটা ছবি বের করে প্রফেসরের হাতে দিয়ে বলি,

– ইনি সেই মানুষ, যে না থাকলে একটা পুরো দল সেদিন মারা পড়তো। একে আপনি বইয়ের পাতায় ঠাঁই দিন।

টিউব লাইটের আলোয় ফটোর ফ্যাকাশে হয়ে আসা মুখটা দেখতে সবুরের মতো। দাড়ি নেই শুধু। লুঙ্গি আর সাধারণ গেঞ্জি পড়ে সফেদা গাছের নিচে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটি সবুরের সাহসী বাবা আজগর মিঞা। আমাদের বাড়ির প্রধান কেয়ারটেকার। ১৯৭১ এর সেপ্টেম্বরে যখন আমি মায়ের কোলে দুধের শিশু, বাবা যুদ্ধে গেছেন। সবুরের মা’ও সন্তান সম্ভবা। মিলিটারি খোঁজ পেল একটা মুক্তির দল ঢুকেছে পাড়ায়। কিন্তু তাঁদের কোনো হদিস পেতে দেয়নি সেদিন আজগর মিঞা। বুদ্ধি করে সিন্দুকে বাবা ও তার দলকে ঢুকিয়ে মুড়ির বস্তা দিয়ে ঢেকে দিয়েছিল। তারপর মাকে আর দাদিকে বড়দাসহ অন্য দরজা দিয়ে পালিয়ে যেতে দিয়ে মিলিটারির বন্দুকের নলের সামনে পেতে দিয়েছিল বুক। সবুরের সাহসী বাবা। সবুর তখন বড়দার খেলার সাথী। আর সবুরের মা’কে পরদিন রূপসার স্রোতে ভেসে উঠতে দেখা যায়। এ ইতিহাস বাবা লুকিয়ে রেখেছিল বহুকাল। সবুরের ভাগ্যে আমাদের মতো মাখন জোটেনি। অনুগত ভৃত্যের মতো সমস্ত জীবন ধরে বাপের মতো নিজেকে বিলিয়ে গেল শুধু।

যেদিন থেকে জেনেছি ওর বাবার কথা, মায়ের কথা– সেদিন থেকেই আসলে নিজের জীবনটাকে তুচ্ছ মনে হচ্ছিল। আজ যেন নির্ভার, মুক্ত হলাম। প্রফেসর হাকিম বিদায় নিলেন যখন বিদ্যুৎ চলে গেল। আমি সবুরকে মোম জ্বালাতে বারণ করলাম। এই আলোহীন রাত, আঁধারের আড়াল বড়ো উপভোগ্য লাগলো আমার কাছে।

লেখক:
Murshida Jaman
মুর্শিদা জামান
কবি, লেখক ও চলচ্চিত্র নির্মাতা।

তিনি বাংলাদেশের নারীর অধিকার বিষয়ে একজন সাহসী ও স্পষ্টভাষী কণ্ঠ হিসেবে পরিচিত। তাঁর কাজ—যা সাহিত্য থেকে শুরু করে বিভিন্ন শিল্পমাধ্যমে বিস্তৃত—সমাজের প্রচলিত ট্যাবু, নারীর শরীর, নিষিদ্ধ যৌনতা, প্রাতিষ্ঠানিক লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা এবং বাংলাদেশের ধর্মীয় মৌলবাদের উত্থানকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে।
তিনি ইডেন মহিলা কলেজ থেকে বাংলা সাহিত্যে স্নাতক (বি.এ.) ও স্নাতকোত্তর (এম.এ.) ডিগ্রি অর্জন করেন।

তাঁর ছোটগল্প, কবিতা এবং অন্যান্য রচনা বাংলাদেশ ও ভারতের বিভিন্ন পত্রিকা, সাহিত্য সাময়িকী এবং অনলাইন মাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। তাঁর সর্বশেষ ছোটগল্পগ্রন্থ Unstandseligt forår (২০২৪) তাঁর প্রথম ড্যানিশ ভাষায় প্রকাশিত কাজ।

মন্তব্য করুন (Comments)

comments

Share.

About Author

বাঙালীয়ানা স্টাফ করসপন্ডেন্ট