আশরাফ আহমদের কবিতা

Comments

অযথা বৃষ্টি

সমুদ্রের চান্দি থেকে ধোঁয়া, 
লম্বা, চতুষ্কোণ তার বাচ্চাকাচ্চাও 
গরমে পেঁচিয়ে ওড়ে। 
মেঘপুঞ্জ, গুচ্ছ স্বচ্ছ, আন্ধার করা গাম্ভীর্য, 
এ ওরে ধাক্কা মারলে তেরচা হয়ে, 
কেন, জানা নেই, পড়ে, 
গলে কান্নার মায়েরা, কিংবা দোররার বৃষ্টি।

বিলাই ও কুত্তা বৃষ্টি পড়ে শাহবাগে, 
রানির দেমাগেও পড়ে, প্রথম আলোতে পড়ে, 
এমনকি ইংলিশ দেশে বাংলা বৃষ্টি, 
সোশ্যাল সিকিউরিটির ডলার-পাউন্ড-বৃষ্টি, 
ঘ্রাণহীন বেলি ও কবিতা বৃষ্টি । 
শেয়ালের আকদের দিনে ইলিশ বৃষ্টির সাথে 
অনেক কবিতা বৃষ্টি ঝরছে— 
কুড়াবার ধূমে আমরা শিশুরা শেষ জলের কিনারে

বৃষ্টি কিছুটা থামলে আমরা আকাশমুখী, 
আমরা প্রতিজ্ঞাবদ্ধ, ফিরবো না। 
রাজমুকুটের জন্য দিনরাত একাকার হলে 
আশা জাগে-আসবে নতুন বৃষ্টি । 
বসে থাকি, হাতড়াই, বৃষ্টি তো আসে না! 
পাখির ডিমের মতো বৃষ্টি, মাটিতে আসার আসেই 
হুমা-বাচ্চা ফিরে যাবে মার কাছে, মেঘের ওপারে! 
উড়ন্ত কবিতা-পাখি স্ফিংক্সের ডানায় বসে 
মহাশূন্য পাড়ি দেবে, মাটিতে নামবে না?

বিদ্যুৎ চমকে খুঁজি হাহাকার, খুঁজি অন্য কিছুও। 
চোখ খুলি—
সামনে হাতির দল, ডাইনোসরও যদি যায়, 
দৃষ্টিভ্রষ্ট, দেখবো কীভাবে? 
চোখ বন্ধ করে ওপরে তাকালে পরে দেখা যায়— 
একদল বান্দর মগডালে বসে মুতছে, 
নিচে, একদল মনুষ্য নাচছে—’বৃষ্টি বৃষ্টি’ বলে!

হননসূত্র

নাড়ি বলছে ঘড়ির ব্যাটারি শেষ, 
রক্ত বলছে পারদ নামছে, 
মনিটরে ক্লান্ত ঢেউ, হাওয়া নেই। 
তার মানে নিবিড় বীক্ষণ। 
আত্মা বলছে, আশাকে কোমায় রেখে 
স্বপ্ন দেখা আর সম্ভব না। 
অনুচ্চারিত শব্দে কাতর অনুরোধ করি, 
ওটিতে নিয়ো না, খুলে দাও মাস্ক, দরজাটা ফাঁক করো, 
দর্শনার্থী হয়ে ওপাশে ভাতের গন্ধ 
দাঁড়িয়ে রয়েছে মা।

বলা হয়েছিল, পাঠ করো। 
বর্ণজ্ঞানহীন, যে কখনো ইস্কুলে গেল না, 
সে যদি কখনো কাউকে বর্ণবাদী বলে, এত আর আশ্চর্য কী?

বলা হয়েছিল, পশ্চিমে যাও। 
যাচ্ছিলামও। অফুরান কুয়াশার হিম ছাড়া 
সামনে আর কিছু নেই—মনে হলে, 
আর কেন যাব? 
কেন আগামীতে, আজ নয়? 
কেন মাঝ রাতে, কেন বেলায় বেলায় 
আলো থাকতে থাকতেই না? 
বলা হলো—অপদার্থ। 
বন্দি করা হলো—শুরু হলো নির্যাতন। 
পিষ্ট হতে হতে ঘরটা বৃত্ত হলো, বৃত্ত বন্দি হলো, 
থ্রেশহোল্ড লেভেল বেড়ে মৃত্যুও সহনীয় হলো। 
মায়া চলে গেলো, একা আর নিঃস্ব হলাম, 
মরতে থাকলাম তিলে তিলে 
মায়ের অপেক্ষা দীর্ঘ হতে থাকল।

ভাতের গন্ধে, মায়ের গন্ধে, 
আবার ফিরলাম, শুরুতে। 
অভিজ্ঞতা শূন্য হয়ে এল, ইচ্ছে করল, 
অস্বীকার করতে সব অসম্মানকে। 
আপাত সত্যের নিরীহ শিকার হয়ে 
আটকে গেছি, পালাতে পারছি না, 
আর কোনো যুক্তিটুক্তি নেই, মুক্তিও নেই।

অপেক্ষা ক্লান্ত মা হাতে ভাত নিয়ে 
আইসিইউ’র দরজায় দাঁড়িয়ে ঝিমান, 
বৃত্তটিকে ঈশ্বরের ঘর বলে মনে হয় তাঁর, 
যেখানে কেবল সত্য না, অসম্ভবও থাকেন। দেখেন ঈশ্বরের খুব রাগ, ঘৃণাও, 
যা কিনা মনুষ্যে বড় বেঢপ সংক্রামিত। 
আর আমার স্থির কাণ্ডটির দিকে তাকিয়ে 
তিনি মুচকি হাসেন, আর তামাশা দেখেন। 
ভাতের গন্ধ ক্রমে উবে যেতে থাকে, 
শুধু মীন চক্ষু দেখে—
জগৎ-বিজয়ী সব বীরের মিছিল 
সূর্যের পিছু পিছু পশ্চিমে ডুবে যাচ্ছে।

দিন যায়

সূর্যকে দশবার প্রদক্ষিণ করতে 
কতটা সময় যায় পৃথিবীর, 
তুরস্কের কারাগার জানে। 
গোবেচারা পেন্সিলের আয়ু সাতদিনে 
কীভাবে ফুরোয়, 
জানে না যে নাজিম হিকমত! 
বিত্তবান বসেরা জানে না, 
ও চির বহমান মেঘ, নদী, হাওয়া, 
মাসের সূর্যাস্তে রেখে ধ্যান 
চাকরিজীবীর কাল কীরকম
হেলা-ফেলায় দ্রুত ক্ষয় হয়ে গেল,
দেখেছ কি?
দিন গেল,
দিন যেতে কত দিন লাগে?

ফেরা না-ফেরা

খাসিয়া কেঁদেছে, ‘চলতি নদীরা’ জানে, 
তার নিচে আমি গড়াই পাথুরে প্রাণ। 
বুক জলে নেমে হিজল ঝরার মানে 
ঝাওয়ার হাওরে বিস্মৃতি টান টান।

উচাটন, যতো মর্মর তোলে সুর 
আমাকে কি ডাকে, ভাটির বাউলা মন? 
ল্যাপটপ ভেঙে গুগোলের হুড়মুড়, 
সব ছেড়ে যাওয়া বাতাসের শনশন? 
আমি কি আমার অন্তরাত্মা ছেড়ে 
খুঁজেছি আদৌ শূন্যের পরিণাম? 
না বাজা শব্দে চমকে বলেছে-কে রে? খুইয়ে নিজেকে হাতড়াস সংক্রাম? 
স্বপ্নেরা সব না ফেরা ভ্রমণে লীন 
আমরা কি আর ফিরবো না কোনোদিন?

সূত্র

না-ঢিল না হাওয়া
তবু ঢেউ
অগুনতি অস্থির ঢেউ চুপিচুপি 
প্রথমে পাশের বাড়ি ভিজিয়ে দিয়েছে 
তারপর চুপ 
দেয়াল উঠেছে 
ফলে কথা বন্ধ বাড়িতে বাড়িতে 
মসের কার্পেট ঢাকে রুক্ষ ইট 
তাতে বিড়ালের নখ 
সারাক্ষণ ছিঁড়েছে সবুজ
বিকেলের লালাকাশে স্বপ্নঝিম
ভেজা চোখে খেলেছে 
মধ্যরাতে বার বার সন্দেহ
কড়া নেড়ে গেছে 
শাসন ডিঙিয়ে তবু

না-চিঠি না-প্রজাপতি 
অভিসারকামী দুই বিড়ালের কান 
সানাই শুনেছে ভুল বাতাসের শীসে সারা রাত

অথচ এখন সেই কিশোর-কিশোরী 
দুইখণ্ড আয়নায় পাকা চুল দেখে 
হাসে
তোলে নতুন দেয়াল

দাম্পত্য

সাজগোজ করে খুব প্রস্ফুটিত হয়ে 
যখন বাইরে যান, 
তাকে প্রায় পরি-পরি লাগে। 
ঘরে তার ফেলে যাওয়া সুরভির ঘোর 
পায়চারি করে, আর 
অস্পষ্ট কষ্টের মধ্যে ফেলে দেয়।

বাইরে, সূর্য হেলছে, 
আশপাশে গোধূলির স্থলে 
শকটের সিসা ও শিস, 
বুকে লাগছে। 
ঘরে, আবছা অন্ধকারে 
অবিশ্বাস আর সন্দেহ উঁকি দিচ্ছে, 
জেগে উঠছে পা, অনুসরণের নামে। 
মনে মনে প্যান্ট-শার্ট পরে পিছু নেই, 
আনন্দের উৎসটা খুঁজে পাওয়া চাই। 
আর ঠিক তখনই, 
সংস্কারের ডান হাত আমার বাঁ পা-কে 
মিনতির ভঙ্গিতে আঁকড়ে ধরে, 
আমি বসে পড়ি। 
তারপর সুখ আর উজ্জ্বল বিভা নিয়ে 
তিনিও ফেরেন, 
প্রগলভতা উপচে পড়তে থাকে, 
আমি চুপসে যেতে থাকি।
তারপর চুপ, তারপর থমথমে, 
রহস্যের জটিল ধাঁধায় নিমজ্জিত। 
আমি দেখি—ভূতের লুঙ্গি দুলছে,
তিনিও প্রবিষ্ট হন মেক্সিতে।
ক্যাজুয়েল অভ্যাসে জীবনটা ডালভাত,
অনান্দনিকতায়, মোহে,
অথবা বিষণ্ণ ক্রোধে খুব
প্রতিশোধ স্পৃহা নিয়ে আমরা দুজন
ব্ল্যাকহোলে ঢুকে যেতে থাকি ।

লেখক:
Ashraf Ahmad
আশরাফ আহমদ, কবি ও কর্পোরেট কর্মকর্তা।

মন্তব্য করুন (Comments)

comments

Share.

About Author

বাঙালীয়ানা স্টাফ করসপন্ডেন্ট