ইস্তেকবাল হোসেনের কবিতা

Comments

বিশ্বাস

যদিও কঠিন জানি ধ্রুব-র বানান;
ধ্রুব জানি, ধ্রুব বলে ধ্রুব কিছু নেই–
তবুও মন্থন করে বিশ্বাসের লেই
গুচ্ছ গুচ্ছ ফুল তুলে সাজাই সাম্পান।

এ কেমন দুঃসময়, বিনাশের কাল?
খরায়, জরায়, কালো কপিশ ছোবলে
পৃথিবীর দেহ থেকে ঘাম ঝরে গেলে
ধ্রুব এই, ফিরে আসে ভোরের সকাল।

ধ্রুব যদি যেতে চায়, যাক না আড়ালে,
বিশ্বাসই হিরো হবে পর্দা ওঠালে।

মীরা

দুঃখকে ছুঁয়ো না, ওর খুব বড়ো বড়ো দাঁত,
ঝকঝকে ধারালো দাঁতেরা সর্বদাই রক্তমাখা,
নিষ্পলক গিরগিটি চোখে,
বরফ ঠান্ডা চোখে, জুলজুল বাঁ’বুকে তাকিয়ে
নিশ্চুপ খেয়ে ফেলে আত্মার চাঁদ, লাবণ্য নীলচে করে,
পোড়া চোখ পুড়ে পুড়ে পোড়ে তবু
পোড়া চোখ পুড়ে পুড়ে তবুও পোড়ে না।

দুঃখের ঠোঁটে ঠোঁট দিও না প্রেমেও
নীল ঠোঁট পুড়ে পুড়ে পুড়ে যাবে
পোড়া ঠোঁট ছোঁয়ানো যাবে না
দুঃখ কিন্তু মীরাবাঈ,
ও’র কণ্ঠে কালভজন ভুলেও শুনো না।

গেরিলা রাতের চোখ

যে যুবক ছিলো মিছিলের মুখ চোখ ঝলসানো রোদে
নির্লোভ লোভে সত্য আগুন পুষেছে বুকের ঘরে
গেরিলা রাতের তামস আঁধারে যার কালো দু’টি চোখ
ভবিষ্যতের দীপ্র ছোঁয়ায় ঝলসে উঠেছে শুধু

করতলে যার জল ও মাটির অবিরাম লুকোচুরি
হৃদয়টি ছিলো ডানকানা মাছ মিছিলের নীল জলে
ভালোবাসি–বলে যে যুবক তার কখনো ফেরেনি পিছু
ছল্ কে উঠেছে পদ্মার জলে ফেণাচূর্ণের মতো
প্রাণের জোয়ারে টেনে নিয়ে গেছে জীবনের যতো ধূলো

সে যুবক আজ কান্নার জলে বিদায় পত্র লেখে
সে যুবক আজ ক্লান্ত দুপুর নির্ঘুম রাত জাগে
নীল জ্যোৎস্নায় রূপোলি আগুনে শেষ নিঃশ্বাস টানে

তবে কি যুবক বোঝেনি জীবন? সংগ্রাম কাকে বলে?
তবে কি যুবক হিসেবে বোঝেনি, কতটা জীবন পাতে
কতটা বেদনা রক্ত ও ঘামে জন্মে শীতল পাটি?

নাকি তাকে তার পাওনা দেয়নি মিথ্যে স্বাধীন মাটি?

ফাঁক

আমি লিখলাম–সম্ভাবনা,
তুমি পড়লে–সম্ভব না।

তোমাকে, নেলসন

সাতাশ বছর ঠেলে যে যুবক বেরিয়ে এসেছে,
তুমি, নেলসন, তোমাকে হৃদয়ে নিই
বুকে ধরে রাখি
তোমার সাহসী বুক
ও’ বুকের তাপ আমাকে উষ্ণ করে
বাংলাদেশ উষ্ণ হয়ে যায়
বনেরা নিজের মধ্যে এইসব বলাবলি করে
এইসব উষ্ণতা সূর্য ধারণ করে
নীলাকাশ আলো হয়ে যায়।
ইলিশ ও কলমিতে আলোর ঝিলিক্ ওঠে
হাওয়া বয়, সারা দুনিয়ার যত
দানা ও শষ্যের ক্ষেত একসাথে নৃত্য করে ওঠে
তুমি বেরিয়ে এসেছো
তুমি অনিবার্য বেরিয়ে এসেছো
একেকটি পদভারে কাঁপছে পৃথিবী
তুমি বেরিয়ে এসেছো
হাওয়ারা গাইছে গান, মুক্তি ও মানুষের
‘তুমি বাইরে, হাওয়ায়!’
হঠাৎ বাউতি কেটে উড়ে যাচ্ছে তিনটে দোয়েল পাখি
ইথারে ইথারে তুমি কেঁপে উঠছো, কাঁপছো, নেলসন!
তোমার নামের শব্দে বাংলাদেশ কাঁপছে এখানে ও বুকে আঁধার কেটে
বেরিয়ে আসছো তুমি আলোর আসরে
চোখের পাতার মতো কাঁপছে পতাকা
কুয়াশা রাজার মতো তোমার আঙুলগুলো
উইনীর কাঁপা কাঁপা আঙুলগুলোকে পেতে
কেঁপে কেঁপে উঠেছিল কিনা এখনো জানি না
সারা দুনিয়ার যতো নিপীড়িত মানুষের পতাকার মতো
তোমার অমল হাত যখন প্রথম তুমি দোলালে বাতাসে
তখন এখানে, আমাদের কাঁধের ওপরে বুট
বুটের চাপের চোটে আমাদের কাঁধ
তোমার সে পাথর কাঁধের মতো শক্ত হয়েছে
লাঠি গুলি গ্যাসের ধোঁয়ায় বাংলাদেশ ঢাকা পড়ে গেছে
এখানে ক্যাম্পাসে লাশ পথে পথে ছোপ ছোপ লাল
অদৃশ্য সূতোর টানে নেচে ওঠে সন্ত্রাসের দানো
এখানে এখোনো দেখো মেয়েদের বিজয় মিছিলে
হঠাৎ হামলে পড়ে বর্বরের বংশধরেরা
শিশুরা নিহত হয় পুলিশী হামলায়
জ্বলন্ত আগুনে মায়ের কোলের শিশু জীবন্ত ছুঁড়ে ফেলা হয়
বিপর্যস্ত সংঘ ঐক্য, বুলেট বে’নেটে ‘মৃদু লাঠির আঘাতে’
সকল শরীরে জ্বালা পিঠ ফালা ফালা
পড়তে পড়তে ছাত্র বইয়ের ওপরে মুখ থুবড়ে পড়েছে
মিছিলে সাহসী মুখ এখনো ফেরেনি ঘরে
রাজপথে সটান দাঁড়ানো
চোখে মুখে বিক্ষোভ ছিটকে পড়ছে
সংবিধান স্বাধীনতা পেঁজা পেঁজা তুলের মতোন ছেঁড়া উড়ছে আকাশে
তোমার মুক্তি শব্দে কেঁপে উঠছে বাংলাদেশ মিছিল কাঁপছে
অন্ধকার কেটে তুমি বেরিয়ে আসছো প্রিয়
বাংলাদেশ আঁধার সরিয়ে প্রিয় আলোতে আসছে

শেষশীতে

ঘুম থেকে দেরি করে উঠি; অসুখের বিছানায় গড়াগড়ি খাই। যদিও ভীষণ প্রিয় নারকেলে সকালের সুকুমারী রোদ,
হাঁটুর একটু নিচে, গোলাচে মাংসে, বিষ,
সকল শরীরে ব্যথা, হৃদয়ে বেদনা আর বুকে তো অসুখ,
এইসব তুষ আর খড়ের বিনুনি নিয়ে
শুশ্রূষার অমল চাদরে আমি মিশে যেতে চাই ।

বাম পা’র চৌচির গোড়ালি দিয়ে ডান পায়ে মারি;
ডান পায়ে বামে, অসুখের সুখ নেই, জ্বলি,
অসুখের ভীষণ ভিতর দিয়ে বহুদূর হেঁটে হেঁটে
অসুখের শেষ সীমা পার হয়ে চলে যেতে চাই।

কুমারী রোদের দিকে ফিরেও চাই না।
আসলে অসুখ জানে, আমিও তা জানি,
কুমারী তো মিসট্রেস, শুশ্রূষার নার্স,
আর যার চুল খোলা, আমূল ভোরের সেই তুমুল বালিকা,
আর সেই ইঞ্জিন ড্রাইভার, যার দু’হাত কাঁপিয়ে বাজে
ভোরের প্রথম বাঁশি

সে বাঁশির সুরে সুরে কুমারী রোদেরা আসে,
যে বাঁশির মন্ত্রণায় কুমারী উঠোন দিয়ে হেঁটে যেতে চাই
চা-সিগ্রেট খেয়ে দেয়ে অতিথির মতো আমি,
অতিথি পাখির মতো তোমাদের রিঙ পায়ে
উত্তুরে উত্তাপে আমি চলে যেতে চাই।

লেখক:
Istekbal Hossain02
ইস্তেকবাল হোসেন, কবি, আবৃত্তিকার, সাংস্কৃতিক সংগঠক ও আইনজীবী। 

মন্তব্য করুন (Comments)

comments

Share.

About Author

বাঙালীয়ানা স্টাফ করসপন্ডেন্ট