ইকবাল আজিজের কবিতা

Comments

সেইসব যুবকেরা

সেইসব যুবকেরা ফিরে আসে বৃষ্টির রাতে
নবাবপুর রোড ছুঁয়ে হৃদয়ে যখন অন্ধকার নামে
সেই সব যুবকেরা ফিরে আসে একদিন যাদের
কথার মালায় মুগ্ধ হতো রেস্তোরাঁ আর সান্ধ্যপাড়া।
সেই সব যুবকেরা পথে পথে ইস্তাহার সেঁটে
হারিয়ে গেছে পৃথিবীর পথে

এখন নির্জন স্টেশন, দাঁড়িয়ে থাকা রেলগাড়ি
খেলনার মতো পড়ে থাকে—যথারীতি হুইসিল বাজে
গার্ড নেই যাত্রী নেই কোনো।
সেইসব যুবকের ছায়া এখনো খুঁজে ফেরে
তাদের মূল শরীর, বৃষ্টিতে ভিজে শিশিরে ভিজে
অনাদিকাল অপেক্ষায় থাকে সেইসব যুবক

ফিরে আসে তারা বৃষ্টির রাতে
গান হয়ে স্বদেশের বিষণ্ণ সংগীতের মতো।

২৫/০২/১৯৮৩

রূপকথা: ১৯৭১

প্রাণ দিয়ে বেঁচে আছি সবাই এবং ছড়িয়ে দিয়েছি প্রাণ।
আগুনের মন্ত্র হয়ে প্রতিটি সেক্টরে ভালোবাসার কথা বলি
মানুষে-মানুষে ভালোবাসা বড় বেশি দরকার;
যুদ্ধ দাঙ্গা ভালো নয় বন্ধুগণ, তবু বেঁচে থাকার এ লড়াই
কথা বলার এ লড়াই চলতে থাকে অনুক্ষণ।

হাজার বছরের স্বপ্ন নিয়ে পদ্মা মেঘনা যমুনায়
অনেক স্বপ্ন ভেসে ওঠে,
রক্ত ও মৃতের মিছিল ডাক দিয়ে যায়।
আমরা আগুনের মন্ত্র হয়ে প্রতিটি সেক্টরে
ভালোবাসার কথা বলি

‘মানুষ মানুষের ভাই’ একথা বলতে বলতে হেঁটে যাই।
শেয়ালদহ থেকে পায়ে হেঁটে শ্যামবাজার;
মালতী বৌদি আড়াইশো গ্রাম মাছ এনেছেন
বাজার থেকে—দশজনে মিলে খাবো।
আসলে মানুষ মানুষের ভাই।
গ্লোবে রাজেশ খান্নার নতুন ছবি,
কিশোর কুমার গান গেয়ে ওঠেন কী উদাত্ত

তবু ক্ষণিকের এইসব স্মৃতি রেখে
চলে যেতে হবে।
কিছু কিছু পশুর বিরুদ্ধে এ যুদ্ধ
একটি জাতির স্বপ্ন নিয়ে এ যুদ্ধ।

দুমাস আগে করিম গিয়েছিল তার দল নিয়ে
আর ফিরে আসেনি।
আমরাও অজস্রবার কেমন অলৌকিক চোখ খুলে
দেখেছি বেঁচে আছি, রাইফেল নিয়ে নদীতীর আর
ধানক্ষেতে পৃথিবীর প্রাচীনতম ভালোবাসা— আমাদের অনেকের শরীর নিভে গেছে-ছড়িয়ে গেছে
বাংলার মাটিতে অজস্র ধারায়
এ রক্তের কাহিনী হাজার বছরের রূপকথা শোনায়।
দানবের বিরুদ্ধে বাঙালি কিশোরের যুদ্ধ বেঁচে থাকবে
চিরকাল, আগুনের মন্ত্র হয়ে প্রতিটি সেক্টরে
ভালোবাসার কথা বলা, প্রতিটি হৃদয়ে
বিজয়নিশান উড়িয়ে
একটি জাতির স্বপ্নের কথা বলা

এইসব রূপকথা বেঁচে থাকবে
পৃথিবীর অনেক প্রাচীন রূপকথার মতো

২০/০৬/১৯৮৪

ভূমিহীন চাষীরা ঘুমিয়ে আছে

ভূমিহীন চাষীরা ঘুমিয়ে আছে
লাল নদী রুগ্ন ফুল ভেসে ওঠে।
আকাশে নক্ষত্রের শিরা উপশিরা—।
                 দগদগ করছে রক্তের কালশিটে দাগ।

কপালে রক্ত চিবুকে রক্ত—এতো রক্ত কেন?
গাঁ-গঞ্জের পাশ দিয়ে লাল নদী বয়ে যায়
ইংরেজ আমলে পুরোনো গির্জার খুবই কাছ দিয়ে
নিঃসঙ্গ আকাশের পাশ দিয়ে সরকারি আমলারা
                 আসে ঐ সুদূর শহর থেকে।
জেলা টাউনের অয়্যারলেস টাওয়ারে ফ্যাকাসে বাতি জ্বলে
এগারো মাইল দূরে উজান গ্রামের মাঠ থেকে দেখা যায়।

মিটমিট করে টাউনের বাতি জ্বলে
ঐ শহর থেকে সরকারি আমলারা আসে
হাতে দলিলপত্র মৌজা দাগ নম্বর
এখন এই পুকুরে শাপলার ফুল ফুটে আছে
                 ঝিঁ ঝিঁ’র ডাক সন্ধেবেলায়।
ভূমিহীন চাষীরা ঘুমিয়ে আছে।

২২/০২/১৯৮৪

অস্তমিত সহচরী

ব্যাথার মোম গলে পড়ে এই প্রবল নিশীথে
কবেকার ফেলে আসা শ্যামাঙ্গীনি শ্রাবণী দত্ত—
সে আজ কোন্ সুদূরবাসিনী।
হয়তো স্মৃতিগুলো দেরাজে সযতনে গুছিয়ে
ময়ূরপালকে মুখ ঢেকেছে সে
মুগ্ধ বাতাস থমকে দাঁড়ায় নিঃশব্দ ঝাউবনে।
মোড়ের নিয়নবাতি তেমনি হয়তো জ্বলছে আজো
আকাশ ভেঙে পড়ছে শিশির অঝর ধারায়
প্রাচীন পাড়ায়।

কবেকার ফেলে আসা হরিণ নয়না শ্রাবণী দত্ত—
এই প্রবল নিশীথে আমার অক্ষয় বিরহ।
যে এক সবুজ সকালে আমায় কাছে ডেকেছিলো
এবং কালো রাত আসার আগেই ম্লান হেসে পরিয়েছিলো
বৈরাগ্যের ব্যথিত সাজ।

০৩/১১/১৯৭৪

প্রতিরাতে

কী এক বিস্তীর্ণ বেদনার জলাভূমি প্রতিরাতে
গ্রাস করে আমায়, তখন কাউকেই থাকে না মনে।
পরিচিত বন্ধুকে ভয়ানক শত্রু ভেবে দূরে সরিয়ে দিই,
সুখস্মৃতি নিমিষেই বিষাদ বিধূর নভেলের ধূসর পৃষ্ঠা হয়ে
উড়তে থাকে ইতস্তত হাওয়ায়।
এ আমার কেমন ডুবে যাওয়া—

প্রতিরাতে সারি সারি স্তব্ধ ঝাউগাছ আঁধারের ভেতর থেকে
গলা বাড়িয়ে ডাকে পেঁচার মতো ভৌতিক স্বরে;
সাদা কফিনে ঢাকা এক সুদূরতমার লাশ
আমার দোরগোড়ায় এসে ডুকরিয়ে কেঁদে ওঠে
আশ্চর্য, প্রতিরাতে।
ক্লান্ত নদীর অস্পষ্ট ঘাট ক্রমেই মিলিয়ে যায়
আমার বুকের ভেতর বসে থাকা এক প্রবল নিস্কাম পুরুষ
বিউগলে বাজিয়ে চলে সত্তার কোনো মরমী গাথা;
তার সুর মেঘের আড়াল থেকে ভেসে বেড়ায়
সমুদ্রের জলে।

কবিতার নির্ঘুম বালুচরে কারা যেনো সব সাজানো সংসার
তুমুল এলোমেলো করে পালিয়ে যায় সন্তর্পণে;
ডুবে ডুবে আমি দেখি চোখের সামনে প্রতিরাতে
কী এক বিস্তীর্ণ বেদনার জলাভূমি গ্রাস করে আমায়,
আমি তলিয়ে যাই ভীষণ গভীর এক অনাহুত খাদে
আশ্চর্য, প্রতিরাতে।

২২/০১/১৯৭৫

পরলোকগমন

পরলোকগমনের ইতিহাস খুবই প্রাচীন:
আমার হাতের কাছে হাজার হাজার মৃত মানুষের ঋণ—
হাওয়ায় হাওয়ায় ওড়ে, বীণায় নীরবে বাজে অনেক রাগিনী;
চলে গেছে পৃথিবীর সীমা ছেড়ে অনেক কামিনী!প্রতিদিনই নিশ্চিন্তে যায়
প্রতিদিনই নীরবে যায়
কখনোবা হয়তো সরবে কোনো নেতা অভিনেতা
              দেশবন্ধু জগদ্বন্ধু প্রভৃতি বিখ্যাত কুখ্যাত
                            মানুষের পরলোকে
শোকবাণী হয়তো রচনা করে কিছু লোকে। কিন্তু ঠিকই চায়ের কাপ পরদিন চা হাতে প্রস্তত
              আমাদের ফ্যাকাসে শিয়রে।
মৃতের সন্তান কয়দিন পর ঠিকই রমণ করে
              তার একান্ত নারীর সাথে;
বাবার কুলখানির ঝমেলা মিটেছে গতরাতে!

পৃথিবীতে পরলোকগমনের ইতিহাস খুবই প্রাচীন
‘তবু বেঁচে থেকে নিজেকে শুধোই
              এ জীবন আর কতো পথ? আর কতো ঋণ?
              পৃথিবীতে মৃত্যুর কাহিনী খুবই প্রাচীন।

০২/০২/১৯৮৪

প্রতিদিন দাবা খেলি

প্রতিদিন দাবা খেলি
হাসতে হাসতে দান চালি;
আমার প্রতিটি কথা যেনো
রাজা উজির নৌকোর মতো পার হয়
পৃথিবীর সাদা কালো ঘর।
নগরীর জেব্রাক্রসিং-এ দাঁড়িয়ে নতুন চালের ফন্দি আঁটি
কিছু দূরে আছে এক শত্রুকবির গোপন ঘাঁটি!

আমি কি বলবো কথা মাত্রাবৃত্তে তার সাথে?
নাকি অক্ষরের বৃত্তে ঘিরে ফেলবো কবিকে?
ভাবতে ভাবতে বেলা বয়ে যায়
তমসায় ঢেকে যায় নদীতীর
চিরায়ত বিশ্বাসে ধরেছে চির।

তবু নতুন নতুন মতবাদের রঙিন খুঁটি চালি
নিমিষে বন্যায় ডুবে যায় কতো যে সংসার নৌকা—
কতো নদীর বাঁধন খুলে প্লাবনের জল নামে
                 দুঃখের বিজন রাতে।
আমার দাবার ঘুঁটি ভিজে যায়
রক্তভেজা দাবাবোর্ড পড়ে থাকে অসীম কান্নায়।
আমি তবু দান চালি
পরাজিত জীবনের সাদা-কালো ঘুঁটি
একে একে সামনে বাড়াই—
অনেক অনেক দিন পরে
অনেক রাত্রির পরে
আমি শুধু নিজেকে হারাই।

১৪/০৪/১৯৮৩

নুলো হাত নেচে ওঠে

রবীন্দ্রসঙ্গীতের সুরে নুলো হাত—নুলো হাত
নেচে ওঠে বারবার—কালো ক্ষয়ে যাওয়া
এবড়ো থেবড়ো বাসনার মতো
নুলো হাত আমার স্বপ্নের মধ্যে নেচে ওঠে—
একটি টিয়ে পাখি গান গায়—
একটি টিয়ে পাখি নেচে ওঠে।
আমি ক্রমেই কৃতজ্ঞ হয়ে উঠি
বিবশ স্বপ্নের কাছে, মদের গেলাস পড়ে থাকে টেবিলে—
বংশাল রোডে শেষরাত;
টস্ টস্ করে কান্না ঝ’রে পড়ে
দেয়ালের অস্পষ্ট গা থেকে—
কয়েকটি ট্রাক ভাঙা ভাঙা কণ্ঠে
কথা বলে চলে যায়
আর সেই নুলো হাত নাচে
আর সেই মরা টিয়ে পাখি গান গায়
আমার স্বপ্নের মধ্যে… …।

০৪/১২/১৯৮৬

টেংরাটিলায় জ্বলছে আগুন

টেংরাটিলায় জ্বলছে আগুন—
বাঙালির মন পুড়ে যায়
ঘর পুড়ে যায়। এলো তবে কোন্ সে ডাকাত এই দেশে আজ—
টেংরাটিলায় পুড়ছে এখন মানবসমাজ।

সাদা চামড়ার ডাকাতরা সব লুট করে আজ খনি যত—
সবুজ বাগান পাখির কূজন সবার দেহেই গভীর ক্ষত।
অনেক খেলাই খেলছে ডাকাত
সঙ্গে তাদের এই দেশেরই অনেক দালাল;
শোকের মাতম শুনছে মানুষ টেংরাটিলায়। এমন আগুন লেগেছিল
এইতো সেদিন মাগুরছড়ায়—
জ্বলছে এখন আগুন আবার টেংরাটিলায়।

‘নাইকো’ এখন চুপ করে হায় ‘ইউনিকোলের’ মুখ দেখা যায়—
ডাকাতরা সব গান গেয়ে যায়।
সাদা চামড়ার ডাকাতরা সব ‘ক্ষুদ্র ঋণের’ গল্প বলে—
টেংরাটিলায় মাগুরছড়ায় সকাল থেকেই আগুন জ্বলে।

৩০/০৬/২০০৫

রূপান্তর

প্রতিনিয়ত বদলে যাচ্ছি

খসে পড়ছে শরীর থেকে প্রাচীন খোলস।
আমি কি বিকট মাকড়সা হয়ে যাবো?
অথবা কুকুর পথের কুকুর?
প্রতি সেকেন্ডে হৃদয় থেকে স্মৃতির পায়রা উড়ে যাচ্ছে
বকুলপুরের দিকে।

মাথা গুঁজে আছি বিভ্রান্তির কারাগারে—
টের পাই দূরে ঝোঁড়ো হাওয়া
ডাক দিয়ে যায়।
হাতের মাঝে অনেক হাত
চোখের মাঝে অনেক চোখ
হাতছানি দিয়ে ডাক দিয়ে যায় দিবস-রজনী
বদলে যাচ্ছি প্রতিনিয়ত
বদলে যাচ্ছি—
আফ্রিকার সিংহের মতো হেঁটে হেঁটে
বিকেলবেলায়
ইঁদরের মতো একা একা ঘরে ফিরি।

আপোসের যত ফর্মুলা আছে
তাই নিয়ে আজ কথা বলি।
ক্ষমতাসীন রাজার কাছে
হাত জোড় করে কথা বলি।
কোথায় আমার বিপ্লব আজ কোন্ আঘাটায় কেঁদে মরে।

বদলে যাচ্ছি প্রতিনিয়ত
পোকা হচ্ছি কুকুর হচ্ছি পথের কুকুর…
মানুষ হওয়া হবে না কি আর এই জীবনে!

২৬/০৯/১৯৯২

লেখক:
Iqbal Aziz02
ইকবাল আজিজ, (১২ জানুয়ারি ১৯৫৫ — ০৯ মার্চ ২০২৪)
কবি, গল্পকার, প্রাবন্ধিক, গবেষক

মন্তব্য করুন (Comments)

comments

Share.

About Author

বাঙালীয়ানা স্টাফ করসপন্ডেন্ট