আজও ভাস্বর কমরেড লেনিন

Comments

“লেনিন সারা দুনিয়া জুড়ে হাঁটেন
কোনো দেশের কোনো সীমানা তাঁকে বাঁধা দিতে পারেনা
কোনো সৈনিক-ছাউনি কোনো বাধার প্রাচীর
কোনো কাঁটা তারের বেড়া
তাঁর চলার গতিকে থামাতে পারেনা…..’
         – ল্যাংস্টন হিউজ

২২ এপ্রিল – সারাবিশ্বের শোষিত বঞ্চিত মুক্তিকামী মানুষ, শোষণ-অত্যাচারের অবসানে, ন্যায্য অধিকার রক্ষার দাবিতে সংগ্রামরত শ্রমজীবী জনগণ, স্বাধীনচেতা প্রগতির অভিযাত্রী – সবার কাছেই এক স্মরণীয় অত্যুজ্জ্বল দিন। ১৮৭০ সালের এই দিনটিতেই জন্মগ্রহণ করেছিলেন বিশ্বের প্রথম সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থার সফল রূপকার কমরেড ভ্লাদিমির ইলিচ উলিয়ানভ। আবিশ্ব যাঁর পরিচিতি ‘লেনিন’ নামের সংগ্রামদীপ্ত চেতনায়। এইদিন তিনি রাশিয়ার মহানদী ভোলগার তীরে সিমবির্স্ক শহরে জন্মগ্রহণ করেন। জার শাসিত রাশিয়ায় তাঁর নেতৃত্বেই প্রথম সফল সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের মধ্যদিয়ে সোভিয়েত ইউনিয়নে শ্রমিক শ্রেণির রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়। সাম্রাজ্যবাদী শৃঙ্খলের দুর্বলতম গ্রন্থিতে সজোরে আঘাত করে বিপ্লবী অভ্যুত্থান ঘটানোর উপযুক্ত মুহূর্ত নির্ধারণ করার যে সূত্র লেনিন উপস্থাপিত করেছিলেন তা মার্কসবাদের বিকাশে তাঁর অনন্য অবদান হিসেবে প্রতিভাত হচ্ছে। মানবমুক্তির আন্দোলনের ইতিহাসে কমরেড লেনিনের এই মহান অবদানকে স্মরণ করে এই দিনটিতে পৃথিবীর দেশে দেশে তাঁর জন্মদিবস উদ্‌যাপিত হয়ে আসছে।

এবছর একদিকে যেমন ভি আই লেনিনের ১৫৫ তম জন্মদিবস, আবার এই বছরই তাঁর প্রয়াণের শতবর্ষ। তাই স্বাভাবিকভাবেই সর্বহারা বিপ্লবী আন্দোলন – কমিউনিস্ট আন্দোলনের পক্ষ থেকে কমরেড লেনিনের বর্ণময় সংগ্রামী জীবন, কর্মকাণ্ড ও অবদান নিয়ে আলোচনা ও নানা কর্মসূচি সংগঠিত হচ্ছে। বর্তমান সময়ে এই আলোচনার পরিসর ও উৎসাহ আরও বৃদ্ধি পেয়েছে।

মানব সভ্যতার বিকাশ ধারায় গুণগত পরিবর্তনের ক্ষেত্রে কমরেড লেনিন অসামান্য অবদান রেখে গেছেন।  সমাজের বুকে নিশ্চল পর্বতের মতো অবস্থান করা শ্রেণি শোষণের অবসান ঘটিয়ে শোষণহীন সমাজতান্ত্রিক সমাজ গড়ে তোলার অনন্যসাধারণ নজির সৃষ্টি করেছিলেন তিনি। সর্বহারা বিপ্লবের মধ্যদিয়ে পুঁজিবাদ ও শোষণ ব্যবস্থার অবসান ঘটানো যে সম্ভব, তা তিনি প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন সোভিয়েতের বুকে সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা নির্মাণ করার মধ্য দিয়ে। সর্বহারা বিপ্লব সফল করা, কমিউনিস্ট পার্টি গড়ে তোলার মতো কঠিন কাজ করার পাশাপাশি সর্বহারা বিপ্লবের মতবাদ অর্থাৎ মার্কসবাদের বিকাশ ও সমৃদ্ধি ঘটানোর ক্ষেত্রেও লেনিন অসামান্য অবদান রেখে গেছেন। তাঁর সেই গুরুত্বপূর্ণ অবদান ও ভূমিকাকে স্মরণে রেখেই বিশ্ব কমিউনিস্ট আন্দোলন সর্বহারা বিপ্লবের মতবাদকে মার্কসবাদ-লেনিনবাদ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।

কমরেড জে ভি স্তালিন লেনিনবাদ সম্পর্কে বলেছেন, “লেনিনবাদ হলো সাম্রাজ্যবাদ এবং শ্রমিক-বিপ্লবের যুগের মার্কসবাদ। আরও সঠিকভাবে বলতে গেলে বলতে হয়, লেনিনবাদ হলো সাধারণভাবে শ্রমিক-বিপ্লবের মতবাদ ও রণকৌশল  এবং বিশেষভাবে এ হলো শ্রমিকশ্রেণির একনায়কত্বের মতবাদ ও রণকৌশল”। তিনি আরও বলেছেন, “লেনিনবাদ শুধু মার্কসবাদকে পুনরুজ্জীবিত করেছে তাই নয়, আরও অগ্রসর হয়ে গেছে – পুঁজিবাদ এবং শ্রমিকদের শ্রেণিসংগ্রামের নতুন অবস্থায় মার্কসবাদকে আরও পরিবর্ধিত করেছে”

আজ পুঁজিবাদের কণ্টকাকীর্ণ ব্যবস্থা থেকে উদ্ভূত তীব্র অর্থনৈতিক সংকট এবং নয়া ফ্যাসিবাদ যখন ভারতসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মাথাচাড়া দিচ্ছে এবং বিভিন্ন দেশের শাসকবর্গ ধর্মকে হাতিয়ার করে ও তাকে রাষ্ট্রশাসনের অঙ্গীভূত করে সাধারণ মানুষের মধ্যে বিভেদ-বিদ্বেষের বিষ ছড়িয়ে শোষণ ব্যবস্থাকে আরও প্রকট করছে, তখন মার্কসবাদ ও লেনিনবাদের প্রাসঙ্গিকতা আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠছে। ১৯০৫ সালে ‘সমাজতন্ত্র ও ধর্ম’ শীর্ষক একটি রচনায় লেনিন যথার্থই বলেছিলেন, “শ্রমিকদের অর্থনৈতিক পীড়নের অনিবার্য পরিণতি অজস্র প্রকার রাজনৈতিক পীড়ন ও সামাজিক অবমাননা, জনগণের আধ্যাত্মিক ও নৈতিক জীবনের কর্কশতা ও অন্ধকার। অর্থনৈতিক মুক্তির জন্য সংগ্রামার্থে শ্রমিকদের পক্ষে অল্পবিস্তর রাজনৈতিক স্বাধীনতা লাভ সম্ভব, কিন্তু পুঁজিকে ক্ষমতাচ্যুত না করে কোনো স্বাধীনতাই দারিদ্র্য, বেকারি এবং পীড়ন থেকে তাদের মুক্তিলাভ অসম্ভব। ধর্ম আধ্যাত্মিক পীড়নের অন্যতম প্রকার বিশেষ। চিরকাল অন্যের জন্য খাটুনি, অভাব ও নিঃসঙ্গতায় পীড়িত জনগণের উপর সর্বত্রই তা চেপে বসে। শোষকদের বিরুদ্ধে শোষিত শ্রেণির সংগ্রামের অক্ষমতা থেকেই অনিবার্যভাবে উদ্ভূত হয় মৃত্যু-পরবর্তী উত্তম জীবনের প্রত্যয়, যেমন প্রকৃতির বিরুদ্ধে সংগ্রামে আদিম মানুষের অক্ষমতা থেকে উদ্ভূত হয় ঈশ্বর, শয়তান, অলৌকিকত্ব ইত্যাদিতে বিশ্বাস। যারা সারাজীবন খাটে আর অভাবে নিমজ্জিত থাকে, ধর্ম এ পৃথিবীতে তাদের নম্রতা ও সহিষ্ণুতার শিক্ষাদান করে স্বর্গীয় পুরস্কারের সান্ত্বনা দেয়। কিন্তু যারা অন্যের শ্রমশোষক, ধর্ম তাদের পার্থিব জীবনে বদান্যতা অনুশীলনের নির্দেশ দেয়। এভাবেই শোষক হিসেবে নিজেদের অস্তিত্বের ন্যায্যতা  সপ্রমাণের জন্য ধর্ম খুবই সস্তা সুযোগ দেয় ও পরিমিত মূল্যের টিকিটে স্বর্গবাসে তাদের স্বাচ্ছন্দ্যবিধানের ব্যবস্থা করে। ধর্ম জনগণের পক্ষে আফিমস্বরূপ। ধর্ম একপ্রকার আধ্যাত্মিক সুরা বিশেষ এবং এরই মধ্যে পুঁজিদাসদের মনুষ্য-ভাবমূর্তি এবং অল্পবিস্তর মানুষ হিসেবে বেঁচে থাকার দাবি নিমজ্জিত”

উপরোক্ত লেখাই প্রমাণ করে আজকের সময়েও কমরেড লেনিনের প্রাসঙ্গিকতা কতটা সজীব ও উজ্জ্বল। জন্মদিনে এই মহান বিপ্লবীকে শ্রদ্ধা জানাই বিশিষ্ট কবি মণিভূষণ ভট্টাচার্যের কবিতায় –

“একটি নামে প্রাণ-জেগে ওঠে,
একটি নামে জ্বলে ওঠে দিন–
একটি নামে শুদ্ধ বসুন্ধরা
ভ্লাদিমির ইলিচ লেনিন”

তথ্যসূত্র:
* ‘সমাজতন্ত্র ও ধর্ম’ – ভি আই লেনিন, ন্যাশনাল বুক এজেন্সি, কলকাতা-৭৩;
*’লেনিনবাদের ভিত্তি’ – জে ভি স্তালিন, ন্যাশনাল বুক এজেন্সি, কলকাতা-৭৩;
* ‘প্রেরণার উৎস’ – (নভেম্বর ১৯৯১) মনন ও সৃজন, ১৯ পিসি ঘোষ রোড, কলকাতা-৪৮;
* গণশক্তি, ২২ এপ্রিল ‘২৪ সংখ্যায় প্রকাশিত প্রতিবেদন ও প্রবন্ধ।

লেখক:

Sandeep Dey

সন্দীপ দে, যুগ্ম সম্পাদক, বাঙালীয়ানা
(বানানরীতি লেখকের নিজস্ব- সম্পাদক)

মন্তব্য করুন (Comments)

comments

Share.

About Author

বাঙালীয়ানা স্টাফ করসপন্ডেন্ট