আবোল – তাবোল, আলোয় ঢাকা অন্ধকার

Comments

।। অভীক লাহিড়ি ।।

রবীন্দ্রনাথ সুকুমার রায় সম্বন্ধে লিখতে গিয়ে বলেছিলেন,

“সুকুমারের লেখনী থেকে যে অবিমিশ্র হাস্যরসের উৎসধারা বাংলা সাহিত্যকে অভিষিক্ত করেছে তা অতুলনীয়। তাঁর সুনিপুণ ছন্দের বিচিত্র ও স্বচ্ছল গতি, তাঁর ভাব সমাবেশের অভাবনীয় অসংলগ্নতা পদে পদে চমৎকৃতি আনে। তাঁর স্বভাবের মধ্যে বৈজ্ঞানিক সংস্কৃতির গাম্ভীর্য ছিল, সেইজন্যই তিনি তাঁর বৈপরীত্য এমন খেলাচ্ছলে দেখাতে পেরেছিলেন। বঙ্গ সাহিত্যে রঙ্গ রসিকতার উৎকৃষ্ট দৃষ্টান্ত আরও কয়েকটি দেখা গেছে, কিন্তু সুকুমারের হাস্যোচ্ছাসের বিশেষত্ব তাঁর প্রতিভার স্বকীয়তার যে পরিচয় দিয়েছে, তার ঠিক সমশ্রেণীর রচনা দেখা যায় না। তাঁর এই বিশুদ্ধ হাসির সঙ্গে সঙ্গেই তাঁর অকালমৃত্যুর সকরুণতা পাঠকের মনে চিরকালের জন্য জড়িত হয়ে রইল”।

এই বিশ্লেষণের শেষ বাক্যটির এই অংশটিতে প্রথম চোখ রাখা যাক – ‘বিশুদ্ধ হাসি’। হাসির কি অশুদ্ধতা হয়? রবীন্দ্রনাথ আসলে বলতে চেয়েছিলেন বোধহয় – নির্মল হাসি, মালিন্যহীনতা যে হাসির গুণ। ব্যঙ্গ নয়, স্যাটায়ার নয়, উইট নয়, এই হাসির ধরণ ‘বিচিত্র’। এই হাসির উৎস ‘ভাব সমাবেশের অভাবনীয় অসংলগ্নতা’। অসংলগ্নতা? শুধু এই শব্দটিকে ধরলে রবীন্দ্রনাথ কি বলতে চাইছিলেন বোঝা যাবে না। সাধারণতঃ যে প্রসঙ্গের অনুষঙ্গে অন্য একটি প্রসঙ্গ আসে, সেই সাধারণ ক্রম- যা ভাবনীয় তা সুকুমারের লক্ষণ নয়। অন্যের ক্ষেত্রে যা অসংলগ্নতা সুকুমারের বেলায় সেটাই ‘ননসেন্সের’ শিল্প।

এই ননসেন্স কিন্তু মোটেই সাধারণ ননসেন্স নয়, বাইরে আপাত ‘নির্বোধের’ মোড়কের ভিতরে অন্য মোচড়।  এই ননসেন্সের মধ্যে বৈজ্ঞানিক বুদ্ধির একটা সুনিপুণ ছক আছে, রীতিমত বৃত্তাকার ছক। আবোল-তাবোল কাব্যগ্রন্থের কবিতাগুলো যখন বইয়ের আকারে সাজানো হয়েছিল, তখন তার আপাত ‘মত্ত পাগল’-এর ছদ্মবেশের আড়ালে কাজ করছিল একটা প্যাটার্ন। তা না হলে একটা কবিতার বইয়ের প্রথম আর শেষ কবিতার নাম এক হবে কেন? দুটোরই নাম আবোল-তাবোল, – এটা মোটেই কবি আর অন্য নাম খুঁজে পান নি বলে এক নামে চালিয়ে দিলেন তা তো হতে পারে না! আসলে এটা এক বৃত্তাকার অভিযাত্রা – যার শুরুতে ‘স্বপনদোলার নাচন’ ঘোষণা করে এ ‘ক্ষ্যাপার গানে নাইকো মানে  – নাইকো সুর’; ‘ভুলের ভবে’ ‘বেঠিক বেতাল’ হবে এই বইয়ের কবিতাগুলির চলন।  শুরুর আবোল-তাবোল কবিতাটির মূল সুর ছিল বাঁধনহারা ফুর্তির, প্রতিশ্রুতি ছিল ‘হিসাবহীন’, ‘সৃষ্টিছাড়া’ হবার মুক্ত উল্লাসের। শুরুর এই ঘোষণার বাইরেটুকু শুধু দেখলে একই বইয়ের শেষ কবিতায় আশ্চর্যজনকভাবে জীবনের ফুর্তির উচ্ছাসের সঙ্গে কেমন অদ্ভুত অসংলগ্ন বৈপরীত্যে মিশে যায় বিদায়ের করুণ সুর। হালকা হাসি আর চোখের জল পরস্পরের সঙ্গে খুনসুটি করতে থাকে কেমন করে, সেটা না দেখতে পেলে দেখাটাই সম্পূর্ণ হয় না।

এই শেষের ‘আবোল-তাবোলে’ তৃতীয় আর চতুর্থ লাইনে ঘোষণা থাকে বটে –

‘তাল বেতালে খেয়াল সুরে / তান ধরেছি কন্ঠ পুরে’

কিন্তু দেখতে ভুলে গেলে চলবে না যে ইতিমধ্যে চারপাশে ঝাপসা রাতের রামধনুকের আবছায়া নেমে এসেছে। এই কবিতাতে একদিকে বলা হবে,

‘হেথায় নিষেধ নাইরে দাদা
নাইরে বাঁধন নাইরে বাধা
হেথায় রঙিন আকাশতলে
স্বপনদোলা হাওয়ায় দোলে’ —

শুনে মনে হবে এ তো বইটার প্রথম কবিতারই উচ্চারণ! বা যখন বলা হবে, এখানে – ‘সুরের নেশায় ঝরণা ছোটে’; অথবা ‘আকাশ কুসুম আপনি’ ফুটে মনকে চমকে দেয় ‘ক্ষণে ক্ষণ’ সেটা যেন প্রথম কবিতাটিরই প্রসারণ, শুধু একটু ভিন্ন ভাষায়।

কিন্তু যখন তার পরের পংক্তিতেই আসবে,

‘আজকে দাদা যাবার আগে
বলব যা মোর চিত্তে লাগে’ –

তখন মনটা হঠাৎই যেন ধাক্কা খেয়ে বুঝবে এ প্রথম আবোল-তাবোল নয়, এ শেষের আবোল-তাবোল। ‘যাবার আগে’ এই শব্দবন্ধ যেন ঝাপসা রাতের রামধনুকের আবছায়ায় মৃত্যুর গন্ধকে জোরালো করে তোলে।

শেষের  ‘আবোল-তাবোল’এও খেয়াল স্রোত আছে, এমন কথা আছে –

‘নাই বা তাহার অর্থ হোক
নাই বা বুঝুক বেবাক লোক’

কিন্তু এ যে প্রথম আবোল-তাবোল-এর চেয়ে আলাদা তা স্পষ্ট হয়ে যায় যখন

‘আলোয় ঢাকা অন্ধকারের গন্ধে ঘন্টা বেজে ওঠে’। প্রথম আবোল-তাবোলে শুধুই ‘আলো’, আর শেষের আবোল-তাবোলে বাইরে আলো কিন্তু সেই আলো দিয়ে ঢাকা আছে ভিতরের গভীরতর এক অন্ধকার।

এই ‘অন্ধকারের’ রঙ্ কেমন, গন্ধ কেমন, তা যারা জেনেছে, তারা জানানোর সুযোগ পায় নি, পায় না। সুকুমার কবি, ‘অ’সাধারণ এক কবি, তাই এই অন্ধকারের গন্ধটা ঠিক কেমন তার বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন – এই গন্ধটা আসলে ‘আদিম কালের চাঁদিম হিম’। আদিম আর হিম শব্দদুটো মৃত্যুর অনুষঙ্গে অন্য অনেক কবিই হয়তো ব্যবহার করেছেন, কিন্তু সুকুমার মৃত্যুর শীতলতা কেমন বোঝাতে গিয়ে ‘হিমে’র বিশেষণ হিসেবে ব্যবহার করলেন ‘চাঁদিম’। চাঁদের মায়াবী আলোর ঠান্ডা শীতল হিম। কোথায় পৌঁছে দেবে এই হিম? – ‘তোড়ায় বাঁধা ঘোড়ার ডিমে’।

ঘোড়ার ডিম তো আসলে ‘না’, কিচ্ছু ‘না’। এমনই এক ‘না’, এতই অমোঘ এই ‘না’, যে সেটা তোড়ায় বাঁধা, এই বহুসংখ্যকতা বা প্লুরালিটি ব্যবহার করে বোঝান সুকুমার। মৃত্যু যে কতবড় ‘না’তে পৌঁছে দেয় মানুষকে, যাকে না জানতে পেরে অলৌকিকের ভরসায় মানুষ খুঁজেছে স্বর্গ বা নরক, হেভন বা হেল, বেহেশত বা দোজখ, আর কিছু না হলে পুনর্জন্ম,  বৈজ্ঞানিক সুকুমার, যাঁর কাছে স্বর্গ নরক পুনর্জন্ম কিছুরই অস্তিত্ব নেই, সে মৃত্যুর চরম শূন্যতাকে স্বীকার করে নেয় অদ্ভুত হাসির মোড়কে।

নিজের বাবার সমস্ত লেখার সংকলন ‘সুকুমার সমগ্র’এর (শিশু সাহিত্য সংসদ প্রকাশিত) ভূমিকা লিখতে গিয়ে পুত্র সত্যজিৎ সাধে কি লিখেছিলেন, – ‘মৃত্যুর ঠিক আগের মুহূর্তে এরকম রসিকতা’র কোন তুলনীয় উদাহরণ বিশ্বসাহিত্যে  সম্ভবত নেই। ‘বন্ধনহীন’ মৃত্যুর গভীর চোখের জলকে ‘খেয়াল স্রোতের’ হালকা হাসিতে এমন ভাবে পরিবেশন করতে যে প্রতিভা লাগে তা শুধু সুকুমারেই সম্ভব। 

avik lahiri2

লেখক:

অভীক লাহিড়ি, প্রাক্তন ডিন, রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়

 

 

 

মন্তব্য করুন (Comments)

comments

Share.