। সেলিনা শেলী।
ক.
এডমন্টন শহরটি অথবা কানাডা এক গ্রাফিতির রাজ্য। কোনো এক রঙের যাদুকর যেনো বিশাল রঙের ঝাঁঝরি উপুড় করে দিয়েছে, আর বেরিয়ে এসেছে অদ্ভুত সুন্দর আদিবাসী নারী-পুরুষ, তাদের জীবনচিত্র, কোথাও গভীর অরণ্যভরা পশুপাখি অথবা পুরাণ কথাচিত্র! কানাডায় পা দিয়েই প্রথম এই ওয়াল পেইন্টিংগুলো আমাকে মুগ্ধ করেছে। আমি শুরু থেকে এগুলোর বিষয়ে জানার চেষ্টা করে যাচ্ছি। আমার চেনাজানা কেউ তেমন কোনো তথ্য দিতে পারেননি। শেষে নেট সার্চ করে এবং সশরীরে গিয়ে কিছু তথ্য জেনেছি। এই গ্রাফিতি শৈলীগুলো নিউ ইয়র্ক এবং ইউরোপীয় স্বাদের একটি শংকর। রঙ স্প্রে করে নানান শিল্পী নানাভাবে তাদের আদি ঐতিহ্য, ইতিহাস, সংস্কৃতি, বর্তমান সময় অথবা অন্য যে কোনো বিষয়কে দেয়ালচিত্রে তুলে ধরেন। এটি পুরো কানাডা-আমেরিকা জুড়ে দেখা যায়। এডমন্টনের সবচেয়ে আইকনিক ইন্টেরিয়র এবং এক্সটেরিয়র ম্যুরালগুলি বাণিজ্যিক সড়কের উঁচু দালানগুলোর সৌন্দর্য বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। আমি বিস্মিত হয়েছি জেনে, যে, এসব গ্রাফিতি বিগত তিন দশকের বেশি সময় ধরে আঁকা হচ্ছে। এখানে গ্রাফিতি শিল্পীরা সম্মানীর বিনিময়ে, কেউ কেউ বিনা সম্মানীতেও এসব শিল্পকর্ম করে থাকেন। তবে প্রতি আগস্ট মাসে ‘রাস্ট ম্যাজিক ইন্টারন্যাশনাল’ নামে একটি সংগঠন নানা দেশের গ্রাফিতি শিল্পীদের দিয়ে ‘ইন্টারন্যাশনাল স্ট্রিট মুরাল ফেস্টিভ্যাল’ নামে বিশাল দেয়াল জুড়ে লাইভ দেয়ালচিত্র আঁকার ব্যবস্থা করে। হয়তো ২০ জন শিল্পী ২০ জায়গায় আঁকা শুরু করেন। শহরের বড়ো বড়ো বাড়ি, অফিস, মল– এরকম যে কোনো স্থাপনার দেয়াল মালিকরা সানন্দে তাদের দেয়ালটি এই শিল্পকর্মে ব্যবহারের জন্য দিয়ে দেন। আগে থেকে ফেসবুকে, অনলাইনে এই ইভেন্টের প্রচার প্রচারণা চলতে থাকে। প্রচুর লোক শহরের যেখানে যেখানে শিল্পীরা আঁকবেন– সেখানে জড়ো হতে থাকে। গান ও মিউজিকের তালে তালে এইসব ম্যুরাল আঁকা উপভোগ করেন দর্শনার্থীরা। লোকজন গাড়ি থামিয়ে, শিশুদের নিয়ে এই বিশাল ম্যুরালের একটু একটু করে পূর্ণাবয়ব হয়ে উঠা দেখে উচ্ছ্বসিত হয়। এটি এখন একটি আন্তর্জাতিক উৎসবে পরিণত হয়েছে।
গত বেশ কিছুদিন ধরে এডমন্টনের নানান সড়ক ধরে হেঁটে অথবা গাড়ি থামিয়ে আমি কিছু স্ট্রিট ম্যুরালের ছবি তুলেছি। এতো বিশাল বড়ো বড়ো বিল্ডিং মোড়ানো ছবি! প্রথমে ভেবেছিলাম এগুলো বোধহয় ছাপানো। সাস্কাচুয়ান নদীর পাড়ের বসার জায়গাটি ছুঁয়ে দেখি– হাতে আঁকা। আমার এপার্টমেন্টের আশেপাশে উঁচু দেয়াল জুড়ে বেশ কটি ছবিও হাতে আঁকা। এর পরই অনুসন্ধান শুরু করি। আর এই কাজটি করতে গিয়ে শহরের নানা রাস্তায় একা একা হেঁটে এখানকার জীবনধারার বহু খুঁটিনাটি বিষয় আমার ভাঁড়ারে জমতে শুরু করেছে।
খ.
কানাডায় এসে আমি মানুষ খুঁজি। আমার মনের রঙ, রেখা, আলোয় যারা ধরা দেবেন তেমন মানুষ। সমস্যা হলো– ভাষা। ইংরেজি বলতে পারলেও বুঝতে পারা ভীষণই কষ্টের! নানান জায়গার মানুষের বিচিত্র উচ্চারণ ধরতে বুঝতে বুঝতে, বক্তা হড়বড়িয়ে পরের এবং তারপরের লাইনে চলে যায়। তবে এখানে ইংরেজি ভাষা না বলতে পারাকে সবাই সহজ বিনয়ের সাথেই গ্রহণ করে এবং নানাভাবে সহযোগিতা করে। আর আপনি যদি কোথাও জব না করা অভিবাসী হয়ে থাকেন– তাহলে বিপদ সবচেয়ে বেশি। যে কোনো কাজ, বিশেষত গ্রোসারি শপ বা ভলেন্টিয়ারিং জাতীয় কাজে নানারকম মানুষের সাথে কথা বলতে হয়। এতে করে যে লাভটা হয়, তা হচ্ছে– বিভিন্ন দেশের মানুষের একই শব্দের বিভিন্ন উচ্চারণ ধরা যায়। এখানে চাইনিজদের উচ্চারণ ভয়ংকর রকম দুর্বোধ্য। এরা মুখের ভেতর শব্দ চেপে রেখে কথা বলে। কোথাও কাজ না করার কারণে তাদের দ্রুত বলা ভাষা ধরে বুঝে জবাব দেয়া আমার পক্ষে কঠিন হয়ে পড়েছে। সারাটি জীবন ছাত্রদের ভাষা, উচ্চারণ শিখিয়েছি। বলেছি– কেনো বাংলা ভাষা অন্য ভাষার চেয়ে সমৃদ্ধ! বলেছি– দেখো, আমাদের ক আছে, খ আছে, ট আছে, ঠ, থ, স, শ এরকম কতো বর্ণ আছে! যে ভাষায় মানুষ যতো বেশি বর্ণ উচ্চারণ করে সেই ভাষা ততো সমৃদ্ধ। কণ্ঠের কতো জায়গা ছুঁয়ে আমরা কতো কতো শব্দ উচ্চারণ করি! কিন্তু অনেক ভাষার মতোন ইংরেজি ততোটা সমৃদ্ধ ভাষা নয়। ওদের th দিয়ে থ, ধ, দ, kh দিয়ে খ, sh দিয়ে শ এভাবে দুটো বর্ণ যোগ করে বহু শব্দ বানাতে হয়। অথচ, আমাদের কতো বেশি বর্ণ– কতো বেশি উচ্চারণ, শব্দভাণ্ডার!
এখানে এসে সেই সহজ ইংরেজি ভাষাটাই দেখছি– ইউক্রেনীয়, চাইনিজ, কঙ্গো, এল সালভাদর, পাঞ্জাবি এরকম জনে জনে আলাদা উচ্চারণ, –বোঝা ভার!
আর একটি বিষয় উপলব্ধি করলাম– যে কোনো ভাষা যতোই জানা থাকুক না কেনো, সেটি বলার চর্চা থাকতে হবে, মুখগহ্বরের পেশীগুলোর জড়তা কাটাতে হবে। এ প্রসঙ্গে সম্রাট আকবরের একটা প্রচলিত গল্প মনে পড়ে গেল। মুঘল সম্রাট আকবর একবার ভাবলেন মানুষ কি করে ভাষা শেখে? বিষয়টি জানার জন্যে তিনি তাঁর পণ্ডিতদের সভা বসালেন। পণ্ডিতরা তাঁকে বোঝাতে চাইলেন যে, মানুষ আখলাতুল মাখলুকাত– তাই ভাষা তাদের ঐশ্বরিকভাবেই প্রাপ্ত। এ ছাড়াও নানা মতামত দিলেন তাঁরা। কিন্তু কোনো পণ্ডিতের উত্তরই আকবরের পছন্দ হলো না। তিনি নিজের যুক্তিতে সব কিছু পরখ করে নিতে পছন্দ করতেন। শেষে আকবর ঠিক করলেন– তিনি নিজেই এ বিষয়টি পরীক্ষা করবেন। সেই লক্ষ্যে তিনি সদ্য জন্ম গ্রহণকারী দুই নবজাতককে নিঃসঙ্গ একটি দ্বীপে পাঠিয়ে দিলেন। সাথে তত্ত্বাবধারক হিসেবে যাদের পাঠানো হলো– তাদের উপর কড়া নির্দেশ ছিলো, শিশুদের সামনে কোনো কথা বলা যাবে না। শিশুরা যেনো কোনোভাবেই ভাষা শুনতে না পায়। অন্যথা হলেই শূলে চড়তে হবে। রাজকর্মচারীরা সেই আজ্ঞা যথাযথভাবে পালনের পর শিশুদের বয়স যখন চার বছর পূর্ণ হলো, আকবর তাদের দরবারে নিয়ে এলেন। দরবারে আনার পর দেখা গেল– তারা কোনো কথাই বলতে পারছে না। আকবর তাদের এবার লোকজনের সাথে কথাবার্তায় সংযুক্ত করে রাখলেন।
দেখা গেল– অল্প দিনেই তারা ভাষা শিখে ফেলেছে।
আসলে ভাষা এভাবেই মানুষের উচ্চারণে-চর্চায় শেখা হয়। একারণেই নানা অঞ্চলের মানুষের নানা ভাষা। মানুষ তার নিজস্ব পরিবেশ ও পরিবার থেকে ভাষা রপ্ত করে। আর তাই বিভিন্নজনের ভাষার ভিন্নতা দেখা যায়। মানুষ জন্ম থেকে যে ভাষাটি শোনে, সেটি দ্রুত শিখে নেয়, সেজন্যে তাকে শিক্ষিত হতে হয় না। এই যেমন আমার বাংলা ভাষাটি একজন অশিক্ষিত বাংলাভাষীও জানেন, কিন্তু একজন পিএইচডি ডিগ্রিধারী ইংরেজিভাষীর সেটি জানতে প্রচুর পড়াশোনা, চর্চা করতে হবে। মূলত ভাষা জানার বিষয়টি নিজস্ব পরিবেশের ওপরই নির্ভরশীল।
হাঁটতে বেরোলে মাঝে মাঝেই আমার বয়সী একজন মিষ্টি নারীর সাথে দেখা হয়। একটু হাসি বিনিময় ছাড়া আমাদের আর কথা হয় না। একদিন আমার প্রাত্যহিক হাঁটা শেষে বিল্ডিংয়ে ঢোকার মুখে এক সুন্দর চেহারার যুবক আমাকে জিগ্যেস করলো– এই জায়গাটি নিরাপদ কিনা? অর্থাৎ এখানে হোমলেস লোকজনের ঝামেলা আছে কিনা? আমি বললাম– কেনো জানতে চাইছো? সে পাশের একটি ভবন দেখিয়ে বললো– ‘ আমি ওখানে বাসা নিতে চাইছি।’
ছেলেটিকে আমার ইরানি বলে মনে হলো। বললাম– আমি তো এলাকায় নতুন, তবে আমার ভবনটি খুবই নিরাপদ, আশেপাশেও ভালোই মনে হচ্ছে। অবশ্য, সিঁড়ির ওপাশে উপরে উঠলে ডাউনটাউনে হোমলেস দেখতে পাই।
একথা বলার পর ছেলেটি ধন্যবাদ দিয়ে চলে গেল।
এখানে হোমলেসদেরকে সরকার ধরে নিয়ে শেল্টারে খাবার ও উষ্ণতা দিয়েও রাখতে পারে না। তারা স্বাধীন এবং প্রায়শই নেশাগ্রস্ত জীবন পছন্দ করে। ছেলেটি চলে যাবার পর চাবি দিয়ে আমার ভবনের দরোজা খুলতে গেছি– দেখি কাছেই প্রতিদিনের হাঁটায় দেখা পাওয়া নারীটি আমাকে ‘হাই’ বলে ডাক দিচ্ছে। আমি এগিয়ে গেলাম। সে সান্দ্রা। নিচে বসে তার সাথে আলাপ জমে গেল। ফোন নাম্বার বিনিময় হলো। সান্দ্রা এল সালভাদর থেকে এখানে বিশ বছর আগে এসেছে। আমার চেয়ে তিন বছর বড়ো। তার দুই ছেলে-মেয়ে একটু দূরে থাকে। সে একা থাকে। ফ্লুয়েন্টলি ইংরেজি বলতে পারে না। আমাকে অবাক করে দিয়ে সে বললো– সেও ভালো ইংরেজি বলতে পারে না। কারণ, বিশ বছর সে কোনো জবই করেনি। হাউজ ওয়াইফ ছিলো। তূর্য ছিলো বলে প্রথম দিনেই আমি তাকে বাসায় নিয়ে এলাম। আপ্যায়নে মুগ্ধ সান্দ্রা আমার বন্ধু হয়ে গেল। সে খুব বেশি লেখাপড়া করেনি। তার স্বামী তাকে ছেড়ে চলে গেছে বহু বছর আগে। ভীষণ উজ্জ্বল সুন্দর মুখের সান্দ্রা একথা বলার সময় তার মুখ ম্লান হয়ে এলো।
এই ঘটনাটি বলার কারণ হচ্ছে– বিশ বছর হাউজ ওয়াইফ থেকে সান্দ্রা যে মানুষের সাথে না মেশার ফলে ভালো ইংরেজি বলাটা এখনও রপ্ত করতে পারেনি, তার কারণ ওই পরিবেশ আর চর্চা– এটাই বোঝানো।
গ.
গতবছর এখানে এক ‘মিউজিক্যাল নাইট’ অনুষ্ঠানে গেছি, সবার জন্যে উন্মুক্ত। এতো লোক জড়ো হয়েছে যে বসার জায়গাও নেই। রাস্তার ধারে শত শত গাড়ি দাঁড়ানো। অনেকেই বাইরে এসে নিজের গাড়িতে হেলান দিয়ে অনুষ্ঠান উপভোগ করছেন। খোলা মাঠে লেবানিজ গান চলছে। কিছু বুঝতে না পারলেও এক ধরণের জিপসি সুর আর বাদ্য আমাকে আকুল করে তুলেছে। আমি একা হাঁটতে বেরিয়ে গানের আওয়াজ শুনে এসে দাঁড়িয়েছি। কিছুক্ষণ পর এক ভদ্রলোক আমাকে তার গাড়িতে হেলান দিয়ে দাঁড়াতে অনুরোধ করলেন। সাগ্রহে সম্মতি জানালাম। কারণ আমার পায়ের ওপর চাপ কমলো। ভদ্রলোক লেবানিজ, নাম মরিস। জিগ্যেস করলেন– কোত্থেকে এসেছি আমি। বাংলাদেশ বলার পর উনি ভালো চিনতে পারলেন না। বললাম, এটা সাউথ এশিয়ান দেশ, এক সময় ভারতের অন্তর্ভুক্ত ছিলো, এখন স্বাধীন, ভারতের পাশেই। মুহূর্তে মরিস চিনে ফেললেন। গানের ফাঁকে ফাঁকে বললেন– ‘ওটা তো সুরের দেশ! গানের দেশ! কী বিস্ময়কর তোমাদের গান, মিউজিক! কী তার বৈচিত্র্য!’ শুনে আমার মন ভরে গেল। তারপর তিনি আমাকে অবাক করে দিয়ে যে প্রশ্নটি করলেন, তা হচ্ছে– ‘প্রায় সারা পৃথিবীর মানুষ দাঁড়িয়ে গান করেন, তাতে তারা দম পান বেশি, কিন্তু বাঙালি কীভাবে বসে বসে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ক্লাসিক্যাল সুরে গান করেন! কী সেই বিদ্যা বা জাদু?’
আমাদের কথা গানের বিপুল আওয়াজে হারিয়ে যাচ্ছিলো। হঠাৎ পাশের আরেকজন বলে উঠলেন– ‘নিশ্চয়ই তাঁদের বসার একটি বিশেষ ভঙ্গি আছে, যা তাঁদের অনায়াস করে তোলে। শ্বাসের সমস্যা হয় না।’ আমি বললাম– হতে পারে। এরপর মরিস আমাকে দুটো খাবারের টোকেন দিয়ে তার সাথে গির্জার ভেতরে যেতে অনুরোধ করলেন। প্রচুর মানুষ ভেতরে যাচ্ছে, হাতে খাবার নিয়ে বের হচ্ছে, বাইরে এসে খাচ্ছে। আমি ধন্যবাদসহ অসম্মতি জানানোতে মরিস আরও চেপে ধরলেন। শেষে পছন্দ মতোন চিকেন ফ্রাই, চিকেন শর্মা কিনে বাইরে এলাম। সেগুলোর পরিমাণ এতোটা বেশি যে মরিসকে বললাম– আমার কোনো ব্যাগ নেই, বক্সগুলো হাতে ধরে রাখা কষ্টকর। কাজেই বাসায় চলে যাচ্ছি, ছেলের সাথে ডিনারে খাবো। মরিস খুশি হলো। এদিকে তুমুল গান, সাথে দর্শকদের নাচ চলছে। পুরো রোববার রাতটি যেনো বাতাসে ভেসে চলেছে সুরের তালে। লেবানিজ তরুণ শিল্পী একের পর এক গেয়েই চলেছেন, মাঝে মাঝে কয়েকজন তরুণী তার সাথে কোরাসে গলা মেলাচ্ছেন। যেতে যেতে ভাবছিলাম– পৃথিবীর এতো যে মানুষ, এতো যে ভাষা– তবু সুর, তাল লয়, কান্না, হাসি, বেদনা, আনন্দের বুঝি কোনো ভেদ নেই, ভিন্ন কোনো ভাষা নেই! মানুষ তবে কী অন্তর্গতে একই তারে বাঁধা?
মরিসের সঙ্গ ভালো লেগেছিলো। কিন্তু তার সাথে আর যোগাযোগ হলো না। তার কোনো ঠিকানা বা ফোন নাম্বারও রাখিনি। তবু মাঝে মাঝেই মরিসের সৌহার্দ্যের উষ্ণতাটুকু মনে পড়ে যায়।
ঘ.
বড়দিনের এই আলো ঝলমলে শহরে আমি হেঁটে চলেছি। একা। আমার কোনো বন্ধু নেই। নিজেই নিজের বন্ধু হয়ে হাত ধরে আছি। চাদ্দিকের বিপুল আলোরাশি তুষার ঠিকরে পুরো শহরকে আলোকে আলোকে প্রিজমায়িত করে তুলেছে। গ্রিক ও রোমান সভ্যতায় তুষারমথিত আত্মহত্যার কথা পড়েছি। তুষারের ভেতর সুউচ্চ কোনো পাহাড় চূড়ায়, উপত্যকায়, বনে– কোনো কোনো মৃত্যুকাঙ্ক্ষী মানুষ নিজেকে ছুঁড়ে দিতো তুষারের হিম শীতলতায়। মৃত্যু তার শরীরের সব তাপ শুষে খেয়ে নিতো। জীবনবিতৃষ্ণ মানুষের যুগে যুগে আত্মহননের কতো রকমফের! অগ্নি, জল, তুষার, পাহাড়, ফাঁসের দড়ি, বিষের কৌটো, গুলি, চাকু আরও কতো কী! ভাবি– আত্মহননকারী ঠিক কীভাবে চলে যাবেন, কোন পথ তার জন্যে জুৎসই বা আরামদায়ক, সেটি নিয়েও তাকে নিশ্চয়ই বেশ ভাবতে হয়। এই আত্মহননের পরিসংখ্যানও সব দেশ সঠিকভাবে দেখায় না। গোপন করে। কোরিয়ায় আত্মহত্যার সংখ্যা কম নয়। তবু তারা সেটি কঠিনভাবে গোপন রাখে। এই কিছুদিন আগেও অক্টোবরে লেখক মনোরোগী বেইকের আত্মহত্যা তারা গোপন করেছে। তুষারপ্রান্তরে হেঁটে হেঁটে এইসব ভেবে চলেছি। মৃত্যুর চোখে চোখ রেখে থার্মাল আন্ডার ওয়্যার পরে, হাত মাথা ঢেকে হেঁটে চলেছি– মৃত্যুর বিপরীতে। কোথাও একটি পাখির ডানার ঝাপট বরফামোড়া কনিফেরাস গাছ থেকে থোকা থোকা বরফ ছুঁড়ে দিচ্ছে। আকাশ চিতই পিঠার মতো থম ধরে আছে। আমার কোনো গন্তব্য নেই। আমি হাঁটি। ভেতরে পাড় ভাঙে। কতোগুলো উন্মত্ত হিংস্র হাত ভেঙে চলেছে বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য! কী ভীষণ এক কাকতাল! গত বছরই ২০২৪ এ ছিলো কমরেড লেনিনের মৃত্যু শতবার্ষিকী! সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে পড়ার পর পরই ভেঙে ফেলা হয়েছিলো শেভচেনকো বুলেভার্ডের লেনিনের বিশাল এগারো ফুট উঁচু লাল গ্রানাইটের মূর্তি, এভাবে সারা রাশিয়ায়। লেনিন অবশ্য তাঁর মূর্তি বানাবার বিষয়ে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিলেন। তবুও– গড়ে উঠতে থাকে একের পর এক মূর্তি! আদর্শ ছাপিয়ে লোক দেখানো ভক্তির প্রাবল্যে একসময় ভেসে যায় সোভিয়েত ইউনিয়ন। নব্বইয়ের দশকে তরুণ প্রজন্মের লেনিনের মূর্তি ভাঙাও ছড়িয়ে পড়েছিলো পৃথিবীর সর্বত্র এমন কী আমাদের ভারতবর্ষেও। তারাও নতুন বিপ্লবের ডাক দিয়েই শাবল-কুড়ালে, হাতুড়ি-বাটালে ভেঙে চুর চুর করেছিলো লেনিনের মূর্তি– মূলত মূর্তির পেছনের আদর্শকে।
আরও বহু বছর আগে আরবে যেমন নবি ইব্রাহিম ভেঙেছিলেন মুশরিকদের মূর্তিগুলো। এ এক চিরন্তন খেলা। আফগানিস্তানের বামিয়ান উপত্যকায় পাহাড়ের খাঁজে ২০০১ সালে প্রায় ১৫০০ বছরের পুরোনো বিশাল বিস্ময়কর বিশ্ব ঐতিহ্যের নিদর্শন মহামতি গৌতম বুদ্ধের মূর্তি দুটো ধ্বংস করে দেয় তালেবানী প্রশাসন। বিশ্ব ঐতিহ্যের এই বেদনাদায়ক ক্ষতি আমাকে আজও মুহ্যমান করে রাখে! এখানে এই এডমন্টনে, শহরের অলিতে-গলিতে মূর্তির বাহার। বাংলাদেশের মসজিদের মতো এখানেও পাড়ায় পাড়ায় গির্জা, আর প্রতিটি গির্জার ভেতরে-বাইরে ক্রুশবিদ্ধ রক্তাক্ত যিশু। যিশু কী শুনতে পাচ্ছেন– ফিলিস্তিনের কান্না? বিশ্বব্যাপী হত্যার নায়ক জুডাসদের যিশু কি ক্ষমা করবেন? গির্জার ভেতর থেকে প্রার্থনার সুরে সুরে, কান্নার বাষ্পে কতো মানুষ কতো যে আবেদন করে হেলানো ক্রুশ গাঁথা নতমস্তক যিশুকে! সেইসব গোপন নিবেদন-কথা যিশুকে ছুঁয়ে ছুঁয়ে ভেসে যায় দূর নীলক্ষায়।
লেখক:
সেলিনা শেলী
কবি, প্রাবন্ধিক, গল্পকার,
অধ্যক্ষ, চট্টগ্রাম বন্দর মহিলা কলেজ