একদিন স্বপ্নের ভোর আসবেই । সাগর লোহানী

Comments

‘‘ভারতে একদিন সমাজতন্ত্র আসবেই, এমন বিশ্বাস জীবনের শেষদিন পর্যন্ত করতেন কাইফি আজমি। তবে তাঁর জীবনে ‘সমাজতন্ত্রী ভারত’ দেখে যেতে না পারলেও তিনি ছিলেন চূড়ান্ত আশাবাদী। তাঁর অভিধানে ‘পরাজয়’ বলে কোনও শব্দ ছিল না।’’

কয়েক বছর আগে দিল্লিতে, বাবার কবিতার অনুবাদ বই প্রকাশের অনুষ্ঠানে স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে এমন কথাই শুনিয়েছিলেন শাবানা আজমি। বইটির শিরোনাম, ‘কাইফি আজমি: পোয়েমস: নাজমস: নিউ অ্যান্ড সিলেকটেড ট্রান্সলেশন।’ দেবনাগরিতে ছাপা বইটি উর্দু কবিতার ইংরেজি অনুবাদ।

মানুষের কথাই ফুটে উঠত তাঁর কবিতায়। শাবানা সেই কথা বলতে গিয়ে জানালেন, ‘‘সমাজের দুর্বলতর অংশের মানুষের জীবন যন্ত্রণা এবং তাঁদের ক্ষমতায়ন নিয়েই কাজ করেছেন, লিখেছেন বাবা। জীবনে বহু সময় তিনি যেমন পেরিয়েছেন, তেমন কখনও ভেঙে পড়তে দেখিনি। কখনও বিশ্বাস হারাতে দেখিনি। আমার মনে হয়, এটাই ছিল তাঁর অন্যতম শক্তি। আমারও বাবার মতো মনে হয়, কোনও শিল্পীরই জীবনে পরাজয় বলে কোনও শব্দ থাকা উচিত নয়। শিল্পীর পরাজয় মানে সমাজের পরাজয়। কারণ একজন শিল্পীই মানুষের মধ্যে আশার বীজ ছড়িয়ে দিতে পারে।’’

kaifi_azmi02

কর্মে নিমগ্ন কাইফি আজমি

তিনি বলতেন, আমি পরাধীন ভারতে জন্মেছি। বেড়ে উঠেছি স্বাধীন ভারতে। আর মারা যাব সমাজতান্ত্রিক ভারতে।”

কবি, সাহিত্যিক হিসেবে সুখ্যাত কাইফি আজমি জন্মগ্রহণ করেন ১৯১৯ সালের ১৪ জানুয়ারী ভারতের উত্তর প্রদেশের আজমগড়ে এক জমিদার পরিবারে। আজমগড়ে জন্ম নেয়ার কারণে কাইফির সঙ্গে ‘আজমি’ উপাধি জুড়ে দেয়া হয়।  তাঁর নাম সৈয়দ আতাহার হোসেন রিজভী। কিন্তু তিনি কাইফী আজমী হিসেবেই সুপরিচিত।

বাড়ি থেকে তাঁকে পাঠানো হল লক্ষৌ এর মাদ্রাসায়। কিছুদিনের মধ্যেই সেখানে ছাত্রদের নিয়ে দল তৈরী করে প্রতিবাদে সরব হলেন সেই প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে। বহিষ্কার করা হল তাঁকে সেই প্রতিষ্ঠান থেকে।

জমিদার পরিবারে জন্ম হলেও নিজেকে মনেপ্রাণে ‘কিষাণ’ ভাবতেন। কমিউনিস্ট পার্টির মেম্বারশিপ কার্ড, কিছু ফাউন্টেন পেন। এই ছিল তাঁর সম্পদ। কলমের প্রতি ছিল ভীষণ ভালবাসা ।

মাত্র ১১ বছর বয়সে তিনি ‘ইতনা তো জিন্দেগি মে’ গজলটি লেখেন। সেই সময়ে কবিদের এক ‘মুশারিয়ায়’ (কবিদের আড্ডা ও প্রতিযোগিতা) গজল পরিবেশন করার পরে অনেকেই সন্দেহ পোষণ করেন এই গজলগুলো তার নয়। তারা কিছু শব্দ দিয়ে তাকে গজল লিখতে বলেন। তিনি লিখলেন এবং সেই গজলটিই পরবর্তীতে অবিভক্ত ভারতে একটি ‘রাগ’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে সেই গজল বেগম আখতারের কণ্ঠে সুরের মূর্ছনা ছড়ালো।

kaifi azmi

স্ত্রী ও কন্যার সাথে কাইফি আজমি

ছাত্রজীবনে উর্দু ও ফার্সি সাহিত্যে লেখাপড়া করেন। ১৯ বছর বয়সে যোগ দেন কমিউনিস্ট পার্টিতে। ১৯৪২ সালে ভারত ছাড় আন্দোলনের সময় তিনি পড়ালেখা ছেড়ে দিয়ে সার্বক্ষণিক মার্কসবাদী হিসেবে কাজ শুরু করেন এবং ভারতীয় কম্যুনিস্ট পার্টির সদস্যভুক্ত হন। ১৯৪৩ সালে আজমগড় ছেড়ে বোম্বে চলে যান। এ সময় তিনি আলী সরদার জাফরি সম্পাদিত পার্টির মুখপত্র ‘কওমী জং’-এ যোগ দেন। অচিরেই কবি হিসেবে তাঁর স্বীকৃতি মিলতে থাকে। সেসময়ে তিনি প্রগতিশীল লেখক আন্দোলনের সাথে যুক্ত হন।

তাঁর প্রথম কবিতার বই ‘ঝংকার’ ১৯৪৩ সালে প্রকাশিত হয়। গ্রন্থের মধ্যে আখির-ই-সাব, শারমায়া, আওয়ারা সাজদে, কৈফিয়াত, নঈ গুলিস্তাঁ প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। নারী অধিকারের পক্ষে ও ধর্মীয় উগ্রতার বিরুদ্ধে লিখেছেন। লিখেছেন শ্রেণীবিভেদের বিরুদ্ধে ও সামাজিক সচেতনতায় অসংখ্য কবিতা। তিনি মনে করতেন, কবিতা সমাজ পরিবর্তনে বাদ্যযন্ত্রের মতো ব্যবহার হওয়া উচিত।  তাঁর বিখ্যাত লেখাগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ‘আউরত’, ‘মাকান’, ‘দাইরা’, ‘বাহুরুপনি’ ইত্যাদি।

১৯৫২ সালে শহীদ লতিফের চলচ্চিত্র ‘বুঝদিল’ -এ গান লেখার মাধ্যমে চলচ্চিত্রে গীতিকার হিসেবে কাজ শুরু করেন। ১৯৬২ সালের ভারত-চীন যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে পরিচালক চেতন আনন্দের ‘হকিকত’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে তিনি চলচ্চিত্রে সুপরিচিত হন। বলিউডের সাড়া জাগানো ৮০টি ছায়াছবির জন্য ২৪০টি গান লিখেছেন তিনি। তাঁর গান আছে এমন উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রের মধ্যে আছে—‘শামা’, ‘কাগজ কি ফুল’, ‘শোলা অর শবনম’, ‘অনুপমা’, ‘আখেরি খত’, ‘হাকিকত’, ‘আর্থ’ ইত্যাদি। এছাড়াও এএমএস সাথ্যু এর পরিচালনায় ‘গরম হাওয়া’ চলচ্চিত্রটির কাহিনী ও চিত্রনাট্য তৈরী করেন। ভারত ভাগ ও তার পরবর্তী অবস্থার ওপর নির্মিত এই চলচ্চিত্রটি ১৯৭৪ এ মুক্তি পায়। তিনি অবশ্য ছবির সংলাপও লিখেছিলেন। চেতন আনন্দের ছবি ‘হির রানঝা’র সব সংলাপ কবিতায় লিখে ইতিহাস গড়েছিলেন তিনি।

Shabana_Kaifi ASzmi

কন্যার সাথে

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় কাইফি আজমি একজন প্রথিতযশা কবি ও সিনেমা ব্যক্তিত্ব ছিলেন। ১৯৭১ সালে বাঙালীর উপর পাকিস্তানী নির্যাতন কাইফি আজমিকে ব্যথিত করে। তিনি কবিতার মাধ্যমে তাঁর অনুভূতি তুলে ধরেন। কবিতা লিখে ও পাঠ করে তিনি বাঙালীর মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত গঠনে সাহায্য করেন। ১৯৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধে বিভিন্নভাবে সহায়তা ও অবদান রাখার স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ সরকারের তরফ থেকে ২০১২ সালে তাঁকে ‘মুক্তিযুদ্ধে মৈত্রী সম্মাননা’ দেয়া হয়।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকালে এর সমর্থনে কাইফি আজমির অসাধারণ উর্দু কবিতার একটি ‘শিরোনাম বাংলাদেশ’ –

শুধু তো একটি দেশ নই যে জ্বালিয়ে দেবে
প্রাচীর তো নই একেবারে ভেঙে ফেলবে
সীমান্ত নই যে মুছে ফেলবে পুরোপুরি।
টেবিলে সারা জাহানের যেই তুমি বিছিয়ে রেখেছ পুরনো নকশা,
যেখানে অর্থহীন কিছু রেখা ছাড়া আর কিছু নাই।
তুমি আমাকে কোথায় খুঁজছ সেই মানচিত্রে।
আমি তো পাগলপারা মানুষের মনে এক দারুণ বাসনা।
দুর্জয় দলিতের স্বপ্ন
লুণ্ঠন যখন সকল সীমা ছাড়িয়ে যায়
অত্যাচার যখন সহ্য অতিক্রম করে
তখন হঠাৎ কোনও এক কোণে আমি দৃশ্যমান হই
কোনো একটি হৃদয় থেকে উৎসারিত হই।

এর আগেও তুমি দেখেছ আমাকে
প্রাচ্যে নতুবা কখন পাশ্চাত্যে
শহরে অথবা কোন গ্রামে
বস্তিতে নতুবা কোনো জঙ্গলে দেখে থাকবে
যার কোনও ভৌগোলিক সীমারেখা নেই
ইতিহাস তো একটি এমন বিষয়
যা থেকে কেউ শিক্ষা নেয় না
আড়ালে মানুষ বসে থাকে ঠিকই
আমি বিজয়ী মাঝে মাঝে হয়েছি পরাজিত
হত্যাকারীদের ফাঁসিতে চড়িয়েছি
আবার কখনও নিজেই শূলে চড়েছি
শুধু এইটুকু পার্থক্য
ঘাতকেরা যেই হোক অবশ্যই মারা পড়বে
আমি মরতে পারি না, আমার মৃত্যু নেই
তুমি কতই নির্বোধ
খয়রাতে সংগৃহীত ট্যাংক নিয়ে আমার দিকে ছুটে আসছো
দিনরাত অবিরাম নাপাম বোমা নিক্ষেপ করছ
দেখো একদিন তুমি ক্লান্ত হয়ে পড়বে
আমার কোনও হাতে শৃঙ্খল পরাবে তুমি
আমার হাত তো আছে সাত কোটি
ঘাড় থেকে কয়টি মাথা বিচ্ছিন্ন করবে।

১৯৭৩ সালে প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ ‘আওয়ারা সেজদে’। এই কাব্যগ্রন্থের জন্য ১৯৮০ সালে তিনি ভারতীয় সাহিত্য একাডেমি পুরস্কার লাভ করেন। তাঁর পাওয়া বহু পুরস্কারের মাঝে ভারতের সর্বোচ্চ বেসামরিক পদক পদ্মশ্রী, আফ্রো-এশীয় রাইটার্স লোটাস পুরস্কার, সোভিয়েতল্যান্ড পুরস্কার এবং মহারাষ্ট্র গৌরব পুরস্কার উল্লেখযোগ্য। ১৯৭৫ খ্রিস্টাব্দে ‘আওয়ারা সাজদে’ কাব্যগ্রন্থের জন্য লাভ করেন সাহিত্য একাডেমি পুরস্কার। এছাড়া তাঁকে ২০০২ খ্রিস্টাব্দে সাহিত্য একাডেমি ফেলোশিপ (২০০২) প্রদান করা হয়। এর আগে তিনি বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক সাম্মানিক ডক্টরেট ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দে তিনি শওকাত আজমিকে বিয়ে করেন। খ্যাতিমান চিত্রাভিনেত্রী শাবানা আজমি কাইফি আজমির কন্যা। তাঁর পুত্র বাবা আজমি একজন চিত্রগ্রাহক।

কাইফি আজমি ২০০২ সালের ১০ মে ৮৩ বছর বয়সে মুম্বাইতে শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

লেখক: সাগর লোহানী, সম্পাদক, বাঙালীয়ানা

মন্তব্য করুন (Comments)

comments

Share.