কবি এলিয়ট, তাত্ত্বিক এলিয়ট । তুষার তালুকদার

Comments

।। তুষার তালুকদার ।।

গোটা বিশ্বসাহিত্যের জন্য বিশ শতক নানা কারণে খুব গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এ শতকেই ঘটে আধুনিকতাবাদের উত্থান, তখনই ইউরোপীয় সভ্যতাসহ নানা সভ্যতায় এসেছিল যুগান্তকারী পরিবর্তন, কৃষিভিত্তিক সমাজ রূপ নেয় শিল্পনির্ভর সমাজে, এবং নগরায়ণ দেয় মানুষের জীবনকে ভিন্ন মাত্রা। তবে ঐ শতকে এ সবকিছুকে ছাপিয়ে মানুষের জীবন ও মূল্যবোধে আমূল পরিবর্তন আনা দুটি ঘটনা ছিল প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। আর এর ফলে পৃথিবীব্যাপী সকল সভ্যতায় আসে আমূল পরিবর্তন, তবে পরিবর্তনের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে বিবেচনায় নিতে হয় ইউরোপীয় সভ্যতাকে। আর বিশ শতকের এ সকল ঘাত-প্রতিঘাত সবচেয়ে বেশি যে কবির কবিতা ও অন্যান্য সাহিত্যকর্মে ধরা পড়েছে তাঁর নাম টি. এস. এলিয়ট (১৮৮৮-১৯৬৫)। হ্যাঁ, মানতেই হবে, তিনি বিশ শতকের একজন আধুনিক কবি। তাঁর কবিতার চিত্রকল্প তাঁকে আধুনিক করে তুলেছিল, তাঁর কবিতায় প্রতিস্থাপিত আধুনিক মানুষের মধ্যকার যোগাযোগের গভীর সমস্যা তাঁর আধুনিকতাকে ভিন্ন মাত্রা দিয়েছিল, এবং ইউরোপীয় সভ্যতার অবক্ষয় ও ব্যক্তি মানুষের স্বপ্ন-স্বপ্নভঙ্গ তাঁর আধুনিক চিন্তার ভিত্কে পোক্ত করেছিল। তবে এ-লেখা কেবল কবি এলিয়ট ও তাঁর কবিতা নিয়েই পড়ে থাকবে না, তাত্ত্বিক এলিয়টের একপেশে চিন্তার রাজ্যেও খানিকটা ঘুরে বেড়াবে।

প্রথমেই বলি, কবি এলিয়ট-এর কবিতার কথা। তাঁর পুরো সাহিত্যকর্মের মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত তিনটি কবিতা “দি লাভ সং অব জে আলফ্রেড প্রুফ্রক” (১৯১৭), দি ওয়েস্ট ল্যান্ড ও ফোর কোয়ার্টেটস্। জে আলফ্রেড প্রুফ্রক কবিতাটি আমাদের একজন মাঝ বয়সী আধুনিক মানুষের বিষণ্ণতা ও হতাশার কথা মনে করিয়ে দেয়। প্রেমিক প্রুফ্রক হ্যামলেটের মতো দ্বিধাগ্রস্থ, তবে প্রাজ্ঞ। তার ক্লান্তির শেষ নেই। সে তার মনের গভীরে জমে থাকা প্রেমের কথা বলতে পারে না। তার বিচ্ছিন্নতা ও যোগাযোগহীনতা তাকে আধুনিক হতাশাগ্রস্থ মানুষে পরিণত করেছিল। আর তাকে কেন্দ্র করেই এলিয়ট সৃষ্টি করেন বিখ্যাত উপমা আর উপমার ভেতর চিত্রকল্প। উক্ত চিত্রকল্প সম্পর্কে বলতে গিয়ে বহুমাত্রিক চিন্তাবিদ হুমায়ুন আজাদ তাঁর “টি এস এলিয়ট: বিশ শতকের বিভ্রান্ত মহাকবি” শিরোনামের প্রবন্ধে বলেন, “প্রুফ্রক অভিসারে যেতে চেয়েছে যখন টেবিলের উপর ইথারে অজ্ঞান করা রোগীর মতো আকাশে ছড়িয়ে আছে সন্ধ্যা। এতো কালের সুন্দর সন্ধ্যা হয়ে ওঠে অসুস্থ, অজ্ঞান বিবশ, যে-রোগ থেকে সে আজো সেরে ওঠে নি।” আজাদ মনে করেন, বদলেয়ার, মালার্মে, র্যাঁবো চিত্রকল্প ব্যবহারের ক্ষেত্রে যে আধুনিকতাবাদের সূচনা করেছিলেন তাকে পরিপূর্ণতা দেন এলিয়ট উক্ত চিত্রকল্পের মাধ্যমে। পাশাপাশি, যুদ্ধোত্তর সমাজে মানুষ যে তীব্র দোটানায় ভুগছিল তার চিত্র বড় হয়ে ধরা দেয় আমাদের চোখের সামনে উক্ত কবিতার মাধ্যমে।

তবে এ-কথা বলতে দ্বিধা নেই, এলিয়টের সবচে উদ্যাপিত, পঠিত কবিতা দি ওয়েস্ট ল্যান্ড (১৯২২)। হ্যারল্ড ব্লুমসহ বোদ্ধাদের অনেকেই বলেছেন, অনেক বেশি পুরাণ, বাইবেল আক্রে ধরা কবিতা এটি। অবশ্যই এলিয়টের ধার্মিকতার চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ এ-কবিতাটি। কিন্তু কেবল ধর্মাক্রান্ত বলে এর গুরুত্বকে উড়িয়ে দেয়া যৌক্তিক হবে না। বিশ শতকের ইউরোপীয় সভ্যতার সংকট, বিজ্ঞানের উত্থান, সৃষ্টিকর্তার উপর মানুষের আস্থাহীনতা, মানবমনের গভীর কোনে লুকিয়ে থাকা ভণ্ডামি, প্রতারণা ইত্যাদি নানা বিষয়কে খ্রিস্ট ধর্মীয় বিভিন্ন মিথের মাধ্যমে প্রতীকী রূপ দিয়েছেন কবি। এবং এসব কারণে পাশ্চাত্য সভ্যতার উপর আস্থা হারান তিনি। তাই ফিরে যান প্রাচ্য সভ্যতার কাছে। হিন্দু ও বৌদ্ধ ধর্মের মধ্যে প্রশান্তি খোঁজেন। পাশ্চাত্যের মানুষকে পরামর্শ দেন গঙ্গায় গিয়ে তাদের পাপ ধুয়ে মুছে পরিশুদ্ধ করতে। তাই সংগত কারণেই এ কবিতাটিকে কেবল পুরাণের আলোকে দেখলে ভুল হবে। এজরা পাউন্ড বলেছিলেন, ‘এ-কবিতার মাধ্যমে বিশ শতকের বিশ্বাসহীনতা আমাদের সামনে মূর্ত হয়ে ওঠে।’ তবে কবিতাজুড়ে থাকা অসংখ্য টীকা নির্দেশ, ইংরেজিতে যাকে বলে এলিউশান-এর কারণে অনেকেই এর বোধগম্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে থাকেন। এ-বিষয়ে আমিও একমত। মাত্রাতিরিক্ত রেফারেন্স কিংবা তথ্য নির্দেশ এ-কবিতার সৌন্দর্য্যকে ম্লান করেছে। তবুও এর চিত্রকল্প ও প্রতীকী ভাব একে বিশিষ্টতা দিয়েছে।

অন্যদিকে, ফোর কোয়ার্টেটস্ (১৯৪৫)-কে অনেকে বলেন এলিয়টের সবচেয়ে পরিণত কবিতা, যদিও কেউ কেউ একে দুর্বোধ্য বলে আধুনিক কবিতা হিসেবে মানতে চান না। তবে সময় ও স্থান নিয়ে যে বিশ্লেষণ তিনি এতে হাজির করেন তাতে আমার তো মনে হয় আধুনিকতার একেবারে গভীরে পৌঁছে গেছেন এলিয়ট। এ-কবিতায় তাঁর বিখ্যাত পংক্তি ‘অতীতকে ফিরিয়ে আনা যাবে না, বর্তমানই মূখ্য কারণ ভবিষ্যৎ আমাদের অজানা’ তো আমাদের চিন্তার আদলকে বদলে দেয়। তাছাড়া তাঁর মতে, এ যুগে আমরা ‘সময়ের দাস’-এ পরিণত হয়েছি। এ-রচনা আমাদের জানায়, স্থানিক সমস্যা আধুনিক মানুষের সবচেয়ে বড় সমস্যা। এর কারণে বিচ্ছিন্নতাও বাড়ে। এসকল বাস্তবসম্মত কারণে এ-কবিতাটিকে এলিয়টের আধুনিকতম কবিতা বললে অত্যুক্তি হবে না।

এবারে খানিকটা সড়ে গিয়ে তাত্তিক টি এস এলিয়ট সম্পর্কে একটু জানি। অনেকেই জানেন, তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ট্র্যাডিশান অ্যান্ড দ্য ইনডিভিজ্যুয়াল ট্যালেন্ট (১৯২০) এলিয়টকে তাত্তিক ও দার্শনিক হিসেবেও প্রতিষ্ঠা দিয়েছে। একজন কবির স্বকীয়তা ও মৌলিকত্ব নির্ভর করে তার পূর্বাপর কবিদের থেকে নিজেকে আলাদাভাবে উপস্থাপনের মাধ্যমে এমন ধারণার ঘোর বিরোধিতা করেন এলিয়ট তাঁর উক্ত গ্রন্থে। তাঁর মতে, একজন কবির সবচেয়ে স্বকীয় ধারণাগুলোর মধ্যে লুকিয়ে থাকে তার পূর্বাপর কবিদের ভালো লেখাগুলোর থিম বা ভাব। তাঁর ঐ গ্রন্থ থেকে জানা যায়, একজন সাহিত্যিকের ইতিহাস চেতনা মানে তার পূর্বেকার সাহিত্যিকদের সৃষ্টিকর্মের সঙ্গে কেবল মিল থাকা নয় বরং ঐ সব সাহিত্যিকের কাজের সঙ্গে তার কাজের সম্পর্কও ইতিহাস চেতনার আওতাভুক্ত। এলিয়টের তত্ত বিশ্লেষণ করলে দাঁড়ায়, কোনো শৈল্পিক সৃষ্টি শূন্য থেকে হয় না। কোনো নতুন সাহিত্যকর্মের প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত পুরাতনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নতুনকে জায়গা করে দেয়া। সেই সাথে যে কোনো সৃষ্টিকর্মের নির্ব্যক্তিকরণ বা ডিপারসনালাইজেসান-এর উপরও জোর দেন এলিয়ট। তাঁর ভাষায়, “কবি কেবল মাধ্যম মাত্র। কবিতা সৃষ্টি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তা কবি থেকে আলাদা হওয়া বাঞ্ছনীয়। মহৎ সাহিত্য কখনো ব্যক্তিগত আবেগ, অনুভূতিকে প্রকাশ করে না। ভালো কবিতা ব্যক্তির গণ্ডি পেরিয়ে মহাকালের হয়ে যায়।” প্রখ্যাত সাহিত্যবোদ্ধা হ্যারল্ড ব্লুম এলিয়টের এ-তত্তের তীব্র সমালোচনা করেন। তাঁর মতে, “একজন শক্তিমান কবি বা সাহিত্যিক তাঁর পূর্বাপর কবিদের ঐতিহ্য বা ধারাবাহিকতার বিরোধিতা করতেই পারেন; হতে পারেন স্বাধীন; রচনা করতে পারেন একেবারে নতুন কিছু যা তার পূর্বাপর কবিদের বা সাহিত্যিকদের সৃষ্টিকর্মে হয়তো নেই।” তবে এলিয়ট ও ব্লুম দুজনই তাদের মতামতের ক্ষেত্রে একগুয়ে মনোভাবের প্রকাশ ঘটিয়েছেন। এলিয়টের ‘ডিপারসনালাইজেসান অব পোয়েট্রি’-এর ধারণার সাথে মোটেও আমি একমত নই। কারণ সবক্ষেত্রে কবিকে কবিতা থেকে আলাদা করা যায় না। কোনো কোনো ক্ষেত্রে কবি ও কবিতা পরিপূরক হিসেবে কাজ করে। যেমন উইলিয়াম ওয়ার্ডসওয়ার্থ-এর কবিতা যেখানে প্রকৃতিকে নিয়ে কবির ব্যক্তিগত আবেগ, অনুভূতি স্থান পেয়েছে। এবং সেসব অনুভূতির আলোচনা কবিকে বাদ দিয়ে অর্থহীন। এক্ষেত্রে এলিয়টের নির্ব্যক্তিকরণের ধারণা মেনে নিলে সেসব কবিতাকে মহৎ বা কালোত্তীর্ণ বলা যাবে না। কিন্তু তা তো কারও পক্ষেই, বোধ করি, বলা সম্ভব নয়। আবার, ব্লুমের কথা মেনে নিয়েও বলতে হয়, পূর্বাপর সাহিত্যিকদের সাহিত্যকর্মকে আমলে না নিয়ে নতুন সাহিত্য যে রচিত হয়নি তা নয়, তবে সেসব কাজেও আগেরকার কবি-সাহিত্যিকদের কাজের ছাপ কিছুটা রয়েছে বৈকি!

শেষ নাগাদ এটুকুন বলতে পারি, কবি ও তাত্তি¡ক দুই পরিচয়েই সাহিত্যপ্রেমীদের কাছের মানুষ হয়েছেন ১৯৪৮ সালে সাহিত্যে নোবেল বিজয়ী টি. এস. এলিয়ট। আমরা শত বছর পরও তাঁর কবিতা আগ্রহভরে পড়ি, শিক্ষকেরা ক্লাসে পড়ান। এত বছর পরও তাঁর তত্ত কথা নিয়ে গবেষকরা গবেষণা করেন,  সেসব থেকে সমালোচকেরা নতুন চিন্তার রসদ পান। তাঁর কবিতা মহাসমুদ্রের মতো বিশ্বপাঠককে ধারণ করে, শতকের পর শতক ধরে করবে। জয়তু এলিয়ট!

তুষার তালুকদার

লেখক, সহকারী অধ্যাপক, ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগ, সেন্ট্রাল উইমেন্স ইউনিভার্সিটি, ঢাকা।

 

 

মন্তব্য করুন (Comments)

comments

Share.