। কাজী ইসলাম ।
বাঙালির হাজার বছরের শ্রেষ্ঠতম গৌরবের কীর্তি তার মুক্তিযুদ্ধ!যা আজও স্বমহিমায় দেদীপ্যমান। সূর্যের মতো যার ঔজ্জ্বল্য কাক-চিল -শকুনের ডানা দিয়ে ঢেকে দেবার মতো বালখিল্য চেষ্টা করা হয়েছে বারংবার , এবং প্রতিবারই তা ব্যর্থ হয়েছে। তা ব্যর্থ হবার মূল কারণ মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের প্রান্তিক দরিদ্র জনগোষ্ঠীর সর্বাত্মক, স্বতঃস্ফূর্ত, বীরত্বপূর্ণ অংশগ্রহণ। মুক্তিযুদ্ধ শুধু নাগরিক মধ্যবিত্তের বিলাসী কোন কর্মকাণ্ড ছিল না।
মুক্তিযুদ্ধের কাহিনি কখনো পুরনো হয় না। তাই আমার ব্যাক্তিগত অভিজ্ঞতা লব্ধ এ লেখা।
– – – স্মৃতির পাতা উল্টিয়ে স্মৃতির এ্যালবামের একটি উজ্জ্বল ছবি আবার দেখি, ছবিটি সাদাকালোই, তবে অপূর্ব সুন্দর। এক কালপুরুষের ছবি।
উনিশ’শ একাত্তরের আগস্টে ট্রেনিং শেষে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের ঝাঁপিয়ে পড়তে দেশের অভ্যন্তরে প্রবেশের পরপর একদিন আমাদের উদ্দিষ্ট শেলটারে পৌঁছুবার আগেই সকাল হয়ে আসছিল। আমাদের মুভমেন্ট ছিল মূলত: রাত্তিরে। রাত্রির আঁধার ছিল আমাদের নিরাপত্তার আবরণ। অঞ্চলটা ছিল দালাল এবং রাজাকার অধ্যুষিত। আমাদের গাইড চিন্তিত হয়ে পড়লেন। তখন আমাদের নিরাপত্তা অনেকটাই নির্ভর করতো এই গাইডদের ওপর।
রাত্রির শেষে দিন জাগছিল ধীরে। জনজীবন শুরু হবে শিগগিরই । আমরা জানতাম খুব কাছেই পাকিদের ঘাঁটি। দালাল অধ্যুষিত গ্রাম। নিরাপদ শেল্টার আরো ৬/৭ মাইল দূরে। অতিদ্রুত আমাদের আড়াল দরকার। গ্রামের এক অতি হত দরিদ্র চেহারার বাড়িতে আমাদের থাকবার ব্যবস্থা করলেন গাইড, গৃহকর্তার সঙ্গে কথা বলে।
গৃহকর্তা তাঁর এবং তাঁর পরিবারের সকলের জীবনের ঝুঁকি নিয়েই আমাদের আশ্রয় দিলেন। মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয় দেবার কারণে বহু মানুষকে জীবন দিতে হয়েছিল তখন। অথচ মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এঁদের সাহস ও ত্যাগের কথা খুব কমই উল্লেখিত।
জীর্ণ ছনে ছাওয়া মাটির বাড়ি। সর্বাঙ্গে দারিদ্রের দংশনের ক্ষত চিহ্ন। বর্তমানে বাংলাদেশে এরকম মাটির দেয়ালের ছনের বাড়ি কোথাও আছে কিনা সন্দেহ। বহুদিন নিকানো না হওয়ায় দেয়ালগুলো অসমান, ফাটা ফাটা । বার্ধক্যের বলিরেখার মত দারিদ্রের বলিরেখা যেন! চালের ছনের অবস্থা শোচনীয়। শরৎবাবুর ‘মহেষ‘ গল্পের গফুরের বাড়ির মত আর কি! গফুরের বাড়ি ছিল খরায় জীর্ণ, আমাদের আশ্রয়দাতার বাড়ি বর্ষার আদ্রতায় খিন্ন।
প্রায় সারারাত আমরা হেঁটেছি। সবাই হা ক্লান্ত। আশ্রয়দাতার বয়স বোঝা মুশকিল, ৫০ থেকে ৭০, যে কোনটা হতে পারে। জীবন সংগ্রামের মধ্যদিয়ে গড়ে ওঠা শালপ্রাংশু শরীর, অনেক বর্ষা, গ্রীষ্ম, শীতের ঝঞ্ঝার চিহ্ন চেহারায়। বোঝা যায় সংসার দরিয়ায় জীর্ণতরী বাইতে বাইতে ক্লান্ত, তবু বলিষ্ঠ! কাঁচাপাকা কেশ ও শ্মশ্রু চেহারায় একটি বিশেষত্ব দিয়েছে। পরনে লুঙ্গি, আদুল গায়ে একটা জীর্ণ গামছা জড়ানো। একটা জোয়ান ছেলে সঙ্গে ছিলো। দারিদ্রকে অস্বীকার করে যৌবনের ঔদ্ধত্য তার অবয়বে দৃশ্যমান।
তাঁদের একটা ঘর অতিদ্রূত খালি করে দিলেন। বাড়ির মহিলাদের কোথায় অদৃশ্য করলেন আল্লাহই মালুম। স্যাঁতসেতে মাটির মেঝেতে দ্রূত কিছু বিচালী বিছিয়ে দিলেন বাবা ছেলে মিলে। এক গামলা মুড়িও এনে দিলেন। অমৃতের মত সেই মুড়ি চিবিয়ে ক্লান্ত আমরা ঘুমিয়ে পড়লাম, খড়ের বিছানায়। পালাক্রমে দুজন করে জেগে থাকবে পাহারায়।
দুপুর তিনটের দিকে বিনয়ের সঙ্গে আমাদের ডেকে তুললেন। জানালেন মহিলারা রান্না করেছেন, কিছু খেতে হবে। একজন একজন করে কুয়োর পাড়ে যেয়ে হাতমুখ ধুয়ে এসে মাটিতে বসলাম। বেশিজন একসঙ্গে গেলে পড়শিদের নজরে পড়ার সম্ভাবনা থাকে।
না মাটির অতগুলো সানকি ছিল না, আমরা ১৪-১৫ জন। বড় কচুপাতা এবং কলা পাতায় পরিবেশন করলেন। মোটা লাল চালের ভাত, ডাঁটার মত কিছু দিয়ে ডাল জাতীয় একটা কিছু। সবিনয়ে জানালেন এর বেশি কিছু করার সামর্থ উনার নেই, উনারা যা খান তাই আমাদের দিয়েছেন, আমরা যেন কিছু মনে না করি। মনে আছে ভাত পরিবেশন করেছিলেন একটি জীর্ণ বেতের ধামায় এবং কোণা ভাঙা একটি মাটির কলসীতে করে ডাল। ক্ষুধার্ত আমরা খেয়েছিলাম গোগ্রাসে। আমার মনে হচ্ছিল উনাদের ৪/৫ দিনের মত খাদ্যের ভাঁড়ারে অনাহূত হয়ে ভাগ বসালাম।
দেশে ঢোকাবার আগে আমাদের ব্রীফ করা হয়েছিল- আমরা অতি দরিদ্র কারো ওপর যেন বোঝা না হই। প্রয়োজন বুঝে pay করতে বলা হয়েছিল খাবার দাবার ইত্যাদি বাবৎ। আমার কাছে ২০০/= টাকার একটা ফাণ্ড দেয়া ছিল। ২০০ রুপি, তখন কম না কিন্তু! বারো আনা থেকে একটাকায় বক্সীবাজারের পপুলার রেস্তোঁরায় এক বেলা পেটভরে খাওয়া যেত।
ভদ্রলোক আমাদের সঙ্গে অনেক গল্প করলেন। শিশুর মতো ঔৎসুক্য নিয়ে আমাদের অস্ত্রগুলো নেড়েচেড়ে দেখলেন। দেশের অভ্যন্তরে যুদ্ধ নিয়ে হাল নাগাদ অনেক তথ্য দিলেন, দালাল রাজাকারদের হদিশ দিলেন। কোন্ কোন্ গাঁয়ে মুক্তিযুদ্ধের সমর্থক বেশি জানালেন। আমাদের গন্তব্যে যাবার নিরাপদ রাস্তা গাইডকে বাৎলে দিলেন। এক সময় উদাস হয়ে বললেন, ‘দেশ তো স্বাধীন হবেই, কিন্তু কত যে লোক মারা যাবে, কত মায়ের কোল যে খালি হবে।’ প্রকৃতি উনাকে প্রজ্ঞা দিয়েছিল।
সন্ধ্যা ঘন হয়ে রাত্তিরে পরিণত হতেই আমরা তৈরী হলাম রওয়ানা দিতে। রওয়ানা হবার সময় সবিনয়ে উনাকে ২০ টা টাকা দিলাম বিস্তর ভদ্রলোকোচিত বাত-বাতেল্লার পর। উনি টাকাটা নিয়ে নেড়েচেড়ে দেখলেন। বল্লেন ,“ আমাকে দিলেন?” সবিনয়ে বললাম ‘জী’। একটু ভাবলেন কিছু, তারপর আমার হাতটা টেনে নিয়ে আমার মুঠোয় জোর করে টাকাটা গুঁজে দিয়ে বললেন, “বাবা, এই টাকাটা আমি মুক্তিযুদ্ধে চাঁদা হিসেবে দিলাম, আপনাদের কাজে লাগাবেন”। অশ্রু শাসন করে খর চোখে হাসলাম। উনার হাত দুটো শক্ত করে ধরে রাখলাম খানিকক্ষণ।
কত যে ঋণ বাংলার কাদামাটিতে, ছনের ঘরে, গৃহস্থের আঙিনায় থেকে গেল ! কয় জনমে শোধ হবে গো! হবে কি কখনো?
কাদামাখা রাস্তা ধরে খালিপায়ে উনি বহুদূর আমাদের এগিয়ে দিয়েছিলেন। পেছন ফিরে তারার আবছা আলোয় দেখলাম এক শালপ্রাংশু পুরুষ চরাচর আড়াল করে আশীর্বাদের ভঙ্গিতে হাত তুলে দাঁড়িয়ে আছেন। আঁধারের সিলুয়েটে দেখাচ্ছে যেন ধরিত্রীর বুকে দাঁড়িয়ে মহাকাশে খচিত নক্ষত্ররাজি দিয়ে আঁকা এক কালপুরুষ !
এখনো আঁধার ঘন আকাশে কালপুরুষ দেখলে আমার সেই কাদামাটির ঘরের সাহসী ও দয়ালু গৃহস্থের কথা মনে পড়ে! কল্পনা করতে ভালোলাগে, বাংলাদেশ এই মানুষগুলোর ত্যাগ ও তিতিক্ষা মনে না রাখলেও মহাকাল মহাকাশের প্রচ্ছদে উনার এক প্রতিরূপ স্থাপিত করেছে।
এর ঠিক দুইদিন পর আমাদের আশ্রয় দেবার কথা কোনভাবে জানতে পেরে রাজাকার বাহিনী উনার বাড়িতে হামলা করে। সৌভাগ্য উনারা প্রাণ নিয়ে পালিয়ে যেতে সক্ষম হন, কিন্তু বাড়িটা পুড়িয়ে সম্পূর্ন ধ্বংস করে দেয় রাজাকারেরা।
শুধু ঋনী নয়, অপরাধীও থেকে গেলাম উনার কাছে। কত যে গ্লানি এই জীবনে !
লেখক:
কাজী ইসলাম
মুক্তিযোদ্ধা, কথাসাহিত্যিক ও দন্ত চিকিৎসক; নিউইয়র্ক