আমরা যে সময়ে বড় হয়েছি… । স্বাতী চক্রবর্তী

Comments

আমরা যে সময়ে বড় হয়েছি সেই সময়ে সলিল চৌধুরীর গান না শোনা, না জানাটাই ছিল অস্বাভাবিক। একাধারে সুরকার, পরিচালক, কবি ও গীতিকার একজন প্রতিভাধর মানুষ যিনি দীর্ঘ সময় জুড়ে বাংলা, হিন্দি এমন কি দক্ষিণ ভারতীয় সংগীত বিশেষ করে চলচ্চিত্রে সংগীতের জগতকে শাসন করেছেন। শুধু তাই নয় তাঁর প্রভাব দীর্ঘতর ছায়া ফেলেছে আজকের সুরকারদের ওপরে। যেমন এ আর রহমান বলেছিলেন, যে সলিল চৌধুরীর সৃষ্টির মধ্যে তিনি পান অর্কেস্ট্রা আর সাংগীতিক আবেগের পরিপূর্ণ মেলবন্ধন যা তাঁকে অনুপ্রাণিত করেছে।

বাড়িটা সেকেলে বামপন্থী বাড়ি হওয়ার কারণে ছোটবেলা থেকেই পরিচিত ছিলাম তাঁর আই পি টি এ যুগের গানগুলোর সঙ্গে। ঘুম ভাঙার গান, রানার, কোন এক গাঁয়ের বধূ (এখন ভাবলে অবাক লাগে যে এই গান লিখছেন, সুর করছেন এক কুড়ি বছরের তরুণ!) বোধহয় জন্ম থেকেই শুনছি। মামাবাড়িতে যেকোনো উপলক্ষে এক হলেই মা এবং মামা মাসীরা গেয়ে উঠতেন ‘ঢেউ উঠছে, কারা টুটছে’ অথবা ‘বিচারপতি তোমার বিচার করবে যারা আজ জেগেছে এই জনতা’। সেটা ১৯৬৭-৭০ এর সময়কাল। হরতাল, চাকা বন্ধ, বা মিছিলে মিলেছি, কথাগুলো পারিপার্শ্বিকের সঙ্গে মিলে বুঝতে বিশেষ অসুবিধে হত না। একই সঙ্গে বড় মনকাড়া ছিল হিন্দি ও অন্যান্য বাংলা গান। সে সব গান তো আমার মত পাঠকরাও সবাই জানেন। ধিতাং ধিতাং বোলে বা আ যা রে পরদেসি, বা আনন্দ সিনেমার গানগুলো আমার মত আপনাদেরও মনে গুঞ্জরিত হয়। কাজেই তা নিয়ে নতুন করে আমার কি বা বলার থাকতে পারে।

সলিল চৌধুরী

সলিল চৌধুরী

বরং স্মৃতির মণিকোঠায় সযত্নে জমিয়ে রাখা এক আশ্চর্য প্রাপ্তি ভাগ করে নিই আজ আপনাদের সঙ্গে। ছাত্রজীবনের শেষে ১৯৮৭-৮৮ সালে সাংগঠনিক ভাবে জড়িয়ে পড়েছিলাম কিশোর বাহিনীর সাথে, উদ্দেশ্য ছিল শিশু কিশোরদের মনে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পরিবেশ সংক্রান্ত সচেতনতা জাগিয়ে তোলা, সমানাধিকারের ভাবনার বীজ বোনা। কলকাতার কলোনি ও বস্তি অঞ্চলগুলোতে কাজ হত বেশি। অঞ্চলের মানুষজন, ক্লাব, স্কুলের শিক্ষক এদের সহযোগিতায় আমরা নানা কর্মশালার আয়োজন করতাম ছোটদের এবং একই সঙ্গে যারা প্রশিক্ষক তাঁদের নিয়ে। এমনিভাবেই জেলার এক সংগীত শিক্ষার কর্মশালা পরিচালনার আবদার নিয়ে হাজির হয়েছিলাম আমরা সলিল চৌধুরীর কাছে। রাজি হবেন না এই সন্দেহ ছিল মনে। শিক্ষার্থীরা তো বেশির ভাগ বস্তির ছেলেমেয়ে, কখনো কোন সরগম এর ধারেপাশে যাবার সুযোগ পায়নি তারা। কিন্তু কিন্তু করে বলা গেল সেটা। কথাটা তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়ে রাজি হয়ে গেলেন উনি। গোটা জেলা থেকে প্রায় জনা চল্লিশ ছাত্র প্রাথমিক বাছাইয়ের পর নেওয়া হল কর্মশালার জন্য।

বেলেঘাটার এক স্কুল বাড়িতে সাধারণ বেঞ্চি টেবিল সজ্জিত এক ক্লাসরুমে সাদামাটা মাইক লাগিয়ে শুরু হল ওয়ার্কশপ, সকাল ১১টা থেকে ৪টে, মাঝে টিফিনের বিরতি। মাস্টারমশাই এলেন ঘড়ি ধরে। দুদিন ধরে অপরিসীম নিষ্ঠায় এবং অক্লান্ত ধৈর্যে পাঁচটি গান শেখালেন চল্লিশটি প্রথমবার হারমনিয়ামের সামনে বসার সুযোগ পাওয়া ছেলেমেয়েকে। সঙ্গে ছিলেন কন্যা অন্তরা। স্বাভাবিকভাবেই বারবার পুনরাবৃত্তি করতে হচ্ছিল গানের কলিগুলি, একবারের জন্য বিরক্তি প্রকাশ করতে দেখিনি। হারমনাইজ করতে শুরু করল ছাত্ররা, আর তৃতীয় দিনের শেষে তারা নিজেরা পরিবেশন করল বৃন্দগান। কিশোর বাহিনীর নিজস্ব কয়ার তৈরি করে দিলেন এক প্রখ্যাত সঙ্গীতজ্ঞ, যিনি প্রথম দিন এসেই ছাত্রদের জিজ্ঞেস করেছিলেন, গান শুনতে ভাল লাগে? গুনগুন করে বা দলবল নিয়ে চেঁচিয়ে গাইতে? তাহলেই শেখা যাবে গান। আর বলেছিলেন, গান গাইতে, পরিবেশন করতে হবে না, আসলে গান বলতে হবে। গান দিয়ে বলতে হবে, শুধু গলা আর শরীর নয়, বুদ্ধি আর সচেতন মনকে ব্যবহার করে। তাহলেই গান আর যে গাইছে তার একার থাকবে না, যারা শুনছে তাঁদেরও নিজস্ব সম্পদ হয়ে উঠবে সেই গান।

বড় অনায়াসে তিনি এটাই করে দেখিয়ে দিয়ে গেছেন সারাজীবন ধরে, তাই তাঁর গান হয়ে উঠেছে আপামর জনতার নিজস্ব সম্পদ, যে গানের আহ্বান মাঠঘাট পেরিয়ে, আজও আমাদের মনের বেলাভূমিতে আছড়ে পড়ছে।

লেখক:
স্বাতী চক্রবর্তী, চিত্র নির্মাতা, সহযোগী সম্পাদক, বাঙালীয়ানা
Swati Chakraborty

মন্তব্য করুন (Comments)

comments

Share.