আমিতো আমাতে নেই । মশহুরুল আমিন

Comments
এইতো কতদিন আর হবে? এই মনে করি হাজার বছর। মরুর বুকে বর্ষায় দুকুল উপচে চলা নীল একে বেঁকে যেতে যেতে আসোয়ান আর সেন্নার এই দুই জায়গায় থমকে দাড়ায় জলের ধারা। অসীম এই ধারার কিছু জল রয়ে যায়। আবার মরুর বুকে পথ চলা। একেই কেন্দ্র করে নগর বন্দর।
নীলের রয়ে যাওয়া জলদিয়েই চলে সারা বছরের ক্ষেতখামারী, কৃষিকাজ। আর তাই মিশরকে আমরা নীলনদের দান হিসেবেই জানি।
শরৎ, হেমন্ত বা শীতে বর্ষা আসে না। বর্ষা বর্ষাতেই আসে। নিয়মিত প্রতি বছর আসে জলের ধারা। যে জলে চলে বছরব্যাপি কৃষিকাজ।
প্রকৃতির এই চক্রে নিয়মিত দেখা দেয় রাতের আকাশের তারা। এই বর্ষায় পুব আকাশের দিগন্তে দেখা দেয় আকাশে দৃশ্যমান সবচেয়ে উজ্জ্বল নক্ষত্র ‘লুব্ধক’।
তাদের মনে হতো ঐ দূর আকাশের তারা ‘লুব্ধক’ একজন প্রভাবশালী দেবতা। যার নির্দেশেই নীলের বুকে জলের ধারাগুলো বয়ে চলে।
এবার আমরা আরো একটু সামনে আসি। আজ থেকে দুই হাজার বছর। টলেমী বললেন, এই পৃথিবী-সমগ্র বিশ্বব্রহ্মাণ্ড কেন্দ্রে অবস্থিত । পৃথিবীকে কেন্দ্র করে সবাই আবর্তিত হয়। তারপর কেটে যায় ১৪শত বছর। পোলিশ জ্যোতির্বিজ্ঞানী নিকলাই কোপার্নিকাস বললেন, ‘পৃথিবী বরং সূর্যকে কেন্দ্র করে ঘুরছে।’ আমরা দেখি এর ২শত বছর পর ইতালিয়ান জ্যোতির্বিজ্ঞানী জিওদ্রানো ব্রুনো, যিনি কোপার্নিকাসের বক্তব্যের সমর্থন করাতে চার্চের পাদ্রিদের রোষানলে পড়েন। পরবর্তীতে আগুনে পুড়িয়ে মেরে ফেলা হয় ব্রুনোকে।
দিনে দিনে টাইকো ব্রাহে ,কেপলার, গ্যালিলিও ধীরে ধীরে কোপার্নিকাসের বক্তব্যকে সঠিক গণিতের ভিত্তির উপর দাঁড় করান।
নিউটনের কথা বিশেষভাবে বলতে হবে। সমগ্র ইউরোপে তখন নিউটনের জয়জয়কার। প্রায় সবাই একমত হলেন যে, পদার্থবিজ্ঞানের আর কিছু জানবার নেই। পদার্থবিজ্ঞানের সর্বোচ্চ পর্যায়ে যেতে যেটুকু বাকি ছিলো, নিউটন সেটা দিয়েছেন।
ক্ষণে ক্ষণে এমন চিন্তা প্রায়ই দেখা দিত যে, ‘ঈশ্বর যদি কোন সমস্যায় পড়েন তবে তা একমাত্র নিউটনের পক্ষেই সম্ভব সমাধান দেবার।’ কিনা সে সময়ই নিউটনের গোলোকিয় গতিবিদ্যা তত্ত্বের প্রয়োগে নেপচুন গ্রহের সন্ধান।
গল্পটা হচ্ছে, ফ্রান্স এবং ইংল্যান্ডের দুজন জ্যোতির্বিজ্ঞানী। যারা তখনও কেউ কাউকে জানেন না। তারা পৃথকভাবেই ইউরেনাস গ্রহকে পর্যবেক্ষণ করছিলেন। কক্ষপথে ইউরেনাস খুব সাবলিল গতিতে চলতে গিয়ে কোথায় যেনো থেমে থেমে যায়। তাকে কি কেউ বাঁধা দেয়। না হলে অমন করে জড়তাপূর্ণ পায়ে হেঁটে চলা কেন? এর উত্তর খুঁজতে নিউটনের গোলোকিয় গতিবিদ্যা বলছে ইউরেনাসের এই জড়তাপূর্ণ লাজুক হেঁটে চলার পেছনে তার রয়েছে কোন অদৃশ্য প্রেমিকের আকর্ষণ। সে নিশ্চয়ই আশে পাশে ইউরেনাসের পায়ে পায়ে হেঁটে বেড়ায়।
সে সময়টিতে জার্মানিতে ছিলো অতি আধুনিক মানমন্দির আর আকাশের বিস্তারিত তারা চিত্র। ফ্রান্স এবং ইংল্যান্ডের দুজন জ্যোতির্বিজ্ঞানীই তাদের খুঁজে পাওয়া তথ্য পাঠিয়ে দিলেন জার্মানিতে। আর মাত্র ৩ঘন্টার পর্যবেক্ষণেই দেখা মেলে নেপচুন গ্রহের।
শুরু হয়ে গেলো নিউটন বন্দনা। এই আবিষ্কারের প্রতিক্রিয়ায় ইউরোপে নিউটনকে সম্ভব হলে ঈশ্বরের পর্যায়ে নিয়ে যাবার চেষ্টা দেখি। কারো কারো কাছে নিউটনই ঈশ্বর!
বিজ্ঞানীরা নিউটনের গতিবিদ্যার আলোকে অপরাপর গ্রহগুলোর ঘুরে বেড়ানোকে ব্যাখ্যা করতে যেয়ে পেয়ে গেলেন একটা কিছু।
একটা কিছুটা হচ্ছে, বুধ গ্রহ। সূর্যের সবচেয়ে কাছের এই পুচকে প্রথমবারের মত সবার মনোযোগের কেন্দ্রে চলে এলো। নিউটনের গতিবিদ্যা বলছে, বুধ এবং সূর্যের মাঝে আরো একটি গ্রহ আছে। না হলে বুধ কেনো খামখেয়ালির মতো হেঁটে চলে। ইতিপূর্বে নেপচুন আবিষ্কারের আত্মবিশ্বাসে বলিয়ান নিউটন বন্দনাকারীরা বুধ এবং সূর্যের মাঝে অবস্থিত গ্রহটির নাম দিলেন ‘এক্স।’ আবার কেউবা ‘ভলকান।’ এখানেই শেষ নয়। কেউ কেউ আবার সেটাকে পর্যবেক্ষণ করেছেন বলেও ঘোষণা দিলেন। তবে এর আসল রহস্য জানবার জন্যে আমাদের অপেক্ষায় রাখেন ঐ যে জার্মান ভদ্রলোক। যাকে কিনা স্কুল থেকে বহিস্কার হতে হয়েছে।
আলবার্ট, আলবার্ট আইনস্টাইন। ততদিনে নিউটনের গতিবিদ্যা কিছুটা খোলস পালটিয়ে চলছে। তবে আইনস্টাইন তাকে একেবারে নিজের মতো করে নতুনরূপে তুলে ধরলেন। নিউটনের অসমাপ্ত কাজের পূর্ণতা পেলো আইনস্টাইনের হাতে। আমরা পেয়ে যাই পুঁচকে গ্রহ বুধের রহস্যময় হেঁটে চলার খবরাখবর।
একটা প্রশ্ন করতে চাই। উপবৃত্তের কেন্দ্র কয়টি?
বুধ গ্রহের কক্ষপথের একটির কেন্দ্রে সূর্যের অবস্থান। কক্ষপথটি নিজেও সূর্যকে কেন্দ্র করে ১০০ বছরে একবার ঘুরে আসে। কি মজার না?
বিলুপ্তি ঘটে বুধ এবং সূর্যের মাঝে অবস্থিত তথাকথিত গ্রহটির। যার নাম ছিল ‘এক্স’/ ‘ভলকান।’ তবে বাংলাদেশের স্কুলের বোর্ডের বই এ এই এক্স/ভলকান এর উপস্থিতি দেখেছি।
আর এখনতো আইনস্টাইন হচ্ছেন বিশ্বের সবচেয়ে পছন্দের বিজ্ঞানীদের মাঝে ১নং। আইনস্টাইনের ছবিসম্বলিত পোস্টার বা আইনস্টাইন বিষয়ক লেখা নিয়ে প্রকাশিত পত্রিকা, বই বিক্রি করে এই বাংলাদেশে কোটিপতি হয়েছেন কেউ। এ চিত্র বিশ্ব জুড়েই।
১৯৮৬ সালে ভয়েজার মিশনের কিছু তথ্য বিজ্ঞানীদের এক মহাচিন্তার মধ্যে নিয়ে গেছে। তথ্যটি হচ্ছে, শনি গ্রহের ‘এফ’ বলয়ে একই কক্ষপথে দুটি উপগ্রহ ঘুরে বেড়ায়। সমস্যা হচ্ছে একটি উপগ্রহ আস্তে ঘোরে। তার মানে অপরটি অবশ্যই জোরে ঘোরে। ফলাফল এক পর্যায়ে এদের মধ্যে সংঘর্ষ হবেই হবে।
কিন্তু না! এরা ভদ্র ঘরের বাচ্চাকাচ্চা। কখনোই সংঘর্ষে জড়িয়ে পরে না। আস্তে করে একজন আরেকজনকে পথ ছেড়ে দেয়।
এবার আসুন, আইনস্টাইন বা হকিং পেনরোজ বা আরো কাউকে নিয়ে। না, কেউ পারছেন না এর ব্যাখ্যা দিতে।
আমাদের অপেক্ষা করতে হবে আগামীদিনের কোন টলেমী, নিউটন বা আইনস্টাইন, হকিং, মেঘনাদ সাহা অথবা সত্যেন বোসের জন্য। যিনি গোলকীয় গতিবিদ্যাকে এগিয়ে নিয়ে যাবেন এমন পর্যায়ে যা দিয়ে শনিকে ব্যাখ্যা করা যাবে।
এই লেখাটা যারা পড়ছেন, সেই স্কুলে যাওয়া বন্ধুটিও কিন্তু হতে পারেন আগামী দিনের সেই নিউটন বা আইনস্টাইন, হকিং বা মেঘনাদ সাহা । মনে রাখতে হবে এরা কেউই কিন্তু মঙ্গলগ্রহ বা ভিনগ্রহ থেকে এই পৃথিবীতে আসেননি। তারা প্রত্যেকে মানুষেরই বাচ্চাকাচ্চা।
আমি আর একটি বিষয় আপনাদের সাথে শেয়ার করতে চাই।
মনে করে দেখুন সেই লুব্ধক আজ আর দেবতার আসনে বসেন না। আকাশের বিপুল তারকাদের মতই একটি নক্ষত্র মাত্র। যা একটি গ্যাসের গোলকীয় পিণ্ড। সে কোন দেবতা নয়।
আবার দেখুন টলেমী কোপার্নিকাস ব্রুনোদের কথা। সূর্যের চারদিকে পৃথিবী ঘোরে। সূর্য আকাশ গঙ্গা ছায়াপথের একটি বাহুতে অবস্থান করে ২৬ হাজার বছরে একবার ঘুরে আসে। অতিসাধারণ মানের নক্ষত্র হল আমাদের সূর্য। আবার আকাশ গঙ্গা ছায়াপথও মহাবিশ্বে ঘুরে বেড়াচ্ছে। আর নিউটন! নিউটন তার অবস্থানে নেই।
এই যে পরিবর্তন, এটা হচ্ছে বিজ্ঞানের নব নব আবিষ্কারের ফলেই। প্রতিনিয়ত আমরা নতুন তথ্য-তত্ত্বে সমৃদ্ধ হচ্ছি। আমাদের ব্যাখ্যার অতীত বিষয়গুলোকে ধীরে ধীরে আমরা জেনে যাচ্ছি। আমাদের ভাবনার জগৎ এর এই পরিবর্তন প্রবাহমান নদীর মতই বহমান। কখনোই তা থেমে যাবে না বা থামবে না। আর বিজ্ঞানের জগৎ এ ‘শেষ বলে কিছুই নেই।’ আজ আমি আপনি আমরা যে বিষয়টিকে সত্য বলে জানছি, শেষ বলছি, ভেবে দেখুন তা শুধুমাত্র এই বর্তমান সময়ের মানদণ্ডে। আগামীতে তার অবস্থা কী দাঁড়ায়? কেউ আজ বলতে পারবে কি?
ডিসেম্বর ১৬, ২০১৩. ঢাকা
লেখক:
Moshurul Amin
মশহুরুল আমিন, চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল এসোসিয়েশন

মন্তব্য করুন (Comments)

comments

Share.