ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি: আগস্ট ছাত্র বিদ্রোহ । মানবেন্দ্র দেব

Comments

বাংলাদেশের ছাত্র আন্দোলনের দীর্ঘদিনের একটা ঐতিহ্য আছে। ভাষা-সংস্কৃতির সংগ্রাম থেকে শুরু করে স্বাধীনতা-গণতন্ত্র সংগ্রামে প্রতিটি ক্ষেত্রেই ছাত্র আন্দোলনের ভূমিকা অনবদ্য। বাংলাদেশের ইতিহাসের বাঁক বরাবরই ছাত্ররা নির্দেশ করেছে এবং তার অগ্রভাগে ছিল ছাত্র ইউনিয়ন। এটিও স্বীকার না করার কোনো সুযোগ নেই।

কিন্তু স্বার্থান্বেষীদের নিরন্তর প্রয়াস ইতিহাসকে বদলে দেয়ার। কার পক্ষে যাবে ইতিহাস? প্রকৃতপক্ষে ইতিহাস ইতিহাসের পক্ষেই থাকে।

আগস্ট ২০০৭ ইতিহাসেরই এক পুনরাবৃত্তি। ছাত্রদের আন্দোলন- একটি বিদ্রোহ। বাংলাদেশের গণতন্ত্রের পথে যাত্রাকে আরেকবার সচল করা। যা কিনা ঐ সময়ের বিবেচনায় একটি অনিবার্য ঘটনা। খুব বেশিদিন আগের কথা না হলে তাকেও পক্ষে নেবার চেষ্টা কম হচ্ছে না। আবার পাশ কাটিয়ে নিরাপদ দূরত্বে অবস্থান, এটিও একটি চেষ্টা। তবে ছাত্র ইউনিয়ন কখনোই দাবি করে না এটি ছাত্র ইউনিয়নের একার আন্দোলন। আবার  ছাত্র ইউনিয়নকে ছাড়া এই আন্দোলন অসম্পূর্ণ, অসম্ভব। যথারীতি ছাত্র ইউনিয়ন সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছে এই আন্দোলনের।

August 20_Manab01

লেখক সেদিনের ছাত্র জমায়েতে বক্তব্য দিচ্ছেন

সুধী মহলে প্রচলিত আছে-খেলার মাঠের একটি তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে ২০ আগস্ট ২০০৭ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এই মহাগ-গোল! ঘটনাটি কি নিছকই একটি তুচ্ছ ঘটনা?  আর এ ঘটনাই কি শুধু ঐ মহাবিস্ফোরণের কারণ ছিলো?

২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি সারাদেশে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয় রাজনৈতিক সংকটের দোহাই দিয়ে। ব্র্যাকেট বন্দি হয় আমাদের গণতন্ত্র-মৌলিক অধিকার। আমাদের জাতীয় রাজনৈতিক সংস্কৃতির সংকট আমাদের জাতীয় জীবনে মহাসংকটের তৈরি করে। দেশের রাজনীতি বা রাজদণ্ড যাদের হাতে যায় তারাই ভাইসরয়। বড়লাটের নির্দেশের বাইরে চলতে পারে না।

প্রথম কয়েক মাস মানুষ যেন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছিল। যত ছোট-বড় টিন চোর, যাকাতের কাপড় চোর, মন্ত্রী-এমপিরা ধরা পড়ছিল, দণ্ডমুণ্ডের কর্তারা সব রুই-কাতল ধরছিল। কিন্তু মানুষ যখন চিৎকার করবার চেষ্টা করলো আনন্দে কি ক্ষোভে, বিপত্তিটা তখনই ঘটলো! দেখলো তাদের গলা দিয়ে স্বর বেরুচ্ছে না। কারা যেন তাদের কণ্ঠ শক্ত করে চেপে ধরেছে। মানুষ বুঝতে শুরু করলো আবার একটা ফাঁদে আটকা পড়ে গেছে। তাদের সামনে উদ্ধারের কোনো পথ নাই। রাজনৈতিক নেতারা, নিচু থেকে সর্বোচ্চ পর্যায় পর্যন্ত; তাদের ঈমানের জোর এতই দুর্বল, তারা জনগণের নেতৃত্ব দেবে কি, নিজেদেরই পিঠ বাঁচাতে ব্যস্ত। আতংকে এবং নিষ্পেষণে থমথমে পরিবেশ চারদিকে। এর মধ্যেও কিছু সুবিধাভোগী লোক তৈরি হলো। রাতারাতি জামা পাল্টিয়ে উর্দির ছায়া গায়ে চাপালো। ক্যান্টনমেন্টের আর কোনো সীমা থাকলো না, সারাদেশই ক্যান্টনমেন্টের আওতায়। তাদের বিবেচনায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ও এর আওতার বাইরে থাকতে পারে না। একটি ক্যাম্প করা হল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের খেলার মাঠে। বন্দুক তাক করে মাঝে মাঝেই ক্যাম্পের গাড়িগুলো জলপাই রঙ ছড়িয়ে ক্যাম্পাস প্রদক্ষিণ করতো, যা এক ধরনের আতংক তৈরি করতো।

ঐ সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪৩তম সমাবর্তনের দিন ঠিক হল। তাদেরই আশীর্বাদপুষ্ট একজনকে ডিলিট ডিগ্রি দেওয়া হবে। ছাত্ররা ঐ বিষয়টিকেও সহজভাবে নেয়নি। ছাত্র ইউনিয়নের নেতৃত্বেই তার প্রতিবাদ হয়। রাস্তায় মিছিল করার উপর নিষেধাজ্ঞা। আমরা কলা ভবনের করিডোরে মিছিল করেছি। সমাবর্তনের রিহার্সেলে গাউনের ভেতর লিফলেট লুকিয়ে নিয়ে গিয়েছি। পরদিন ড. ইউনুসের নাম উচ্চারণের সাথে সাথে তাকে NO প্রতীক দেখানোর কথা। কিন্তু অন্য সংগঠনের কেউ সেদিন NO দেখানোর সাহস পায়নি। শুধু ছাত্র ইউনিয়নের পক্ষে যেহেতু আমি একাই ছিলাম, আমাকে একাই NO প্রতীক দেখাতে হয়। সাথে সাথে ওখানে নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থাসহ কয়েকজন আমাকে নিবৃত্ত করার জন্য এসে ঘিরে ধরে।

বিভিন্ন পর্যায়ে এই বন্দোবস্তের সুযোগ নিয়ে যেমন অপকর্ম বা বিদেশী প্রভুদের ব্যবস্থাপত্র নির্বিঘ্নে বাস্তবায়নের সুযোগ নিচ্ছিলো অন্যরা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনও এর থেকে পিছিয়ে থাকেনি। একে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে রূপ দেওয়ার যত প্রচেষ্টা! কিন্তু ছাত্রদের মধ্যে ‘জরুরী ভূত’ তেমন আঁচড় কাটতে পারেনি। বিশ্ববিদ্যালয়ের ফি বৃদ্ধির চক্রান্ত, টিএসসি খাবারের মূল্যবৃদ্ধি ও বাণিজ্যিক ভিত্তিতে দ্বিতীয় শিফট চালু করার চক্রান্ত ছাত্ররা শিকেয় তুলে দেয় আন্দোলনের মুখে। কখনো সামনে থেকে, কখনো পেছনে থেকে এই আন্দোলন পরিচালনা করেছে ছাত্র ইউনিয়ন। আর ঐ  সময়ে ক্যাম্পাসে অন্যদের টিকিটিও খুঁজে পাওয়া যায়নি।

August 20_Rajshahi

ছাত্র বিক্ষোভ সারা দেশে ছড়িয়ে পড়লে ধরপাকড়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক

২০ আগস্ট ঘটনাটি খুব পরিকল্পনা করে, আঁটঘাট বেঁধে আন্দোলনে নামা হয়নি। সেটি ছিল স্বতঃস্ফুর্ত ক্ষোভের  বিস্ফোরণ। আমরা সবাই ব্যস্ত বন্যা দুর্গতদের সাহায্য করতে। বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তঃবিভাগ ফুটবল খেলা চলছে বিশ্ববিদ্যালয়ের খেলার মাঠে। তাও আবার স্বভূমে পরবাসী। মাঠের দখল তখন সেনাবাহিনীর।  গণযোগাযোগ ও লোক প্রশাসন বিভাগের মধ্যে খেলা চলছে। হঠাৎ করেই একজন সেনা সদস্য লোক প্রশাসন বিভাগের শিক্ষার্থী মেহেদীর উপর চড়াও হয়। ছাত্ররা তৎক্ষণাৎ উত্তেজিত হয়ে যায়। তাদের মাথায় ছিল না তাদের প্রাণপ্রিয় ক্যাম্পাস আর তাদের নেই। তা বাহুবলের দখলে। যার দখলেই থাকুক, ছাত্ররাই বা তা মানবে কেনো? মেনে নেয়ার কথা ইতিহাসও সায় দেয় না। আমরা গেলাম খেলার মাঠের ঘটনা শুনে। বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকর্তারা ততক্ষণে সেনা ক্যাম্পের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সাথে দরবার করেছিলেন দোষী সেনা সদস্য যাতে ছাত্রদের সামনে এসে ক্ষমা চায় এবং তার বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। কিন্তু প্রকাশ্যে এই ছেলে ছোকরাদের সামনে ক্ষমা চাওয়া!!! এতে কি তাদের মান থাকে? সারাদেশের দণ্ডমুণ্ডের কর্তা তারা! উল্টো প্রতিবাদী ছাত্রদের ভিডিও ফুটেজ ধারণ করা হচ্ছিলো গোপনে, যাতে পরে এদের দেখে নেওয়া যায়। আর আমাদের ধৈর্য্যের বাঁধ ভাঙতে থাকে। তখন আমরা মাঠের ৩০-৩৫ জন ছাত্র খেলার মাঠ থেকে প্রতিবাদ মিছিল বের করি। মিছিল খেলার মাঠ থেকে শহীদ মিনার হয়ে টিএসসি লাইব্রেরির সামনে আসতেই কয়েকশ ছাত্র জমায়েত হয়। সেখানে সংক্ষিপ্ত সমাবেশে ঘটনার বিচার, সেনা ক্যাম্প প্রত্যাহারের দাবি উত্থাপিত হয়। আমাকে বলা হচ্ছিল সেদিনকার মত কর্মসূচি শেষ করে দিতে। তা না হলে ঝামেলা হবে। আর ছাত্র আন্দোলনের শিক্ষা হচ্ছে ছাত্রদের সাথে থাকা, যাই ঘটুক না কেন। তারপর আবার মিছিল। মিছিল যখন উত্তর পাড়ার হলগুলোর সামনে দিয়ে যাচ্ছে, মাঝে মাঝে সংক্ষিপ্ত বক্তৃতা হচ্ছে আর হল ভেঙ্গে বাঁধ ভাঙ্গা জোয়ারের মত ছাত্ররা সেই মিছিলে যোগ দিচ্ছে। হাজার হাজার ছাত্রের মিছিল শ্লোগানে শ্লোগানে প্রকম্পিত ক্যাম্পাস। সেই কম্পনে কেঁপে উঠেছিল দুর্গের সুদৃঢ় প্রাচীর। কখন হঠাৎ মিছিল থেকে শ্লোগান উঠল ঘেরাও ঘেরাও হবে সেনা ক্যাম্প ঘেরাও হবে আর মিছিল চলল টিএসসি হয়ে সেনা ক্যাম্পের দিকে।

আমরা জানি রাষ্ট্র যখন সন্ত্রস্ত হয় তখন তার সবচাইতে ব্যর্থ যে অস্ত্র সেই নিপীড়নের পথ বেছে নেয়।

জেনারেল সাহেবদের অনুসারীরাও সেই পথ বেছে নিল। সেনাবাহিনী ও পুলিশের যৌথ প্রযোজনায় শুরু হলো আক্রমণ। এক ভয়াবহ দানবীয় হিংস্রতায় ছাত্রদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল তারা। শতশত ছাত্র আহত। অনেককে ধরে নিয়ে ক্যাম্পের মধ্যে চালাতে থাকে অমানুষিক নির্যাতন। কিন্তু থামেনি প্রতিবাদের মিছিল। মিছিল দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হয়েছে। আহত ছাত্ররা ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এসে নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার দুষ্কৃতকারীদের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে। কয়েকজন আমাকে ঢাকা মেডিকেলের পিছন দিয়ে একটি বেসরকারি ক্লিনিকে পাঠিয়ে দিল ঝুঁকি বেশি থাকার কারণে। সেখানে আরও আহত সহযোদ্ধাদের সাথে দেখা হল। সেদিন মনে হয় ছাত্র ইউনিয়নের খুব কম ছেলেই আছে যারা আহত হয়নি। কিন্তু মুহূর্তের জন্যও আমরা যুদ্ধের ময়দান ছাড়িনি।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আমাদের শিক্ষকরা আসেন। তারা ছাত্রদের চিকিৎসার খোঁজখবর নিলেন আর বুঝাবার চেষ্টা করলেন। শিক্ষক সমিতির সভা শেষ করে তারাও এই আন্দোলনের সাথে একাত্মতা  প্রকাশ করে আন্দোলনের ঘোষণা দেন।

আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ল বিশ্ববিদ্যালয়ের আশেপাশের এলাকায় এবং খুব দ্রুতই ঢাকা শহরে। বিষয়টা এমনই অগণতান্ত্রিকতার বিরুদ্ধে একটা লড়াই হবে যা কিনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা শুরু করবে। মানুষ যেন বিষয়টির জন্য অপেক্ষা করছিল। শেষ পর্যন্ত বারুদে ছাত্ররা আগুনটি ধরালো। আর সে আগুন ছড়িয়ে গেল সবখানে। হকার শ্রমজীবী নিম্নবিত্ত মানুষ যারা ওই সময়টায় সবচেয়ে বেশি বঞ্চিত নিগৃহীত নিষ্পেষণের শিকার হয়েছে তারা একমূহূর্ত দেরি করেনি। একেবারেই ঘোষণা ছাড়া রাজপথে নেমে আসে। পরদিন অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়, বিশ্ববিদ্যালয় কলেজগুলোতেও এই ঘটনা ছড়িয়ে পড়ে।

August 20_03

রোষানলে সেনাসদস্য

একুশে আগস্ট শাহবাগে একজন সেনা সদস্যকে প্রহার করা হয় ও তাদের একটি গাড়ি পুড়িয়ে দেয়া হয়। ঘটনাটি সকালে আহত থাকার কারণে দুপুর পর্যন্ত আমার জানা ছিলো না। কিন্তু ওই ঘটনাটি আন্দোলনকে ভিন্ন দিকে নিয়ে যেতে পারত বা সেই চেষ্টাও তাদের পক্ষ থেকে হয়েছে কিন্তু তারুণ্যের স্বতঃস্ফূর্ততার কাছে কখনোই কি ভিন্ন কিছু টিকেছে!

বিকেলে মধুর ক্যান্টিনে একটি সংবাদ সম্মেলন হওয়ার কথা কিন্তু এর নেতৃত্ব কার বা কাদের কাছে থাকবে বক্তব্যই বা কী হবে তা নিয়ে ছাত্র সংগঠন ও গ্রুপগুলোর মধ্যে এক প্রকার যুদ্ধ শুরু হল।

যুদ্ধটা কেন কিভাবে এটা আজও আমার কাছে প্রশ্ন। আমি আহত অবস্থায় আমার এক বন্ধুর বাসায় চিকিৎসাধীন ছিলাম। ওই পরিস্থিতিতে আবার আমার ডাক পড়ল, কয়েকজন বন্ধুর সহযোগিতায় মধুর ক্যান্টিনে পৌঁছে টেবিলের উপর দাঁড়িয়ে অন্য সংগঠনের নেতাদের পাশে নিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করে মধুর ক্যান্টিনের বাইরে গিয়ে পাঁচ দফা দাবি ঘোষণা করেছিলাম। দাবিগুলো হলো-

১. সেনা ক্যাম্প প্রত্যাহার করা।

২. দোষী সেনা সদস্যদের প্রকাশ্যে ক্ষমা চাওয়া।

৩. আহতদের চিকিৎসা ও ক্ষতিপূরণ।

৪. পুলিশ প্রধান ও সেনাপ্রধানের ক্ষমা প্রার্থনা।

৫. সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ দাবি ছিল শিক্ষাঙ্গনে গণতান্ত্রিক চর্চার পরিবেশ ফিরিয়ে দিতে হবে।

কেউ কেউ অবশ্য দুই নেত্রীর মুক্তির বিষয় আনতে চেয়েছিল। কিন্তু সেটি আমরা হতে দেইনি। এই আন্দোলনকে কোন নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর কাছে কুক্ষিগত করতে দেইনি। পরদিন ছাত্র-শিক্ষকদের যৌথ কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। মৌন মিছিলের কর্মসূচি কিন্তু ছাত্ররা মৌন প্রতিবাদের সাথে ওই স্যুট পরা স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে শ্লোগান দিয়ে যাচ্ছিল সমানতালে।

সরকার মনে হল কিছুটা পিছুটান দিল। ২১ তারিখ রাতেই তারা সেনাক্যাম্প প্রত্যাহার করে আরো কিছু দাবি মেনে নেয়ার আশ্বাস দেয়। কিন্তু সেটা যে গুলি করার আগে বন্দুকের শাটার টানার মতো, সেটা বোঝা গেল যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের হল খালি করার নির্দেশ আসলো সন্ধ্যা ছয়টার মধ্যে এবং ছয়টা থেকে ঢাকাতে কার্ফ্যু (সান্ধ্য আইন) ঘোষণা করা হল। আরো ভয়ঙ্কর অবস্থা রাস্তায় রাস্তায় চেকপোস্ট বসিয়ে গাড়ি থামিয়ে ছাত্রদের খুঁজে খুঁজে তাদের উপর অমানুষিক নির্যাতন শুরু করলো। বিশ্ববিদ্যালয়ের যে পরিচয়পত্রটি নিয়ে ছাত্ররা গর্ব অনুভব করে, সেটি তাদের জন্য অভিশাপ হয়ে দাঁড়ালো। রাতে সারা ঢাকা শহরে ছাত্রাবাস, ছাত্রমেসগুলোতে রেইড দিয়েও অকথ্য নির্যাতন চালানো হয়েছে। সেনা সদস্যরা শিক্ষকদের বাড়িতে গিয়ে শিক্ষকদের ও ছাত্রদের চোখ বেঁধে ক্যান্টনমেন্ট নিয়ে গেছে। মনে হচ্ছে দেশে একটি যুদ্ধাবস্থা বিরাজ করছে, ১৪ ডিসেম্বর ১৯৭১ এর কথা মনে হচ্ছিল। মনে হচ্ছিল এরা কি আমাদের লোক? আমাদের আর্মি? আমাদের নিরাপত্তা কি এদেরই উপর? আঁতকে উঠার মতই ঘটনা।

নির্যাতন নিপীড়ন চালিয়ে তারা আন্দোলনকে দমন করতে চেয়েছিল। রাষ্ট্রক্ষমতায় যারা যায় তারা ভুলে যায় দমনপীড়ন করে আন্দোলন থামানো যায় না। আমাদের আন্দোলনের নেতা, উস্কানিদাতা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। চোখ বেঁধে ক্যান্টনমেন্টে নিয়ে নির্যাতন করা হয়েছে। জেল খেটেছি। আফসোস নেই। তবে অনুকম্পার জায়গা হচ্ছে তারা কত বোকা! নেতা মেনে নিলাম, শুনতেও ভালো লাগে। কিন্তু যদি বলি আন্দোলনের উস্কানিদাতা তারা নিজেরাই। কারণ নির্যাতন-নিপীড়ন যত বেড়েছে আন্দোলনের গতি তত বেড়েছে। সকল বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ বন্ধ করে দিয়েছিল অনির্দিষ্টকালের জন্য। ছাত্র-শিক্ষকরা কারারুদ্ধ, তারা ভেবেছিল এতে বোধ হয় আন্দোলনকারীরা ভীত হয়ে যাবে। শান্ত হয়ে যাবে। আর যারা বন্দী তাদের বিচার করে, সমঝোতা করে একটা বন্দোবস্ত নিশ্চয়ই করা যাবে। কিন্তু আমরা যে সমঝোতা করতে শিখিনি, সমঝোতা করতে জানি না এটা তারা বুঝতে পারেনি। পারার কথাও নয়।

তারপর আন্দোলন পেল নতুন মাত্রা। নতুন নতুন কৌশলে আন্দোলন তার লক্ষ্যে এগিয়ে চলে আর এখানেও ছাত্ররা অন্যদের শিক্ষা দেয় একটি টায়ার না জ্বালিয়েও রাষ্ট্রের শক্তিকেন্দ্রের সাথে কিভাবে লড়াই করতে হয়, বিজয় ছিনিয়ে আনতে হয়। আর এখানেই অন্যদের থেকে ছাত্র ইউনিয়ন অনন্য।

একটি ছাত্র আন্দোলন, ছাত্রদের স্বার্থে, দেশ-গণতন্ত্র-তার অধিকারের স্বার্থে। সেখানে ছাত্র ইউনিয়নের নতুন করে তার ভূমিকা প্রমাণ করার প্রয়োজন আছে কি? আমাদের মন্টি, সায়েম, শাহীন, মলয়, মিথুন, মিতাসহ অসংখ্য নেতাকর্মী কি তার প্রমাণ দেয়নি?

কেউ কেউ বলেন, ওটা একটা অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা। প্রশ্নটা হচ্ছে কেন অনাকাঙ্ক্ষিত? দেশ-জাতি-ছাত্রসমাজ যখন সংকটে পড়বে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা তার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে লড়াই করবে। এটাই কাঙ্খিত, তাই ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি বলা যায় আগস্ট ছাত্র বিদ্রোহকে। তবে সেই সংগ্রাম এখনো শেষ হয়নি, ক্যাম্পাসগুলোতে গণতন্ত্র অনুপস্থিত, আজও আবু বকর, যুবায়েররা হারিয়ে যায়। লিমন পঙ্গু হয়ে যায়। একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক রাস্তায় গাড়ি চালকের চপেটাঘাতেও অপমানিত বোধ করেন না। নিশ্চয়ই ইতিহাস আবার ঘুরে আসবে ছাত্রদের হাত ধরে।

লেখক:
Manabendra Deb
মানবেন্দ্র দেব, সাবেক সভাপতি, বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন

[লেখাটি ২০১২ সালে বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের সংকলনে প্রকাশিত]

মন্তব্য করুন (Comments)

comments

Share.