আবু কাজী রুবেলের কবিতা

Comments

আকাশের ফুল

আকাশও মনের কথা বলতে পারে
বিড়বিড় করে বলে নৈশব্দের সংলাপ,
রোদের আলোতে গা ভিজেয়ে কথা বলে
আড়ালে কান পেতে শোনে সূর্য চুপচাপ।

কথার উত্তরে সূর্য ছড়ায় সৃজনী উত্তাপ
জল বলে যাব আমি, কে সে ডাকে আমায়?
বাতাসের রথ ছুটে যায় দূর মেঘের খোঁজে
ডানা মেলে ঐ নীল আকাশের ঠিকানায়।

সাদা মেঘেরা দিনভর কানাকানি করে
সাজাবে দল বেঁধে প্রতীক্ষার বৃষ্টিমেলা,
তুলতুলে সিঁড়ি বেয়ে উঠে যায় সংগোপনে
মন ভরে ঝরাবে রিমঝিম বৃষ্টি এক পশলা।

ফোঁটা ফোঁটা জল, ভেজে ফুল পাপড়িতে
ফিরে পায় শক্তি শিকড়ের গভীর প্রাণে,
মায়ার বাঁধনে বাঁধে সবুজের মিশ্র খোঁপা
কালো ভ্রমর তবে আসবে কখন এখানে?

– ক্যালিফোর্নিয়া, ২০২২

ঈশ্বরের ক্ষমা

কেঁদো না মা! আমি এখন স্বর্গে আছি!
শুনেছি ঈশ্বরও আছেন এখানে!
এখানে আরো আছে ক্যাথলিক বোর্ডিংয়ের ইন্ডিয়ান শিশু হাজার হাজার,
কালাকানুন করে ওদেরকেও ধরে নিয়ে এসেছিল ক্যানেডিয়ান পুলিশ-ইনুত বসতি থেকে
যাদের সঙ্গী ছিল অভিশাপ, অনাহার আর দুর্ধর্ষ পাদ্রীদের বিভীষিকাময় দুর্ব্যবহার।

ওরা কেড়ে নিয়েছিল আমার মায়ের ভাষা, ইনুত ভাষায় কথা বলা ছিল একদম নিষেধ,
নিত্যদিনের পচা খাবার গিলে নেবার আদেশ ছিল হেসে-খেলে,
মরণঘাতী জ্বর আর যক্ষার একমাত্র দাওয়াই ছিল পাদ্রীর পবিত্র বাইবেলে
বাইরে যাওয়ার অধিকার ছিল না, ক্যাথলিক স্কুল নামের এই নিষিদ্ধ জেলে।

বদ্ধ ঘরে আমি দেখেছি পাদ্রীদের চেপে রাখা কামনার কি বীভৎস যৌনাচার
ওরা ঈশ্বরকে ভয় পায়নি একটুও! ভয় পেয়েছিল দুর্বল অবলা শিশুদের!
রাতের অন্ধকারে ওরা করেছিল গণহত্যা!
গলা টিপে শ্বাসরোধ করেছিল আমাকে! শ্বাসরোধ করেছিল সত্যের!

কদিন আগে ঐ পাদ্রীকেই দেখেছি এই ঈশ্বরের স্বর্গে
শুনেছি কার্ডিনালের বিশেষ ক্ষমায় এসেছেন উনি,
অনুরোধটা ফেলতে পারেননি দয়াশীল পিতা,
ভেবেছি মা-ঈশ্বরের দেখা পেলে বলবো
তুমি কি আবার ক্ষমা করে দেবে অন্যায় অত্যাচার?
নিরপরাধ শিশুদের হত্যা?

ক্যালিফোর্নিয়া, ২০২২

ভালোবাসার আতশবাজি

ক্যামেলিয়া! মনে আছে তুমি আতশবাজি দেখতে খুব পছন্দ করতে?
জীবনের প্রথম আতশবাজিটা তুমি আমার সাথে দেখেছিলে,
আমেরিকার জন্মদিনে হাডসন নদীতে হচ্ছিল আতশবাজির প্রদর্শনী
শেষ পর্বটিতে বিকট শব্দ শুনে তুমি আমাকে জড়িয়ে ধরেছিলে।

আমি এতটা আশা করছিলাম না তোমার কাছ থেকে,
উজ্জ্বল আতশবাজির লাল নীল আলোয় আমি দেখছিলাম তোমাকে,
উপভোগের মাঝখানে ছিল একটা উৎকণ্ঠা, হতেও পারে সেটা অভিনয়
নিঃসংকোচে হয়েছিলাম আমি সাদর নিরাপত্তার আশ্রয়, তোমার ভাষাহীন আতঙ্কে।

কোনদিন ভাবিনি, আমাদের ভালোবাসাটাও হবে আতশবাজির মতো;
বেশ উপভোগ্য ছিল প্রথম দিকে,
তোমার প্রতিদিনের উপস্থিতি ছিল নানা রঙে সকল রাঙিয়ে,
হঠাৎ করেই অভিমানের কারণটা না বলে তুমি চলে গেলে দূরে
নান্দনিক বিস্ফোরণের মতো আমার স্বপ্নগুলো অন্ধকারে গেল হারিয়ে।

আজ ইন্দ্রজালের ধোঁয়ায় আমার আকাশটা তলিয়ে গ্যাছে
বর্ণিল আলোয় সাজানো আমার অনুভূতিগুলো আজ নির্বাসিত,
বাতাসে আর ভেসে আসে না কোকো শ্যানেলের গন্ধ
হারিয়ে গ্যাছো তুমি! হারিয়ে গ্যাছে ভালোবাসা, আতশবাজির মতো!

ক্যালিফোর্নিয়া, ২০২২

সন্ধ্যার অপেক্ষায়

সন্ধ্যা আমাকে মনে করিয়ে দেয়, এখন আমার ফেরার পালা
যেমন পাখিরা ফিরে যায় তাদের সুখের নীড়ে,
আমিও ফিরে যেতে চাই, ফিরে পেতে চাই
তুমি কি এখনো অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছ, জানালার শিক ধরে?

আমিও বসে আছি কখন নামবে সন্ধ্যা
আকাশ জুড়ে
ক্লান্ত মেঘগুলো তোমার মতো লজ্জায় লাল হয়ে যাবে,
বলবে চলো বাড়ি যাই, যেতে হবে বহুদূর!
চোখের ইশারায় ডাকবে আমায়,
ভালোবাসার অনুভবে।

হয়তো সন্ধ্যা আমার জন্য হারিয়ে গ্যাছে স্তব্ধ ঘড়ির কাঁটায়
দিনভর অপেক্ষার পরও কোনদিন আর আসে না ফিরে,
যেমন সন্ধ্যার অপেক্ষায় কেউ কেউ হারিয়েছে-ফেলে গন্তব্য
উড়ন্ত পাখিদের মতো হয় না ফেরা কোনদিন, তোমার সুখের ঘরে।

ক্যালিফোর্নিয়া, ২০২২

নগ্নতা

গল্প বলার সময় কাঁপছিল তোমার ঠোঁট
দৃষ্টি ছিল আমার থেকে অন্যদিকে,
দিনের আলোতে মুখটাও ছিল ভীষণ ফ্যাকাশে
পারলে কি তুমি ঢাকতে ঐ নগ্নতাকে?

তোমার শব্দগুলো ছিল মিথ্যা দিয়ে গাঁথা
তুমি যদি আবার বলো এইসব গল্পকথা,
এবড়োথেবড়ো মিল ছাড়া ইটের মতো ভেঙে পড়বে
পারবে না তুমি ঢাকতে ঐ নগ্নতাকে।

তোমার কপালে ছিল বিন্দু বিন্দু ঘাম
ধমনির রক্তগুলো কোথাও-বা ছিল আটকে
নিঃশ্বাসের শব্দগুলো মনে করিয়ে দিচ্ছিল
পারবে না তুমি ঢাকতে ঐ নগ্নতাকে।

তুলোর সুতোয় শুধু ঢাকা যায় যৌনতার নগ্নতা
নগ্ন আয়নায় দেখেছ কি নিজেকে?
সত্যের সুতোয় ঢাকতে হয় মনের নগ্নতা
পারবে কি তুমি ঢাকতে ঐ নগ্নতাকে?

ক্যালিফোর্নিয়া, ২০২২

মাথাপিছু আয়

স্যারে কইল মাথাপিছু আয় বাইড়া
প্রায় আড়াই লাখ হইছে!
স্যারের দিকে দুইবার তাকাইয়া ভাবলাম-  
অভাবের সংসারে টাকাটা পাইলে ভালই হইত,
সরকার হয়ত পাবলিকরে টাকাটা নগদে দিয়া দিব।

মাঝরাতে কুত্তার মরা কান্দা ভাইসা আসে!
মাথার বালিশটা উল্টাইয়া-পাল্টাইয়াও ঘুম আসে না,
কত্ত সমস্যা! মাথা গোঁজার এই ছাপড়ার ভাড়া বাকি,
এখনো দুই মাসের।

সকালে বউ কয় শরীরডা ভালা না,
মাথা ধরা, জ্বর জ্বর, তার গতরে ব্যাদনা;
গরিব মানুষ, ডাক্তার দেহানের ট্যাকা পামু কই?
কইলাম মাথাডারে ঠান্ডা কর পাগলী,  
কপালে দে জলপট্টির ত্যানা।

চাইর বছরের সংসারে,
পাঁচ-পাঁচটা খাওনের মাথা,
চলে না সংসার!
ভোর থাকতেই কসাই পাড়া থেইক্কা
সকাল সকাল মাল নিয়া বারাইয়া পরনের পালা,
আগাইয়া যায় মাথায় ঝুড়ির পসরা-ফেরিয়ালা!

মাথা নিবেন… মাথা! খাসির মাথা!
বাঁচার লাইগ্যাই ফেরি কইরা মাথা বেচন,
চার মাথার গলির দোতলায় বিবি সাহেব ডাকলো,
কইলাম ভালা মাথা আছে, কয়ডা লাগব কন?

বউ অনেকদিন ধইরা কইতাছে মাছের মাথা খাওনের শখ;
বাজার থেইক্কা বউয়ের জন্য কিনলাম একখান কাতলা মাছের মাথা,
বউরে কমু মাথা দিয়ে মাছের মুড়িঘন্ট করতে।

বাড়ি ফিরতেই দেহি বস্তির সামনে চারিদিকে শুধু মানুষের মাথা আর মাথা!
ভীড়ের মাইধ্যে উঁকি মাইরা দেহি পোলাপানে কানতাছে!
বউয়ের মাথাডা সাদা চাইদরে ঢাকা
মনের দুঃখে অন্তরটা ফাইটা গেল!
বাজারের ব্যাগের মাথাটা হাত থেইক্কা পইড়া গেল!

দিন যায় তবু মাথার মধ্যে চিন্তাডা ঘুরপাক খাইতে থাকে
টাকার অভাবে বউয়ের মাথার রোগটার চিকিৎসা করাইতে পারলাম না
সরকার যদি মাথাপিছু আয়ের টাকাটা দিত,
তয় বউয়ের চিকিৎসাটা করাইতে পারতাম!
সাহেবরে একবার দেখলে জিগাইমু,
মানুষ মইরা গেলে কি মাথাপিছু আয় বাইড়া যায়?

ক্যালিফোর্নিয়া, ২০২২

লেখক:
Abu Kazi Rubel
আবু কাজী রুবেল, কবি

মন্তব্য করুন (Comments)

comments

Share.

About Author

বাঙালীয়ানা স্টাফ করসপন্ডেন্ট