। লুৎফুল হোসেন ।
২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র তৃতীয় পর্বে যৌথ সামরিক হামলা শুরু করে ইরানের সামরিক অবকাঠামো, পারমাণবিক স্থাপনা এবং ব্যালাস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি লক্ষ্য করে। হামলার ফলে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আল খামেনিসহ বেশ কয়েকজন রাজনৈতিক ও সামরিক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নিহত হন। যদিও ইরান আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থার (আইএইএ) নজরদারিতে পরমাণু কর্মসূচি চালাচ্ছে, তথাপি ইসরায়েল বারংবার ‘ইরান পারমাণবিক বোমা বানিয়ে ফেলছে, পারমাণবিক শক্তি অর্জন করে ফেলে আঞ্চলিক ভূরাজনৈতিক ভারসাম্য নষ্ট করে ফেলবে’ এমন অজুহাতে নিজে হামলা করার পাশাপাশি আমেরিকাকে হামলা চালাতে প্ররোচনা দিয়ে আসছে। নেতানিয়াহু নিজেই সম্প্রতি বলেছেন যে এবারের হামলা কয়েক দশকের ইচ্ছে ও পরিকল্পনার বাস্তবায়ন।
ইসরায়েলের যুদ্ধবাজ নেতৃত্ব অতীতে একবার বলেছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন ও তার পোষ্য পিএলওকে বিনাশ করলে পৃথিবী থেকে তাবৎ সন্ত্রাসবাদ উবে যাবে। এরপর একবার বললো যে ইরাক গোটা অঞ্চলের জন্য হুমকি তথা বিশ্বের বা আমেরিকার জন্য হুমকি। সাদ্দামকে নিশ্চিহ্ন করলে তাদের সব ভয়ঙ্কর অস্ত্র নিশ্চিহ্ন করে আঞ্চলিক শান্তি নিশ্চিত করা সম্ভব। এরপর আসলো ইরানের পালা। ইরানের পারমাণবিক বোমার জুজু আসলে ইরানকে কব্জা করার অজুহাত মাত্র। গোটা ইরান নিয়ে আমেরিকা বা ইসরায়েলের মাথাব্যাথা নেই। তাদের দরকার ইরানের তেল বানিজ্যের দখল বা সরাসরি তেল সম্পদ কুক্ষিগত করা ও ভূরাজনৈতিক আধিপত্য বহাল রাখা। সহজ কথায় মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য বশ্য রাষ্ট্রগুলোর মতো কোনো একটা পুতুল সরকারকে বসিয়ে দিয়ে তেল বানিজ্যের লাভ খাওয়া আর পেট্রো ডলারের চাকা সচল ও জোরালো রাখার মধ্য দিয়ে বিশ্ব জুড়ে আমেরিকার আধিপত্য অব্যাহত রাখা।
জ্বালানিকে ঘিরেই একবার কানাডার ওপর হামলে পড়া, একবার গ্রিনল্যাণ্ড দখলে নেয়ার উদ্যোগ, একবার ইরান, একবার কিউবা – এ যেন এক অনির্বাণ ক্ষুধা। আমেরিকা থেকে মাত্র ৯০ মেইল দূরের কিউবা প্রচুর তেল মজুদ নিয়ে বসে আছে, পাশাপাশি ক্যারিবীয় নৌপথের নিয়ন্তার ভুমিকায় আছে। ইরানে তেল মজুদের পাশাপাশি তার আয়ত্বাধীন হরমুজ প্রণালী দিয়ে বিশ্বের প্রায় এক চতুর্থাংশ জ্বালানির চালান আসাযাওয়া করে। ভেনিজুয়েলার কাছে আছে ৩০৩ বিলিয়ন ব্যারেল অর্থাৎ বিশ্বের সবচেয়ে বড়ো তেলের সম্পদ। কানাডার কাছে আছে ১৬৫ বিলিয়ন ব্যারেল। জ্বালানি হচ্ছে বিশ্বসভ্যতার চাকা সচল রাখার অত্যাবশ্যক উপকরণ। ট্রাম্পের হুমকি-ধামকি পাওয়া দেশগুলোর একটাই অপরাধ, তাদের তেল সম্পদ।
তেল সম্পদের যোগান সব দেশেরই মাথাব্যাথা, কিন্তু তার জন্য এমন আগ্রাসী অন্য আর কোনো রাষ্ট্র নয়। এর একটা আপাত দৃশ্যমান কারণ ট্রাম্পের যুদ্ধবাজ মানসিকতা আর তার মহাযুদ্ধবাজ মিত্র ইসরায়েল। এবার খোদ আমেরিকায়ও এ নিয়ে তুমুল শোরগোল যে, গণতান্ত্রিক আমেরিকার রাষ্ট্রনীতির লঙ্গন করে ট্রাম্প ইরানে হামলার মাধ্যমে একক সিদ্ধান্তে আমেরিকাকে একটা যুদ্ধে জড়িয়েছে। সাম্প্রতিক এক জরিপ অনুযায়ী আমেরিকার জনগণের ২১ শতাংশ কেবল এই যুদ্ধকে সমর্থন করে। মজার ব্যাপার হচ্ছে যে এই ট্রাম্পই নির্বাচনের আগে পূর্ববর্তী সরকারের সমালোচনা করে বলেছিল – “আমরা মধ্যপ্রাচ্যে আট ট্রিলিয়ন ডলার খরচ করেছি অথচ আমাদের রাস্তাঘাট, ব্রিজ, টানেল, হাসপাতাল, স্কুল এসবের মেরামত বা উন্নয়নের কাজ করছি না।”
তাহলে কেন মধ্যপ্রাচ্য ঘিরে আমেরিকার এত মাথাব্যাথা, কেন এই অঞ্চলে দেশে দেশে তাদের সামরিক ঘাঁটি থাকতে হবে, সরকারগুলো তাদের মদদপুষ্ট বা বশ্য পুতুল সরকার হতেই হবে। কারণ পেট্রো ডলার। মধ্যপ্রাচ্যের তেল বিশ্বের সবচেয়ে বড়ো জ্বালানি সরবরাহ সূত্র। বিশ্বের এক পঞ্চমাংশ জ্বালানি এখান থেকে হরমুজ ঘুরে বিশ্বব্যাপী যায়। এই তেল বিক্রি হয় মার্কিন ডলারে। তেল বিক্রি করা কাঁড়ি কাড়ি টাকা মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো নিয়ে বিনিয়োগ করে আমেরিকার স্টক মার্কেটে। সেই স্টক মার্কেট বিশ্বকে তাক লাগিয়ে চাঙ্গা থাকে এই পেট্রো ডলারের কল্যাণে। এখানে একটা প্রেক্ষিত খুবই গুরুত্বপূর্ণ যে আমেরিকার স্টক মার্কেটের ২৫ শতাংশ দখল করে আছে মাত্র সাতটি কোম্পানি। এরা সব গ্লোবাল জায়ান্ট, টেক কোম্পানি। পেট্রো ডলারের অবারিত বিনিয়োগের স্রোত যদি বিঘ্নিত হয়, বিনিয়োগ যদি না যায় – তাহলে মুখ থুবড়ে পড়বে আমেরিকার শেয়ার মার্কেট। ধ্বস নামবে গ্লোবাল জায়ান্ট কোম্পানিগুলোতে। ধ্বস নামবে গোটা মার্কিন অর্থনীতিতে। নিজেদের পতনের পাশাপাশি বিশ্বজুড়ে বিদ্যমান কর্তৃত্বটুকুও হাতছাড়া হয়ে যাবে আমেরিকার। তার মানে ইরানকে হারতেই হবে মার্কিন আধিপত্যবাদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার চ্যালেঞ্জকে জয়ী রাখতে হলে। বিপরীতে ইরান যদি জয়ী হয় বা অন্য কথায় আমেরিকা যদি ইরানকে কব্জা করতে না পারে তাহলে মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক ভারসাম্য পাল্টে যাবে। আমেরিকার থাবা থেকে বেরিয়ে অন্য পরাশক্তিগুলোর দাপট বাড়াবে, পেট্রো ডলারের চালান বন্ধ হয়ে আমেরিকার আধিপত্যবাদের যুগটির সমাপ্তি ঘটবে। এই ভারসাম্য রক্ষার খেলায় তাই ইউরোপের অধিকাংশ রাষ্ট্রই আমেরিকার সমর্থক হবে। কেননা বিপরীত দিকে আছে রাশিয়া। ইরানের পতন হলে খুব দ্রুত পরবর্তী টার্গেট হবে রাশিয়া। তাই রাশিয়া ইরান সুগভীর বন্ধুরাষ্ট্র না হলেও রাশিয়া শতভাগ চাইবে ইরান না হারুক। যদিও বর্তমান বিঘ্নিত জ্বালানি সরবরাহ চক্রের সুবিধা নিয়ে রাশিয়া উচ্চমূল্যে জ্বালানি বিক্রি করছে নতুন নতুন ক্রেতা রাষ্ট্রের কাছে।
ইরানের পতনের জন্য ইসরায়েল-আমেরিকার পরিকল্পনা ছক দীর্ঘদিনের। প্রথমে আছে ইরানের পারমাণবিক ও মিসাইল স্থাপনাগুলোর পাশাপাশি পানির আধার বা সরবরাহসূত্র ধ্বংস করা। যা ইতিমধ্যে তারা করে যাচ্ছে। এর পরের লক্ষ্য ইরানের শাসক পরিবর্তন। সাম্প্রতিক মোসাদ রিপোর্ট অনুযায়ী কয়েক মাসের নজরদারির সূত্র ধরেই ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বের একসাথে মিটিং করার তথ্য জেনে হামলা করে ইরানের শীর্ষ নেতা এবং আরো গুরুত্বপূর্ণ অনেককে একসঙ্গে হত্যা করতে সক্ষম হয়েছে ইসরায়েল ও আমেরিকা। এই দুই দেশ ভেবেছিল ইতিপূর্বে ইরানে রাজনৈতিক বিক্ষোভের যে দানা তারা ছড়াতে সক্ষম হয়েছিল, শীর্ষ নেতৃত্বের পতনে সেই বিপ্লবীরা রাষ্ট্রের দখল নেবে আর তখনই আমেরিকা তাদের পছন্দের নতুন সরকার বসিয়ে সব কুক্ষিগত করবে। কিন্তু বাস্তবে ঘটেছে উল্টোটা। গোটা দেশে বিভেদ ভুলে মানুষ আমেরিকা বিরোধী ক্ষোভ-বিক্ষোভে খামেনি সমর্থিত সরকারকে নিরঙ্কুশ সমর্থন দিয়েছে। কেননা ভেনিজুয়েলার মতো ইরানে তারা স্বজাতির পিঠে ছুরি বসাবার মতো লোক বাগে আনতে পারেনি। এদিকে গত এক বছরে ইরান তাদের অতীত অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্বকে বিকেন্দ্রিকরণ করেছে ব্যাপকভাবে। তাদের পারমাণবিক ও মিসাইল স্থাপনাগুলোকে ছড়িয়ে দেয়ার পাশাপাশি নতুন এক যুদ্ধ কৌশল নিয়ে স্বল্পমূল্যের (৩৫ থেকে ৫০ হাজার ডলার) ড্রোন দিয়ে নিখুঁত আক্রমণ শানানোর যে পথ অবলম্বন করছে তাতে গোটা যুদ্ধটা সামরিক যুদ্ধের চেয়ে অধিক মাত্রায় অর্থনৈতিক যুদ্ধে পরিণত হয়েছে। একটা ৫০ হাজার ডলারের ড্রোন ঠেকাতে আমেরিকার ১ মিলিয়ন বা তারও বেশি ডলারের এক বা একাধিক আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপনাস্ত্র ছুঁড়তে হচ্ছে। এই ক্ষেপনাস্ত্রের দাম যেমন বেশি মজুদও তেমনি সীমিত, এগুলো নিক্ষেপের স্থাপনা ভারী ও সহজে শত্রুপক্ষের নিশানায় পরিণত হতে পারে। অন্যদিকে ইরান এই শাহেদ ড্রোন দৈনিক ৫০০টা বা এর দ্বিগুণও তৈরি করার সক্ষমতা রাখে। ছোটো একটা ট্রাকে করে যখন তখন যে কোনো জায়গায় নিয়ে যাওয়া বা যে কোনো জায়গা থেকে ছোড়া সম্ভব এই ড্রোন। কিছু কিছু রিপোর্টে বলা হচ্ছে যে ইরানের কাছে অন্তত ৮০,০০০ শাহেদ-১৩৬ ড্রোন মজুদ আছে।
এক সপ্তায় হাজার হাজার ড্রোন ব্যবহারের সহজ পন্থায় এর সাথে হাতে গুণে অল্প সংখ্যায় ব্যালাস্টিক মিসাইল দিয়ে ইরান মধ্যপ্রাচ্যের যে কয়টি দেশে আমেরিকার সামরিক স্থাপনা আছে সেখানে, তেল শোধনাগার, পানি শোধনাগার, মোসাদ দপ্তর, মার্কিন সেনাদের আশ্রয় নেয়া হোটেল – সর্বত্রই হামলা চালিয়েছে। ইরানের নতুন শীর্ষ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতাবা খামেনি তাঁর প্রথম প্রদত্ত বক্তব্যে বলেছেন যে, মধ্যপ্রাচ্যে যে সমস্ত দেশে মার্কিন ঘাঁটি আছে সেগুলো অবলম্বে বন্ধ না হলে পুনরায় সেসব দেশে আক্রমণ করা হবে। ইতিপূর্বে ইরান আরো ঘোষণা দিয়েছিল, যে সমস্ত রাষ্ট্র তাদের ভূখণ্ডে আমেরিকার দূতাবাস বন্ধ করে দেবে, তারা বিনা বাধায় হরমুজ দিয়ে তেল পরিবহন করতে পারবে। বলা বাহুল্য, ইরান হরমুজ বন্ধ করে দেয়নি। আতঙ্ক ছড়িয়ে এই এলাকাকে উচ্চ বীমা ব্যয়ের সীমানায় ফেলে পরোক্ষভাবে স্থবির করে দিতে চাইছে আমেরিকা ও তাদের বন্ধু-ভাবাপন্ন দেশসমূহের জন্য। কেননা চীন এর মধ্যে নিয়মিত তেল আমদানি করে যাচ্ছে ইরান থেকে। এই তেল বিক্রি হচ্ছে ডলারে নয় ইউয়ানে। ইরান সম্প্রতি ঘোষণা দিয়েছে, যারা ইউয়ানে তেল কিনবে তারা হরমুজ দিয়ে বিনা বাধায় জাহাজ আনা-নেওয়া করতে পারবে। অন্যথায় তারা ইরানের আক্রমণের শিকার হবে। যেমনটা ইতিমধ্যে কয়েকটি ট্যাংকার হয়েছেও।
এতসবের পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যে সবচেয়ে বড়ো অস্ত্র হয়ে উঠতে পারে পানি। কেননা মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে কানাডা ব্রাজিল বা বাংলাদেশের মতো সহজলভ্য নয় পানি। আমাদের দেশে যেমন পানির কোনো অভাব নেই তথাপি বছরের কিছু সময়ে খরায় চাষাবাদ বন্ধ হয়ে যায়। এরচেয়ে বহুগুণ জটিল মধ্যপ্রাচ্যের মরুভূমিময় দেশগুলোর পরিস্থিতি। সৌদি আরব তাদের পানির মজুদের ৮৮৩ গুণ পানি যোগায় সমুদ্রের নোনা পানি পরিশোধনের মাধ্যমে। একই প্রক্রিয়ায় বাহরাইন যোগায় ৪,০০০ গুণ, মিসর ৬,৪২০ গুণ, আরব আমিরাত ১৭,০০০ গুণ। এইসব দেশে পানি শোধনাগার ধ্বংস হয়ে গেলে সভ্যতা বিলুপ্ত হয়ে যাবে। একই ভয় ইরানেরও আছে। যদিও তাদের পানির সহজ যোগান ‘লেক ঊর্মিয়া’ ১৯৮৪ সালে পৃথিবীর বৃহত্তম নোনা পানির হ্রদ ২০০৪ সালেই শুকনো খটখটে বিরানভূমিতে পরিণত হয়েছে তথাপি ইরানের পানি সংকট অন্যদের চেয়ে অনেক কম মাত্রার। এদিকে সাম্প্রতিক হামলায় আমেরিকা-ইসরায়েল একটা পানি শোধনাগার ক্ষতিগ্রস্ত হলে কয়েকটা গ্রামের ৩০ হাজার মানুষের পানি সরবরাহ বিঘ্নিত হয়েছে। এমন পালটা হামলা ইরানও অন্তত একটি ঘটিয়েছে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এই যে, জিসিসি (গালফ কোঅপারেশন কাউন্সিল) ভুক্ত দেশগুলোকে তাদের ৯০ শতাংশ খাবার আমদানি করতে হয়। হরমুজ বন্ধ মানে তাদের খাবারের যোগান বন্ধ। আরো উল্লেখযোগ্য বিষয় এটা যে, বিশ্বজুড়ে গম ও সমজাতীয় শস্য উৎপাদনে আবশ্যক উপকরণ ইউরিয়া সারের বৈশ্বিক চাহিদার অর্ধেক সরবরাহ আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। এর সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে ফসলের যে ক্ষতি হবে তাতে বিশ্ব জুড়ে খাদ্য সংকট অবিস্যম্ভাবী। ইতিমধ্যে বিশ্বে ইউরিয়া সারের দাম বেড়েছে ৩০ শতাংশ, গমের দাম বেড়েছে ১৫ শতাংশ।
যুদ্ধটা এখন তাই শুধু অস্ত্রের না। এই যুদ্ধ জ্বালানি, পানি, টাকা আর ক্ষমতার। খাদ্যাভাব আর বাস্তুচ্যুত মানুষের সংকট তো আছেই। ইরান তাই নিজে মরে হলেও যুদ্ধটাকে দীর্ঘ করতে মরীয়া। তাতে মুখ থুবড়ে পড়বে গোটা বিশ্ব। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে আমেরিকা। ইতিমধ্যে বিশ্বব্যাপী যে প্রতিবাদ, নিন্দা ও সমালোচনা হচ্ছে তার পাশাপাশি উচ্চারিত হচ্ছে এই যুদ্ধে আমেরিকার বিজয়ী না হতে পারার অনুমান। আমেরিকা বিজয়ী হতে না পারা মানেই ইরানের জয়। হয়তো এর মধ্য দিয়ে ঘটতে যাচ্ছে নতুন এক বিশ্বব্যবস্থার সূত্রপাত।
খোদ আমেরিকার গোয়েন্দা সূত্র বলছে – পতনের ঝুঁকিতে নেই ইরান। সেইসাথে যুদ্ধ শুরুর ৯ দিনের মধ্যে পেন্টাগন জেনেছে যে, ২৭টি কার্গো বিমানে অজ্ঞাত যেসব মালামাল ইরানে পৌছেছে, তা আসলে রাশিয়ার এস-৪০০ মিসাইল। যা অতি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন বিধায় আমেরিকার কোনো বিমান বা জাহাজ এর সীমানায় পাঠানো মানে নিশ্চিতক্ষয়ক্ষতির মুখে ঝাঁপ দেয়া। এই মিসাইল ৬০০ কিলোমিটার দূরে অনায়াসে আঘাত করতে পারে এবং লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করার সক্ষমতা এর এতো নিখুঁত যে অন্যান্য মিসাইলের মতো ৫০/১০০/১৫০ মিটার দূরে নয়, কেবলমাত্র ৫ মিটারের হেরফেরে লক্ষ্যে নিশ্চিত আঘাত করতে সক্ষম এটা। ৯০০ মিলিয়ন ডলারের বিনিময়ে এই এস-৪০০ মিসাইলের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট পুরো প্রযুক্তিই ইরানকে সরবরাহ করেছে রাশিয়া এমনটাই পেন্টাগন বলছে। এর অপারেটিং সিস্টেম এতটাই উন্নত যে একটা লক্ষ্যবস্তুকে তাক করলে তা কেবল একটা মিসাইল লঞ্চারের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত না হয়ে সিস্টেমের সকল মিসাইলের লক্ষবস্তুতে পরিণত হবে একসঙ্গে। ফলে সেই মিসাইলটি নষ্ট করে দিলেও অন্য মিসাইল তৎক্ষণাৎ আঘাত হানবে। রাশিয়ার এমন সহায়তার কারণে ক্ষিপ্ত আমেরিকা রাশিয়ার রাষ্ট্রদূতকে তলব করলে তিনি জানান যে, ইরানের সঙ্গে অস্ত্র কেনাবেচায় কোনো সমস্যা রাশিয়ার নেই। আর রাশিয়া কার কাছে অস্ত্র বিক্রি করবে কিংবা করবে না তা রাশিয়ার ইচ্ছা-অনিচ্ছার ব্যাপার। এজন্য জবাবদিহি চাওয়া বা দেওয়া ব্যাপারটি কোনোভাবে অভিপ্রেত নয়।
এত কথার পর ফিরে যাই অতীত ইতিহাসের কাছে। নভেম্বর ১৯৫৬। মানব সভ্যতার ইতিহাসের সবচেয়ে শক্তিশালী সাম্রাজ্য যারা বিশ্বের এক চতুর্থাংশ দখল করে ছিল এবং এক শতাব্দির বেশি সময়কাল বিশ্ব-বানিজ্যকে নিয়ন্ত্রণ করতো, সেই পরাক্রমশালী শক্তির পতন ঘটে মাত্র ১১ দিনের মধ্যে। না, কোনো বিপ্লবের মধ্য দিয়ে বা প্রতিপক্ষ সৈন্যবাহিনির হাতে তাদের পতন ঘটেনি। একটা ফোন কলে তাদের মূদ্রার পতন ঘটাবার হুমকিতে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বৃটিশ সাম্রাজ্য আত্মসমর্পণ করে তাদেরই সৃষ্ট ঋণসমুদ্রের কাছে। সেই মুহূর্তটি ইতিহাসে ‘সুয়েজ ক্রাইসিস’ নামে পরিচিত। যা বৃটিশ আধিপত্যবাদের কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকে দিয়েছিল। ইতিহাসের বইগুলো সন্তর্পণে এই সত্যটাকে সবসময়ই আড়াল করে গেছে– আজ আমেরিকা যে ভুলটা করছে ঠিক একই ভুলের জন্য বৃটিশ সাম্রাজ্যের পতনের শেষ বাঁশিটি বেজেছিল।
উনিশ শতকে বৃটিশ পাউন্ড ছিল বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী মূদ্রা। যা তাদেরকে যেন এক অলৌকিক ক্ষমতার আসনে আসীন করেছিল। যা তাদেরকে দেদার পাউন্ড ছাপানোর আর বানিজ্যিক ঘাটতি ঢেকে যথেচ্ছা সামরিক ব্যয় করার স্বাধীনতা এনে দিয়েছিল। কেননা বিশ্ববানিজ্যে পাউন্ড তখন সবারই প্রয়োজন ছিল। কিন্তু ১৮০০ শতকের শেষ দিকে আমেরিকার কারখানাগুলো বৃটিশ কারখানাগুলোর চেয়ে এগিয়ে গিয়েছিল উদ্ভাবনী সক্ষমতায় এবং সম্পদ সমৃদ্ধিতে। তবু বিশ্ববানিজ্যের জাদুবলেই টিকে ছিল বৃটিশ পাউন্ড।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ফলশ্রুতিতে বৃটেন রাতারাতি বিশ্বের শীর্ষ ঋণদাতা থেকে শীর্ষ ঋণগ্রহিতা হয়ে পড়ে। যার সিংহভাগেরই পাওনাদার ছিল আমেরিকা। এই ভারসাম্যহীনতাকে আমলে না নিয়ে বৃটিশরা একটা বড়ো ভুল করে বসে, ১৯২৫ সালে গোল্ড স্ট্যান্ডার্ডে ফিরে যাওয়ার মধ্য দিয়ে। দেমাগী ভাবমূর্তি নিয়ে তারা সুদের হারটাও রেখেছিল চড়া। ফলে অচিরেই তা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির শ্বাসরোধ করে ধরে, লাফিয়ে বাড়তে থাকে বেকারত্ব। বিপরীতে বিশ্বজুড়ে তাদের বিশাল সেনাবাহিনীর ভরণপোষণ যখন সাধ্যের বাইরে, তখনও তারা তা চালিয়ে যাচ্ছিল বহাল তবিয়তে। ১৯৩১ সালে মহামন্দায় বৃটেন গোল্ড স্ট্যান্ডার্ডের চক্করে রাতারাতি পাউন্ডের মূল্য হারায় ৩০ শতাংশ হারে। তবু তারা দখলকৃত সাম্রাজ্যগুলোকে, যেমন ভারতবর্ষ ও অস্ট্রেলিয়ায়, জোরপূর্বক পাউন্ডে রিজার্ভ রাখতে বাধ্য করে পাউন্ডের দাপট ধরে রাখার চেষ্টায়। বর্তমানে আমেরিকাও একেবারে হুবহু একই পথ অবলম্বন করছে। পেট্রো-ডলারে জোরে তারা গোটা বিশ্বকে ডলারে বানিজ্য চালাতে বাধ্য করছে পূর্ববর্তী সুদিনের ঠাটেবাটে। কিন্তু এই চাপে বিরক্ত পৃথিবীতে সবাই ডলার থেকে সরে আসতে সচেষ্ট। রাশিয়া, চীন তাদের মুদ্রায় বানিজ্য পরিচালনা করতে শুরু করেছে আগেই। ব্রিকসভুক্ত দেশগুলোও তাদের অভ্যন্তরীণ বানিজ্যের জন্য ভিন্ন মুদ্রা-ব্যবস্থার প্রক্রিয়ায় আছে। আমেরিকার ঋণ-জাতীয় আয় অনুপাত এখন ১২০ শতাংশ এবং তা দ্রুত বর্ধমান। ফলে মাত্র এক বছরের মধ্যে তাদের ঋণের পরিমাণ বেড়েছে ২ ট্রিলিয়ন ডলার। প্রতিদিন তারা ৭ মিলিয়ন ডলার করে ঋণ নিয়ে চলছে। ঠিক যেভাবে বৃটেন দেউলিয়া হয়ে গিয়েছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর। সেই সময়ের বৃটেনের মতো আমেরিকাও ঋণগ্রস্ততার মধ্যেই তাদের সামরিক শক্তির ঠাট বজায় রাখতে বিশ্বব্যাপী বিশাল ব্যয় নির্বাহ করে যাচ্ছে। সামরিক ব্যয় তালিকায় আমেরিকার নিচে থাকা নয়টা দেশের মোট সামরিক ব্যায়ের চাইতে তাদের ব্যয় বেশি।
১৯৫৬ সালে আর্থিক দৈন্যদশার মধ্যেও সুয়েজ খালকে ফের তাদের রাষ্ট্রীয় মালিকানায় নেবার খায়েশ নিয়ে ফ্রান্স ও ইসরায়েলের সঙ্গে টেক্কা দিতে গেলে আমেরিকা ক্ষেপে গিয়ে বৃটেনের সেই পুরোনো সাম্রাজ্যবাদী আচরণের মুখে জমা ঋণ পরিশোধের চাপে ফেলে। অন্যদিকে আইএমএফ থেকে জরুরি ঋণের পথও রুদ্ধ করে দেয়। এতে বৃটেন তাদের পতন আর ঠেকিয়ে রাখতে পারেনি। সপ্তাহে ১০০ মিলিয়ন ডলার করে ঋণ নিয়ে অর্থনৈতিক ধ্বসের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বৃটেনকে নতজানু হতে হয় আমেরিকার কাছে।
আজকে আমেরিকাও তাদের ভুল সামরিক পদক্ষেপ কিংবা গলা অব্ধি ঋণে ডোবা পরিস্থিতি বা ভূরাজনৈতিক পালাবদলের ধাক্কা – সব আঙ্গিকেই মুখিয়ে আছে পতনের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছাতে। উল্লেখ্য এবছর আমেরিকার অর্থনীতির বাৎসরিক পরিশোধতব্য সুদের পরিমাণ ১ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাবে। যা তাদের সামরিক বা চিকিৎসা বাজেটের চেয়েও বেশি। এহেন পরিস্থিতিতে আমেরিকার পতনের প্রথম শিকার হবে সাধারণ নাগরিকরা। বিশেষ করে মধ্যবিত্তের জীবনযাপন পড়বে সবচেয়ে বড়ো চ্যালেঞ্জের মুখে।
মাত্র দুই সপ্তার চেয়ে কম সময়ে ঘটে যাওয়া পতন থেকে বৃটেনকে উঠে দাঁড়াতে তিন দশকের বেশি সময় নিতে হয়েছে। আমেরিকার অর্থনীতি মন্দার দিকে ধাবিত হচ্ছে গত ৫০ বছর ধরে। ১৯৭৫ সাল থেকে লাগাতার বানিজ্যিক ঘাটতি ২০০৮ সাল থেকে ঋণের পরিমাণ বাড়াচ্ছে দ্রুততর গতিতে। পতন হলে আমেরিকার ফিরে দাঁড়াতে তাহলে কতদিন লাগতে পারে।
তাই ফের বলছি, যুদ্ধটা এখন তাই শুধু অস্ত্রের না। এই যুদ্ধ জ্বালানি, পানি, টাকা আর ক্ষমতার। সেই সাথে অতি নাজুক বিশ্ব মোড়লের আর্থিক সঙ্গতির। সময় যত গড়াবে, পরাশক্তির বিশ্বভারসাম্য আর ভূরাজনৈতিক সমীকরণ ততই বদলে যেতে থাকবে। আপাত দৃশ্যমালা যা-ই হোক, আমরা সম্ভবত সেই নতুন বিশ্বব্যবস্থার দোরগোড়ায় এসে দাঁড়িয়েছি আজ। প্রশ্ন শুধু একটাই, পালাবদলের খেলায় পৃথিবীর মানুষকে মূল্য দিতে হবে কতটা?
১২ মার্চ ২০২৬
লেখক:
লুৎফুল হোসেন
কবি, গল্পকার ও প্রাবন্ধিক, সাহিত্য সম্পাদক, বাঙালীয়ানা, ঢাকা