উপনিবেশিক আগ্রাসন ও গান্ধীর অহিংসা

Comments

সময়টা ১৮৯০, উত্তর আমেরিকায় তখন ইউরোপীয় উপনিবেশের স্বর্ণযুগ। সমস্ত রেড ইন্ডিয়ানদের(নেটিভ আমেরিকান) নির্মূল করে বিশাল সম্পদশালী আমেরিকা মহাদেশ তাদের হাতের মুঠোয়। ব্রিটিশ আর্মির বিরুদ্ধে যুদ্ধরত শেষ ইন্ডিয়ান গোত্রটিকে জড়ো করা হয়েছে পাইন রিজ ইন্ডিয়ান রিজার্ভেশনে। ইউরোপিয়ান উপনিবেশের বিরুদ্ধে দীর্ঘ লড়াই করা সিউ নেতা বিগ ফুট এই দলটির নেতা। প্রবল ঠাণ্ডায় বয়স্ক এই নেতা তখন নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে শয্যাশায়ী। তার নেতৃত্বে রয়েছে মাত্র সাড়ে তিনশ সিউ ইন্ডিয়ান। যাদের ভিতর ২৩০ জনই নারী ও শিশু। একসময় আমেরিকার বিস্তীর্ণ প্রেইরি জুড়ে দাপিয়ে বেড়ানো পরাক্রমশালী ইন্ডিয়ানরা উপনিবেশের ক্রমাগত অত্যাচার, অনাচার, লুন্ঠন আর হত্যার ফলে এখন নিজভূমে বিলুপ্তপ্রায়। তাদের বিরুদ্ধে উপনিবেশের শেষ হত্যাকান্ডটি সংগঠিত হয় এই পাইন রিজ ইন্ডিয়ান রিজার্ভেশনের ‘হাঁটু ভাঙ্গার বাঁকে’ (বর্তমান সাউথ ডাকোটা)। সামান্য ভুল বুঝাবুঝির সূত্র ধরে নিরস্ত্র অসহায় ইন্ডিয়ান নারী পুরুষদের শেষ দলটিকে কামানের মুখে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া হয়। উপনিবেশের এই গণহত্যা মানব সভ্যতার ইতিহাসে কালিমাস্বরূপ। ১৪৯২ সালে কলম্বাসের আমেরিকা আবিস্কারের পর থেকে পরবর্তী ৪০০ বছরে একের পর এক ইন্ডিয়ান গোত্র বিলুপ্ত হয়েছে শ্বেতাঙ্গ উপনিবেশের হাতে। মহান চেরোকি, নাভাহো, চেইনি, অ্যাপাচি, উতে, পউনি, সিউদের মতো একের পর এক প্রবল পরাক্রমশালী গোত্র নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে ইউরোপীয় আগ্রাসনে। এদের এই অন্যায় আগ্রাসন শান্তিপূর্ণভাবে মেনে নেওয়া সম্ভব নয়, তাই অস্ত্রহাতেই লড়েছিলো বীর ইন্ডিয়ানরা।

প্রায় একই সময়ে উপনিবেশিক আফ্রিকাতেও চলছিলো পশ্চিমাদের নির্লজ্জ আগ্রাসন যা এখনও বলবত রয়েছে। আমেরিকা, ভারতের মতো আফ্রিকাও ছিলো ইউরোপীয় দেশগুলির উপনিবেশ। দেখতে কালো এবং আমেরিকান রেড ইন্ডিয়ানদের মতো শিকার ও সংগ্রহবৃত্তিতে অভ্যস্ত পিছিয়ে পড়া আফ্রিকানরাও চরম অত্যাচারের শিকার হয়েছিল দীর্ঘ উপনিবেশিক শাসনে। এদের শোষণে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত আফ্রিকা এখন দুর্ভিক্ষের চারণভূমি। ১৮৯৩ সালে আফ্রিকা ছিলো শ্বেতাঙ্গদের চরম বর্ণবাদের শিকার। এ সময়টায় দক্ষিণ আফ্রিকা ভ্রমণ করছিলেন এক উচ্চবিত্ত ভারতীয়, নাম মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী। পেশায় ছিলেন আইন ব্যবসায়ী, স্বদেশে ভালোই নাম কামিয়েছিলেন এই পেশায়। দক্ষিণ আফ্রিকায় এসে তিনি শিকার হন বর্ণবাদের। তিনি দেখতে পান এখানে অবস্থানকারী ভারতীয়দের প্রতি শেতাঙ্গদের চরম বর্ণবাদী নিপীড়ন। এটা এতোটাই জঘন্য পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছিলো যে ভারতীয় এবং আফ্রিকানদের জন্তু জানোয়ারের চেয়েও জঘন্য আচরণের শিকার হত শেতাঙ্গ প্রভূদের কাছে। এর বিরুদ্ধে প্রবাসেই রুখে দাঁড়ান ভারতীয় ওই ব্যারিস্টার মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী। তিনি চরম বর্ণবাদের শিকার ভারতীয়দের অধিকার আদায়ে বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় লেখালেখি ও সভা সমাবেশের মাধ্যমে অত্যাচারিত প্রবাসী ভারতীয়দের সচেতন করে তোলেন। তার নেতৃত্বে দক্ষিণ আফ্রিকায় গড়ে উঠে ‘নাটাল ইন্ডিয়ান কংগ্রেস’। ১৮৯৬ সালের দিকে ভারতীয়দের যৎসামান্য অধিকার আরও খর্ব করার জন্য নতুন আইন পাশ করে দক্ষিণ আফ্রিকান ঔপনিবেশিকেরা। এর বিরুদ্ধে ভারত এবং দক্ষিণ আফ্রিকা দুই জায়গায়ই দীর্ঘ আন্দোলন গড়ে তোলেন গান্ধী। উনিশ শতকের শুরুর দিকে তার জীবনে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আসে। অহিংসা ও সত্যাগ্রহে অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি অতি সাধারণ জীবন যাপন করতে থাকেন একইসাথে দক্ষিণ আফ্রিকায় ভারতীয়দের অধিকার রক্ষার আন্দোলন চালিয়ে যান। ১৯০৭ সালে ট্রান্সভাল কর্তৃপক্ষ গৃহীত এশিয়াটিক রেজিস্ট্রেশন অ্যাক্টের প্রতিবাদ জানাতে তিনি প্রথমে প্রার্থনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করলেন এবং সরকারের কাছে এই আইন রদ করার আবেদন জানালেন। কিন্তু পরে তিনি বুঝতে পারলেন শুধু প্রার্থনা দিয়ে কাজ হবে না কারণ সরকার একে পাত্তাই দিচ্ছে না। তাই তিনি সূচনা করলেন আন্দোলনের সম্পূর্ণ এক নতুন অধ্যায়। দক্ষিণ আফ্রিকার ভারতীয়দের কাছে তিনি আহ্বান জানালেন, তারা যেন সরকারের এই ‘এশিয়াটিক রেজিস্ট্রেশন অ্যাক্ট’ অমান্য করে এবং পারমিট অফিসের মতো সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর সামনে ধর্ণা দেয় অথবা বিক্ষোভ প্রদর্শন করে। তবে সেই বিক্ষোভ যেন কোনোভাবেই সহিংস না হয়। সরকার গ্রেফতার করলে করবে, তাই বলে হিংসা-মারামারির মতো কোনো পন্থা গ্রহণ করা যাবে না। শুরু হলো মহাত্মা গান্ধীর প্রথম সত্যাগ্রহ আন্দোলন। কারো সঙ্গে মারামারি, হানাহানি নয়। শান্তিপূর্ণভাবে বসে অথবা দাঁড়িয়ে আপন আপন দাবি জানানো। পুলিশ লাঠিপেটা করুক বা গ্রেপ্তার করুক—যা খুশি। গান্ধীর এই আহবানে চরম সাড়া পড়ে ভারতীয়দের মাঝে। আফ্রিকায় তারা নিজের অধিকারের জন্য শান্তিপূর্ণ আন্দোলন শুরু করে। এসময় দক্ষিণ আফ্রিকায় হিন্দু, মুসলিম বা পারসিক রীতির বিয়েকে স্বীকৃতি দিতে অস্বীকার করে আসছিল ঔপনিবেশিক সরকার। এর প্রতিবাদেই হাজার হাজার নারী নেমে আসে রাজপথে। নিউক্যাসল অভিমুখে পদযাত্রা অংশ নেয় হাজার হাজার নারী পুরুষ। অনেকেই গ্রেপ্তার হন কিন্তু রচিত হয় শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের এক নতুন অধ্যায়। অবশেষে দীর্ঘ সাত বছরের লড়াই শেষ হয়, ভারতীয়রা পায় তাদের অধিকার।

একই চিত্র ছিলো ঔপনিবেশিক ভারতেও। জোর করে নীল চাষ, অতিরিক্ত করের বোঝা আর জমিদারদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ ভারতীয় কৃষকরা। চম্পানগর এবং খেদা বিদ্রোহের সূত্রপাত হয়। ১৯১৮ সালে ব্রিটিশদের অন্যায় কর প্রবর্তনের বিরুদ্ধে গান্ধীর নেতৃত্বে গড়ে উঠে আরেকটি সত্যাগ্রহ আন্দোলন। সফলতাও আসে দুর্ভিক্ষ পীড়িত ভারতীয়দের এই ভিন্নধর্মী আন্দোলনে। প্রসঙ্গত, এই সময়টায় সমগ্র ভারতবর্ষই ব্রিটিশ উপনিবেশের বিরুদ্ধে ফুঁসে উঠেছিলো। ভারতে স্বাধিকার আন্দোলন তখন তুঙ্গে। একের পর বিদ্রোহে ফুঁসে উঠছে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষ। ১৯১৯ সালে পাঞ্জাবের জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকান্ডে জনগণ ব্যাপক বিক্ষোভ শুরু করে। কংগ্রেসের অসহযোগ আন্দোলন এবং মুসলিম লীগের খেলাফত আন্দোলনের সমন্বয় ঘটে এ সময়ে। ইংরেজ রাজের ভিত্তি কাঁপিয়ে তোলা ওই আন্দোলন থেকে সত্যাগ্রহ নীতির কারণে সরে যায় কংগ্রেস। কারণ ছিলো চৌরিচৌরায় আন্দোলনের সহিংস হয়ে উঠা। সেখানে বিক্ষুব্ধ জনতা থানায় আগুন লাগিয়ে দেয়। অথচ সার্বিক দিক বিবেচনায় আন্দোলন থেকে পিছিয়ে যাবার অর্থ ছিলো ভারতে ইংরেজ শাসনকে দির্ঘায়িত করা। তাই এই বিতর্কিত সিদ্ধান্তে কংগ্রেস কার্যত দুইভাগে ভাগ হয়ে যায়। আন্দোলনও ব্যর্থ হয়। এতে উপমহাদেশে ইংরেজ শাসন দির্ঘায়িত হলেও স্বাধিকারের প্রশ্নে ভারতের জনগণ আপোষহীন হয়ে উঠে। ভারতে ঔপনিবেশিক শাসনের অন্তিম সময়টাই কেবল পার করছিলো সেসময়।

এর সূত্র ধরেই ১৯৪২ সালের দিকে কংগ্রেস শুরু করে ঐতিহাসিক ভারত ছাড় আন্দোলন। একদিকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, অন্যদিকে ভারতের বিদ্রোহ ইংরেজদের বাধ্য করে ভারত থেকে তাদের শাসন গুটিয়ে নিতে। উল্লেখ্য, ভারত ছাড় আন্দোলন তখন তার সত্যাগ্রহী রূপ ছেড়ে চিরায়ত রুদ্র কালীর বেশেই আঘাত করছিলো ইংরেজ রাজকে। গুজরাট, পাঞ্জাব, আসাম, উত্তর ও পশ্চিম বিহার, উত্তর প্রদেশের পূর্বাঞ্চল, বাংলার মেদিনীপুর জেলা এবং মহারাষ্ট্র, কর্ণাটক ও  উড়িষ্যার বিভিন্ন স্থানে আন্দোলন ছাত্র-জনতার দুর্বার নেতৃত্বে জঙ্গীরূপ ধারণ করে। এই আন্দোলন হয়ে ওঠে দু’শ বছরের ইংরেজ শাসনের বিরুদ্ধে এক ভারতীয় মহাবিদ্রোহ। সফলতাও পায় ভারতীয়রা। আমেরিকান রেড ইন্ডিয়ানদের মতো করুণ পরিণতির হাত থেকেও রক্ষা পায়।

কিন্তু পূর্বে ১৯২৪ সালের দাঙ্গা, নেহেরুর রিপোর্টে মুসলমানদের জন্য আলাদা নির্বাচনের দাবি অগ্রাহ্য ইত্যাদি কারণে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে অসহিষ্ণুতার উদ্ভব হয়। ১৯৪৬ সালে ভারতের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সমঝোতার জন্য মন্ত্রী-মিশন পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয় কিন্তু তা ব্যর্থ হয়। এতে ভারতের রাজনৈতিক পরিস্থিতি অত্যন্ত  উত্তপ্ত হয়ে পরে। ফলে ১৯৪৬ সালের ১৬ই আগস্ট মুসলিম লীগের প্রত্যক্ষ কর্মপন্থা দিবসে কলকাতায় ইতিহাসের এক জঘন্যতম নারকীয় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা সংঘটিত হয়। অসংখ্য মানুষ সেই দাঙ্গায় প্রাণ হারায়। ঘটনা প্রবাহ পর্যবেক্ষণ করে দেখা যায়, ১৯৪০ সালে জিন্নার দ্বিজাতিত্ত্ব এবং কংগ্রেস ও মুসলিম লীগ নেতাদের সাম্প্রদায়িক মনোভাব এই দাঙ্গার পেছনে অন্যতম অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে। এর সূত্র ধরেই শুধুমাত্র ধর্মের ভিত্তিতে ভাগ হয় ভারত। পরিস্থিতি হয়ে উঠে আরও ভয়াবহ। টানা দাঙ্গা, দেশভাগ, দুর্ভিক্ষ প্রভৃতি কারণে হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে অসংখ্য মানুষ নিহত হয়। কেবলমাত্র ৪৭-এর দাঙ্গায়ই মারা যায় পঞ্চাশ হাজারেরও বেশি মানুষ। রাজনৈতিক দলগুলোর সমন্বয়হীনতা এর পিছনের মূল কারণ।

মহান অখণ্ড ভারতবর্ষ কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের সিদ্ধান্তের বলি হয় এই ৪৭ সালেই। ১৫ আগস্ট, ১৯৪৭, ধর্মের ভিত্তিতে দুইটি ভাগে ভাগ হয় ভারত। মুসলমান অধ্যুষিত পাকিস্তান অধিরাজ্য এবং হিন্দু অধ্যুষিত ভারত অধিরাজ্য নামের দুইটি সার্বভৌম রাষ্ট্র গঠিত হয়। বাংলা, আসাম, পাঞ্জাব, কাশ্মীর প্রভৃতি অঞ্চলগুলো অদ্ভুত বিভাজনের শিকার হয়। এক একটি রাজ্য কেবলমাত্র ধর্মের কারণে দুই বা তিন খন্ডে বিভক্ত হয়ে পড়ে। ভারত ভাগের বা সার্বভোমত্বের প্রশ্নে কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের ভূমিকা ছিলো অত্যন্ত গোঁড়া, একপেশে। যার কারণে ভারতের ইতিহাসের এক কলঙ্কময় অধ্যায় সূচিত হয়। আর মহাত্মা গান্ধীর ভূমিকাও হয় প্রশ্নবিদ্ধ।

বর্ণিল জীবনের অধিকারী, বর্তমান ভারতের জাতির পিতা মহাত্মা গান্ধী ১৮৬৯ সালে ২ অক্টোবর, গুজরাটের পোরবন্দরে এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা করমচাঁদ গান্ধী ছিলেন পোরবন্দরের দেওয়ান (প্রধানমন্ত্রী), তার মায়ের নাম পুতলিবা প্রনামী। অসহযোগ আন্দোলনসহ বিভিন্ন আন্দোলন থেকে সত্যাগ্রহ নীতির কারণে পিছিয়ে যাওয়া, দক্ষিণ আফ্রিকায় কেবল ভারতীয় হিন্দুদের অধিকারের আন্দোলনে বঞ্চিত আফ্রিকান কৃষ্ণাঙ্গদের কার্যত অগ্রাহ্য করার কারণে বর্তমানে তার সে সময়ের ভূমিকা নিয়ে অরুন্ধতী রায়, দক্ষিণ আফ্রিকার শিক্ষাবিদ ও লেখক আশ্বিন দেশাই এবং গোলাম বাহেদ প্রভৃতি বুদ্ধিজীবীদের তীব্র সমালোচনা রয়েছে। তা সত্ত্বেও ভারতীয়দের উপনিবেশবিরোধী লড়াইয়ে নেতৃত্বদানকারী এই বরেণ্য তার সাদামাটা জীবন-যাপন সত্যাগ্রহ অহিংস নীতির কারণে বিশ্বজুড়ে অনুসরণীয় হয়ে আছেন।

তথ্যসূত্রঃ Bury My Heart at Wounded Knee, লেখক ডি ব্রাউন; historyworld.net, exhibitions.nypl.org, historyindia.org,

মন্তব্য করুন (Comments)

comments

Share.

About Author

বাঙালীয়ানা স্টাফ করসপন্ডেন্ট