। রেজিনা সুলতানা পিয়া।
পিয়াল আর মোহনা—যেন দুই দেহ এক আত্মা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে ওদের বন্ধুত্বটা ছিলো এক অটুট বন্ধন। কলাভবনের সামনের শতবর্ষী বটগাছের শেকড়ের মতোই গভীর আর মজবুত। পিয়াল ছিলো বসন্তের বাতাসের মতোই প্রাণচঞ্চল আর খোলামেলা। আর মোহনা ছিল হেমন্তের স্নিগ্ধ সন্ধ্যার মতো শান্ত, নিজের গুটিয়ে রাখা এক জগৎ। এই বৈপরীত্যই ওদের বন্ধুত্বকে এক অন্য মাত্রা দিয়েছিল। ক্লাসরুম থেকে টিএসসির আড্ডা, কিংবা রাতের পর রাত ফোনে অন্তহীন কথা বলা—সবকিছুতেই ওদের বোঝাপড়া ছিলো দারুণ। ওদের সম্পর্কটা ক্যাম্পাসে এতটাই ঈর্ষণীয় ছিলো যে, মনে হতো এ এক অলিখিত চুক্তি, যার ভিত্তি শুধুই অগাধ বিশ্বাস।
কিন্তু জীবনের চেনা ছক সব সময় একরকম থাকে না। ওদের এই নিখুঁত সম্পর্কে প্রথম ফাটল দেখা দিলো যখন ডিপার্টমেন্টে সুমনার আগমন ঘটলো। সুমনা দেখতে মিষ্টি, কিন্তু ভেতরে ভেতরে তীব্র ঈর্ষাকাতর। ক্লাসে ঢোকার পর থেকেই সে দেখলো, পিয়ালকে সবাই চেনে ওর চঞ্চল স্বভাবের জন্য, আর মোহনাকে শিক্ষকরা পছন্দ করেন ওর মেধার জন্য। বিশেষ করে পিয়ালের প্রতি সুমনার একটা গোপন দুর্বলতা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু পিয়াল আর মোহনার ওই অটুট দেয়াল টপকে পিয়ালের কাছাকাছি হওয়া সুমনার পক্ষে অসম্ভব ছিলো। তাই সে ঠিক করলো, আগে এই দেয়ালটাই ভাঙতে হবে।
সুমনা খুব ঠাণ্ডা মাথায় চাল চাললো। সে জানতো, শুধু মুখে বললে ওরা কেউ কাউকে অবিশ্বাস করবে না। তাই সে একদিন সুযোগ বুঝে পিয়ালের ফোন থেকে একটা টেক্সট মেসেজ ডিলিট করে, মোহনার ফোনের একটা চ্যাটের স্ক্রিনশট এডিট করল।
সেদিন বিকেলে সুমনা লাইব্রেরির পেছনে মোহনাকে একা পেয়ে গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে গেলো। চোখে-মুখে কৃত্রিম উদ্বেগের ছাপ এনে বললো, “মোহনা, একটা কথা বলবো? কিছু মনে করবি না তো? আসলে পিয়ালকে আমি যতটুকু ভালো ভেবেছিলাম, ও আসলে তেমন না।”
মোহনা ভ্রু কুঁচকে তাকাল, “মানে? কী হয়েছে?”
সুমনা ওর ফোনটা বের করে এডিটেড চ্যাটটা দেখালো, যেখানে পিয়াল অন্য একজনকে বলছে—”মোহনা মেয়েটা বড্ড পজেসিভ রে, সারাক্ষণ সাইকোর মতোন পিছে লেগে থাকে। ওর জন্য আমি নিজের লাইফ এনজয় করতে পারছি না। মাঝে মাঝেই দম আটকে আসে।”
লেখাটা দেখে মোহনার পায়ের নিচের মাটি সরে গেল। পিয়ালের চেনা টাইপিং স্টাইল, চেনা শব্দ—মোহনা ভাবতেই পারলো না পিয়াল ওর পেছনে এত বড়ো একটা কথা বলতে পারে! তীব্র অভিমানে আর ক্ষোভে ওর চোখ ফেটে পানি আসতে চাইলো, কিন্তু ও নিজেকে সামলে নিলো।
পরদিন সকালে কলাভবনের নিচের তলায় ফটোকপির সামনে পিয়াল যখন চেনা হাসিতে মোহনার দিকে এগিয়ে এলে মোহনা ওর দিকে তাকালও না। পিয়াল বলল, “কী রে মো, আজ এত গম্ভীর কেন? চল, টিএসসিতে যাই, চা খেয়ে আসি।”
মোহনা একটা শীতল, কঠিন দৃষ্টিতে পিয়ালের দিকে তাকিয়ে বললো, “তোর সাথে চা খাওয়ার চেয়ে আমার একলা থাকা অনেক বেশি ভালো রে। আর শোন, আমার মতো ‘সাইকো’র সাথে থেকে তোর দম আটকে যাওয়ার দরকার নেই। আজ থেকে তুই মুক্ত।”
পিয়াল আকাশ থেকে পড়লো, “মানে? কী বলছিস এসব?”
কিন্তু মোহনা আর কোনো কথা না শুনে হনহন করে হেঁটে চলে গেল। পিয়াল হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো কিছুক্ষণ। নিজের অজান্তেই ওর মনেও একটা ক্ষোভ দানা বাঁধল—মোহনা ওকে এত বড়ো একটা অপবাদ কীভাবে দিলো?
সুমনা এই সুযোগেরই অপেক্ষায় ছিলো। সে এবার পিয়ালের ভাঙা মনের সুযোগ নিতে এগিয়ে এলো। পিয়ালের পাশে বসে সহানুভূতি দেখানোর ভান করে বললো, “পিয়াল, আসলে মোহনা ইদানীং তোকে নিয়ে ডিপার্টমেন্টের সবার কাছে আজেবাজে কথা ছড়াচ্ছে। ও বলছিল, তুই নাকি ওর নোটস চুরি করিস আর ওর পরিচয়ে চলিস। আমি প্রতিবাদ করেছিলাম বলে ও আমাকেও দু’কথা শুনিয়ে দিলো।”
পিয়াল প্রথমে বিশ্বাস করতে চায়নি, কিন্তু মোহনার সকালের ওই রুক্ষ আচরণ আর সুমনার সাজানো কিছু মিথ্যে সাক্ষী (যা সুমনা আগেই তৈরি করে রেখেছিলো) মিলিয়ে পিয়ালের মাথা কিছুটা গরম হয়ে গেল। ও ভাবলো, মোহনা তাহলে সত্যিই হয়তো বদলে গেছে। এভাবেই ধীরে ধীরে ওদের হাসি-ঠাট্টা, চায়ের কাপের ঝড়, আর দীর্ঘ কথোপকথনগুলো এক নিমিষেই যেনো থমকে গেল।
ক্লাসে ওরা পাশাপাশি বসলেও মাঝে তৈরি হলো এক অদৃশ্য, হিমশীতল দেয়াল। সুমনা দূর থেকে এই দৃশ্য দেখে মনে মনে হাসতো। ওর চাল সফল হয়েছে। পিয়াল এখন একলা, আর সেই ফাঁকে সুমনা পিয়ালের ‘ভালো বন্ধু’ হয়ে ওঠার চেষ্টা চালাতে লাগলো।
দিন কাটার সাথে সাথে পিয়াল একটা জিনিস খেয়াল করলো—সুমনা যতটাই ওর কাছাকাছি আসার চেষ্টা করছে, ততই সে মোহনার নামে বিষ উগরে দিচ্ছে। পিয়ালের মনে খটকা লাগলো। মোহনা রাগ করতে পারে, কিন্তু সে কখনো এতটা নিচে নামতে পারে না।
এরই মধ্যে সেমিস্টারের ফাইনাল গ্রুপ প্রজেক্ট দেওয়া হলো। নিয়তির পরিহাসে, লটারির মাধ্যমে পিয়াল আর মোহনা একই গ্রুপে পড়লো। প্রথম প্রথম তারা একে অপরের সাথে শুধু কাজের খাতিরে ফর্মাল কথা বলতো। কিন্তু একদিন প্রজেক্টের কাজে সেন্ট্রাল লাইব্রেরিতে বসার পর সুমনাও সেখানে এসে জুড়ে বসলো। কাজের মাঝখানেই সুমনা পিয়ালকে উদ্দেশ্য করে একটু বাঁকা সুরে বললো, “পিয়াল, কাজটা তুই একাই দেখ, অন্যের ওপর ভরসা করিস না। পরে দেখবি ক্রেডিট নিজের নামে চালিয়ে দিয়েছে।”
কথাটা মোহনার কানে তীরের মতো বিধলো। ও আর সহ্য করতে পারলো না। টেবিল চাপড়ে উঠে দাঁড়িয়ে বললো, “সুমনা, তোমার সমস্যাটা কী বলতো? শুরু থেকেই তুমি আমাদের মাঝে ঝামেলা বাঁধানোর চেষ্টা করছো, কেনো?”
পিয়ালও এবার দমে গেল না। ও বললো, “মোহনা, সুমনাকে দোষ দিচ্ছিস কেন? তুই তো সবাইকে বলে বেড়াচ্ছিস যে আমি তোর নোট চুরি করি!”
মোহনা স্তব্ধ হয়ে গেলো, “আমি? আমি কখন বললাম? তুই-ই তো অন্য ছেলেদের কাছে চ্যাট করে বলেছিস আমি সাইকো, আমার সাথে থাকলে তোর দম আটকে আসে!”
লাইব্রেরির পিনপতন নীরবতার মধ্যে দুজনের এই মুখোমুখি সংঘর্ষে সুমনার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল। পিয়াল অবাক হয়ে বললো, “আমি চ্যাট করেছি? কার সাথে? দেখা তো আমাকে!”
মোহনা যখন ওর ফোনের সেই পুরনো স্ক্রিনশট বের করলো, পিয়াল এক নজরেই ধরে ফেললো। ও বললো, “এটা তো আমার পুরনো আইডি, যা ছয় মাস আগে হ্যাক হয়েছিলো! আর এই চ্যাটের ডেট দেখ, এটা তো গত মাসের! গত মাসে এই আইডি দিয়ে আমি চ্যাট করবো কীভাবে?”
এবার সুমনার দিকে দুজনের চোখ গেলো। সুমনা ততক্ষণে কাঁধের ব্যাগটা তুলে নিয়ে কাঁপতে কাঁপতে বললো, “আমার… আমার একটা কাজ আছে, আমি আসছি।” ওর চলে যাওয়ার ভঙ্গিতেই সত্যটা প্রজেক্টরের আলোর মতো পরিষ্কার হয়ে গেলো দুজনের কাছে।
বিকেলে কলাভবনের তিন তলার নির্জন বারান্দায় পিয়াল আর মোহনা পাশাপাশি বসলো। দীর্ঘদিনের ভুল বোঝাবুঝিটা কেটে গেছে ঠিকই, কিন্তু চারপাশের বাতাসটা কেমন যেন ভারী হয়েই রইলো।
পিয়াল একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো, “আমরা এত বছরের বন্ধু অথচ একটা বাইরের মেয়ের কথায় একে অপরকে জাজ করে ফেললাম? আমরা কেউ কাউকে একবার সামনাসামনি জিজ্ঞেসও করলাম না!”
মোহনা শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো সামনের আম গাছটার দিকে। ও নিচু গলায় বলল, “তোর ওপর আমার অধিকার আর বিশ্বাসটা এত বেশি ছিলো রে পিয়াল, যে ওটার ওপর আঘাত আসতেই আমার অহংকার কাজ করেছিলো। রাগটা বিশ্বাসের চেয়ে বড়ো হয়ে গিয়েছিলো তখন।”
ওরা আবার আগের মতো কথা বলতে শুরু করল ঠিকই, ডিপার্টমেন্টে একসাথে হাঁটেও। কিন্তু সেই আগের দিনগুলোর মতো প্রাণখোলা হাসিটা কেমন যেন হারিয়ে গেল। গসিপ আর মিথ্যের সেই বিষাক্ত ফিসফাস ওদের সম্পর্কের গভীর আত্মবিশ্বাসে এমন একটা অদৃশ্য আঁচড় কেটে দিয়ে গেছে, যা পুরোপুরি জোড়া লাগার নয়। ওরা বুঝতে পারলো, ভাঙা কাচ জোড়া লাগলেও দাগটা থেকেই যায়।
সুমনা ওদের বন্ধুত্বটা পুরোপুরি শেষ করতে না পারলেও, সেই নিষ্পাপ ও অটুট বিশ্বাসের গল্পে চিরদিনের মতো একটা দীর্ঘশ্বাসের অধ্যায় যোগ করে দিয়ে গেল…
লেখক:
রেজিনা সুলতানা পিয়া
শৌখিন লিখিয়ে; বিভাগীয় প্রধান, ইংরেজি বিভাগ, কানাডিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ; ঢাকা;