একাত্তর–ফিরে দেখা – পর্ব ০১

Comments

। শাহ সাঈদ কামাল ।

শুরুটা যেভাবে ~ 

মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ের কথা লিখতে গিয়ে যার কথা মনে পড়ে তিনি হলেন প্রয়াত জাতীয় অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাক। সম্পর্কে আমার চাচাশ্বশুর। উনার উপস্থিতিতে সবসময়েই একটু অস্বস্তি অনুভব করতাম, কখন না জানি জ্ঞানতত্ত্ব নিয়ে আলাপ করতে বসেন। সুখের বিষয় তিনি যার সাথে আলাপ করতেন তার বিষয়ের ওপরই আলোচনা করতেন। আর সবার মতো মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে ছিলো তার বিরাট দুর্বলতা। আমি মুক্তিযোদ্ধা, তাই আমার সাথে এ বিষয়েই বেশি আলাপ করতেন। সে সময়ের আমার ছোটোখাটো যেসব অভিজ্ঞতা তা শুনে প্রায়ই ওনার স্বভাবসিদ্ধ স্থানীয় ভাষায় বলতেন “বাবা, এইগুলা তোমাগো একটু লেইখা রাখনের দরকার, না অইলে ভবিষ্যৎ ছেলেপুলারা জানবো কেমনে?” অথচ তিনি নিজে কিন্তু লেখালেখিতে তেমন উৎসাহী ছিলেন না। সেদিক থেকে আমরা নিজেদের বঞ্চিতই ভাববো। লিখতে গিয়ে তাই উনার কথাই মনে পড়ছে। কিছুদিন আগে (ডিসেম্বর, ২০০৮)। আমি ঢাকা ক্লাবের মাসিক ম্যাগাজিন ‘Ramna Green’ এ লিখেছিলাম। সেই সূত্র ধরেই আমার এ লেখা হয়ে উঠলো।

প্রথমত ৩৭/৩৮ বছরের স্মৃতির দুর্বলতা স্বীকার, সেইসাথে নিজের ভেতরের দায়বোধ, দ্বিতীয়তঃ নতুন ধরনের এক কর্মকাণ্ড, তদুপরি তৃতীয় এবং সম্ভবত প্রধান কারণ এই যে– লেখালেখিতে আমার প্রচন্ড সীমাবদ্ধতা। এইসব দীর্ঘ কারণের সারিকে পাশ কাটিয়ে তবু প্রায়ই সময় করে লিখতে বসতে শুরু করলাম। মূলত দুটি কারণে, এক– নতুন প্রজম্মকে বাংলাদেশ জন্মের ইতিহাস জানানো। দুই– বাংলাদেশ, তথা বাঙালি জাতি একটা মহাসংকটময় সময় পার করছে; স্বাধীনাতার অনেক পরে হলেও যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবি সোচ্চার হয়েছে, এই প্রেক্ষাপট ঘিরে দেশে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ ও বিপক্ষ শক্তির সুস্পষ্ট অবস্থানগুলো ফুটে উঠেছে। মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষ ও বিপক্ষ শক্তির পরিচয় এই সংকটকালে প্রকট হয়ে উঠছে। অতএব কোনো দিব্যদৃষ্টি নয় অতীতের বাস্তবচিত্রগুলো দেখানোর দায়টা আমি উপলব্ধি করলাম; তাই সঙ্গত কারণেই প্রয়াস নিলাম, সেই দিনগুলিতে নিজের দেখা ঘটনাগুলো তুলে ধরার।

একাত্তরে আমার বয়স ১৭-১৮র মাঝামাঝি, সব সম্ভবের এক বয়স। মোমেনশাহী, বর্তমানে মির্জাপুর ক্যাডেট কলেজের এইচএসসি প্রথম বছরের ছাত্র। মুক্তিযুদ্ধের এই কয়েক মাসে ছোটো-বড়ো অনেক অভিজ্ঞতাই হয়েছে, তবে এই লেখায় যে ঘটনাগুলি তুলে ধরবো, তা সরাসরি কোনো যুদ্ধের ঘটনা নয়, যুদ্ধের পেছনের ঘটনা, সে সময়ের বাঙালির অনুভূতির ঘটনা, আবেগের ঘটনা। আমি নিজে একটু আবেগপ্রবণ মানুষ। ঘটনাগুলি আমাকে তখন যেমন নাড়া দিয়েছিলো, আজো তেমনি দেয়। মনে হতো এতো মনের জোর, এতো সাহস, এতো দেশপ্রেম যে জাতির, সে জাতির স্বাধীনতা শুধু সময়ের ব্যাপার মাত্র।

মেলাঘর হয়ে সীমান্ত পথে ~ 

ট্রেনিং নিয়ে ফিরছি, ট্রেনিং হয়েছে বিহারের চাকুলিয়া ক্যাম্পে সি-ইন-সি স্পেশাল-এর দ্বিতীয় ব্যাচে। আমি ঢাকার ছেলে, তাই ঢাকার আশেপাশে যুদ্ধ করার ইচ্ছা। কোলকাতা থেকে ট্রেনে আসাম, তারপর আগরতলায় ২ নম্বর সেক্টরের সদর দপ্তর মেলাঘরে উপস্থিত হলাম। সেক্টর কমান্ডার মেজর খালেদ মোশাররফ যুদ্ধে আহত, আমাদের যোগাযোগ ক্যাপ্টেন হায়দার, আমাদের হায়দার ভাইয়ের সাথে। চমৎকার এক মানুষ। ক্যাডেট কলেজে ক্যাপ্টেন পদবীর অফিসাররা আমাদের এডজুটেন্ট হতেন। ওনাদের দূরের মানুষ মনে হতো, কিন্তু হায়দার ভাইকে সে রকম কখনো মনে হয়নি। কী করলে এই অতি সাধারণ যোদ্ধাদের ভালো হবে, স্বল্প ট্রেনিংপ্রাপ্ত, এই যোদ্ধাদের অস্ত্রের যোগান হবে এবং নির্বিঘ্নে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করানো যাবে, সেই চিন্তায় হায়দার ভাই মগ্ন। অথচ সদা সপ্রতিভ, অমায়িক কিন্তু কাজের বেলায় কঠোর (এমন মানুষের অপমৃত্যু আমরা কতো সহজভাবে মেনে নিলাম)। বলে রাখা ভালো, আমার দেখা মুক্তিযোদ্ধারা শতকরা ৯০-৯৫ ভাগ গ্রামের অতি সাধারণ ছেলে। এই সব ছেলেদের নিয়েই একটি দল গঠন করতে হবে, তারপর অস্ত্রের যোগান এবং বাংলাদেশে প্রবেশ। এই কাজে আমি সাথে পেলাম– একই সাথে ট্রেনিংপ্রাপ্ত আব্বাস ভাই (তৎকালীন ঢাকা কলেজের ভিপি ও ছাত্রলীগ নেতা), আঙ্গুর ভাই ও ফেলু ভাইকে। আব্বাস ভাই কমান্ডার, আমি টুআইসি অর্থাৎ উপ-অধিনায়ক। ৩০-৩৫ জনের দল গঠন সমাপ্ত, এখন অপেক্ষা অস্ত্রের। কিছুটা দেরি হচ্ছে, ২-৪ দিনের অবসর। 

আব্বাস ভাই একদিন বললেন, ‘চল আগরতলা শহর ঘুরে আসি’। ঘুরতে যাব বললেই তো আর যাওয়া যায় না, দুরু দুরু বুকে হায়দার ভাইয়ের কাছে আবেদন এবং আশ্চর্যজনকভাবে সাথে সাথে অনুমোদন। মেলাঘর থেকে বাসে আগরতলায়, আমি ও আব্বাস ভাই। ছাত্রলীগ কর্মী হিসেবে আব্বাস ভাইয়ের রাজনৈতিক যোগাযোগ ভালো, তখনকার নামি-দামি নেতাদের ভাই বলে ডাকেন, অমি অবাক হই। যাদের দূর থেকে নাম শুনেছি, তারা কতো কাছের। আগরতলার রাস্তায় হঠাৎ তখনকার তুখোর ছাত্রনেতা আব্দুল কুদ্দুছ মাখনের সাথে দেখা, আব্বাস ভাইয়ের সাথে ভালো পরিচয়। আমরা তিনজন আগরতলার স্বল্প পরিসর রাস্তায় হাঁটছি, নিজেকে কেমন জানি বেশ কেউকেটা মনে হচ্ছে। একেই তো সদ্য ট্রেনিংপ্রাপ্ত তার ওপর বিখ্যাত ছাত্রনেতার পাশে হাঁটছি, মনে হচ্ছিল সবাই বোধহয় বুঝতে পারছে যে আমরা অস্ত্র, বিস্ফোরক, মাইন ইত্যাদিতে দক্ষ। রাস্তায় শরণার্থী ও যুব শিবিরের ছেলেদের বেশ ভিড়।

এমন সময় কোত্থেকে ৫৫/৬০ বছরের এক বৃদ্ধের আগমন, সরাসরি আমাদের তিন জনের সামনে। সম্ভবত জানতে পেরেছে ছাত্রনেতাদের পরিচয়। তার আকুতি, “আমারে একটা ট্রেনিং এর ব্যবস্থা কইরা দে”। ট্রেনিং পাবার ব্যাপারটা যতো সহজ মনে হতো, ততো সহজ ছিল না। আগস্ট-সেপ্টেম্বরে যুবশিবিরগুলিতে ছেলে-যুবাদের প্রচন্ড ভিড়। বিপরীতে ছিল ট্রেনিং ক্যাম্পের স্বল্পতা। অতএব বৃদ্ধের ধারণা ক্ষমতাবান ছাত্র নেতারাই পারবে তার ট্রেনিং এর ব্যবস্থা করতে। তার আকুতিতে আমরা বেশ আগ্রহী হয়ে উঠি। আমাদের প্রশ্ন– বাবা এ বয়সে ট্রেনিং নিয়ে কী করবেন? বৃদ্ধের উত্তর “আমারে শুধু ব্যবস্থাটা কইরা দে, তারপর দেখ আমি কেমনে পাকিস্তানি জল্লাদদের শেষ করি”।

আমরা জানতে চাইলাম, “আপনার বাড়িতে কে কে আছেন”? 

বৃদ্ধের উত্তর, “কেউ নাই। তিন ছেলে, সবগুলারে যুদ্ধে পাঠাইছি, বুড়িটারে এক আত্মীয়ের কাছে রাইখা আইছি, আমার আর কোনো পিছটান নাই। তোরা শুধু আমার ট্রেনিং এর ব্যবস্থাটা কইরা দে”।

কী বিরাট বাস্তবতার মুখোমুখি আমি, এই আমি, আমার সামনে আমার চেয়ে প্রায় তিন গুণ বয়সের বৃদ্ধ, বাড়িতে তার বৃদ্ধা স্ত্রী, তিন ছেলের যুদ্ধে গমন এবং সর্বোপরি তার নিজের বয়স, কোনোকিছুই তার মুক্তিযুদ্ধে যাবার বাসনা প্রতিহত করতে পারছে না! কি অসীম তেজ, কী অসাধারণ প্রত্যয়। এই দেশ স্বাধীন হবে না তো হবে কোন দেশ?

ক্যাপ্টেন হায়দারকে ঘিরে স্মৃতি ~ 

আমাদের দল গঠন সমাপ্ত, অস্ত্রের যোগানও শেষ, এখন সময় বুঝে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ। এই উদ্দেশ্যে মেলাঘর থেকে অস্ত্র, গোলাবারুদ নিয়ে মনতলী যেতে হবে। মনতলী ক্যাম্প থেকে বাংলাদেশের ভেতর অনুপ্রবেশ করতে হবে, এমনই ব্যবস্থা। ক্যাম্পের দায়িত্বে ক্যাপ্টেন আইনুদ্দিন। অগাস্টের মাঝামাঝি কোনো একদিন। আমাদের দলটি সকাল থেকেই প্রস্তুত। যার যার অস্ত্র বুঝিয়ে দেওয়া হলো। অস্ত্রের মাঝে আছে ৩০৩ রাইফেল, ৭.৬২ মি.মি. এস এল আর, ৯ মি.মি. ষ্টেনগান, সাথে গুলি, গ্রেনেড, বিস্ফোরক, বিভিন্ন ধরনের মাইন। সবার মাঝে একটা উৎসবের ভাব, সবাই উৎফুল্ল; বাংলাদেশে, নিজ ভূমিতে ফিরে যাবো বলে। লে. মালেক অস্ত্র ও গোলাবারুদ বুঝিয়ে দিচ্ছেন, হায়দার ভাই মাঝে মাঝে এসে তদারকি করছেন। উপ-অধিনায়ক হিসেবে তদারকির ভার কিছুটা আমার ওপরও। আমাদেরকে মনতলীতে নেবার জন্য ট্রাক প্রস্তুত। পুরো দলটি লাইন করে দাঁড় করানো, হায়দার ভাই রওয়ানা হবার আগে ব্রিফিং করলেন। যে যার ব্যক্তিগত অস্ত্র পরীক্ষা করে নিচ্ছে, ঠিক এমন সময় ‘ঠা’ করে গুলির শব্দ। সবাই হতচকিত, বুঝে উঠতে পারছি না কী হলো। হায়দার ভাই দলের মাঝ থেকে বের করলেন রফিক নামে ১৬/১৭ বছরের গ্রামের এক ছেলেকে। ঘটনা হলো, ভুলবশত সে তার ৩০৩ রাইফেলে গুলি ভর্তি ম্যাগাজিন লাগিয়েছিল। অস্ত্র পরীক্ষার সময় ট্রিগারে চাপ দিলে গুলি বেরিয়ে যায়। ভাগ্যক্রমে আমাদের কারও গায়ে লাগেনি। হায়দার ভাই রেগে আগুন। এমনিই কমান্ডো হিসাবে তাকে বেশ কঠিন লাগে, রেগে গিয়ে আরও কঠিন হয়ে গেলেন। ছেলেটির অস্ত্র কেড়ে নিলেন এবং দল থেকে বের করে দিলেন। তার কথা, এখনই যদি এত দায়িত্বহীন হয় তবে এই ছেলে ভবিষ্যতে পুরো দলকে বিপদে ফেলবে, অর্থাৎ সেই রফিকের আর আমাদের সাথে যাওয়া হবে না। কিছুক্ষণ পর ছেলেটি আমার কাছে হাজির, তার হয়ে হায়দার ভায়ের কাছে ওকালতি করতে হবে– যাতে সে যেতে পারে। রফিকের চোখে জল ও প্রচণ্ড আকুতি, যেনো এই যাবার ওপরই তার জীবন নির্ভর করছে। অতএব আমি আমাদের কমান্ডার আব্বাস ভাইকে নিয়ে গুটি গুটি করে হায়দার ভাইয়ের কাছে উপস্থিত হলাম এবং রফিককে ক্ষমা করে আমাদের সাথে যাবার অনুমতির জন্য অনুরোধ করলাম। বেশ অনেকবার অনুরোধের পর হায়দার ভাই নরম হলেন এবং অনুমতি দিলেন। রওয়ানা হবার আগে নানা প্রসঙ্গে আমাদের বিভিন্ন নির্দেশ দিচ্ছেন, এবার বিদায়ের পালা, হায়দার ভাই আমাদের বুকে জড়িয়ে ধরলেন, কথা বলছেন কিন্তু ভারী গলায়। তাকিয়ে দেখি তার চোখে জল; বললেন– তোমরা নিজেরাও জানো না তোমরা কত বিপদের মাঝে যাচ্ছো। বাংলাদেশের ভেতরে শুধু পাকিস্তানি শত্রুরা তোমাদের চারপাশে থাকবে না, শত্রু তোমাদের ভেতরেও থাকবে। এইসব ছেলেরা যারা তিন অথবা চার সপ্তাহের ট্রেনিংপ্রাপ্ত, তাদের নিজ অস্ত্র নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য যে মানসিক শৃঙ্খলা প্রয়োজন, সেটা এতো অল্প সময়ে হয়ে ওঠে না। এদের সঠিক নিয়ন্ত্রণে রাখাই হবে তোমাদের একটি বড়ো চ্যালেঞ্জ, তার ওপর আছে বিশ্বাসঘাতক বাঙালিরা।

আমরা বেশ উৎফুল্ল, বাংলাদেশের পথে রওয়ানা দেব বলে, কিন্তু বিদায় বেলায় এই কঠিন হৃদয়ের মানুষের চোখে জল ও কথা শুনে আমাদের মনটাও ভারাক্রান্ত হয়ে এলো। তাৎক্ষণিকভাবে অনভিজ্ঞতার কারণে তার কথা উপলদ্ধি করতে পারিনি। কিন্তু পরে বাস্তবতায় এসে বেশ অনেকবারই কঠিনভাবে এটা উপলদ্ধি করতে পেরেছি।

হায়দার ভাইয়ের সাথে আমার তখনকার মেলাঘর ক্যাম্পে পরিচয়ের ব্যাপ্তি ৭-১০ দিনের। চাকুলিয়া থেকে ট্রেনিং শেষে কলকাতা হয়ে আসা (আমরা কলকাতা থেকে ট্রেনে করে কুচবিহার, আসাম হয়ে বাংলাদেশের পশ্চিম-উত্তর ঘুরে ত্রিপুরা আসি। সময় লাগে ৭ দিনের বেশি)। এই অল্প সময়ে হায়দার ভাইকে যে খুব বেশি কাছ থেকে দেখতে পেরেছি তা নয়। শুনেছি উনি কমান্ডো ছিলেন। চলা-ফেরায়, আচার-আচরণে সবসময় বেশ কঠিন মনে হতো। অথচ এই অল্প সময়ের পরিচয়ে বিদায়ের সময় কঠিন মানুষটার অত্যন্ত কোমল দিকটার পরিচয় আমরা পেলাম। কী অসাধারণ মমত্ববোধ। বিজয়ের ঠিক আগে, সম্ভবত ১৪ই ডিসেম্বর, ঢাকার অদূরে– মুগদাপাড়ায় অবস্থিত এক জুট মিলে হায়দার ভাইয়ের সাথে মিটিংয়ে দেখা হয়েছিল। বিজয়ের পরে দেখা হয়েছে ঢাকায় বহুবার, তখন এই কঠিন এবং কোমল মানুষটার পরিচয় আরো পেয়েছি। যুদ্ধ মানব চরিত্রের কতো দিকই না চেনায়।

সীমান্ত পার হওয়ার অভিজ্ঞতা ~ 

আগস্টের শেষ অথবা সেপ্টেম্বরে প্রথম। আমাদের ৩০-৩৫ জনের গ্রুপটি মনতলী (আগরতলা) ক্যাম্প থেকে হাতিমারা (সম্ভবত কুমিল্লার উল্টো দিকের কোনো জায়গা) দিয়ে বাংলাদেশে ঢুকেছি। সময়, সন্ধ্যর পর। উদ্দেশ্য, মাঝ রাতে পাকিস্তান আর্মির দুটি প্রধান বাধা, ঢাকা-চিটাগাং রেল লাইন এবং সিএন্ডবি রোড (বোধ হয় বর্তমানের কুমিল্লা-ব্রাহ্মণবাড়িয়া সড়ক), পাড়ি দেওয়া। বেশ কিছুটা পথ হেঁটে, তারপর নৌকায় যেতে হয়। আমাদের প্রত্যেকের কাছে ব্যক্তিগত অস্ত্র, গোলাবারুদ ও নিজস্ব প্রয়োজনীয় জিনিষপত্র, বিছানার চাদরে বোচকার মতো করে বেঁধে পিঠের উপর ওজন আধমন বা তারও বেশি। পিঠে বাঁধা গোলাবরুদ, মাইন, এর সাথে অন্যান্য আনুষাঙ্গিক জিনিষপত্র। কিছুক্ষণ পিঠে থাকার পর বুঝলাম যথেষ্ট ভার। তার সাথে আছে অসুস্থ সহযোদ্ধাদের বোঝা ভাগ করে নেওয়া (৩০-৩৫ জনের গ্রুপে ৩-৪ জন অসুস্থ থাকাই স্বাভাবিক)। এ যেন ‘বোঝার উপর শাকের আটি’। আমাদের লক্ষ্য ঢাকার পূর্বে রূপগঞ্জ থানায় বালু নদীর পাড়ে ‘হরদি’ বাজার (ইছাপুর বাজারের প্রায় ২ কি. মি. উত্তরে) যা বর্তমানে রাজউকের উপ-শহর প্রকল্প ‘পূর্বাচল’। আমাদের সাথে একজন গাইড, পথ দেখিয়ে নিয়ে যাবার জন্য। আমাদের গ্রুপটার ঢাকা প্রবেশের জন্য বিশেষ সতর্কতা অনুসরণ করা হয় এবং দুইবার তারিখ পরিবর্তন করা হয়। কারণ আমাদের ঠিক আগের গ্রুপটা সিএন্ডবি রোডে ব্রিজ পার হবার সময় পাকিস্তান আর্মির এম্বুশে পড়ে এবং বহু মুক্তিযোদ্ধা হতাহত হয়। অতএব, ঠিক কখন রওয়ানা হবো তা আগে থেকে বলা হচ্ছে না। পাকিস্তান আর্মি কোনোভাবে আগের থেকে খবর পেলে আমাদের পরিণতি একই হতে পারে এই আশঙ্কায়। যুক্তিও আছে, মুক্তিযুদ্ধের সময় ট্রেনিংপ্রাপ্ত যোদ্ধারা খুব মুল্যবান, আরও মুল্যবান অস্ত্রশস্ত্র ও গোলা বারুদ। 

ঘটনাক্রমে আমাদের আগের গ্রুপে যারা আহত তাদের দেখার সুযোগ হয়েছিল কিছুদিন আগের ঘটনায়। ছাত্রনেতা আব্দুল কুদ্দুস মাখনের সাথে দেখা হওয়ার এক পর্যায়ে তিনি বললেন যে কিছু মুক্তিযোদ্ধা আহত অবস্থায় বিশ্রামগঞ্জ মুক্তিযোদ্ধা হাসপাতালে আছে। তাদের দেখতে যাবার জন্য, তার জীপে যেতে হবে। আমরা বিশ্রামগঞ্জে বাংলাদেশ হাসপাতালে পৌঁছালাম। তরুণ ডাক্তার জাফরউল্লাহ হাসপাতালটির তত্ত্বাবধানে। ওখানেই তাকে প্রথম দেখি। ঘণ্টাখানেক ওখানে ছিলাম, সে এক বিভীষিকাময় অভিজ্ঞতা। সদ্য আহত কারও হাত কেটে ফেলা হয়েছে, কারও পা কেটে ফেলা হয়েছে, করুণ স্বরে ব্যথায় কাতরাচ্ছে, অসহায় ডাক্তাররা। প্রয়োজনীয় ঔষধপত্র, সরঞ্জামের অভাব। এ হাসপাতালকে আবার প্রকৃত হাসপাতাল ভাবার কোনো অবকাশ নেই। মোটামুটি জঙ্গল কেটে টিলার উপর বাঁশের তৈরি ঘর। বিছানাগুলি বাঁশের মাচা, এই অবস্থা। মনে হলো, এদের আপনজনেরা কেউই জানে না এরা কোথায় কী অবস্থায় আছে। তাদের আদরের, ভালবাসার, স্নেহের পরশটুকুও পাচ্ছে না এই সময়। নিজেকে এদের অবস্থানে ভেবে মনটা হুহু করে উঠলো। ভারাক্রান্ত মন নিয়ে ফিরেছিলাম। জানা ছিলো সীমান্ত পাড়ির সময় ওরা আহত হয় কিন্তু যেটা জানা ছিলো না সেটা হলো যে আমাদেরও একই পথে যেতে হবে।

ফিরে আসি আমাদের স্বদেশ যাত্রায়। হাতিমারা থেকে রাত ৯টা ১০টার দিকে হেঁটে রওনা হলাম। গ্রামে বেশ গভীর রাত। বেশ কিছু সময় হেঁটে তারপর নৌকায় উঠলাম। বর্ষার শেষ, গ্রামের পরিবেশে শীতের হাতছানি, মনে টান টান উত্তেজনা ও উৎকণ্ঠা। দুই মাস পরে ফিরছি। যে আমি ভারতে এসেছিলাম আর যে আমি ফেরত যাচ্ছি তার মাঝে বিরাট ব্যবধান। এসেছিলাম বালক, এখন এই দুই মাসে কৈশোর ছাড়িয়ে যুবক, মানসিকভাবে আরও বেশি ঋজু। দলনেতা হিসেবে আমার সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করবে আমার সহযোদ্ধাদের জীবন-মরণ। তারা বয়সে অধিকাংশই আমার চেয়ে বড়ো। অতি সাধারণ গ্রামের ছেলে অথচ কী সরল, সুন্দর, চোখে-মুখে দেশপ্রেমের ছাপ। সামনে জীবন-মৃত্যুর দোলাচল– ‘হয় মারো নয় মরো’। মনটা কেমন করে উঠে। জীবনের অনেকটাই তো দেখা হলো না, কেন এমন হলো? কেন এমন হয়? কিছু মানুষের প্রথা-বহির্ভূত ক্ষমতার লোভের জন্য এতো মানুষের এত ভোগান্তি? সামনে অনিশ্চিত ভবিষ্যত। মনটা উদাস হয়ে ওঠে। মনে হয়, আহা জীবনটা কতো সুন্দর, বেঁচে থাকাটা আরও সুন্দর। 

দু’টো নৌকা ঠিক হলো, একেকটাতে ১৫-১৬ জন করে। একটার ভার আমার ওপর, আরেকটার ভার আব্বাস ভাইয়ে ওপর। মাঝরাত, বেশ আঁধার, ঘোর আমাবস্যার রাত। আমাদের সুবিধা অন্ধকারে আমাদের দেখা যাবে না। নৌকার পাটাতনের ওপর পিঠের বোচকা রেখে চারিদিকে দৃষ্টি রেখে এগুচ্ছি। মোটামুটি নির্বিঘ্নে সামনে এগিয়ে চলছি। মাঝরাত, সবার মাঝে সাংঘাতিক এক অব্যক্ত উত্তেজনা। প্রথমে পার হতে হবে রেল লাইনের ব্রিজ। ব্রিজের ওপর পাকিস্তানি আর্মি ও রাজাকারদের বাংকার, তবে আশার বিষয় রাতের বেলায় ওরা বাংকার থেকে সাধারণত বেরোয় না। রেল ব্রিজের কাছাকাছি গিয়ে অপেক্ষা রাজাকারদের সংকেতের। ভয় হয় আবার না এম্বুশে পড়ি। আমরা মোটামুটি গাইডের ওপর নির্ভরশীল। গাইড অপরিচিত। আর যুদ্ধের সময় এমন যে, কাউকেই বিশ্বাস করা যায় না। আমাদের বাঙালিরাইতো জামায়াত এ ইসলামী, রাজাকার, আলবদর। অবশেষে নির্বিঘ্নে রেল ব্রিজ পার হলাম, দুটা নৌকাই পাশাপাশি। এখন কিছুটা নিশ্চিত, অন্তত সিএন্ডবি রাস্তা পর্যন্ত। নৌকার সহযোদ্ধাদেরকে ওপর নজর রাখতে হচ্ছে, কেউ যেন আবার বিড়ি-সিগারেট না ধরায়। যুদ্ধক্ষেত্রে এটা একেবারেই মানা, শত্রুর গুলির নিশানা হওয়ার খুব সহজ উপায়।

দুর থেকে সিএন্ডবি রোড দেখা যাচ্ছে, আরও দেখা যাচ্ছে বাতি নিভিয়ে পাকিস্তান সোনাবাহিনীর গাড়ির কনভয়ের আনাগোনা। আমরা সতর্কতার সাথে এগুচ্ছি সবচেয়ে বিপজ্জনক বাধা অতিক্রম করার জন্য। দূর থেকে ব্রিজটিকে আবছা দেখা যাচ্ছে, যার নিচ দিয়ে যেতে হবে। মনে হচ্ছে মৃত্যুফাঁদ। রাতের নিকষ আঁধারেরও একটা আলো থাকে, তাতেই অনুমান করছি ব্রিজটার অবস্থান। আমাদের গাইডের একই অনুমান। এমন সময় হঠাৎ মনে হলো আমাদের আরেকটি নৌকা পাশে নেই। এই অন্ধকারে দূরে একটা আলো আলো ভাব থাকে অথচ কাছের জিনিস দেখা যায় না। সাথের নৌকাটা আমরা হারিয়ে ফেলেছি। শুরু হল খোঁজা, ওরাও হয়ত খুঁজছে, আমরাও খুঁজছি। মাঝি চালাচ্ছে খুব সাবধানে, বৈঠার শব্দও যেন না হয়। প্রায় ঘণ্টা দুয়েক পার হলো, সময়টা আরও দীর্ঘ মনে হচ্ছে। রাত প্রায় শেষ, কিছুক্ষণের মধ্যে আরেকটা নৌকা না পেলে ফিরতে হবে। দিনের আলোয় পানির ওপর নৌকায় আমরা একেবারে অসহায়। আমাদের থেকে রাস্তায় পাকিস্তান আর্মির অবস্থান গুলির দূরত্বের ভেতর। দিনের আলো ফুটে উঠলে শত্রুর গুলিতে মারা যাওয়া ব্যতিত আর কোনো উপায় নাই। কিন্তু ফিরি কী করে? অন্য নৌকা কোথায়? প্রচণ্ড দোটানা। ঠিক সেই সময় পাশ থেকে চাপা স্বরে ডাক শুনলাম। পাশের নৌকার অনুযোগ আমরা কোথায় ছিলাম, আমাদেরও একই অনুযোগ। দ্রুত অভিযোগ, অনুযোগ শেষ করে সিদ্ধান্ত নিলাম আমাদের তাড়াতাড়ি পার হতে হবে। সময় খুব অল্প। কিছুক্ষণের মাঝে ফজরের আজান পড়বে, বেশ শীত শীত লাগছে। ঠিক এই সময় মনে হলো পানিতে কিছু একটা নড়ছে। আমরা সতর্ক, কী ওটা? দেখি কিছু একটা সাঁতরে আমাদের নৌকার দিকে আসছে। খুব কাছে আসলে দেখি একটা মানুষ, আমরা আশ্চর্য, কিছুটা হতবিহবল। মানুষটাকে টেনে আমাদের নৌকায় উঠানো হলো, নানারকম শঙ্কা মনের মাঝে কাজ করছে। নৌকায় উঠানোর পর দেখলাম মাঝবয়সী এক লোক (৪০-৪৫), গায়ের রং বেশ কালো, মুখে দাড়ি, অন্ধকারে ভালো দেখা যায় না, শীতে কাঁপছে। আমাদের সাবধানী গলায় জিজ্ঞাসা “কে তুমি”?

উত্তরে সে তার ভাষায় বলে “তোরা যাইছ না, ফিরা যা, তোরা যে আইবি এই খবর ওরা জানে, গেলে ঠাইট (একেবারে) মারা পড়বি, ব্রিজের ওপর ওৎ পাইতা (এম্বুস) আছে।” আমরা বিশ্বাস করি না, আগেই বলেছি যুদ্ধক্ষেত্রে বিশ্বাস করা খুব কঠিন। আবার জিজ্ঞাসা করি তার পরিচয়। সে পরিচয় দেয় না, বরং বার বার ফিরে যেতে বলে। আমাদের হাতে সময় কম, সকাল হয়ে আসছে পার হতে হলে এখনই শেষ সময়। নৌকার অন্য সহযোদ্ধারা অসহিষ্ণু হয়ে উঠছে। এক পর্যায়ে আমরা বেশ কঠিন হয়ে উঠি এবং ধমক দিয়ে বলি যে আমাদের আসার খবর সে কী ভাবে জানলো? আরও ভয় দেখালাম, পরিচয় না দিলে আমরা কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হবো। উত্তরে সে যা বললো, তা শোনার জন্য অন্তত আমি প্রস্তুত ছিলাম না। সে বললো যে সে এখানকার রাজাকার কমান্ডার এবং আমাদের আসার খবর সে পাকিস্তান আর্মির কাছ থেকে পেয়েছে। পেয়েই সে এই বিলের মাঝে গ্রামে (অনেকটা দ্বীপের মতো) অপেক্ষা করছে। স্থানীয় হিসাবে সে জানে যে ব্রিজের নিচ দিয়ে যেতে হলে এই পথ দিয়েই যেতে হবে। তারপরের ঘটনা আমাদের জানা। 

আমরা বিস্মিত, কিছুটা বিচলিত। জিজ্ঞাসা করলাম এতক্ষণ পরিচয় না দেয়ার কারণ কি? উত্তরে সে যা বললো, সেটা আরো বিস্ময়কর। সে বললো কিছুদিন আগ পর্যন্ত তার বড়োভাই এখানকার রাজাকার কামান্ডার ছিলো। একইভাবে খবর পেয়ে কয়েকদিন আগে মুক্তিযোদ্ধাদের আরেকটি গ্রুপকে বাধা দিতে এসেছিলো। গ্রুপটি তার কথা শোনেনি বরং যখন তার পরিচয় পেয়ে সেই গ্রুপেরই একটি ছেলে উত্তেজিত হয়ে গুলি করে এবং তার বড়ো ভাই মারা যায়। সেই গ্রুপটি ব্রিজ অতিক্রম করার সময় এম্বুশে পড়ে এবং অনেক যোদ্ধা হতাহত হয়। আমি তার বর্ণনা শুনছি আর হিসেব করছি। আমার হিসেব মিলে যায়। এই গ্রুপকেইতো আমরা দেখে আসলাম বিশ্রামগঞ্জে বাংলাদেশ হাসপাতালে। অবিশ্বাস থেকে লোকটার উপর বিশ্বাস জন্মালো। আমি দাঁড়িয়ে আছি এমন এক মানুষের সামনে যার বড়ো ভাইকে মুক্তিযোদ্ধারা গুলি করে মেরেছে মাত্র ৭/৮ দিন আগে। তার অপরাধ ছিলো যে সে সেই দলটিকে বাঁচাতে চেয়েছিল। ব্যাপারটা যদিও ঘটেছিল ভুল বুঝাবুঝির কারণে। আজ তারই ছোটো ভাই একইভাবে জীবনের ঝুকি নিয়ে আমাদের বাঁচাতে এসেছে। নিজের মাঝে নেই কোনো রাগ, ক্ষোভ, এটাই যেন তার কর্তব্য। এ কোন স্তরের মানুষ? এ কেমন দেশপ্রেম?

আমরা নৌকা ঘুরাই, ফিরে আসি। ভাবনায় মনটা ভারাক্রান্ত। দেশ একদিন স্বাধীন হবে হয়তো। এ মানুষটার পরিচয় রাজাকার হিসাবে থাকবে, অথবা কোনো মুক্তিযোদ্ধার হাতে মারাও পড়তে পারে। কিন্তু সে কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধাকে বাঁচানোর জন্য, দেশের জন্য আজ যা করলো, তাকে আমি কিসের সাথে তুলনা করবো? যুদ্ধ বড় জটিল জিনিস এবং কারও কাম্য হতে পারে না। কিন্তু এ ধরনের সংকট প্রকৃত মানুষ চেনায়। এই মানুষ চেনাটাই আমার মুক্তিযুদ্ধের বিরাট অর্জন। যে প্রশ্নটির মিমাংসা আমি আজও করতে পারিনি, সেটা হলো, সেই রাজাকার কমান্ডার আর আমার মাঝে, কে বড়ো মুক্তিযোদ্ধা? সে না আমি?

প্রায় মৃত্যু ফাঁদে ~ 

বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের প্রথম ব্যর্থতার পর দ্বিতীয়বার অন্য পথে ঢুকি। এবারের অনুপ্রবেশটা মোটামটি বির্বিঘ্ন ছিল। সিএন্ডবি রাস্তা পার হবার পর আমাদের সবার মাঝেই স্বস্তিভাব ফিরে আসে। তখন মাঝরাত, নৌকার মাঝে কেউ টুকটাক কথা বলছে, কেউবা ঝিমুচ্ছে, দুটি নৌকা বর্ষার ক্ষেতের মাঝে নৌকা চলাচলের পথ দিয়ে নিঃশ্বব্দে এগুচ্ছে। আমাদের গাইডকে আমাদের অবস্থান জিজ্ঞাস করলাম। সে বললো কিছুক্ষণের মধ্যে আমরা একটা নদী পার হবো, তারপর হেঁটে ভোরের আগে আমাদের কুমিল্লার কোনো এক গ্রামে দিনের মতো আশ্রয় নিতে হবে। আবার সেই পিঠের ওপর বোঝা নিয়ে হাঁটা! নৌকাই তো ভালো ছিল। উপায় নেই, সংকটকালের পথ তার নিজের নিয়মে চলে।

মাঝরাতের পর অন্ধকার নদীর পাড়ে আমরা কোনো এক জায়গায় নামলাম। নৌকার ভাড়া চুকিয়ে গাইডের পিছনে পিছনে ক্ষেতের আইল ধরে হাঁটছি, গাইডের ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল। পথ-ঘাট আমরা কিছুই চিনি না। আমাদের এই নৌকার মাঝি সম্বন্ধে কিছু না বললে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সাধারণ জনগণের সম্পৃক্ততা অনেকটাই বলা হবে না। নৌকায় করে যখনই আমরা কোনো ব্রিজ বা পাকিস্তানি সোনাবাহিনীর কোনো বাংকার অতিক্রম করছি তখন স্বাভাবিক কারণেই সবাই বেশ উৎকণ্ঠায় থাকতাম। কোথায় মাঝিকে আমরা সাহস যোগাব, উল্টো সে আমাদের অভয় দিয়ে বলতো “আপনারা একটুও চিন্তা কইরেন না, মিলিটারিরা রাইতে বাইর অয়না, আমি ঠিকই আপনাগো যায়গা মতো লইয়া যামু”। এই হলো আমাদের অতি সাধারণ মানুষের সাহস এবং আমাদের জনযুদ্ধে তাদের সম্পৃক্ততা। নৌকা ভাড়ার টাকাটা না নিলেই নয়, তাই নেয়া।

বর্ষার ক্ষেতের আইল তার উপর পিঠে ভারি বোঝা নিয়ে হাঁটা বেশ কঠিন ব্যাপার। আমরা যারা অভ্যস্ত নই, তারা থেকে থেকেই ক্ষেতের চিকন আইল থেকে কাদায় পড়ে যাচ্ছি। এভাবে চলতে চলতে কখন যে সকাল হয়ে গেছে টের পাইনি। আমরা তখন এক বিরাট ক্ষেতের মাঝখানে, দূরে গ্রাম দেখা যাচ্ছে। রাতের আঁধারের মাঝে গ্রামে পৌঁছতে না পারলে বিরাট বিপদ, দিনের আলোয় আশেপাশের সবাই সহজেই দেখে ফেলতে পারবে ৩০-৩৫ জনের একটা মুক্তিযোদ্ধা দল যে যাচ্ছে। এই সংবাদ শত্রুর কাছে পৌঁছতে কতক্ষণ? আমরা যতোই তাড়াহুড়া করি, গ্রামগুলি আরও দূর মনে হয়। এরই মাঝে ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে। যে ভোরের সূর্য সবার কাছে কাঙ্ক্ষিত তা তখন আমাদের কাছে সবচাইতে অনাকাঙ্ক্ষিত। দু-চার জন করে কৃষক মাঠে আসছে আর বিস্ময়ে আমাদেরকে দেখছে কৌতুহলী দৃষ্টি নিয়ে। আমাদের কাঁধের রাইফেলগুলি আমাদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে ভোরের আলোয় লম্বা ছায়া ফেলে এগিয়ে চলছে। গাইডের ওপর আমাদের সন্দেহ ক্রমেই বাড়ছে। তাহলে কি ও আমাদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করলো? আমাদের ভুল পথে নিয়ে ধরিয়ে দেয়ার জন্য? কিছু ছেলে তো গাইডের প্রতি মারমুখী, পারলে ওখানেই গুলি করে মারে। অবশেষে, মোটামুটি আলোর মাঝেই আমরা গ্রামে পৌঁছলাম। গ্রামের লোকজন এগিয়ে এসে যা বললো তা মোটেই স্বস্তিকর নয়। মাত্র দু-দিন আগে পাকিস্তানি মিলিটারিরা এই গ্রাম তছনছ করে গেছে। গ্রামের অবস্থানটাও বিপদজ্জনক একদিকে ময়নামতি ক্যান্টনমেন্ট, আরেকদিকে ঢাকা-চিটাগাং রোড, অন্যদিকে থানা। মোটামুটি চারদিক থেকেই আমরা শত্রু পরিবেষ্টিত। উপায় নেই, তাই এই গ্রামেই দিনটা কাটাতে হবে। দুই দিন আগে আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া এক বাড়িতে আমরা অবস্থান নিলাম। গ্রামের নেতৃস্থানীয় কিছু লোক এলে তাদের কিছু টাকা দিয়ে আমাদের খাবারের বন্দোবস্ত করতে বললাম। তারাও শঙ্কিত, মিলিটারি খবর পেলে আবারও বড়ো ঝাপটা তাদের ওপর দিয়েই যাবে। এদিকে আমরা নজর রাখছি আমাদের গাইড যেন কোনো অবস্তাতেই আমাদের চোখের আড়াল না হয়। যেই গাইডের হাতে আমাদের জীবন-মরণ নির্ভর করে তাকে কতো অবিশ্বাস, এটাই বাস্তবতা। গ্রামের লোকদের বলা হলো তারা যেন চারদিকে সজাগ দৃষ্টি রাখে এবং সন্দেহজনক কিছু দেখলে আমাদের খবর দেয়।

এদিকে সারা রাতের নির্ঘুম পথচলার ক্লান্তি ও উত্তেজনায় একে একে সবাই বাড়ির উঠানে বসে ঘুমিয়ে যাচ্ছে। পিঠের বোঝাটা খুলে নেবার ফুরসত নাই। কাত হয়ে বোচকার উপরই ঘুমিয়ে গেছে কেউ কেউ। জেগে আছি দুজন, আমি ও আরেকটি গ্রামের ছেলে। আমার জন্য চোখ খোলা রাখা দায়। কিন্তু এই অবস্থায় সবাই ঘুমালে, শত্রু এলে বেয়োনেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুচিয়ে মারবে, একটি গুলিও খরচ করতে হবে না। অগত্যা অনেক কষ্টে, চোখে পানি দিয়ে নিজেকে জাগিয়ে রাখছি। বেলা সকাল ৯টা-১০টা হবে, এমন সময় গ্রামের লোক খবর নিয়ে এলো কিছু মিলিটারি এই গ্রামের দিকে আসছে। পরিস্থিতির কারণে আমি নিশ্চিত যে তারা খবর পেয়েই আসছে। খবরটা দিয়ে লোকজন গ্রামের অপর প্রান্তে চলে গেল। দু-চারজন সাহসী লোক আমাদের সাথে রইলো।

এখন বাড়ির অবস্থানটা সম্বন্ধে একটু ধারণা দেওয়া যাক। বাড়িটা গ্রামের শুরুর দিকে, একদিকে ফসলের মাঠ, পিছন দিকে গ্রামের অন্যান্য বাড়ি, আরেক দিকে ডিস্ট্রিক্ট বোর্ডের কাঁচা রাস্তা, যেখান দিয়ে মিলিটারিরা আসছে। রাস্তার পাশে একটু ঢালু যায়গা তারপর বাগান, বিভিন্ন ফলজ গাছ, তারপর এই বাড়িটা। এই বাগানে এসে গাছের আড়াল থেকে আমি দেখবার চেষ্টা করলাম। মিলিটারির অবস্থান তখন বেশ দূরে। আনুমানিক ১০-১২ জনের গ্রুপ এক লাইনে মার্চ করে গ্রামের দিকে আসছে। আমি ও আমার সাথের ছেলিটি ফিরে এসে ঘুমন্ত সহযোদ্ধাদের কাউকে ধাক্কা দিয়ে কাউকে পানি ঢেলে জাগিয়ে তুলি। সবাই সজাগ হলে পরিস্থিতি বুঝিয়ে বলি। তাড়াতাড়ি করণীয় ঠিক করে আমি ১০ জন ছেলে নিয়ে সামনে বাগানে গাছের আড়ালে অবস্থান নেই। সিদ্ধান্ত, শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত চেষ্টা চলবে গুলি না করার, কারণ এই শত্রুর ১০-১২ জনের দলটিকে ঘায়েল করতে হয়তো অসুবিধা হবে না, কিন্তু গোলাগুলি আরম্ভ হলেই আমরা পুরো ফাঁদে আটকে যাবো। ক্যান্টনমেন্ট এবং থানা থেকে ওদের শক্তি বৃদ্ধি করতে পেতে দেরি হবে না। এই অচেনা যায়গায় এত বড়ো যুদ্ধের ঝক্কির সামর্থ আমাদের নেই। অর্থাৎ গুলি হওয়া মানেই আমাদের পুরো দলটি নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়া, চারিদিক থেকে আমরা অবরুদ্ধ হয়ে যাবো।

এদিকে শত্রু এগিয়ে আসছে ২০০ গজ, ১০০ গজ, দুরত্ব দ্রুত কমে আসছে। তাদের একেকটি কদম যেন আমার বুকের উপর এসে পড়ছে। কড়া নির্দেশ, আমি গুলি করার সাথে সাথে অন্যরা গুলি করবে তার আগে নয়। চরম উত্তেজনা, শত্রু ৩০-৩৫ গজের মাঝে চলে এসছে। গুলি করলে পুরো দলটিকেই শেষ করা যাবে। সিদ্ধান্ত আমাকেই নিতে হবে। সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলি, আর দেরি করা সম্ভব না। এবার শত্রু আমাদের দেখে ফেলবে। আমি ট্রিগারে হাত রেখে গুলি করার নির্দেশ দেবো ঠিক তখনই মিলিটারির দলটা থমকে দাড়ালো, কিছুক্ষণ এদিক-সেদিক তাকালো তারপর উল্টো ঘুরে যেদিক থেকে এসেছিলো সেদিকে রওয়ানা হলো। আমাদের সবার যেনো ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়লো। এরপর সারাদিন যে কীভাবে কাটলো আমার মনে নেই। কখন উঠেছি– কখন খেয়েছি কিছু মনে নেই। একেবারে সন্ধ্যায় উঠে আবার ঢাকার পথে রাতের যাত্রা শুরু। বেঁচে থাকার আনন্দটাই অন্যরকম। 

লেখক:
Shah Sayed Kamal
শাহ সাঈদ কামাল
একাত্তরের মুক্তিযোদ্ধা, মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি সংরক্ষণ উদ্যোক্তা, সংগঠক– “মুক্তিযুদ্ধ ‘৭১” এবং
দেশব্যাপী মুক্তিযুদ্ধের প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শন প্রকল্প উদ্যোক্তা;

মন্তব্য করুন (Comments)

comments

Share.

About Author

বাঙালীয়ানা স্টাফ করসপন্ডেন্ট