ইফতার কড়চা

Comments

এম কে জাকারিয়া

 এক

ইফতার বানানোটা একটা শিল্প

বেশ কয়েকবছর আগে এক রোজার দিনে অফিস থেকে বাসায় ফেরার পথে বাংলা মটর গিয়েছিলাম গাড়ির চাকা বদল করতে। ভেবেছিলাম তাড়াতাড়ি কাজটা শেষ করে বাসায় ফিরে ইফতার করবো সবার সাথে। কিন্তু না, কয়েকটা দোকানে টায়ারের দরদাম করে কাজটা শেষ করতে করতে মাগরিবের আযান পড়ে গেল। তাই বাধ্য হয়ে ইফতারটা আমার সারতে হল বাংলামোটরের বিভিন্ন দোকান আর ফুটপাথের ধূলা মিশানো মজাদার ইফতার দিয়ে।

সত্যি বলতে কি, এই দেশের সাধারণ মানুষের আন্তরিকতা, আতিথিয়তা অকল্পনীয়, যা আপনি দেখতে পাবেন বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে, ইফতার করানোটা তার মধ্যে একটা।

ইফতারের সময় সামনে থাকলে যে কোন মর্যাদার মানুষ আপনাকে অনুরোধ করবেই, এমনকি নিজেদের ভালো আইটেমগুলোও আপনার প্লেটে তুলে দিবে খাওয়ার জন্য কার্পণ্যহীন ও স্বতঃস্ফূর্তভাবে। সবাই মিলে ইফতার করার মধ্যে যেন এক মহা আনন্দ এবং তৃপ্তির ব্যাপার সুপ্ত আছে। এই বিষয়টা পৃথিবীব্যাপী মুসলিম ধর্মাবলম্বীদের ঐতিহ্যর একটি অঙ্গ হয়ে আছে শত শত বছর ধরে।

যে প্রসঙ্গে বলা তা হলো, ইফতার তৈরি করা। ইফতার খাওয়ার চেয়ে পরিবেশনের আয়োজন বা কথ্য পরিভাষায় ‘ইফতার বানানো’ দেখার মতো একটা ব্যাপার, বলা যায় ‘একটা শিল্প’।

ঢাকার বিভিন্ন দোকানে ইফতার বানানোর জন্য নির্দিষ্ট লোক আছে। মাগরিবের আজানের ঘণ্টাখানেক আগে থেকে তার কার্যক্রম আরম্ভ হয়। বেশ আয়োজন করে বিভিন্ন ধরনের সরঞ্জাম নিয়ে সে বসে। ছুরি দিয়ে নিখুঁতভাবে কুচি কুচি করে কাটা হয় পেঁয়াজ, মরিচ, ধনে পাতা, পুদিনা পাতা, শশা, টমেটো, লেবুর ছিলকা ইত্যাদি। এরপর পরিমাণ মতো লবন, সরিষার তেল, বিট্ লবন দিয়ে এগুলো একসাথে জড়ো করা হয় পেয়াজু, বেগুনি, আলুর চপ, ঘুগনি, ছোলা আর মুড়ির সাথে একটা বেশ বড়ো বলের মধ্যে। তারপর শক্ত হাতে নিখুঁতভাবে মাখিয়ে তৈরি করা হয় আসল ইফতারিটা। সাথে ধূলাবালি থাকলে তো কথাই নাই, উম.. ম… ম…, কি যে স্বাদ!
যারা এরকম পদ্ধতিতে বানানো ইফতার খায়নি তারা কোনোদিনই বুঝবে না। ব্যাপারটা সেই না খাওয়া কাউকে বুঝাতে হলে হয়তো কেতাবি ফুড আর স্ট্রিট ফুডের স্বাদ নিয়ে প্রসঙ্গ টানা যায়, তবু পুরোপুরি বোঝানো যাবে কি?

দোকানে ইফতারের দাওয়াত দিলে তাই মিস করিনা আমি কোনোকালেই। এত সুস্বাদু আইটেমের ব্যবস্থা থাকে যে, তার কোনোটি হয়তো জীবনে দেখা তো দূরের কথা নামই শুনি নাই। সম্ভবত বিশাল এক পাত্রে পাঁচ-দশজনের ইফতার একসাথে মিশিয়ে বানানোটাই এর একটা আলাদা স্বাদু বৈশিষ্ট তরি করে যা উপকরণের সংখ্যা আর পরিমাণের বিভিন্নতার কারণে সবসময়ই নতুন একটা স্বাদের সন্ধান দেয়।

পুরান ঢাকায় এই মিশ্রণের (ইফতার বানানোর) চল থেকেই সম্ভবত সেই বিখ্যাত ‘বড়ো বাপের পোলায় খায়’ টাইপ আইটেমের জন্ম।

দুই

ইফতারে বরফের কদর

‘এই বরফ। বরফ নেন, বরফ।’ এভাবে হাঁকডাক দিচ্ছিলেন এক যুবক। হাতে থাকা লোহার শাবলের আঘাতে ভ্যানের ওপর রাখা বিশাল বরফের চাঁই ভাঙছিল সে নিখুঁতভাবে। তাকে ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে অনেক মানুষ। কেউ বলছেন, ‘আমাকে ৫ টাকার বরফ দাও’, কেউ বলছেন, ‘১০ টাকার বরফ দাও’, কেউ বলছেন, ‘২০ টাকার দাও’, কেউ বলছেন, ‘১৫ টাকার দাও’।

ওই যুবক বিশাল বরফের চাঁইটাকে তাঁর হাতের ছোটোখাটো শাবল দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে ছোটো ছোটো খণ্ড করে পলিথিনে ভরে একেক জনের হাতে দিয়ে টাকা বুঝে নিচ্ছিল।

এখন এই ব্যবসা আর সবখানে দেখা যায় না। একটা মোটামুটি শহরেও সবার বাসায় ফ্রিজ থাকায় এই দৃশ্য হারিয়ে গেছে। তবে গ্রামে-গঞ্জে এখনও কোথাও কোথাও দৃশ্যটা দেখা যায় রোজার মাসে।

আমাদের শৈশবে, সেই ৪৭/৪৮ বছর আগের কথা, পাড়ায় এমনকি শহরেও হাতেগোনা বাসায় ফ্রিজ ছিল। ইফতারের সময় ঠাণ্ডা পানির শরবত খাওয়ার জন্য অধীর আগ্রহ নিয়ে বসে থাকতাম আমরা সবাই। ফ্রিজের ছোটো আইস্কিউব ট্রে থেকে পাওয়া অল্প বরফে ইফতারের চাহিদা মেটানো যেতো না কোনোভাবেই। পরিবারের আকার আকৃতিও তখন বড়ো ছিল। ফলে বাধ্য হয়ে বাইরে থেকে কিনতে হতো বরফ, বিভিন্ন রকম শরবতের সাথে মিশিয়ে ঠাণ্ডা এবং মজাদার করার জন্য কিংবা স্রেফ পানির সাথে দিয়ে খাওয়ার জন্য বিকল্প তো আর ছিল না।

সেসময়, বিশেষ করে গরমের দিনে, সব রোজাদারদের জন্য বরফ দেয়া শরবত ছিল ইফতারের প্রথম এবং প্রধান আইটেম। বলা বাহুল্য যে, তখন কথায় কথায় ঠাণ্ডা লাগতো না এমনকি খালি খালি বরফ কামড়িয়ে খেলেও না। কারণ তখন আমাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ছিল খুবই বেশি। সতেজ এবং ভেজালমুক্ত খাওয়াদাওয়া, সুস্থ-সুন্দর সামাজিক পরিবেশ, নির্মল আবহাওয়া, নিয়মিত খেলাধুলা ইত্যাদি কারণে।

আমারা সাধারণত বরফ কিনতাম বাসার সামনে কুমিল্লা জিলা স্কুলের গেইটের সামনে থেকে। ঠেলাগাড়ির উপরে বা নিচে পলিথিন বিছিয়ে বস্তা দিয়ে মোড়ানো বড়ো বড়ো বরফের চাকতি (অনেক সময় ধানের তুষ / কাঠের ভুসি মাখানো) এনে রাখা হতো সেখানে ইফতারের বেশ আগে থেকে।

রোজার সময় বিকালবেলা পাড়ার ছেলেরা মিলে বিভিন্ন ধরনের পানির জগ, বাটি, হাঁড়ি নিয়ে লাইন ধরতাম বরফের জন্য স্কুল গেইটের সামনে। তারপর দোকানদার হাতুড়ি আর ছোটো লোহার শাবল দিয়ে বরফ ভেঙ্গে ভেঙ্গে বিক্রি করতো যার যার চাহিদা অনুযায়ী পরিমাণ ধরে।
ওজন করার কিছু ছিল না বলে মাঝে মাঝে পরিমাণের হেরফের নিয়ে হালকা ঝগড়াঝাটিও হতো বিক্রেতার সাথে আমাদের, তবে এক অন্য ধরনের মজা আর আনন্দের ছিল এই বরফ কেনার মুহূর্তগুলি।

আবার বিকাল বেলা ছোটো ছোটো আইসক্রিমের গাড়ি টুং টুং শব্দ বাজিয়ে পাড়ায় ঢুকতো বরফের বিভিন্ন রঙের আইসক্রিম নিয়ে (হাল আমলে নতুন প্রজন্মের ললিজ বলা যায় সেই রঙিন আইসক্রিমগুলোকে)। পাড়ার সবাই মিলে লাইন ধরে এই কমদামি আইসক্রিম কিনতাম মহা আনন্দে, কত মাজাই না লাগতো তখন এই সবে।

এখন হাত বাড়ালে সবই পাই কিন্তু সেই আইসক্রিম, বরফ এবং বরফের শরবতের স্বাদ আর পাই না, এটাই পার্থক্য।

তিন

মোমো ও পোখারা

ইফতারে মোমো আইটেমটা দেখে সেদিন কিছু স্মৃতি মনে পড়লো। ফিরে গেলাম ২০১৪ সালে।

এই মজাদার খাবারটা বেশ কয়েক বছর ধরে ঢাকাসহ সারা দেশের আনাচেকানাচে ছড়িয়ে পরেছে খুব সুস্বাদু বলে।

আমি ও আমার পরিবার এর সাথে পরিচিত হই প্রথম নেপালের পোখারাতে ২০১৪ সালে, আমাদের হোটেলের পাশে অবস্থিত ববিতা’স ক্যাফেতে। এরপর যতদিন সেখানে ছিলাম প্রতিদিনে ২/৩ বার খাওয়া হতো আমাদের এই মজাদার চিকেন মোমো।

নৈসর্গিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি দক্ষিণ এশিয়ার দেশ নেপাল। মন্দিরের শহর কাঠমাণ্ডু আর অন্নপূর্ণার কোল ঘেঁষা দেশটির মধ্যাঞ্চলীয় শহর পোখারা যেন এক টুকরো স্বর্গরাজ্য। আমার দেখা অন্যতম সুন্দর একটা জায়গা।

অন্যদিকে, সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় সাড়ে সাত হাজার ফুট ওপরে অবস্থিত নাগরকোট যেন স্বর্গেরই আরেক নাম। যেখানে, হিমালয়ের বুক চিরে বের হওয়া রক্তিম সূর্যের সোনালি আভা, মেঘের আড়ালে উঁকি দেয় ক্ষণে ক্ষণে।

হিমালয়কে স্বচক্ষে এবং খুব কাছ থেকে দেখার জন্য কাঠমাণ্ডু থেকে পোখারা গিয়েছিলাম আমি সপরিবারে ২০১৪ সালের অক্টোবরের ১৬ তারিখে। নেপালে আমাদের প্রধান গন্তব্য পোখারা আর নাগরকোট হলেও, কাঠমাণ্ডু নেমেই গগণচুম্বি পাহাড় আর সবুজে ঘেরা চারপাশ দেখে মনে পড়ে গেল কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের ‘হিমালয়’ কবিতার দুটি লাইন–
‘তোমার বিশাল ক্রোড়ে লভিতে বিশ্রাম-সুখ; ক্ষুদ্র নর আমি এই আসিয়াছি ছুটিয়া।’

সূর্য তখন উঠি উঠি করছে। কাঠমাণ্ডু শহর পার হওয়ার পর দেখতে পেলাম চারপাশে সীমাহীন সবুজের সমারোহ।
একপাশে সুউচ্চ পাহাড়ের সারি, অন্যপাশে গভীর খাদ, কোথাও শান্ত কোথাও তীব্র জলস্রোত। পাহাড়ি ঘুরপথে এগিয়ে চলছে আমাদের সাথে অনেকগুলি বাস। আমার অপলক দৃষ্টি ছড়িয়ে দিলাম বহিরের দিকে বাসের স্বচ্ছ কাঁচের জানালা দিয়ে উন্মুক্ত প্রাঙ্গণে। এরকম পথ ধরেই ফিরে আসতে আসতে ভাবছিলাম মমো খেতেই আবার আসতে হবে। তখন তো আর ভাবিনি, কিছুদিন গেলে এই ঢাকা শহরের গলিতে গলিতেই পাওয়া যাবে মমো। যদিও তার সব স্বাদে সমান অত্তীর্ণ নয়।

লেখক:
M K Zakaria
এম কে জাকারিয়া
মুক্তগদ্য ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক লেখক, সাবেক ব্যংক কর্মকর্তা; ঢাকা

মন্তব্য করুন (Comments)

comments

Share.

About Author

বাঙালীয়ানা স্টাফ করসপন্ডেন্ট