কথায় কথায় বহিষ্কার: ভিসি খোন্দকার নাসিরের ‘সন্তান শাসন’

Comments

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গোপালগঞ্জের উপাচার্যের বিরুদ্ধে কথায় কথায় ‘বহিস্কার’ ও ‘শোকজ’ করে শিক্ষার্থীদের স্বাধীনতা ও স্বাভাবিক মত প্রকাশের অধিকার ব্যহত করবার অভিযোগ উঠেছে গত কয়েক মাসে।

বিগত ছয় মাসে সাত শিক্ষার্থীকে সাময়িক বহিষ্কার করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। বহিষ্কৃত ওই শিক্ষার্থীদের ‘অপরাধ’, ফেসবুকে বিরুদ্ধ মত জানিয়ে স্ট্যাটাস দিয়েছিলেন তাঁরা। পরে অবশ্য উপাচার্যের কাছে ক্ষমা চাওয়ায় তিনজনের বহিষ্কারাদেশ তুলে নেওয়া হয়।

এর আগে ১৫ মে ধানের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করার দাবিতে মানববন্ধন করায় ১৪ শিক্ষার্থীকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়। ওই নোটিশে বলা হয়, প্রশাসনের অনুমতি ছাড়া সরকার ও প্রশাসনবিরোধী প্ল্যাকার্ড-ফেস্টুন বহন ও উসকানিমূলক বক্তব্য দেওয়ায় তাঁদের কারণ দর্শানো নোটিশ পাঠানো হয়। তবে শিক্ষার্থীরা ভুল স্বীকার করে নেওয়ায় তাঁদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

খোন্দকার নাসির উদ্দিন সুযোগ পেলেই এ বিশ্ববিদ্যালয়টি নিজে খুলেছেন বলে দাবি করেন। ফাতেমা-তুজ-জিনিয়াকে বহিষ্কার করার আগে নিজ কক্ষে ডেকে তুই তোকারি করে উপাচার্য তাকে বলেছিলেন, ‘আমি খুলছি বলেই তো তোর চান্স হইছে। না হলে তো তুই রাস্তা দিয়া ঘুরে বেড়াতি। বেয়াদব ছেলেমেয়ে।’ উপাচার্য এসব মন্তব্যকে যতই ‘সন্তান শাসনের বকা’ বলেন না কেন তার এমন অশোভন ও অশিক্ষকসুলভ মন্তব্য শিক্ষার্থীদের ক্ষুব্ধ করে বলে বিশ্ববিদ্যালয় সংশ্লিষ্ট অনেকেই মনে করছেন এবং তারা আরও মনে করেন যে উদ্ভট সব কারণে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে কথায় কথায় দেওয়া হচ্ছে কারণ দর্শাও ও বহিষ্কারের নোটিশ।

শ্রেণীকক্ষ পরিষ্কার না থাকায় ক্ষোভ প্রকাশ করে ফেসবুকে স্ট্যাটাস ও মন্তব্য করায় ৪ সেপ্টেম্বর একই বিভাগের ছয় শিক্ষার্থীকে বহিষ্কার করা হয়। পরে ১১ সেপ্টেম্বর ফেসবুকে শিক্ষকদের নিয়ে স্ট্যাটাস দেওয়া ও উপাচার্যের ফেসবুক আইডি হ্যাক করার অভিযোগ এনে আইন বিভাগের ফাতেমা-তুজ-জিনিয়াকে বহিষ্কার করা হয়। তিনি একটি জাতীয় দৈনিকের বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবেদক।

অপর বহিষ্কৃত শিক্ষার্থীরা হলেন ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং (ইইই) বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী হাবিবুল্লা, মো. রাশেদ হাসান, মুনিম ইসলাম, ঝিলাম হালদার, ফাহমিদা বৃষ্টি, দেবব্রত রায়। এঁদের মধ্যে জিনিয়াকে অনির্দিষ্টকালের জন্য বহিষ্কার করা হয়েছে। বাকি ছয়জনের মধ্যে হাবিবুল্লা নিয়নকে এক বছর (দুই সেমিস্টার) ও অন্য পাঁচজনকে ছয় মাসের জন্য (এক সেমিস্টার) বহিষ্কার করা হয়।

ফেসবুকে লেখার তিন মাস পর বহিষ্কার করা হয় ইইই বিভাগের ছয় শিক্ষার্থীকে। বহিষ্কারাদেশের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের পাঁচ কর্মদিবসের মধ্যে নিজেদের পক্ষে যৌক্তিক লিখিত জবাব দিতেও বলা হয়েছিল। পরে উপাচার্যের কাছে শিক্ষার্থীদের ক্ষমার ও অভিভাবকদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে তিন শিক্ষার্থীর বহিষ্কারাদেশ তুলে নেওয়া হয়।

বহিস্কার বিষয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হলে সমালোচনার ঝড় ওঠে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিক সমিতির পক্ষ থেকে এ ঘটনার তীব্র প্রতিবাদ ও নিন্দা জানানো হয়। দেশজুড়ে প্রতিবাদ শুরু হলে অবশেষে নড়েচড়ে বসেছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।

মঙ্গলবার, ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৯, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ একটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দিয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. মাহবুবুল আলমের সই করা ওই লিখিত বক্তব্য পরে সংবাদ সম্মেলনে পাঠ করেন উপাচার্য খোন্দকার নাসির উদ্দিন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের নিয়ে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেওয়া ও উপাচার্যের ফেসবুক আইডি হ্যাক করার অভিযোগ এনে ১১ সেপ্টেম্বরে বহিস্কৃত আইন বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ফাতেমা-তুজ-জিনিয়াকে বহিষ্কারের ব্যাখ্যা দিয়ে উপাচার্য খোন্দকার নাসির উদ্দিন সাংবাদিকদের বলেছেন, একাধিক অপরাধে ফাতেমা-তুজ-জিনিয়াকে বহিষ্কার করা হয়েছে। জিনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের নিয়ে ফেসবুকে অশালীন ও কুরুচিপূর্ণ কথাবার্তা লেখার মতো অপরাধ করেছেন।

লিখিত বক্তব্যে তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ফাতেমা তুজ জিনিয়া সম্প্রতি বিভিন্ন অনলাইন নিউজ পোর্টালে বিশ্ববিদ্যালয়কে নিয়ে বিভিন্ন মিথ্যা বানোয়াট ও ভিত্তিহীন সংবাদ পরিবেশন করেন। এ ক্ষেত্রে কোনো তথ্যের সত্যতা যাচাই করা হয়নি এবং প্রশাসনের কাছ থেকে কোনো তথ্য নেওয়া হয়নি। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়েছে।

উপাচার্য আরও বলেন, জিনিয়া অন্যায়ভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের নিয়ে অশালীন কুরুচিপূর্ণ বক্তব্য দিয়েছেন এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের ফেসবুক, ইমেইল আইডি হ্যাক করেছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইট হ্যাক করে ভর্তি পরীক্ষা বানচালের অপচেষ্টাসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষতি হয়— এমন নানা ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিলেন জিনিয়া। তিনি এরই মধ্যে আমার ব্যক্তিগত ফেসবুক আইডি দুই বার হ্যাক করেছেন।

উপাচার্য খোন্দকার নাসির উদ্দিন বহিষ্কারের বিষয়ে গণমাধ্যমকে  বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষার্থী শিক্ষকদের নাম ধরে ডাকা ও ফেসবুক আইডি হ্যাক করার কাজে সহায়তার মতো কাজ করে। তাদের সতর্ক করার জন্যই সাময়িক বহিষ্কার করা হয়। তারা তো আমার সন্তানের মতোই। পরে ক্ষমা চাওয়ায় কয়েকজনের বহিষ্কারাদেশ তুলে নেওয়া হয়।’

বহিস্কারের নোটিশ পাওয়ার পরে ফাতেমা-তুজ-জিনিয়া গণমাধ্যমকে বলেন, ‘কীভাবে ফেসবুক আইডি হ্যাক করতে হয়, আমি তো সেটাই জানি না। তা ছাড়া উপাচার্য স্যারের ফেসবুক হ্যাক করতে যাব কেন? আমি কোনো দিন বিশ্ববিদ্যালয়কে নিয়ে কোনো মন্তব্য করিনি। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন নিয়ে তো প্রশ্নই ওঠে না।’

জিনিয়া বলেন, ‘একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান কাজ কী হওয়া উচিত?’— সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এমন একটি স্ট্যাটাস দিয়েছিলেন তিনি। সেই পোস্ট নিয়েই উপাচার্য তার সঙ্গে খুব বাজে আচরণ করেন।

জিনিয়া বলেন, এর কিছুদিন পর বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্নীতি নিয়ে লেখায় ভার্সিটির একজন শিক্ষার্থীকে ‘উপাচার্য বাহিনী’র সদস্যরা তুলে নিয়ে যায়। ওই শিক্ষার্থী আমাকে দুর্নীতির প্রাথমিক তথ্য দিতেন। তার কাছ থেকে ফোন ও ল্যাপটপ কেড়ে নিয়ে আমার সঙ্গে কথোপকথনের স্ক্রিনশট নেওয়া হয়। এর কিছুদিন পরই আমাকে বহিষ্কার করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।

ফাতেমা-তুজ-জিনিয়াকে সাময়িক বহিষ্কারের প্রতিবাদে মঙ্গলবার, ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৯, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা ডিসিপ্লিনের (বিভাগ) শিক্ষার্থীরা মানববন্ধন করেন। মানববন্ধনে বশেমুরবিপ্রবির প্রশাসনের সমালোচনা করে বক্তারা বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো একটি জায়গায় তুচ্ছ ঘটনায় কোনো সাংবাদিককে বহিষ্কার বিশ্ববিদ্যালয়ের মননশীলতায় বড় আঘাত। বিশ্ববিদ্যালয় মুক্তচিন্তার জায়গা। সেখানে সামান্য একটি মন্তব্য সহ্য করতে পারছে না বশেমুরবিপ্রবির প্রশাসন। এটা বিশ্ববিদ্যালয়ের মুক্তচিন্তার দ্বার রুদ্ধ করবে। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ওই মানববন্ধনে একাত্মতা প্রকাশে ওই ডিসিপ্লিনের শিক্ষকেরাও অংশ নেন।

এর আগে সোমবার, ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৯, বেলা সাড়ে ১২টায় ঢাবির সন্ত্রাসবিরোধী রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে ‘মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চ’ ব্যানারে গোপালগঞ্জের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বশেমুরবিপ্রবি) উপাচার্য খোন্দকার নাসির উদ্দিনের পদত্যাগের দাবি ও ফাতেমা-তুজ-জিনিয়াকে সাময়িক বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহারের দাবিতে মানববন্ধন করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ (ঢাবি) বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা। বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষকও তাদের সাথে যোগ দেন।

তবে এসব বিষয়ে উপাচার্য খোন্দকার নাসির উদ্দিনের মন্তব্য জানতে সরাসরি ফোনে কথা বলতে চাইলেও এ প্রতিবেদক ফোনে তাকে পাননি।

বাঙালীয়ানা/এসএল

মন্তব্য করুন (Comments)

comments

Share.