“এমন ঘটনা ঘটাব যে দেহাংশ খুঁজে বের করার সময়ও মিলবে না”

Comments
সেদিন সকালের জঙ্গি হামলার ভয়াবহতা কাটিয়ে উঠতে হয়তো অনেক সময় লেগে যাবে শ্রীলঙ্কার। এর মাঝেই চলছে তল্লাশি, বন্দুকযুদ্ধ। সেনাবাহিনীকে দেয়া হয়েছে জঙ্গি দমনে বিশেষ ক্ষমতা। কিন্তু ব্যর্থতার অভিযোগের আঙুল রয়েছে সে দেশের সরকারের দিকেই। ইস্টারের সকালে হামলার মূলচক্রান্তকারী হিসাবে ইতিমধ্যেই মহম্মদ হাশিম মহম্মদ জাহরানের নাম উঠে এসেছে। ছবি প্রকাশ করেছে আইএস। নিজের বোন ভাইয়ের এমনতর কাজে ঘৃণা জানিয়েছেন।

আত্মঘাতী হামলায় জাহরানের মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছে সে দেশের গোয়েন্দারা।  সেই  সঙ্গে জানা গেছে, দীর্ঘদিন ধরেই জিহাদি কাজকর্মে যুক্ত ছিল জাহরান। সোশ্যাল মিডিয়ায় নাশকতার হুমকিও দিয়েছে সে। এমনকি স্থানীয় মুসলিমদের মধ্যেও তাকে নিয়ে অসন্তোষ তৈরি হয়েছিল। তা সত্ত্বেও তার বিরুদ্ধে আগে ভাগে ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

শ্রীলঙ্কার বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম সূত্রে জানা যায়, দেশের পূর্বে উপকূলবর্তী শহর কট্টানকুড়িতে দু’কামরার বাড়িতে মা-বাবা ও চার ভাই বোনের সঙ্গে থাকত জাহরান। তারা বাবা ছিল পেশায় ফেরিওয়ালা। ছিঁচকে চোর হিসেবেও দুর্নাম ছিল তার। সেই অবস্থাতেই বেড়ে ওঠে জাহরান। তবে ছাত্র হিসাবে প্রচণ্ড মেধাবী ছিল সে। স্মৃতিশক্তি ছিল প্রখর। মাত্র ১২ বছর বয়সে জামিয়াতুল ফালাহ আরবি কলেজে ভর্তি হয়। সেখানে অল্পদিনের মধ্যে শিক্ষক-শিক্ষিকাদের নজরে পড়ে যায় সে।

কিন্তু বুদ্ধিমত্তার জন্য যেমন সকলের নজর কেড়েছিল জাহরান, তেমনই একগুঁয়ে, গোঁড়া স্বভাব কারও নজর এড়ায়নি। একদিকে ৩ বছরের  মধ্যে কোরান ঠোঁটস্থ করে ফেলেছিল জাহরান। তারপর নখদর্পণে এনে ফেলেছিল ইসলামি আইনও। কিন্তু ইসলাম সম্পর্কে জানার আগ্রহ যত বৃদ্ধি পাচ্ছিল, ততই অবাধ্য হয়ে উঠছিল সে। এমনকি শিক্ষক-শিক্ষিকাদের সঙ্গেও মতবিরোধ দেখা দিচ্ছিল তার। উদারপন্থী শিক্ষক-শিক্ষিকাদের প্রতি ক্রমশ বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়ছিল জাহরান। তার কলেজের প্রাক্তন সহ অধ্যক্ষ  এসএম আলিয়ার জানান, “আমাদের পড়ানোর আদব কায়দা একেবারেই পছন্দ ছিল না ওর। আমরা যেভাবে কোরান ব্যাখ্যা করতাম, তার ঘোর বিরোধী ছিল জাহরান। ওর বিশ্বাস ছিল কট্টর ইসলামে।”

আচরণে অতিষ্ঠ হয়ে ২০০৫ সালে তাই কলেজ থেকে হাশিমকে বহিষ্কার করা হয় জানিয়ে এসএম আলিয়া বলেন, ‘‘সেই শেষ বার বাবার সঙ্গে স্কুল থেকে বেরিয়ে যেতে দেখেছিলাম তাকে।  তার প্রায় ১৪ বছর পর, সংবাদমাধ্যমে আত্মঘাতী জঙ্গি হাশিমকে দেখতে পেলাম।’’

কলেজ থেকে বহিষ্কৃত হওয়ার পর ২০০৬ সালে দারুল আথার নামে একটি মসজিদে যোগ দেয় জাহরান। সেখানের ম্যানেজমেন্ট কমিটিতেও জায়গা পেয়ে যায় সে। কিন্তু সেখানেও বেশিদিন টিকতে পারেনি। অন্য সদস্যদের সঙ্গে মতবিরোধের জেরে তিনবছরের মধ্যেই মসজিদের চাকরিটি খোয়াতে হয় তাকে। দারুল আথারের ইমাম এমটিএম ফাওয়াজ জানান, কারও মতামত নেওয়ার প্রয়োজন বোধ করত না জাহরান। নিজে থেকেই সব সিদ্ধান্ত নিয়ে নিত। এমনকি ধর্মীয় গোঁড়ামি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে মেয়েদের চুরি ও কানের দুল পরা নিয়েও আপত্তি ছিল তার।

স্কুলে পড়ার সময় হাশিমের সঙ্গে বন্ধুত্ব হয় মহম্মদ ইউসুফ মহম্মদ তৌফিকের। পরে হাশিমের অনুচরে পরিণত হন তৌফিক। মহম্মদ তৌফিক জানান, নিজের পছন্দ মতো কোরানের উল্লেখিত নির্দেশের ভুল অর্থ উদ্ধৃত করা বদভ্যাস হয়ে দাঁড়িয়েছিল জাহরানের। তার জেরেই তিনমাসের জন্য ধর্মোপদেশ দেওয়া থেকে তাকে নিষিদ্ধ করে মসজিদ কমিটি। তারপরই  রাগে সেখান থেকে চলে যায় জাহরান। নিজের অনুগামীদের নিয়ে দল তৈরি করে। তাদের নিয়ে এদিক ওদিক ঘুরে ধর্মীয় বক্তৃতা করত সে।  নিজের মতো করে কোরান ব্যাখ্যা করে শোনাত প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষদের। ২৩ বছর বয়সে ১৪ বছরের একটি কিশোরীকে হাশিম বিয়ে করে বলেও জানা যায়।

উদারপন্থী সুফি সাধকদের বিরুদ্ধে একসময় হাশিম উঠে পড়ে লেগেছিল বলে জানিয়েছেন সুফি মসজিদগুলির দেখভালের দায়িত্বে থাকা সংগঠনের সচিব সাহলান খলিল রহমান। তিনি জানান, ২০০৪ সালে কট্টানকুড়ির একটি সুফি মসজিদে গ্রেনেড হামলা হয়। ২০০৬ সালে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয় বেশ কিছু বাড়িতে। এমনকি তাদের এক নেতাকে খুনের হুমকিও দেওয়া হয় প্রকাশ্য। সুফি সাধকদের ধর্মান্তকরণের উদ্দেশ্যে মৌলবাদী ওয়াহাবিরাই এই ঘটনা ঘটিয়েছিল বলে দাবি তাঁর। আর সেই সুযোগেই সুফি সাধকদের হেনস্থা করতে নেমে পড়ে জাহরান। সুফিদের প্রার্থনার সময় হলে মাইক বাজিয়ে তাদের উদ্দেশে কটুক্তি করতে শুরু করে সে। এমনকি ২০১২ সালে নিজের আলাদা মসজিদও শুরু করে। বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় এবং কেন্দ্রীয় প্রশাসনের কাছে অভিযোগ জানানো হলেও তার বিরুদ্ধে কোনও পদক্ষেপ নেয়া হয়নি।

সোশ্যাল মিডিয়ারও অপব্যবহার করতে শুরু করে জাহরান। মুসলিম ছেলেমেয়েদর মগজধোলাই করতে অনলাইনে নানারকম ভিডিও পোস্ট করতে শুরু করে সে। জিহাদের ডাক দেয়। হুমকি দেয় নাশকতারও। একট ভিডিওয় এমনও বলতে শোনা যায় তাকে যে, ‘‘এমন ঘটনা ঘটাব যে দেহাংশ খুঁজে বের করার সময়ও মিলবে না। আল্লাকে যারা অপমান করে তাদের নরকে পাঠানোর বন্দোবস্ত করে ছাড়ব।’’

তারপরই রোববার, ২১ এপ্রিল, ২০১৯, ইস্টারের সকালে শ্রীলঙ্কায় তার নেতৃত্বে আটটি ধারাবাহিক বিস্ফোরণ ঘটায় জঙ্গিরা। তাতে নারী, পুরুষ এবং শিশু মিলিয়ে ২৫৩ জন প্রাণ হারান। হামলাকারীদের মধ্যে বেশিরভাগই বিদেশ ফেরত, উচ্চ শিক্ষিত, অভিজাত পরিবারের সন্তান বলে তদন্তে  উঠে এসেছে। তবে একমাত্র ব্যতিক্রম তাদের নেতৃত্বে থাকা মহম্মদ হাশিম মহম্মদ জাহরান। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের একগুঁয়ে কিশোর থেকে মধ্য তিরিশের সন্ত্রাসী হয়ে ওঠার যাত্রা কিন্তু দেশের মধ্যেই, প্রশাসনের নাকের ডগায়।

ছবি ও সূত্র: আনন্দবাজার

বাঙ্গালীয়ানা/এসএল

মন্তব্য করুন (Comments)

comments

Share.