আরেকটি আফগানিস্তান কিম্বা সিরিয়া চাই না

Comments

ওয়াহাবী জঙ্গি দলগুলোই শুধু নয় ঐ মতাদর্শে বিশ্বাসী ব্যক্তিদের হামলা ও নির্যাতনে মুসলিম ধর্মাবলম্বী মানুষও দুনিয়া জুড়ে এক ভয়াবহ অসহায়তায় জীবনযাপন করছে।

কিছুদিন আগে মায়ের সঙ্গে ছয় বছরের শিশু জাকারিয়া আল জাবের নবী মুহম্মদের রওজায় যাবার জন্যে ট্যাক্সিতে ওঠার পরে মায়ের মুখে দরুদ শুনে ট্যাক্সিচালক জানতে চায় সে শিয়া সম্প্রদায়ের কিনা? উত্তরে ওই নারী হ্যাঁ সূচক জবাব দিলে ট্যাক্সি থামিয়ে চালক নিচে নেমে এসে ট্যাক্সির ভেতর থেকে শিশুকে নামিয়ে ট্যাক্সির কাচ ভেঙে তা দিয়ে মায়ের সামনেই শিশুটিকে গলা কেটে হত্যা করে।

রয়টার্স জানায় বুধবার, ১৩ ফেব্রুয়ারী, ইরানের দক্ষিণপূর্বাঞ্চলে পাকিস্তান সীমান্তের কাছে ইরানের সিস্তান-বেলুচিস্তান প্রদেশে এক আত্মঘাতী বোমা হামলায় ইরানের রেভলিউশনারি গার্ড বাহিনীর ২৭ সদস্য নিহত এবং ১৩ জন আহত হয়েছে। পাকিস্তানের সীমান্তবর্তী বেলুচিস্তান ভিত্তিক সুন্নি জঙ্গিগোষ্ঠী জইশ আল আদল হামলার দায় স্বীকার করেছে।

ইয়েমেনে সৌদি আরবের সেনা ও বিমানবাহিনীর এমনতর হত্যাকান্ডের ঘটনাও প্রচার পেয়েছে সম্প্রতি। স্কুলের শিশু ভর্তি বাসে সৌদি বিমান হামলায় নিহত হয়েছে অসংখ্য শিশু। সৌদি ও যুক্তরাষ্ট্র মদত পুষ্ট আলকায়দা, আইসিসসহ অজস্র ওয়াহাবী মতাদর্শিক জঙ্গি সংগঠন বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, আফগানিস্তান, ইরাক, সিরিয়া, জর্ডানে ইসলাম ধর্মাবলম্বী বিভিন্ন সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে তাদের ভাষায় “জেহাদ” এ লিপ্ত রয়েছে।

দেশের ভেতরেও ওয়াহাবী মতাদর্শিক জঙ্গি সংগঠনের অবস্থান সুসংহত সরকার ও প্রশাসনিক উদাসিনতা এবং পরোক্ষ পৃষ্ঠপোষকতায়। যার বহু উদাহরণ রয়েছে। অতি সম্প্রতি পঞ্চগড় শহরে আহমদিয়া মুসলিম জামাত ২২ থেকে ২৪ ফেব্রুয়ারী আহমদনগর এলাকায় তিনদিনের বার্ষিক সালানা জলসা আয়োজনের ঘোষণা দিলে ওই জলসা বন্ধের দাবিতে খতমে নবুওয়ত সংরক্ষণ পরিষদ, ঈমান আকিদা রক্ষা কমিটি, ইসলামী যুব সমাজ ও স্থানীয় তৌহিদি জনতার ব্যানারে বিভিন্ন ধর্মভিত্তিক সংগঠন ফেব্রুয়ারীর শুরু থেকেই উত্তেজনা ছড়াতে থাকে। প্রশাসন তাদের চাপের মুখে আহমদিয়া মুসলিম জামাতের বার্ষিক জলসাটিকে নিরাপত্তা না দিয়ে তার অনুমতি বাতিল করে। কিন্তু তাতেও শেষ রক্ষা হয়নি, আহমদিয়া সম্প্রদায়ভুক্তদের বাড়ীঘরে হামলা, ভাংচুর, লুটপাট, নারী নির্যাতন, অগ্নিসংযোগ করেছে খতমে নবুওয়ত সংরক্ষণ পরিষদসহ অন্যান্য ধর্মভিত্তিক সংগঠনগুলো।

বাংলাদেশে এদের পেছনে মূল মদতদাতা দেশের ওয়াহাবী সংগঠন ও কওমী মাদ্রাসাগুলো। আর জামায়াতে ইসলামী ব্যাকফুটে চলে যাবার পরে দেশের এইসব ওয়াহাবী মতাদর্শের জঙ্গিবাদী সংগঠনগুলোর পৌরোহিত্য করে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ।

পঞ্চগড়ের সাম্প্রতিক হামলার আগে সুন্নিপন্থিদের হুমকি ধামকিতে প্রত্যক্ষ মদত দেন হেফাজতে ইসলামের আমির হাটহাজারী মাদ্রাসার পরিচালক শাহ আহমদ শফী। শাহ আহমদ শফী এক বিবৃতিতে ওই আন্দোলনের সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করে আহমদিয়া জলসা বন্ধের দাবি তোলেন।

এহেন অরাজকতা প্রতিরোধে প্রশাসনিক ভূমিকা অত্যন্ত দুর্বল যা সব সময় প্রশাসনের অযোগ্যতার দিকেই অঙ্গুলি নির্দেশ করে। অথচ গরুর চোরাকারবার ঠেকাতে গুলিতে প্রাণ যায় মানুষের। পঞ্চগড়ে বেশ কিছুদিন ধরে সংগঠিত এই অরাজকতা ঠেকাতে প্রশাসন ব্যর্থ হয় কেন? কেন সেখানে পুলিশ ও বিজিবি সদস্যদের অধিক সংখ্যায় মোতায়েন করা হলো না? কেন শহরের চৌরঙ্গী মোড়ে পঞ্চগড়-ঢাকা মহাসড়ক ও বিভিন্ন সড়কে অবস্থানরত অরাজকতা সৃষ্টিকারীদের সেখান থেকে উৎখাতে ব্যর্থ হলো প্রশাসন? কেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, ধর্মমন্ত্রী কিম্বা সরকারী দলের জ্যেষ্ঠ নেতৃবৃন্দ কোন নিন্দা জানালো না এ ঘটনার?

রাষ্ট্রের অসাম্প্রদায়িক ভাবমূর্তি বিনষ্টের সুবিধাভোগী কারা তা রাষ্ট্রকেই বের করতে হবে। কারা ধর্মীয় উন্মাদনা সৃষ্টি করে আরেক জনগোষ্ঠীর মৌলিক অধিকার, অপর মতাদর্শিক ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে বাধাই শুধু নয় উন্মত্ত সহিংসতায় ঝাঁপিয়ে পড়ছে তার দায় কিন্তু সরকারের। সরকারকে মনে রাখতে ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শে সংঘটিত বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ৩০ লক্ষ শহীদের রক্তে লেখা সংবিধান এভাবে ভূলুণ্ঠিত হলে পৃথিবীর মানচিত্রে সহসাই আরেকটি আফগানিস্তান কিম্বা সিরিয়ার সৃষ্টি হবে।

লেখক:

 

 

সাগর লোহানী
সম্পাদক
বাঙালীয়ানা

 

মন্তব্য করুন (Comments)

comments

Share.