আলী তারেকের কবিতা

Comments

তোর সাথে কথা ছিল

তোর সাথে কথা ছিল 
তোমার সঙ্গে কথা ছিল

কথা?
শুনলেই মানসচক্ষে দেখিস তুই 
কথার বাহার–গ্যালারি বোঝাই 

সে আর এমন ভুল কি?
ডাইনে বাঁয়ে, সামনে পিছে
এদিক সেদিক, উপর নিচে
মনের ভিতর যতই তাকাই
কথাই কথা যথা তথাই 
কাজের কথা বাজে কথা 
ভুল কথা শুদ্ধ কথা 
কথার পিঠে কথা দিয়ে 
হচ্ছে বোনা কথার মালা-ই
কথার কথা শুনলে তাই  
কথার দোকান দেখবি তুই,
সে আর এমন ভুল কি?

শোন তবু শোন না তুই 
এই কথা নয় সেই কথা
অফিস বাজার রান্না চান 
বই কবিতা নৃত্য গান 
সমস্ত কিছু করে done
বিছানপাতে উঠিয়ে পা 
সোফার উপর ডুবিয়ে গা 
মাথার ঘরে কথা যত,
করে নিয়ে বহির্গত, 
তারপরেতে শব্দ সকল 
হয়ে এলে স্তব্ধ বিকল 
মাথা রেখে মাথার পাশে 
চোখের পাশে চোখটা ঘেঁষে 
নীরব চোখে চলনা শুই। 

গোল মরিচের গুঁড়ো চুলে 
সাদা কালোর ভিড়টা ঠেলে 
চুলকে কপাল লাল ফেঁপে 
সুড়সুড়িতে হাঁচি চেপে
হাঁটু কনুই সামলে সবে 
চোখের দিকে তাকাই যবে 
নিমেষে ফুড়ুৎ কথা সব 
ঠোঁট কপাটি স্তব্ধ নীরব
এখন আমার সময় হল 
তোর সাথে কথা ছিল 
তোমার সঙ্গে কথা ছিল

যাও চলে দূরতম নক্ষত্রে

তুমি ওপাশে ফেরালে ঘুম 
মনে হয় গেছো চলে দূরতম নক্ষত্রে 
সেখানে তোমার বান্ধব স্বজন 
সেখানে তোমার পুনর্লব্ধ হাসির প্লাবন 
তোমার উদ্বেলিত ত্রস্তপদ, তোমার অকারণ বিস্ময় 
তোমার চমক–ফাগুনের হঠাৎ ঝাপটায়
তোমার সাগরের ঢালে ধীরগতি পদস্খলন
স্মৃতির দূরত্ব দীর্ঘ হতে হতে দিগন্ত অতিক্রমণ–
এসব সব দৃশ্যই দূরতম দূরত্ব পার হতে হতে 
সময়ের মাধ্যাকর্ষিক আপেক্ষিকতায় 
হারায় তাদের সত্যতা
অতীত মিশে যায় একাকার ভবিষ্যতের সংশয়ে

ওপাশে ফেরালে ঘুম, বলবে তুমি,
কতটুকুই বা যাওয়া যায় দূর

ভালোবাসার ভুলভ্রান্তি আর জীবনের অবোধ বিস্ময়
তীক্ষ্ণ ফলার এক ভ্রান্তিহীন লাঙ্গলের মতো–
শ্রান্তিহীন প্রেতাত্মা যেন এক 
ক্ষয়ে ক্ষয়ে দিন রাত বছর মাস খুঁড়ে খুঁড়ে গেছে 
অন্ধকারের চেয়ে ভয়ঙ্কর অতলান্ত এক সাগর
আমার আরেকপাশে সেই সাগরের সঙ্গ দিবারাত্র–

তাই তুমি ওপাশে ফেরালে ঘুম 
যাও চলে দূরতম নক্ষত্রে

তোমার কাছে আসবো বলে

তোমার কাছে আসবো বলে আমি ঘুমিয়েছিলাম আমার আপন ঘরে।
আমার শেষ শৈশবের বিশ্রামহীন জাগরণ যখন 
আমপাতায় বৃষ্টিফোঁটার শব্দ,
ভেন্টিলেটরে বিরামহীন আসা-যাওয়া চড়ুইয়ের আকুলিবিকুলি,
ড্রেনের পূতি ছাপিয়ে হঠাৎ রজনীগন্ধার ঘ্রাণ,
আর বিকেলে মেঘের শরীরে কমলা আগুনের আক্রমণে ব্যতিব্যস্ত,
আমি তোমার কাছে আসবো বলে ঘুমিয়েছিলাম আমার আপন ঘরে।

অন্ধকারে ভরা ছোটো সেই ঘুমের ঘরে ছিল একেবারেই ছোট্ট অবকাশ–  
আমার মনের শরীরের জন্য একটুকু জায়গা,
আর তারই ভিতর এটেসেঁটে আরও একটুখানি আমার দেহটির মনের জন্য।
সেখান থেকে তোমার কাছে আসবো বলেই আমার নিদ্রাচারণ।
আর সে অন্ধকারই ছিল আমার অভিসারের সমস্ত উদ্যমের উৎস। 

তাই তোমার কাছে আসবো বলে বেরিয়েছিলাম পথে  
যেসব সঙ্গী আমাকে বাঁচিয়ে এসেছে বরাবর–তাদের কিছুই আনিনি সাথে–
আমার ব্যথা, আমার ভয়, আমার আকস্ম উদ্বেগ
আমার আভরণের দেহত্রাণ, আমার পরিচ্ছদের শেষতম বস্ত্র, 
এমনকি আমার পরম উদ্ধারক–রাতভর দুঃস্বপ্ন–
একেবারে কিছুই আনিনি সাথে।
শুধু অন্ধকারের নিশ্চয়তা নিয়ে শুরু করেছিলাম আমার অভিসার।

কিন্তু কোথা থেকে এক অদ্ভুত আলো ছড়িয়ে পড়েছিল আমার দেহ ঘিরে।  
পরে বুঝেছি সে ছিল তোমার পথে এগোনোর অপরিত্যাজ্য অনুষঙ্গ–
তোমার নিজস্ব কামনাসাধনের অজেয় কৌশল।
কিন্তু তখন তার কিছুই বুঝিনি। 
তবু আমার তো সে পথে হেঁটে চলার কোনো বিকল্প ছিল না।
মোহিনী সেই আলোতে উদ্ভাসিত হয়ে  
আমার নিরাবরণ দেহ শিহরিত হলো এক অজ্ঞেয় অনুভবে।

তারপর তোমার সাথে দেখা হলো। কত সহজে! 
তোমারই পথের বাঁকে প্রসারিত বাহুতে তুমি দাঁড়িয়ে 
আমার শরীর তার নগ্নতার সংকোচে হলো সংকুচিত– 
কি এক সহজাত সতর্কতার মূঢ়তায়।
বিব্রত আমি সহজেই সামলে উঠলাম তোমার সাথে মিলনের আনন্দাতিশয্যে। 
তুমি আমার কামনার্ত গালে তোমার ঠোঁট স্পর্শ করেছিলে, তাই না?
হ্যাঁ আমার গাল তখন আমার ঘুমের ঘরে ফেলে আসা কামনাটিকে 
কখন যেন ফিরিয়ে এনেছিল।
কিন্তু সেই কামনাস্পর্শে আমার প্রস্তুতিহীনতা আমাকে বলে দিয়েছিল যে সে তুমি ছিলে না।
সে তুমি ছিলে না। 
তাই মুখ ফেরাবার আগেই তুমি অদৃশ্য হয়েছিলে তোমারই পথের বাঁকে।

তারপর আবার দেখা তোমার সাথে। 
একটা গাছ–যেখানে সারাদিন আলোছায়ার খেলার পর বৃষ্টির ঝাপ্টায়  
আমার শরীর শীতের কাঁটার মতো রোমাঞ্চে কেঁপে উঠত, 
সেখানে তোমার সহাস্য উদয়। 
আমার ঠোঁট পিষ্ট আর সিক্ত হলো। 
তারপর আবার আমার সেই অবোধ সাবধানতায় তোমার প্রস্থান। সে তুমি ছিলে না। 

তারপর বার বার বার বার তোমার পূর্ব অনুমেয় দর্শন–
কখনো কণ্ঠে আমার পুলক জাগানো গুনগুনানো গানে,
কখনো আমার অস্থির আঙুলের ডগায় বইয়ের পাতা উল্টানোর আওয়াজে 
কখনো আমার শরীরে স্নানের জলধারাপাতের রোমাঞ্চে
কখনো আয়নায় আমার যৌবনের মুগ্ধতার অতর্কিত মুহূর্তে 
তুমি হয়েছ আবির্ভূত। 
একে একে আমার বাহু, আমার পা, আমার স্তন, আমার নিম্নাঙ্গ 
শিখেছে কামনায় শিহরিত হতে। 
আর বার বার আমার অর্বাচীন সতর্কতা তোমাকে করেছে লীন। 

তারপর অবশেষে তুমি এলে। এলে?
এলে নিশ্চয়ই। নাহলে আমার শরীরে কেন আরেকটা শরীর বাড়ে?
তোমার কাছে আসবো বলে তুমি এসেছিলে। 
নাহলে রোমাঞ্চ আর কামনার আতিশয্য কি করে লঘু হতে হতে  
আমার ঘুমানোর সেই ছোট্ট ঘর এতটা বড়ো হয়ে গেল।
কতটা দূর বড়ো হলো জানি না, জানবার সময় তো নেই।  
জানবার সময় নেই–সেই তো বলে দেবে তুমি এসেছিলে। 
তুমি এসেছিলে, 
কতটা এসেছিলে, জানবার সময় তো নেই। 
জানবার সময় নেই–সেই তো বলে দেবে তুমি এসেছিলে।

তারপর একদিন হঠাৎ প্রবল এক আওয়াজে 
মুখ তুলে দেখি, তুমি নেই, তুমি ছিলে না 
কতদিন ছিলে না জানি না, জানবার সময় তো নেই.
জানবার সময় নেই–সেই তো বলে দেবে তুমি ছিলে না। 
আমার অজ্ঞ সাবধানতা তখন অসতর্কতায় প্রাজ্ঞ।
দেখি সেই ছোট্ট ঘুমের ঘর আমার ছোটোই রয়ে গেছে।
সবসময়ই ছিল–
আমার মনের শরীরের জন্য একরত্তি জায়গা,
আর তারই ভিতর এটেসেঁটে আর একটুখানি আমার শরীরের মনের জন্য।

তার বাইরে কিছু কি আছে? কিছু কি ছিল?
যেখানে তুমি তুমি হয়ে বসে দাঁড়িয়ে সহাস্যবদনে, তোমার প্রসারিত বাহুতে 
রাস্তার বাঁকে বাঁকে, গাছের ছায়ায়, গানের গুনগুনানিতে, 
স্নানের শীতল জলস্পর্শে, বইয়ের পাতায় পাতায়? 
তুমি তুমি হয়ে অপেক্ষায় আছো–তোমার অদৃশ্য হবার খেলার উল্লাসে।

আর আমার অনাবৃত দেহ নিয়ে আমি তোমার রাস্তায় রাস্তায়।
তোমার কাছে আসবো বলে। 
ভালোবাসা–তোমার কাছে আসবো বলে।

একটা পাহাড় ছুঁবো বলে

একটা পাহাড় ছুঁবো বলে তোমায় ছুঁয়েছিলাম
একটা পাহাড় চূড়ায় উঠব বলে আকাশ দেখেছিলাম 
একটা ঝিমানো বিকেল সবটা ধরে হেঁটে চলার তাড়া,
পথের তবু ছোটো হবার নেই কোনো সাড়া
দৃশ্যের পর দৃশ্য পরে পাহাড় যেন স্থাণু  
মেঘের গায়ে মেঘের তুলি, কাছের ছবির ধোঁকা

একটা পাহাড় ছুঁবো বলে তোমায় ছুঁয়েছিলাম 
একটা উপত্যকায় হাঁটব বলে তোমায় হেঁটেছিলাম
সেই যেখানে বৃষ্টি পড়ে নরম দেয়াল ঘেঁষে 
সেই যেখানে বৃষ্টিজলে রোদের গন্ধ মেশে 
বিরল তৃণের পেলব কোলে তীব্র আদর যত  
কোন দূরাঙ্গনার লজ্জাকোমল একান্ততার মতো

একটা পাহাড় ছুঁবো বলে তোমায় ছুঁয়েছিলাম 
স্তরে স্তরে সন্ধ্যারাগে পাহাড় রেঙেছিলাম
দিগন্তরে রাতের আভাস লাজুক লাজুক তারা 
তোমার চাঁদের হাটের সবই আছে শুধু তুমি ছাড়া 

লেখক:
Ali Tareque
আলী তারেক, কবি, গল্পকার, ঔপন্যাসিক, চলচ্চিত্রকার এবং নাট্যকর্মী।

মন্তব্য করুন (Comments)

comments

Share.

About Author

বাঙালীয়ানা স্টাফ করসপন্ডেন্ট