বাঙালীর আত্মপরিচয় গঠনে অবিস্মরণীয় ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর । সাগর লোহানী

Comments
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর হলেন মধ্যযুগীয় সমস্ত রকমের গোঁড়ামি, কুসংস্কার থেকে মুক্ত এক বিরল ব্যক্তিত্ব। তত্‍কালীন সমাজ ও সংস্কার থেকে স্রোতের বিপরীতে চলা এক বলিষ্ঠ চরিত্র যা তাঁর জন্মের ২০০ বছর পরে আজও বিস্ময়কর। বিদ্যাসাগরের মতো মনীষীদের চর্চা বাংলাদেশে একেবারেই হয়নি। কিছুটা পশ্চিমবঙ্গে হয়েছে তাও অপ্রতুল। ফলে নবপ্রজন্মের ক’জন চেনেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরকে? গুটিকয় মানুষ বিদ্যাসাগরের নাম কেবল পণ্ডিত হিসেবেই হয়তো শুনেছেন।

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর নিজে সংস্কৃত সাহিত্যের দিকপাল ছিলেন। কিন্তু এরপরেও পাশ্চাত্য যুক্তিবাদী বিজ্ঞান শিক্ষার বিস্তার চেয়েছিলেন তিনি। তিনি বেদান্ত দর্শন নির্ভর শিক্ষার বিরোধী ছিলেন। বলেছিলেন, ‘কতকগুলি কারণে সংস্কৃত কলেজে বেদান্ত ও সাংখ্য আমাদের পড়াতেই হয়। কিন্তু সাংখ্য ও বেদান্ত যে ভ্রান্ত দর্শন সে সম্বন্ধে এখন আর বিশেষ মতভেদ নেই।’ এর পরিবর্তে তিনি আধুনিক যুক্তিবাদী বিজ্ঞানমনস্ক চিন্তার বিস্তার চেয়েছিলেন।

Ishwar Chandra Vidyasagar01

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর

মধ্যযুগীয় কূপমণ্ডুক চিন্তা থেকে সমাজকে মুক্ত করার লক্ষ্যে নারী শিক্ষার বিস্তার তাঁর হাত দিয়েই হয়েছিল। হিন্দু ধর্মের প্রচলিত চিন্তার বিরুদ্ধে গিয়ে তত্‍কালীন পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে নারীদের মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্যে বিধবা বিবাহ প্রবর্তনের মতো অসাধ্য কাজ তিনিই করেছিলেন।

উনবিংশ শতকের বাঙালি শিক্ষাবিদ, সমাজ সংস্কারক ও গদ্যকার ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরকে আধুনিক বাংলা ভাষার জনক বললে হয়ত ভুল বলা হবে না। তিনিই প্রথম বাংলা লিপি সংস্কার করেছিলেন এবং তিনি যে শুধু বাংলা ভাষাকে যুক্তিগ্রাহ্য ও সকলের বোধগম্য করে তুলেছিলেন তাই নয়, তিনি ছিলেন বাংলার শিক্ষা ব্যবস্থা এবং বাঙালী সমাজে প্রগতিশীল সংস্কারের একজন অগ্রদূত।

১৮২০ খ্রিষ্টাব্দের ২৬শে সেপ্টেম্বর (১২ আশ্বিন, ১২২৭ বঙ্গাব্দ), মঙ্গলবার তদানীন্তন হুগলি জেলার (অধুনা পশ্চিম মেদিনীপুর জেলা) বীরসিংহ গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। প্রকৃত নাম ঈশ্বরচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়। যিনি বিদ্যাসাগর নামেই বেশি পরিচিত।

পিতার নাম ঠাকুরদাস বন্দ্যোপাধ্যায় এবং মায়ের নাম ভগবতী দেবী। তাঁর পিতামহের নাম রামজয় তর্কভূষণ। পণ্ডিত হিসাবে রামজয়ের সুনাম থাকলেও, তিনি অত্যন্ত দরিদ্র ছিলেন। ভাইদের সাথে মনমালিন্য হওয়ার জন্য রামজয় গৃহত্যাগ করলে, তাঁর স্ত্রী দুর্গাদেবী (বিদ্যাসাগরের পিতামহী) পুত্রকন্যা নিয়ে দুরবস্থায় পড়েন এবং তিনি তাঁর পিতার বাড়ি বীরসিংহ গ্রামে চলে আসেন। এই কারণে বীরসিংহ গ্রাম বিদ্যাসাগরের মামার বাড়ি হলেও পরে সেটাই তাঁর আপন গ্রামে পরিণত হয়। আর্থিক অসুবিধার কারণে দুর্গাদেবী জ্যেষ্ঠ সন্তান ঠাকুরদাস কৈশোরেই উপার্জনের জন্য কলকাতায় চলে আসেন এবং সেখানে তিনি অতি সামান্য বেতনে চাকুরি গ্রহণ করেন। পরে তেইশ-চব্বিশ বছর বয়সে তিনি গোঘাট নিবাসী রামকান্ত তর্কবাগীশের কন্যা ভগবতী দেবীকে বিবাহ করেন। আর্থিক অনটনের জন্য তাঁর পক্ষে সপরিবার শহরে বাস করা সাধ্যাতীত ছিল। তাই শৈশব ঈশ্বরচন্দ্র গ্রামেই মা ভগবতী দেবী ও ঠাকুরমা দুর্গাদেবীর কাছেই প্রতিপালিত হন।

পাঁচ বছর বয়সে ঈশ্বরচন্দ্র গ্রামের কালীকান্ত চট্টোপাধ্যায়ের পাঠশালায় ভর্তি হন। এই পাঠশালায় তিনি সেকালের প্রচলিত বাংলা শিক্ষা লাভ করেছিলেন। তখন কাজের সূত্রে কলকাতায় থাকতেন ঈশ্বরচন্দ্রের পিতা ঠাকুরদাস বন্দ্যোপাধ্যায়। ১৮২৮ খ্রিষ্টাব্দের নভেম্বর মাসে উচ্চশিক্ষার জন্য তিনি কলকাতায় আসেন। শিক্ষালাভের জন্য ঈশ্বরচন্দ্র বীরসিংহ গ্রাম থেকে কলকাতায় পৌঁছান পায়ে হেঁটে, যখন তাঁর বয়স মাত্র আট পেরিয়েছে, বীরসিংহ থেকে কলকাতার দূরত্ব ৫২ মাইল, এই দীর্ঘ পথ তিনি প্রায় পুরোটা নিজে পায়ে হেঁটেই পাড়ি দিয়েছিলেন। শোনা যায়, এই পথপরিক্রমায় পথের ধারে মাইলফলকে ইংরেজি সংখ্যাগুলি দেখে সংখ্যাচিহ্ন শিখেছিলেন। কথিত আছে, ঈশ্বরচন্দ্রের লেখাপড়ায় এতটাই আগ্রহ ছিল যে বাসায় আলো জ্বালার যথেষ্ট সামর্থ্য না থাকায় তিনি রাস্তার আলোর নিচে পড়াশোনা করতেন।

Ishwar Chandra Vidyasagar_Father & Mother

পিতা ঠাকুরদাস বন্দ্যোপাধ্যায় এবং মাতা ভগবতী দেবী

এক সময় ঠাকুরদাশ এবং বিদ্যাসাগর কলকাতার বড়বাজার অঞ্চলের বিখ্যাত সিংহ পরিবারে আশ্রয় নেন। ১৮২৯ খ্রিষ্টাব্দের ১ জুন সোমবার, কলকাতা গভর্নমেন্ট সংস্কৃত কলেজে ব্যাকরণের তৃতীয় শ্রেণীতে তিনি ভর্তি হন। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, এই সংস্কৃত কলেজের প্রতিষ্ঠা হয়েছিল ১৮২৪ খ্রিষ্টাব্দে। এই কলেজে তাঁর সহপাঠী ছিলেন মুক্তারাম বিদ্যাবাগীশ ও নদিয়া নিবাসী মদনমোহন তর্কালঙ্কার। বিদ্যাসাগরের আত্মকথা থেকে জানা যায় মোট সাড়ে তিন বছর তিনি ওই শ্রেণীতে অধ্যয়ন করেছিলেন।

১৮৩০ খ্রিষ্টাব্দে সংস্কৃত কলেজের ইংরেজি শ্রেণীতেও ভর্তি হন। ১৮৩১ খ্রিষ্টাব্দের মার্চ মাসে অনুষ্ঠিত বার্ষিক পরীক্ষায় কৃতিত্বের জন্য মাসিক পাঁচ টাকা হারে বৃত্তি পান এবং ‘আউট স্টুডেন্ট’ হিসেবে একটি ব্যাকরণ গ্রন্থ ও আট টাকা উপহার পান। তৎকালীন সংস্কৃত কলেজে মাসিক বৃত্তিপ্রাপ্ত ছাত্রদের ‘পে স্টুডেন্ট’ ও অন্য ছাত্রদের ‘আউট স্টুডেন্ট’ বলা হত। ১৮৩৩ খ্রিষ্টাব্দে তিনি কাব্য শ্রেণীতে ভর্তি হন। এই সময় তিনি শিক্ষক হিসাবে পেয়েছিলেন বিশিষ্ট পণ্ডিত জয়গোপাল তর্কালঙ্কারকে। ১৮৩৩ খ্রিষ্টাব্দে তিনি ‘পে স্টুডেন্ট’ হিসেবে মাসিক ৫ টাকা পেতেন। ১৮৩৪-৩৫ খ্রিষ্টাব্দের বার্ষিক পরীক্ষায় কৃতিত্বের জন্য তিনি ৫ টাকা মূল্যের পুস্তক উপহার পান। ১৮৩৫ খ্রিষ্টাব্দে তিনি অলঙ্কার শ্রেণীতে ভর্তি হন। এখানে তিনি শিক্ষক হিসাবে পান পণ্ডিত প্রেমচাঁদ তর্কবাগীশকে। এই শ্রেণীতে তিনি এক বছর শিক্ষালাভ করেন। ১৯৩৫-৩৬ বৎসরের বাৎসরিক পরীক্ষায় তিনি সর্বোচ্চ সংখ্যক নম্বর পেয়ে উত্তীর্ণ হন। এ কারণে তিনি কলেজ থেকে রঘুবংশম্, সাহিত্য দর্পণ, কাব্যপ্রকাশ, রত্নাবলী, মালতী মাধব, উত্তর রামচরিত, মুদ্রারাক্ষস, বিক্রমোর্বশী ও মৃচ্ছকটিক গ্রন্থসমূহ উপহার পান।

১৮৩৬ খ্রিষ্টাব্দে তিনি ভর্তি হন বেদান্ত শ্রেণীতে। সেই যুগে স্মৃতি পড়তে হলে আগে বেদান্ত ও ন্যায়দর্শন পড়তে হত। কিন্তু ঈশ্বরচন্দ্রের মেধায় সন্তুষ্ট কর্তৃপক্ষ তাঁকে সরাসরি স্মৃতি শ্রেণীতে ভর্তি করে নেন। এই পরীক্ষাতেও তিনি অসামান্য কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখেন এবং  ত্রিপুরায় জেলা জজ পণ্ডিতের পদ পেয়েও পিতার অনুরোধে, তা প্রত্যাখ্যান করে ভর্তি হন বেদান্ত শ্রেণীতে। ১৮৩৮ সালে সমাপ্ত করেন বেদান্ত পাঠ। ১৮৩৯ খ্রিষ্টাব্দের ২২ এপ্রিল মাসে হিন্দু ল কমিটির পরীক্ষা দেন ঈশ্বরচন্দ্র। এই পরীক্ষাতেও যথারীতি কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হয়ে, ১৬ মে ল কমিটির কাছ থেকে যে প্রশংসাপত্রটি পান, তাতেই প্রথম তাঁর নামের সঙ্গে ‘বিদ্যাসাগর’ উপাধিটি ব্যবহৃত হয়।

Ishwar Chandra Vidyasagar-Sangskrit College

কলকাতায় সংস্কৃত কলেজ থেকে ‘বিদ্যাসাগর’ উপাধি লাভ করেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর

এরপর তিনি কৃতিত্বের সাথে ‘ন্যায় শ্রেণী’ ও ‘জ্যোতিষ শ্রেণী’তে শিক্ষালাভ করেন।  ১৮৪০-৪১ খ্রিষ্টাব্দে তিনি ‘ন্যায় শ্রেণী’তে পাঠ করেন। এই শ্রেণীতে দ্বিতীয় বার্ষিক পরীক্ষায় একাধিক বিষয়ে তিনি পারিতোষিক পান। ন্যায় পরীক্ষায় প্রথম স্থান অর্জন করে ১০০ টাকা, পদ্য রচনার জন্য ১০০ টাকা, দেবনাগরী হস্তাক্ষরের জন্য ৮ টাকা ও বাংলায় কোম্পানির রেগুলেশন বিষয়ক পরীক্ষায় ২৫ টাকা – সর্বসাকুল্যে ২৩৩ টাকা পারিতোষিক পেয়েছিলেন।

১৮৪১ সালে সংস্কৃত কলেজে শিক্ষা সমাপ্ত করে ২৯ ডিসেম্বর মাত্র একুশ বছর বয়সে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ বাংলা বিভাগের সেরেস্তাদার বা প্রধান পণ্ডিতের পদে নিযুক্ত হন। সে সময় তাঁর বেতন ছিল মাসে ৫০ টাকা। সংস্কৃত কলেজের রামমাণিক্য বিদ্যালঙ্কারের মৃত্যুতে একটি পদ শূন্য হলে তিনি ১৮৪৬ খ্রিষ্টাব্দের ৬ এপ্রিল সংস্কৃত কলেজের সহকারী সম্পাদক হিসাবে যোগদান করেন। কিন্তু কলেজ পরিচালনার ব্যাপারে সেক্রেটারি রসময় দত্তের সঙ্গে মতান্তর হওয়ায় তিনি ১৮৪৭ খ্রিষ্টাব্দের ১৬ জুলাই তারিখে সংস্কৃত কলেজের সম্পাদকের পদ থেকে পদত্যাগ করেন। এই বছরের ১ মার্চ পাঁচ হাজার টাকা জামিনে, মাসিক ৮০ টাকা বেতনে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজে হেডরাইটার ও কোষাধ্যক্ষ পদে যোগদান করেন।

১৮৪৭ এ তিনি স্থাপন করেন সংস্কৃত প্রেস ডিপজিটরি নামে একটি বইয়ের দোকান। ১৮৪৯ খ্রিষ্টাব্দে বন্ধু ও হিতৈষীদের সহযোগিতায় সমাজ সংস্কার আন্দোলনের লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠা করেন ‘সর্ব্বশুভকরী সভা’। ১৮৫০ খ্রিষ্টাব্দের আগস্ট মাসে মদনমোহন তর্কালঙ্কারের সহযোগিতায় তিনি ‘সর্ব্বশুভকরী’ পত্রিকা প্রকাশ করেন।

১৮৫০ খ্রিষ্টাব্দের ৪ ডিসেম্বর ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের কাজে ইস্তফা দেন এবং ৫ ডিসেম্বর সংস্কৃত কলেজে সাহিত্যের অধ্যাপক হিসাবে আবার ফিরে আসেন। ১৮৫১ খ্রিষ্টাব্দের ৫ জানুয়ারীতে তিনি সাহিত্যের অধ্যাপকের পদ ছাড়াও কলেজের অস্থায়ী সেক্রেটারির কার্যভারও গ্রহণ করেন। ২২ জানুয়ারী ১৫০ টাকা বেতনে কলেজের অধ্যক্ষ নিযুক্ত হন। এই সময় থেকেই সংস্কৃত কলেজে সেক্রেটারির পদটি বিলুপ্ত হয়। সংস্কৃত কলেজের অধ্যক্ষের দায়িত্বভার নিয়ে তিনি কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার সাধন করেন। ৯ জুলাই, পূর্বতন রীতি বদলে ব্রাহ্মণ ও বৈদ্য ছাড়াও কায়স্থদের সংস্কৃত কলেজে অধ্যয়নের সুযোগ করে দেন। ২৬ জুলাই পূর্বের অষ্টমী ও প্রতিপদ তিথিতে কলেজ ছুটির নিয়ম পাল্টে রবিবার সাপ্তাহিক ছুটির প্রথা প্রবর্তন করেন। ডিসেম্বর মাসে সংস্কৃত কলেজকে সকল বর্ণের সম্ভ্রান্ত হিন্দু সন্তানদের জন্য উন্মুক্ত করে দেন। ১৮৫২ খ্রিষ্টাব্দের এপ্রিল মাসে ২৬ অনুচ্ছেদ সম্বলিত নোটস অন দ্য সংস্কৃত কলেজ প্রস্তুত হয়।

১৮৫৩ খ্রিষ্টাব্দে তিনি তাঁর জন্মভূমি বীরসিংহ গ্রামে একটি অবৈতনিক বিদ্যালয় স্থাপন করেন। ১৮৫৪ খ্রিষ্টাব্দে তাঁর নিজের বেতন বৃদ্ধি পেয়ে তিনশো টাকা হয়।

১৮৫৪ খ্রিষ্টাব্দের জানুয়ারী মাসে ইংরেজ সিভিলিয়ানদের প্রাচ্য ভাষা শিক্ষা দেওয়ার জন্য প্রতিষ্ঠিত ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ ভেঙে বোর্ড অফ একজামিনার্স গঠিত হয়। বিদ্যাসাগর এই বোর্ডের সদস্য মনোনীত হন।

১৮৫৫ খ্রিষ্টাব্দে মফস্বলে স্কুল পরিদর্শনে যাওয়ার সময় পাল্কিতে বসে তিনি বর্ণপরিচয়-এর পাণ্ডুলিপি প্রস্তুত করেন।

Ishwar Chandra Vidyasagar_Borno Porichay

১লা মে-তে সংস্কৃত কলেজের অধ্যক্ষের পদ ছাড়াও মাসিক অতিরিক্ত ২০০ টাকা বেতনে দক্ষিণবঙ্গে সহকারী বিদ্যালয় পরিদর্শকের পদে নিযুক্ত হন। ১৭ জুলাই বাংলা শিক্ষক প্রশিক্ষণের উদ্দেশ্যে সংস্কৃত কলেজের অধীনে, ওই কলেজের প্রাতঃকালীন বিভাগে নর্ম্যাল স্কুল স্থাপন করেন। এই স্কুলে প্রধান শিক্ষক নিযুক্ত হন অক্ষয়কুমার দত্ত। এই বছরেই দক্ষিণবঙ্গের চার জেলায় একাধিক মডেল স্কুল বা বঙ্গবিদ্যালয় স্থাপন করেন। আগষ্ট-সেপ্টেম্বর মাসে নদিয়ায় পাঁচটি, আগস্ট-অক্টোবরে বর্ধমানে পাঁচটি, আগষ্ট-সেপ্টেম্বর-নভেম্বরে হুগলিতে পাঁচটি এবং অক্টোবর-ডিসেম্বরে মেদিনীপুর জেলায় চারটি বঙ্গবিদ্যালয় স্থাপন করেন। ১৮৫৬ খ্রিষ্টাব্দের ১৪ জানুয়ারী মেদিনীপুরে পঞ্চম বঙ্গবিদ্যালয় স্থাপিত হয়।

১৮৮৫-র অক্টোবর মাসে বিধবা বিবাহ বিরোধী মতের কণ্ঠরোধ করার পর্যাপ্ত শাস্ত্রীয় প্রমাণসহ ‘বিধবা বিবাহ প্রচলিত হওয়া উচিত কিনা এতদ্বিষয়ক প্রস্তাব’ – দ্বিতীয় পুস্তক প্রকাশ করেন। বিধবা বিবাহ আইনসম্মত করতে ভারতে নিযুক্ত ব্রিটিশ সরকারের নিকট বহুস্বাক্ষর সম্বলিত এক আবেদনপত্রও পাঠান। ২৭ ডিসেম্বর আরেকটি আবেদনপত্র পাঠান বহু বিবাহ নিবারণ বিধির জন্য।

১৮৫৬ খ্রিষ্টাব্দের ১৬ জুলাই বিধবা বিবাহ আইন পাশ হয়। ৭ ডিসেম্বর কলকাতায় প্রথম বিধবা বিবাহ আয়োজিত হয় ১২ নম্বর সুকিয়া স্ট্রিটে বিদ্যাসাগর মহাশয়ের বন্ধু রাজকৃষ্ণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়িতে। পাত্র ছিলেন প্রসিদ্ধ কথক রামধন তর্কবাগীশের কণিষ্ঠ পুত্র তথা সংস্কৃত কলেজের কৃতি ছাত্র ও অধ্যাপক, বিদ্যাসাগর মহাশয়ের বন্ধু শ্রীশচন্দ্র বিদ্যারত্ন। পাত্রী ছিলেন বর্ধমান জেলার পলাশডাঙা গ্রামের অধিবাসী ব্রহ্মানন্দ মুখোপাধ্যায়ের দ্বাদশ বর্ষীয়া বিধবা কন্যা কালীমতী।

১৮৫৭ খ্রিষ্টাব্দের ২৪ জানুয়ারী, স্থাপিত হয় কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়। এই সময় তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচালনা সমিতির অন্যতম সদস্য অর্থাৎ ফেলো মনোনীত হন।

এ বছর নভেম্বর-ডিসেম্বর মাসে হুগলি জেলায় সাতটি ও বর্ধমান জেলায় একটি বালিকা বিদ্যালয় স্থাপন করেন। পরের বছর জানুয়ারী থেকে মে মাসের মধ্যে হুগলিতে আরও তেরোটি, বর্ধমানে দশটি, মেদিনীপুরে তিনটি ও নদিয়ায় একটি বালিকা বিদ্যালয় স্থাপন করেন। ১৮৫৭ খ্রিষ্টাব্দের নভেম্বর মাস থেকে ১৮৫৮ সালের মে মাস অবধি সমগ্র দক্ষিণবঙ্গে বিদ্যাসাগর মহাশয় ৩৫টি বালিকা বিদ্যালয় স্থাপন করেছিলেন। মোট ১৩০০ ছাত্রীসম্বলিত এই বিদ্যালয়গুলির জন্য তাঁর খরচ হতো মাসে ৮৪৫ টাকা।

১৮৫৮ খ্রিষ্টাব্দের ৩ নভেম্বর শিক্ষা বিভাগের অধিকর্তার সঙ্গে মতবিরোধ হওয়ায় তিনি সংস্কৃত কলেজের অধ্যক্ষের পদ ত্যাগ করেন।

১৮৫৮ খ্রিষ্টাব্দের ১৫ নভেম্বর প্রকাশিত হয় ‘সোমপ্রকাশ’, সাপ্তাহিক পত্রিকা। এই পত্রিকা প্রকাশের পরিকল্পনার নেপথ্যে তিনি ছিলেন। দেশীয় ভাষায় প্রকাশিত এটিই প্রথম পত্রিকা, যাতে রাজনৈতিক বিষয় স্থান পেয়েছিল।

১৮৫৯ খ্রিষ্টাব্দে ১ এপ্রিল পাইকপাড়ার রাজাদের পৃষ্ঠপোষকতায় মুর্শিদাবাদের কান্দিতে প্রতিষ্ঠা করেন ইংরেজি-বাংলা স্কুল। কিছুকাল এই প্রতিষ্ঠানের অবৈতনিক তত্ত্বাবধায়কও ছিলেন তিনি।

২০ এপ্রিল মেট্রোপলিটান থিয়েটারে উমেশচন্দ্র মিত্র রচিত নাটক ‘বিধবা বিবাহ’ প্রথম অভিনীত হয়। ২৩ এপ্রিল রামগোপাল মল্লিকের সিঁদুরিয়াপট্টির বাসভবনে সেই নাটকের অভিনয় দেখেন বিদ্যাসাগর মহাশয়। মে মাসে তত্ত্ববোধিনী সভা ব্রাহ্মসমাজের সঙ্গে মিশে গেলে সভার সভাপতির পদ থেকে তিনি পদত্যাগ করেন। ২৯ সেপ্টেম্বর গণশিক্ষার প্রসারে সরকারি অনুদানের জন্য বাংলার গভর্নরের কাছে আবেদন করেন। ১৮৬০ খ্রিষ্টাব্দে বোর্ড অফ একজামিনার্সের পদ থেকেও ইস্তফা দেন তিনি।

Ishwar Chandra Vidyasagar_Museum_Sudipta Biswas

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ব্যবহৃত বই ও অন্যান্য সামগ্রী রয়েছে বীরসিংহ গ্রামে বিদ্যাসাগর স্মৃতি সংগ্রহশালায়

১৮৬১ খ্রিষ্টাব্দের এপ্রিল মাসে কলিকাতা ট্রেনিং স্কুলের সেক্রেটারি মনোনীত হন। এ বছর ডিসেম্বর মাসে হরিশ্চন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের অকালপ্রয়াণে, তিনি  তাঁর সম্পদিত ‘হিন্দু প্যাট্রিয়ট’ পত্রিকার পরিচালনভার গ্রহণ করেন। ১৯৬২ খ্রিষ্টাব্দে কৃষ্ণদাস পালকে তিনি এই পত্রিকার সম্পাদক নিযুক্ত করেন। এই বছর তাঁর সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় বাণভট্টের কাদম্বরী। মাইকেল মধুসূদন দত্ত তাঁকে উৎসর্গ করেন স্বরচিত ‘বীরাঙ্গনা কাব্য’।

১৮৬৩ খ্রিষ্টাব্দে সরকার তাঁকে ওয়ার্ডস ইনস্টিটিউশনের পরিদর্শক নিযুক্ত করেন। উল্লেখ্য, ৮ থেকে ১৪ বছর বয়সী নাবালক জমিদারদের শিক্ষাদানের উদ্দেশ্যে ১৮৫৬ খ্রিষ্টাব্দে এই ইনস্টিটিউশন প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। ১৮৬৪ খ্রিষ্টাব্দে কলিকাতা ট্রেনিং স্কুলের নাম পরিবর্তন করে কলিকাতা মেট্রোপলিটান ইনস্টিটিউশন রাখা হয়। ৪ জুলাই ইংল্যান্ডের রয়্যাল এশিয়াটিক সোসাইটি তাঁকে সাম্মানিক সদস্য নির্বাচন করে। ২ আগস্ট ফ্রান্সে ঋণগ্রস্থ মাইকেল মধুসূদনের সাহায্যার্থে ১৫০০ টাকা প্রেরণ করেন তিনি। ১৮৬৫ খ্রিষ্টাব্দের ১১ জানুয়ারি ওয়ার্ডস ইনস্টিটিউশনের পরিদর্শক হিসেবে বিদ্যাসাগর মহাশয় তাঁর প্রথম রিপোর্টটি পেশ করেন।

১৮৬৬ খ্রিষ্টাব্দের ১ ফেব্রুয়ারী বহুবিবাহ রদের জন্য দ্বিতীয়বার ভারতীয় ব্যবস্থাপক সভার নিকট আবেদনপত্র পাঠান। ১৮৬৭ সালের জুলাই মাসে তাঁর জ্যেষ্ঠা কন্যা হেমলতার সঙ্গে গোপালচন্দ্র সমাজপতির বিবাহ হয়। এবছর অনাসৃষ্টির কারণে বাংলায় তীব্র অন্নসংকট দেখা দিলে তিনি বীরসিংহ গ্রামে নিজ ব্যয়ে একটি লঙ্গরখানা স্থাপন করেন। ছয় মাস দৈনিক চার-পাঁচশো নরনারী ও শিশু এই লঙ্গরখানা থেকে অন্ন, বস্ত্র ও চিকিৎসার সুযোগ পেয়েছিল।

১৮৬৯ খ্রিষ্টাব্দে জানুয়ারী মাসে তিনি বেথুন বালিকা বিদ্যালয়ের সেক্রেটারির পদ ত্যাগ করেন।

এ বছর এপ্রিল মাসে তাঁর সম্পাদনায় কালিদাসের ‘মেঘদূতম্’ প্রকাশিত হয়। এই বছরে বীরসিংহ গ্রামে তাঁর পৈত্রিক বাসভবনটি ভস্মীভূত হয়।

১৮৭০ খ্রিষ্টাব্দের জানুয়ারী মাসে ডাক্তার মহেন্দ্রলাল সরকারের বিজ্ঞান সভায় এক হাজার টাকা দান করেন। ১১ আগস্ট তাঁর বাইশ বছর বয়সী পুত্র নারায়ণচন্দ্রের সঙ্গে কৃষ্ণনগর নিবাসী শম্ভুচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের চতুর্দশবর্ষীয়া বিধবা কন্যা ভবসুন্দরীর বিবাহ সম্পন্ন হয়।

Ishwar Chandra Vidyasagar_House01_Sudipta Biswas

বীরসিংহ গ্রামের ঈশ্বরচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের পৈত্রিক বাড়ি যা এখন তাঁর স্মৃতি সংগ্রহশালা। ছবি: সুদীপ্ত বিশ্বাস

১৮৭১ খ্রিষ্টাব্দের ১২ এপ্রিল কাশীতে তাঁর মা ভগবতী দেবী মৃত্যবরণ করেন। ১৮৭১-৭২ সাল নাগাদ তাঁর স্বাস্থ্যের অবনতি হয়। জলহাওয়া পরিবর্তনের জন্য তিনি কার্মাটারে (বর্তমানে ভারতের ঝাড়খণ্ড রাজ্যে অবস্থিত) একটি বাগানবাড়ি কেনেন।

সেখানে একটি স্কুলও স্থাপন করেন। ১৮৭২ খ্রিষ্টাব্দের ১৫ জুন স্বল্প আয়ের সাধারণ বাঙালীর মৃত্যুর পর তাঁর স্ত্রী-পুত্র পরিবারবর্গ যাতে চরম অর্থকষ্টে না পড়েন সে জন্যে হিন্দু বিধবাদের সাহায্যার্থে হিন্দু ফ্যামিলি অ্যানুয়িটি ফান্ড নামে একটি জনহিতকর অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান স্থাপন করেন। বিদ্যাসাগর ছিলেন এর অন্যতম ট্রাস্টি।

১৮৭৩ খ্রিষ্টাব্দের জানুয়ারী মাসে স্থাপিত হয় মেট্রোপলিটান কলেজ। সে যুগের এই বেসরকারি কলেজটিই বর্তমানে কলকাতার বিখ্যাত ‘বিদ্যাসাগর কলেজ’ নামে পরিচিত। ১৬ আগষ্ট মাইকেল মধুসূদনের নাটক শর্মিষ্ঠা অভিনয়ের মাধ্যমে উদ্বোধিত হয়েছিল বেঙ্গল থিয়েটার। বিদ্যাসাগর মহাশয় এই থিয়েটারের ম্যানেজিং কমিটির সদস্য ছিলেন। ১৮৭৪ খ্রিষ্টাব্দে মাত্র এক বছরেই ফার্স্ট আর্টস পরীক্ষায় মেট্রোপলিটান কলেজ গুণানুসারে দ্বিতীয় স্থান অধিকার করেছিল।

১৮৭৫ খ্রিষ্টাব্দের ৩১ মে-তে নিজের উইল প্রস্তুত করেন। পরের বছর ২৬ ফেব্রুয়ারী হিন্দু ফ্যামিলি অ্যানুয়িটি ফান্ডের ট্রাস্টি পদ থেকে ইস্তফা দেন। এপ্রিল মাসে কাশীতে পিতা ঠাকুরদাস বন্দ্যোপাধ্যায়ের মৃত্যু হয়। এই সময় তিনি কলকাতার বাদুড়বাগানে একটি বাড়ি তৈরি করেন। বর্তমানে এই বাড়ি সংলগ্ন রাস্তাটি বিদ্যাসাগর স্ট্রিট ও সমগ্র বিধানসভা কেন্দ্রটি বিদ্যাসাগর নামে পরিচিত। ১-২ আগষ্ট আদালতে উপস্থিত থেকে চকদিঘির জমিদার সারদাপ্রসাদ রায়ের উইল মামলায় উইল প্রকৃত নয় বলে জমিদার পত্নী রাজেশ্বরী দেবীর স্বপক্ষে সাক্ষী দেন। ১৮৭৭ খ্রিষ্টাব্দে জানুয়ারী থেকে বাদুড়বাগানে বাস করতে শুরু করেন। এপ্রিল মাসে গোপাললাল ঠাকুরের বাড়িতে উচ্চবিত্ত ঘরের ছেলেদের পড়াশোনার জন্য বিদ্যালয় স্থাপন করেন। ছাত্রদের বেতন হয় মাসিক ৫০ টাকা। ১৮৭৯ খ্রিষ্টাব্দে মেট্রোপলিটান কলেজ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক দ্বিতীয় থেকে প্রথম শ্রেণীর কলেজে উন্নীত হয়।

১৮৮০ খ্রিষ্টাব্দের ১ জানুয়ারীতে তিনি সিআইই উপাধি পান। ১৮৮২ খ্রিষ্টাব্দে ৫ আগস্ট রামকৃষ্ণ পরমহংস তাঁর বাদুড়বাগানের বাড়িতে আসেন। দুজনের মধ্যে ঐতিহাসিক এক আলাপ ঘটে। ১৮৮৩ খ্রিষ্টাব্দে তিনি পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ের ফেলো নির্বাচিত হন। মার্চে বাণভট্টের ‘হর্ষচরিতম্’ তাঁর সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়।

পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসাতেও পারদর্শী ছিলেন। সাঁওতাল এবং দরিদ্রদের মধ্যে তিনি হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা করতেন। হোমিওপ্যাথি শিক্ষার জন্য তিনি বাড়িতে সেই সময় তাঁর ষাট বছর বয়সে কঙ্কাল কিনে এনে অ্যানাটমি শিখেছিলেন।

১৮৮৪ খ্রিষ্টাব্দের নভেম্বর মাসে কানপুরে বেড়াতে যান এবং সেখানে বেশ কিছুদিন অতিবাহিত করেন।

১৮৮৮ খ্রিষ্টাব্দের ১৩ আগস্ট রক্ত আমাশয়ে আক্রান্ত তাঁর পত্নী দীনময়ী দেবীর মৃত্যু হয়।

১৮৯০ খ্রিষ্টাব্দের ১৪ এপ্রিল বীরসিংহ গ্রামে তাঁর মায়ের নামে স্থাপন করেন ভগবতী বিদ্যালয়।

১৮৯১ খ্রিষ্টাব্দের ২৯ জুলাই (১৩ শ্রাবণ, ১২৯৮ বঙ্গাব্দ) রাত্রি দুটো আঠারো মিনিটে তাঁর কলকাতার বাদুড়বাগানস্থ বাসভবনে। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৭০ বছর ১০ মাস ৩ দিন। ডাক্তারের মতে মৃত্যুর কারণ ছিল লিভারের ক্যানসার।

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরকে জানতে তাঁর সম্পর্কে অন্যান্যের মন্তব্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ:

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
“দয়া নহে, বিদ্যা নহে, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের চরিত্রের প্রধান গৌরব তাঁহার অজেয় পৌরুষ, তাঁহার অক্ষয় মনুষ্যত্ব।”
স্বামী বিবেকানন্দ
‘আমার জীবনে দু’জন বড় মানুষ, একজন বিদ্যাসাগর, আর অপরজন রামকৃষ্ণ।’
ড. অমিয় কুমার সামন্ত
“শিক্ষা ক্ষেত্রে তাঁর প্রধান অবদান হচ্ছে দেশের সর্বসাধারণের জন্য মাতৃভাষার মাধ্যমে প্রাথমিক শিক্ষা চালু করা এবং একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ প্রাথমিক শিক্ষার পাঠক্রম তৈরি করা। ছয় মাসের মধ্যে তিনি বাংলার মেয়েদের জন্য প্রায় ৪০টি স্কুল প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।”
তপন রায়চৌধুরী
“সেই সময়ে বাঙালী হিন্দু ও মুসলমান উভয় সমাজে মেয়েদের অবস্থা খুবই খারাপ ছিল। সমাজে মেয়েদের খুবই ছোট চোখে দেখা হতো। কিন্তু যে দরদ নিয়ে এবং যেভাবে সাহসের সঙ্গে বিদ্যাসাগর তাদের অবস্থার উন্নতির জন্য লড়াই করেছেন, তার আর তুলনা নেই।”
তপন রায়চৌধুরী
“ঈশ্বরচন্দ্রের শ্রেষ্ঠত্ব ছিল তাঁর স্বাধীন চিন্তায়- শিক্ষার ক্ষেত্রে এবং সমাজ সংস্কারের ক্ষেত্রে। সমাজের প্রচলিত প্রথার বিরুদ্ধে মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়ানোর মধ্যেই ছিল তাঁর শ্রেষ্ঠত্বের পরিচয়।”
ড. পবিত্র সরকার
“বাঙালী শিশুদের কাছে বেদগ্রন্থ ছিল তাঁর লেখা বর্ণপরিচয়। বইটি এত সুন্দরভাবে সংগঠিত ছিল যে বেশ কয়েকটি প্রজন্মের এই বই থেকে অক্ষর পরিচয় হয়েছিল। বাঙালীর স্বাক্ষরতা বিস্তারে এই বর্ণপরিচয়ের ভূমিকা ছিল অসাধারণ। আর সেখানেই তিনি থামেননি। এরপরে লিখেছিলেন বোধোদয়, কথামালা এবং ধাপে ধাপে শিক্ষার একটা সিঁড়ি তৈরি করে দিয়েছিলেন।”

বিদ্যাসাগরের রচনাসমগ্র:

বেতাল পঞ্চবিংশতি (১৮৪৭)। লল্লুলাল কৃত বেতাল পচ্চীসী’র অনুবাদ।
বাঙ্গালা ভাষার ইতিহাস, দ্বিতীয় ভাগ (১৮৪৮),  মার্শম্যানের হিস্ট্রি অফ বেঙ্গল- অবলনে রচিত।
জীবনচরিত (১৮৪৯)। উইলিয়াম ও রবার্ট চেম্বার্স রচিত খ্যাতিমান ইংরেজ মণীষীদের জীবনী অবলম্বনে রচিত গ্রন্থ।
বোধদয়, শিশুশিক্ষা চতুর্থ ভাগ (১৮৫১)।  রুডিমেন্টস অফ নলেজ অবলম্বনে তাঁর রচিত গ্রন্থ।
নীতিবোধ : প্রথম সাতটি প্রস্তাব (১৮৫১) । রবার্ট ও উইলিয়াম চেম্বার্সের মরাল ক্লাস বুক অবলম্বনে রচিত।
সংস্কৃত ব্যাকরণের উপক্রমণিকা (১৮৫১)।
ঋজুপাঠ : প্রথম ভাগ (১৮৫১), দ্বিতীয় ভাগ (১৮৫২), তৃতীয় ভাগ (১৮৫২)।
ব্যাকরণ কৌমুদি : প্রথম ভাগ (১৮৫৩), দ্বিতীয় ভাগ (১৮৫৩), তৃতীয় ভাগ (১৮৫৪), চতুর্থ ভাগ (১৮৬২)।
সংস্কৃত ভাষা ও সংস্কৃত সাহিত্য বিষয়ক প্রস্তাব (১৮৫৪)
শকুন্তলা (১৮৫৪)। কালিদাসের অভিজ্ঞানম শকুন্তলম্ অবলম্বনে তাঁর রচিত গ্রন্থ।
বিধবা বিবাহ প্রচলিত হওয়া উচিত কিনা এতদ্বিষয়ক প্রস্তাব – প্রথম পুস্তক (১৮৫৫)
বর্ণপরিচয় : প্রথম ভাগ (১৮৫৫), দ্বিতীয় ভাগ (১৮৫৫)
বিধবা বিবাহ প্রচলিত হওয়া উচিত কিনা এতদ্বিষয়ক প্রস্তাব – প্রথম পুস্তক (১৮৫৫)
কথামালা (১৮৫৬)। ঈশপের কাহিনি অবলম্বনে রচিত গ্রন্থ।
চরিতাবলী (১৮৫৬)। স্বরচিত গ্রন্থ।
মহাভারত- উপক্রমণিকা ভাগ (১৮৬০)।
সীতার বনবাস (১৮৬০)। ভবভূতির উত্তর রামচরিত অবলম্বনে তাঁর রচিত বিখ্যাত গ্রন্থ।
আখ্যানমঞ্জরী (১৮৬৩)
শব্দমঞ্জরী (১৮৬৪)
ভ্রান্তিবিলাস (১৮৬৯)। উইলিয়াম শেক্সপিয়র রচিত কমেডি অফ এররস্ অবলম্বনে রচিত গ্রন্থ।
বহুবিবাহ রহিত হওয়া উচিত কিনা এতদ্বিষয়ক বিচার (১৮৭১)
বামনাখ্যানম্ (১৮৭৩)। মধুসূদন তর্কপঞ্চানন রচিত ১১৭টি শ্লোকের অনুবাদ।
বহুবিবাহ রহিত হওয়া উচিত কিনা এতদ্বিষয়ক বিচার -দ্বিতীয় পুস্তক। (১৮৭৩)
পদ্যসংগ্রহ : প্রথম ভাগ (১৮৮৮), দ্বিতীয় ভাগ (১৮৯০)
নিষ্কৃতিলাভ প্রয়াস (১৮৮৮)
সংস্কৃত রচনা (১৮৮৯)
শ্লোকমঞ্জরী (১৮৯০)
বিদ্যাসাগর চরিত [স্বরচিত] (১৮৯১)
ভূগোল খগোল বর্ণনম্ (১৮৯২)
অতি অল্প হইল (১৮৭৩)
আবার অতি অল্প হইল (১৮৭৩)
ব্রজবিলাস (১৮৮৪)। ‘কস্যচিৎ উপযুক্ত ভাইপোস্য’ ছদ্মনাম রচিত।
বিধবা বিবাহ ও যশোহর হিন্দুধর্মরক্ষিণীসভা (১৮৮৪)। ‘কস্যচিৎ তত্ত্বান্বেষিণঃ’ ছদ্মনামে রচিত। দ্বিতীয় সংস্করণে তিনি এর নামকরণ করেন বিনয় পত্রিকা।
রত্ন পরীক্ষা (১৮৮৬)। ‘কস্যচিৎ উপযুক্ত ভাইপোসহচরস্য’ ছদ্মনামে রচিত।

বিদ্যাসাগর সম্পাদিত গ্রন্থ:

অন্নদামঙ্গল (১৮৪৭)
কিরাতার্জ্জুনীয়ম্ (১৮৫৩)
সর্বদর্শনসংগ্রহ (১৮৫৩-৫৮)
শিশুপালবধ (১৮৫৩)
কুমারসম্ভবম্ (১৮৬২)
কাদম্বরী (১৮৬২)
বাল্মীকি রামায়ণ (১৮৬২)
রঘুবংশম্ (১৮৫৩)
মেঘদূতম্ (১৮৬৯)
উত্তরচরিতম্ (১৮৭২)
অভিজ্ঞানশকুন্তলম্ (১৮৭১)
হর্ষচরিতম্ (১৮৮৩)
পদ্যসংগ্রহ প্রথম ভাগ (১৮৮৮ ; কৃত্তিবাসি রামায়ণ থেকে সংকলিত)
পদ্যসংগ্রহ দ্বিতীয় ভাগ (১৮৯০ ; রায়গুণাকর ভারতচন্দ্র রচিত ।

মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র নারায়ণচন্দ্র বিদ্যারত্ন প্রকাশ করেন:

অসমাপ্ত আত্মজীবনী ‘বিদ্যাসাগর চরিত’ (সেপ্টেম্বর, ১৮৯১)
৪০৮টি শ্লোকবিশিষ্ট ‘ভূগোল খগোল বর্ণনম্’ (এপ্রিল, ১৮৯২)

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠায় সারা জীবন লড়াই চালিয়েছিলেন। তিনি বাল্যবিবাহের অবসান ঘটাতে চেয়েছিলেন, চেয়েছিলেন বিধবা বিবাহ প্রচলন করে নারীর অধিকারকে সুপ্রতিষ্ঠিত করতে, বহুবিবাহ রহিত করে নারীকে অবিচার ও যন্ত্র্রণার হাত থেকে মুক্তি দিতে।

বাংলায় নারীশিক্ষার প্রসারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ছিলেন পথিকৃৎ। তিনি মনে করতেন, নারী জাতির উন্নতি না ঘটলে বাংলার সমাজ ও সংস্কৃতির প্রকৃত উন্নতি সম্ভব নয়। তিনিই উদ্যোগী হয়ে কলকাতায় যে হিন্দু বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, সেটিই ভারতের প্রথম বালিকা বিদ্যালয় যা বর্তমানে বেথুন স্কুল নামে পরিচিত। বিদ্যাসাগর ছিলেন এই বিদ্যালয়ের সম্পাদক। বাংলার বিভিন্ন জেলায় ব্যক্তিগত উদ্যোগে ৩৫টির বেশি বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। শুধু স্ত্রী শিক্ষাই নয়, সমাজের সকল স্তরের মানুষকে বিদ্যাসাগর শিক্ষার আলো দেখাতে চেয়েছিলেন।

Ishwar Chandra Vidyasagar_House02_Kolkata

কলকাতার বাদুড়বাগানের বাড়ি

অসাম্প্রদায়িক চেতনার প্রাণপুরুষ ছিলেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। তিনি মনে করতেন, ছাত্রদের পাঠ্য গ্রন্থে ধর্মের কথা বলতে গেলে ছাত্রদের মন প্রথম থেকেই নিজের স্বাভাবিক উন্মেষ ছেড়ে ধর্মের দিকে চলে যায়। তাই তিনি বলেছিলেন শিক্ষার ক্ষেত্র থেকে, পাঠ্যপুস্তক থেকে ধর্মের কথা, ধর্মনীতির কথা বাদ দিয়ে দাও। এটাই ছিল বিদ্যাসাগরের সেক্যুলারিজমের মূল তত্ত্ব। তিনি প্রমাণ করতে পেরেছিলেন তাঁর ধর্ম হল মানবতাবাদ – রিলিজিয়ন অফ হিউম্যানিটি।

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর সর্বস্তরের জন্য শিক্ষা বিষয়ক বই, শিশুদের বর্ণপরিচয় থেকে শুরু করে সংস্কৃত গ্রন্থের অনুবাদ করেছিলেন। তাঁর কিছু কিছু পাঠ্যপুস্তক কয়েক প্রজন্ম ধরে বাঙালী শিশুদের মৌলিক শিক্ষার প্রধান বাহন হয়েছে।

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের সমাজ সংস্কারের জন্য নিরলস আন্দোলন সমগ্র বাঙালী জাতিকে নতুন পথে চলার রাস্তা দেখিয়েছিল যা একটা আদর্শ, একটা সংগ্রামের ঐতিহ্য সৃষ্টি করেছিল।

বিদ্যাসাগর-পরবর্তী সময়ে তার জীবন ও সংগ্রাম নিয়ে মূলত কিছুই করা হয়নি, হয়নি তেমন করে বিদ্যাসাগর চর্চা। উপমহাদেশের আজকের স্বাধীন রাষ্ট্রযন্ত্র কিছুই করেনি বরঞ্চ শাসকরা বারবার ভুলিয়ে দিতে চেয়েছে তাঁর জীবন ও সংগ্রামকে। ভুলিয়ে দিতে না পারলে রাষ্ট্রযন্ত্রে ঘাপ্টি মেরে থাকা উদ্ধত কৃপাণ ধর্মীয় মৌলবাদীদের যে বিপদ! ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর নামটি ওদের কাছে ভয়ঙ্কর প্রতীয়মান হয়। তাই তো বাংলাদেশে বিদ্যাসাগরের নাম মুছে যায় পাঠ্য পুস্তক থেকে আর পশ্চিমবঙ্গে বিদ্যাসাগরের পাথরের মূর্তিও রক্ষা পায় না ওদের হাত থেকে!

লেখক: সাগর লোহানী, সম্পাদক, বাঙালীয়ানা

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর
সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন রচনা ও তাঁর রচিত বেতাল পঞ্চবিংশতি পড়ুন এখানে

বাঙালীয়ানার নিয়মিত আপডেট পেতে আমাদের ফেইসবুক পেজে লাইক দিয়ে রাখতে পারেন।

মন্তব্য করুন (Comments)

comments

Share.