উঠে দাঁড়ান জাফর ভাই । মোজাম্মেল হোসেন

Comments

ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর জন্য মন কাঁদছে। জাফর ভাইর সঙ্গে অনেক মানুষ নানাভাবে ঘনিষ্ট। তেমনি আমি একজন।

বিশ বছর আগের কথা। ২০০০ সালের জুন মাসের শেষ সপ্তাহ। স্থান সুইজারল্যান্ডের জেনিভা শহর। জাতিসংঘের ‘কোপেনহেগেন+৫’ নামে অভিহিত বিশ্ব সামাজিক উন্নয়ন শীর্ষ সম্মেলন। পাঁচ বছর আগে কোপেনহেগেনে অনুষ্ঠিত প্রথম আন্তর্জাতিক সামাজিক শীর্ষ সম্মেলনের একটি ফলোআপ সম্মেলন। সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এমডিজি) নামে জাতিসংঘের বৈশ্বিক কর্মসূচি সেখানে গৃহীত হয়। সাংবাদিক হিসেবে আমার উপস্থিত থাকার সুযোগ হয়েছিল। আমন্ত্রণ ও খরচ ছিল জাতিসংঘ তথ্য বিভাগের। একদিন দুপুরে বিশ্ব সংস্থার জেনিভাস্থ সদর দপ্তরে সম্মেলনস্থল থেকে ইচ্ছে করে শাটল বাস ছেড়ে হেঁটে পথ দেখতে দেখতে হোটেলে ফিরছি। প্রায় জনহীন রাস্তায় দূর থেকে চোখে পড়লো কোনো কাফের সামনে ফুটপাথে বড় ছাতার (বিচ আমব্রেলা) নিচে একা একজন পরিচিত আদলের মানুষ, হাতে গ্লাস নিয়ে নিবিষ্ট মনে কিছু কাগজ দেখছেন। কেবল পাক ধরতে শুরু করা ঝাঁকড়া চুল মাথাভর্তি। কবি নজরুলের মতো। প্যান্টের উপর সেই পরিচিত অতি সাধারণ একটা হাফ সার্ট। ডা. জাফরুল্লাহ। আমি অনেক বছর ধরে চিনলেও তিনি তখন আমাকে চিনতেন না। আমি যে সংবাদপত্রের প্রতিনিধি সেই ‘প্রথম আলো’র বয়স দু’বছর হলেও দ্রুত পরিচিতি পেয়েছে। কাছে এসে পরিচয় দিয়ে বসলাম বড় ছাতাটির নিচে পাতা ছোট গোল টেবিল ঘিরে আসনগুলির একটিতে। তিনি আমাকেও ফলের রস খাওয়ালেন। মুহূর্তে অন্তরঙ্গ হয়ে শিশুর সরলতা নিয়ে আমার সঙ্গে এমনভাবে গল্প জুড়লেন যেন কতদিনের পরিচয়। বেশির ভাগ কথাই সোশ্যাল সামিট নিয়ে। লাঞ্চের পরে সেশন ও সন্ধ্যায় প্রেস ব্রিফিং, তাই বেশিক্ষণ বসিনি। জাফর ভাইরা এসেছিলেন এনজিও প্রতিনিধি হিসেবে। ওই সময় ও পরের বছরগুলোতে জাতিসংঘ ও বিশ্বব্যাংকের আন্তর্জাতিক সম্মেলনগুলোতে সমান্তরালে এনজিওগুলোর শত শত প্রতিনিধি হাজির হতেন নীতি নির্ধারণকে সাধারণ মানুষের পক্ষে প্রভাবিত করার আওয়াজ নিয়ে। কর্পোরেট স্বার্থ, সাম্রাজ্যবাদ ও কর্তৃত্ববাদী বিশ্বায়নের বিরোধিতা ছিল মূল সুর। অনেক বিক্ষোভও হয়েছে। সেদিন জাফর ভাইরাও জেনিভায় মিছিল করেছিলেন। পরের বছরই ব্রাজিলে ওয়ার্ল্ড সোশ্যাল ফোরাম গঠনের কথা অনেকে জানেন।

সেই থেকে পরবর্তী বিশ বছর জাফর ভাইর সঙ্গে কতবার দেখা, কত কথা, কত তর্ক-বিতর্ক। এই গত জানুয়ারিতে এক অনুষ্ঠানে একত্রে দুপুরের খাবার খেয়েছি। তারপর ফোনে কথা হলেও দেখা হয়নি। ২০০৮ সালে অল্প কিছুদিন দৈনিক ‘সমকাল’-এ একসঙ্গে কাজ করেছিলাম। আমি ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক থাকাকালে তিনি সম্পাদকীয় উপদেষ্টা। ব্যক্তি হিসেবে তিনি খুবই প্রাণবন্ত। অনেক গণমুখী কাজের উপদেশ তিনি দিতেন কিন্তু আমাদের দিক থেকে দরকার হতো তাঁকে একটু সামাল দিয়ে রাখা। শিক্ষানবিশ সংবাদকর্মী নেওয়া হবে। তিনি বললেন না শুধু, নিজে ড্রাফট করে রীতিমতো গোঁ ধরলেন, নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে লিখতে হবে যে প্রার্থীদের অবশ্যই অধূমপায়ী হতে হবে এবং মেয়েদের সাইকেল চালাতে পারতে হবে। আমরা বোঝালাম, এটা না লিখে প্রথম নিয়োগ পরীক্ষার সময়েই আমাদের এই অগ্রাধিকার বলে দিয়ে সেই নিরীখে সিদ্ধান্ত নেব। কিন্তু শর্ত হিসেবে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে লিখতে চাই না। আমাদের অফিস তো ধূমপানমুক্ত আছেই। জাফর ভাই মানলেও অভিমান করলেন। জাফর ভাইয়ের সঙ্গে বিভিন্ন সময়ে মতের অমিল হয়েছে কিন্তু তাঁর সঙ্গে অামার প্রাণের সখ্য কোনোদিন এতটুকু শিথিল হয়নি।

জাফর ভাইকে যাঁরা চিনেন তাঁরা চিনেন। অনেকে তাঁকে এক্সেনট্রিক বা ক্ষ্যাপাটে স্বভাবের মনে করেন। কিছুটা তো বটেই। কিন্তু পৃথিবীতে বিরল প্রতিভাধর ও তুমুল কর্মোদ্যোগী লোকেরাই এরকম ক্ষ্যাপাটে হয়, হিসেবী ও অকম্মারা হয় না। আমি ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীকে বাস্তববাদী হিসেবেই দেখি। তিনি রাজনৈতিক দল করেননি। সামরিক একনায়ক এরশাদের নেওয়া উদ্যোগে শামিল হয়ে জাতীয় ঔষধ নীতি প্রণয়নে সাহায্য করার জন্য রাজনৈতিক মহল থেকে তাঁকে ‘স্বৈরাচারের দালাল’ গালি শুনতে হয়েছে। কিন্তু ওই ঔষধ নীতি জাতীয় ঔষধ শিল্পের প্রসার ঘটিয়ে তাকে বিশ্ব বাজারে এগিয়ে দিয়েছে। ওষুধের প্যাকেটের গায়ে সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য লেখার নিয়ম নাম-কা-ওয়াস্তে চালু থাকলেও জনস্বার্থে ওষুধের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হয়নি পরবর্তী সময়ে কায়েমী স্বার্থবাদীদের কারণে। দেশে অবাধ সুষ্ঠু নির্বাচনের দাবি তুলে ২০১৮-এর সংসদ নির্বাচনের আগে ডা. জাফরুল্লাহ ব্যক্তিগতভাবে বিএনপি ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের শিবিরে সক্রিয় হওয়ায় আওয়ামী লীগ তাঁর প্রতি অত্যন্ত বিরূপ হয়। তাঁর প্রতিষ্ঠান সাভারে আক্রান্ত হয়। কিন্তু তিনি বর্তমান সরকার ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি পূর্ণ সম্মান বজায় রেখে অসীম ধৈর্যের সঙ্গে তাঁর গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের কার্যক্রম এগিয়ে নিতে চেষ্টা করছেন। গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের সাফল্য-ব্যর্থতার বিচার ভিন্ন প্রসঙ্গ। তবে সত্যিকার সমাজমুখী গণমুখী স্বাস্থ্যব্যবস্থার আন্তরিক নিরলস প্রচেষ্টা হিসেবে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রকে সম্মান দিতেই হবে।

একজন নির্ভেজাল দেশপ্রেমিক সাহসী কর্মবীর মুক্তিযোদ্ধা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী অত্যন্ত নির্দয় আচরণের শিকার হলেন প্রবীণ বয়সে। তাঁর প্রতিষ্ঠান গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের বিজ্ঞানী ড. বিজন কুমার শীলের টিমের আবিস্কৃত করোনাভাইরাস পরীক্ষার র‍্যাপিড কিট গ্রহণযোগ্য হোক বা না হোক, তার চেয়ে বড় কথা হলো, তা বিশেষ গোষ্ঠীস্বার্থে যাতে গ্রহণ করা না হয় সে-লক্ষ্যে স্বাস্থ্য খাতের একাংশের আমলাদের নিষ্ঠুর কারসাজি এবং ওই আমলাদের নিবৃত্ত করতে সরকারের রাজনৈতিক নেতৃত্বের অনীহা ও ব্যর্থতা। কর্তৃপক্ষের তরফে এই অপরাধকে আমরা কোনোদিন ক্ষমা করবো না।

ডা. জাফরুল্লাহ করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে তাঁর নিজের প্রতিষ্ঠিত গণস্বাস্থ্য নগর হাপাতালে চিকিৎসাধীন। তাঁর সমাজকর্মী স্ত্রী শিরীন হক ও পুত্র বারিশ চৌধুরীরও করোনা পজিটিভ।

জাফর ভাই, আপনি সুস্থ হয়ে উঠে দাঁড়ান। দেশবাসীর এখন স্বাস্থ্যসেবা খুব, খুব প্রয়োজন। আপনি উঠে দাঁড়ান।

লেখক:
Muzzammil Husain Monju

মোজাম্মেল হোসেন, সাংবাদিক

*প্রকাশিত এ লেখার মতামত এবং বানানরীতি লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাঙালীয়ানার সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকা অস্বাভাবিক নয়। তাই এখানে প্রকাশিত লেখা বা লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা সংক্রান্ত আইনগত বা বানানরীতি বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় বাঙালীয়ানার নেই। – সম্পাদক

মন্তব্য করুন (Comments)

comments

Share.