কমরেড কামাল লোহানী । মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম

Comments

কামাল লোহানী ছিলেন আমার শ্রদ্ধেয় ও প্রিয় ব্যক্তিদের মধ্যে অন্যতম। তাঁর সঙ্গ, তাঁর সান্নিধ্য ও তাঁর সাথে পথ চলা সবসময়ই আমাকে বিপ্লবী প্রেরণায় উজ্জ্বীবিত করতো। প্রগতির সংগ্রামে এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে তিনি সবসময় আমাকে প্রেরণা যোগাতেন। তাঁর প্রয়াণের পরেও তাঁর স্মৃতি আজও আমাকে একইভাবে বিপ্লবী প্রাণশক্তি যোগায়।

কামাল লোহানী ছিলেন আমার একজন অগ্রজ ‘কমরেড’। বয়সের ক্ষেত্রে এক দশকের মতো ব্যবধান সত্তে¡ও, সমাজতন্ত্র-সাম্যবাদ অভিমুখী অগ্রযাত্রার সংগ্রামী অভিযাত্রায় আমার ছিলাম পরস্পরের সহযোদ্ধা ও বন্ধু। ৬০-এর দশকে কমিউনিস্ট আন্দোলনে বিভক্তি আসার পর আমরা দু’জন কখনও একই পার্টিতে ছিলাম না। কিন্তু তা সত্তে¡ও তাঁকে আমি সবসময় একজন নিবেদিতপ্রাণ কমরেড হিসেবেই গণ্য করতাম। মানবমুক্তির মহাসংগ্রামে কমরেড কামাল লোহানীর অবদান নিশ্চিতভাবেই অক্ষয় হয়ে থাকবে।

কামাল লোহানীকে আমি আগাগোড়াই ‘লোহানী ভাই’ বলে সম্বোধন করতাম। তাঁর রাজনৈতিক পরিচয়ে তাকে চেনার আগে আমি লোহানী ভাইকে একজন নৃত্যশিল্পী হিসেবে প্রথম দেখেছিলাম। ৬০-এর দশকের একেবারে শুরুতে আমি ‘আছিয়া’ নামে একটি সিনেমায় নায়কের ছোটবেলার চরিত্রে অভিনয় করেছিলাম। আমি তখন স্কুলের ৬ষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র। ‘আছিয়া’ সিনেমার একটি অংশে গ্রামীণ মেলার পুতুলনাচের একটি দৃশ্য ছিল। সেই দৃশ্যের জন্য গঠিত নাচের দলের অন্যতম সদস্য ছিলেন কামাল লোহানী। ছোটবেলায় সেদিন যাকে নৃত্য অভিনেতা হিসেবে দেখেছিলাম তিনিই যে কামাল লোহানী- সে কথা অনেক পরে জেনেছিলাম। বহুদিন পরে কথায় কথায় ‘আছিয়া’ সিনেমার প্রসঙ্গটি ওঠায় লোহানী ভাই জানিয়েছিলেন যে তিনি সেই নাচের দৃশ্যের একজন শিল্পী ছিলেন।

লোহানী ভাইয়ের পোশাক ছিল সাদা ঢোলা পায়জামা-পাঞ্জাবি। কোনোদিন এর ব্যতিক্রম হয়েছে বলে মনে করতে পারছি না। এই পোশাক নিয়ে তাঁর বিদ্রোহের কথা এখানে উল্লেখ করার লোভ সামলাতে পারছি না। ১৫ আগস্ট পরিবর্তী রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে তিনি রাজশাহী থেকে প্রকাশিত ‘দৈনিক বার্তা’র সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। ১৯৭৮ সালে আফ্রিকার দেশে জাম্বিয়ার রাজধানী লুসাকাতে কমনওয়েলথ রাষ্ট্রপ্রধানদের একটি সম্মেলন হচ্ছিল। সেখানে কামাল লোহানী বাংলাদেশের প্রেসিডেন্সিয়াল এনট্যুরেজের একজন সদস্য মনোনীত হয়েছিলেন। কিন্তু যাওয়ার সময় তাঁর ‘ট্রেড মার্ক’ পোশাক নিয়ে বিপত্তি বাঁধে। রাষ্ট্রপতির সামরিক সচিব তাঁকে পায়জামা-পাঞ্জাবির পরিবর্তে স্যুট-কোট-টাই পরতে পরামর্শ দেন। কিন্তু কামাল লোহানী সেই পরামর্শ শুনতে নারাজ। তিনি তাঁর চিরাচরিত পোশাক পরেই সম্মেলনে অংশগ্রহণের জন্য দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। কারণ, এর আগেও তিনি এই পোশাকেই বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। কোথাও কোনো সমস্যা হয়নি। কিন্তু সামরিক সচিব সেটি মানতে নারাজ। কামাল লোহানীও নিজের অবস্থানে অচল। একপর্যায়ে রাষ্ট্রপতির সামরিক সচিবের সঙ্গে তাঁর এ নিয়ে বিতর্ক হয়। শেষে তিনি সেই অনুষ্ঠানেই না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।

কিশোর বয়সে যখন থেকে আমি রাজনীতি ও ছাত্র আন্দোলনে যুক্ত হই তখন থেকেই কালাম লোহানীর নামের সঙ্গে ও সেই নামের মানুষটির সঙ্গে আমার পরিচয়। তিনি তখন সাংবাদিকতার পাশাপাশি একজন শক্তিশালী সাংস্কৃতিক সংগঠক হিসেবে জাতীয়ভাবে সুপরিচিত। তাঁর ‘বামপন্থি’ পরিচয়ও ছিল সর্বজনবিদিত। সেসময় তাঁর নেতৃত্বে ‘ক্রান্তি’ নামে একটি সাংস্কৃতিক সংগঠন গড়ে উঠেছিল। লোহানী ভাই ছিলেন সেই সংগঠনের কাÐারি। ‘ক্রান্তি’-র মাধ্যমে তিনি উদ্দীপনামূলক ও দেশপ্রেমিক গণ-সাংস্কৃতিক কর্মকাÐ পরিচালনা করতেন। তিনি শুধু একজন সাংস্কৃতিক সংগঠকই ছিলেন না, তিনি নিজেই একজন জনপ্রিয় ‘পারফর্মারও’ ছিলেন। আমরা জড়িত ছিলাম ‘সংস্কৃতি সংসদ’, ‘ছায়ানট’, ‘উদীচী’ প্রভৃতি সাংস্কৃতিক সংগঠনের সাথে। বামপন্থি ধারার এই দুই সাংস্কৃতিক গোষ্ঠীর মধ্যে এক ধরনের প্রতিযোগিতা ছিল। কিন্তু তাদের মধ্যে সহযোগিতা ও যৌথ কর্মকাণ্ডও ছিল। রবীন্দ্র জন্মবার্ষিকী পালন বা রবীন্দ্র সংগীতের বিরুদ্ধে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে আমরা একসাথে লড়েছি। বিশেষ উপলক্ষে একসাথে অনুষ্ঠানও করা হতো। যেমন মহান শহীদ দিবসে ২১ ফেব্রুয়ারিতে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে কিম্বা পল্টন ময়দানে সব প্রগতিশীল সংগঠনের শিল্পীদের নিয়ে সম্মিলিতভাবে অনুষ্ঠান হতো। এসব অনুষ্ঠানের সূত্র ধরেই মূলত লোহানী ভাইয়ের সাথে আমার পরিচয় ঘনিষ্ঠ হওয়ার সুযোগ হয়েছিল। এরপর থেকে লোহানী ভাইয়ের সাথে ঘনিষ্ঠতা দিনে দিনে ক্রমাগত আরো গাঢ় হয়েছে।

কমরেড কামাল লোহানী মার্কসবাদী মতবাদে এবং সমাজতন্ত্র-সাম্যবাদের আদর্শে দীক্ষিত ছিলেন। তার গোটা জীবনটাই ছিল শোষণহীন সাম্যের সমাজও সভ্যতা নির্মাণের লক্ষ্যে রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক-সাংবাদিকতার লড়াইয়ে মোড়ানো। ছাত্র জীবনেই তিনি ভাষা আন্দোলনে যুক্ত হন। তারপর থেকে বিরতহীনভাবে তিনি গণতন্ত্রের জন্য, সাম্প্রদায়িকতা ও সাম্রাজ্যবাদকে রোখার জন্য, বাঙালি জাতির আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকারে জন্য, মেহনতি মানুষের রুটি রুজির অধিকার ও শোষণমুক্তির জন্য সংগ্রাম করে গেছেন। শৈশবকাল থেকেই তিনি কমিউনিস্ট পার্টি ও কমিউনিস্ট আন্দোলনের সাথে যুক্ত ছিলেন। তাকে বার বার কারাগারে যেতে হয়েছে। কারাগার থেকে বের হয়ে এসে তিনি আবার গণমানুষের মুক্তির আন্দোলনে দাঁড়িয়েছেন। তিনি কখনও পিছু হটেননি। জেল-জুলুম-অত্যাচার কখনোই তাঁকে তাঁর আদর্শ ও সংগ্রাম থেকে বিরত রাখতে পারেনি। তিনি মানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রামকে জীবনের ব্রত হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন।

কামাল লোহানীর যখন রাজনীতিতে দীক্ষা গ্রহণ ঘটে তখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ মাত্র শেষ হয়েছে। দেশভাগ হয়েছে। মন্বন্তর আর দাঙ্গায় জর্জরিত এই উপমহাদেশ। এর মধ্যেই সৃষ্টি হয়েছে ‘নাচোলের রানীমা’ ইলা মিত্রের নেতৃত্বে ঐতিহাসিক তেভাগা আন্দোলন, মণি সিংহের নেতৃত্বে টংক প্রথা বিরোধী সশস্ত্র বিদ্রোহ, বারীণ দত্ত-অজয় ভট্টাচার্যের নেতৃত্বে নানকার প্রথা বিরোধী লড়াই, রাজশাহী জেলের খাপড়া ওয়ার্ডে কমিউনিস্ট বন্দীদের উপর পরিচালিত জেল হত্যাকাণ্ড, শুরু হয়েছে ভাষা আন্দোলন ইত্যাদি। এই পরিস্থিতিতে সাংস্কৃতিক আন্দোলন আর কমিউনিস্ট আন্দোলন হাত ধরাধরি করে সামনে এগিয়ে গেছে। সেই সময়ের গর্ভ থেকে বেরিয়ে এসেছিলেন তারুণ্যে ভরপুর এক উদ্দীপ্ত কিশোর, কামাল লোহানী।

সমাজ বাস্তবতার মধ্যে নিজের বিবেকবুদ্ধিই কামাল লোহানীকে কমিউনিস্ট আন্দোলনের দিকে এগিয়ে দিয়েছিল। তিনি ছিলেন সরাসরি ‘৫২-র ভাষা আন্দোলনের সন্তান’। তাঁর বিপুল অভিজ্ঞতা এই দেশের গণমানুষের বীরত্বপূর্ণ শ্রেণি-সংগ্রামের সঙ্গে মিশে গিয়েছিল। তিনি ছিলেন একজন বিপ্লবী সাধক ও সৈনিক। তিনি আমাদের সংস্কৃতির অঙ্গনকে যেমন সমৃদ্ধ করে গেছেন তেমনি মানুষের মুক্তি ও শোষণমুক্ত সমাজের জন্য সব সংগ্রামে তিনি ছিলেন পরিপূর্ণভাবে একাত্ম। তিনি ছিলেন একজন নির্ভীক সাংবাদিক ও সাংবাদিকতার স্বাধীনতার জন্য নিরলসভাবে লড়াই করে যাওয়া একজন মানুষ।

আমাদের দেশের ‘রাজনীতিতে রয়েছে সংস্কৃতির অভাব এবং সংস্কৃতিতে রয়েছে রাজনীতির অভাব’ বলে একটি গুরুতর দৈন্যের কথা সাধারণভাবে স্বীকৃত। কামাল লোহানী এ কথাটিকে মিথ্যা প্রমাণ করেছিলেন। সেই দৈন্য দূর করে তিনি রাজনীতি ও সংস্কৃতির মধ্যে মেলবন্ধনের প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন।

কামাল লোহানী ভাষা আন্দোলনের বছরই মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। এরপর তিনি উচ্চ মাধমিকে ভর্তি হন পাবনা এডওয়ার্ড কলেজে। ভাষা আন্দোলনে যারা নেতত্ব দিয়েছিলেন তাদেরই একটি অংশ পরবর্তী সময়ে প্রগতিশীল অসাম্প্রদায়িক ছাত্র সংগঠন, পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের সাথে যুক্ত হয়েছিলেন। তাঁদের নেতৃত্বেই এই সংগঠন সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছিল। কামাল লোহানী পাবনা এডওয়ার্ড কলেজে প্রগতিশীল সমমনাদের নিয়ে নির্বাচন করেছেন এবং সেখানে জয়লাভ করেছেন। ছাত্র আন্দোলনের পাশাপাশি সে সময়টি ছিল সাংস্কৃতিক আন্দোলনের স্বর্ণযুগ। কামাল লোহানী তাতে নিবিড়ভাবে যুক্ত হয়ে পড়েন। রাজধানী ঢাকায় এসে তিনি তরুণ শিল্পী-সাহিত্যিক-বুদ্ধিজীবী মহলের একজন স্বাভাবিক অগ্রণী ব্যক্তি হয়ে ওঠেন।

কামাল লোহানী ছিলেন একজন নীতিনিষ্ঠ ও কমিটেড মুক্তিযোদ্ধা। আমাদের মুক্তিযুদ্ধে সাংস্কৃতিক আন্দোলনের গুরুত্ব ছিল অপরিসীম। মুক্তিযুদ্ধের একেবারে শুরুতেই আমি ন্যাপ-কমিউনিস্ট পার্টি-ছাত্র ইউনিয়নের যৌথ গেরিলার বাহিনীর সশস্ত্র কর্মকাণ্ডে, ট্রেনিং ক্যাম্পে, বেস ক্যাম্পে ইত্যাদির কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ি। আর লোহানী ভাই যুক্ত হয়ে পড়েন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের কাজের সাথে। দু’জনার কাজ ছিল দু’ধরনের। কিন্তু দু’ধরনের কাজই ছিল গুরুত্বপূর্ণ। শিল্পী-বুদ্ধিজীবীদের কর্মকাণ্ড মুক্তিযোদ্ধাদের অফুরন্ত প্রাণশক্তি দিয়েছে, তাদের যুদ্ধপ্রয়াস অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করা মুক্তিযোদ্ধাদের ও সমগ্র দেশবাসীকে প্রতিনিয়ত উজ্জীবিত করেছে।

স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে আমরা যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ গঠনে মনোযোগী হই। এর কিছুদিনের মধ্যেই ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করা হয়। সেই সময়কার সামরিক শাসন ও স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে আমরা কখনো পাশাপাশি থেকে, কখনো একসাথে লড়াই করেছি। আশির দশকে আমি ক্ষেতমজুরদের আন্দোলনকে সংগঠিত করতে সক্রিয়ভাবে কাজে নেমে পড়ি। সারা দেশে চারণের বেশে ঘুরে ঘুরে ক্ষেতমজুরদের সংগঠিত করি। সেই আন্দোলন বাংলাদেশের মানুষের হৃদয় স্পর্শ করেছিল। লোহানী ভাই এই আন্দোলনের প্রতি সহমর্মী ছিলেন। তাঁর সাথে যখনি দেখা হয়েছে, তিনি আগ্রহ নিয়ে আন্দোলনের কথা আমার কাছ থেকে শুনতেন এবং উৎসাহ দিতেন।

ষাটের দশকে আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলনে বিভক্তি দেখা দেয়। সেই বিভক্তির ঢেউ এসে আমাদের দেশের কমিউনিস্ট আন্দোলনেও লাগে। এদেশেও কমিউনিস্ট আন্দোলন রুশপন্থি, চীনাপন্থি নামে দ্বিধা-বিভক্ত হয়। কখনো কখনো তাদের মধ্যে মুখোমুখি বৈরিতার পরিবেশও তৈরি হতো। কামাল লোহানী চীনাপন্থি অংশের সাথেই ছিলেন। কিন্তু তিনি কোনোদিন এই বৈরিতাকে প্রশ্রয় দেননি। তিনি দু’পক্ষের শ্রদ্ধা ও সম্মান অর্জন করেছিলেন এবং সম্মিলিত সাংস্কৃতিক আন্দোলনের অগ্রভাগে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন।

লোহানী ভাইয়ের সাথে পরবর্তী সময়ে যখনি এ বিষয়ে কথা হয়েছে, এই ধরনের দ্বিধা-বিভক্তিকে স্থায়ী করে রাখা নিয়ে তিনি হতাশা ব্যক্ত করতেন। তিনি কখনোই বামপন্থিদের মধ্যে বিভক্তি চাননি। এই দলাদলি তাঁকে পীড়া দিত। এই বিভেদকে তিনি কখনোই ইতিবাচকভাবে দেখেননি। যেটুকু দ্বন্দ্ব আছে সেটা ভুলে সবাই একসাথে কাজ করুক- এটিই ছিল তাঁর আকাঙ্ক্ষা। একজন রাজনীতি সচেতন বুদ্ধিজীবী হিসেবে তিনি ঐক্যবদ্ধ বামপন্থি আন্দোলনের কথা ভাবতেন।

মার্ক্সবাদ-লেনিনবাদের প্রতি তাঁর অবিচল আস্থা আমি সারাজীবনই দেখেছি। শোষণমুক্তির সংগ্রাম আর শ্রেণিসংগ্রামের লড়াইয়ে তিনি সারাজীবন নিজেকে ব্যপ্ত রেখেছেন। একসময় তিনি সাংগঠনিকভাবে কোনো একটি বিশেষ পার্টির সাথে নিজেকে যুক্ত না করে সম্পৃক্ততা ছিল সবার সাথে সম্পর্ক রেখে চলা শুরু করেন। আমার সাথে যখনি তিনি কথা বলতেন, তখন জোর দিতেন কীভাবে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা কমিউনিস্টদের এক কাতারে এনে মানুষের অধিকার আদায়ের লড়াইকে আরো জোরদার করা যায়। তিনি আশা পোষণ করতেন, আমরা হয়তো সব বিভেদ ভুলে গিয়ে এক হতে পারব। এটা ঠিক, তিনি এ ব্যাপারে কখনো মধ্যস্ততার ভূমিকা নেননি। কিন্তু তিনি অপেক্ষা করেছিলেন, বামপন্থিরা যেন সেই ইতিবাচক পথে অগ্রসর হয়ে যায়। নানা সময়ে নানাভাবে আমরা সেই ধরনের উদ্যোগ হয়তো কখনো কখনো নিয়েছি। কোনো একটি বিশেষ ইস্যুতে হয়তো আমরা একসাথে লড়াইও করেছি। কিন্তু সামগ্রিকভাবে মানুষের প্রত্যাশা অনুযায়ী, কমিউনিস্ট ঐক্য আমরা গড়ে তুলতে সক্ষম হইনি। এটা আমারও একটি দুঃখ।

কামাল লোহানী একসময় বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। অনেকে তাকে এ দায়িত্ব গ্রহণ না করার জন্য পরামর্শ দিয়েছিলেন। তিনি যেন এই দায়িত্ব গ্রহণ করেন সেজন্য আমি ব্যক্তিগতভাবে তাঁর সাথে কথা বলেছিলাম। তিনি যথেষ্ঠ দক্ষতার সাথে ঐতিহ্যবাহী এই সংগঠনটির নেতৃত্ব দিয়েছেন। তাঁর নেতৃত্বে উদীচী প্রসারিত হয়েছে, আদর্শ-নিষ্ঠা বজায় রেখে সম্মানের সাথে এগিয়ে যেতে পেরেছে।

কমরেড কামাল লোহানীর সাথে সাংস্কৃতিক আন্দোলন ছাড়াও অনেক ইস্যুতে নাগরিক আন্দোলন গড়ে তোলা নিয়েও কথা হয়েছে। মানুষের যেকোনো অধিকার আদায়ের আন্দোলনেই তিনি সোচ্চার থাকতেন। যে কোনো অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে মাঠে নামতেন, অকুস্থলে ছুটে যেতেন। তাঁর নেতৃত্বেই আমরা বাহাত্তরের সংবিধান পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য আন্দোলন সংগঠিত করেছি। বিচারবহির্ভূত হত্যার বিরুদ্ধে আন্দোলন, সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী আন্দোলন করেছি। লোহানী ভাই নানা মঞ্চে দাঁড়িয়ে নানা ইস্যুতে সংগ্রাম করে গেছেন। সেসবের বিবরণ দিয়ে শেষ করা যাবে না। বয়সের ভারে শরীর অচল হয়ে পড়ার পরেও তিনি থেমে থাকেননি। তাঁর মৃত্যুর প্রায় বছর দশেক আগে একবার সকালের দিকে তিনি শাহবাগ চত্তরের একটি সমাবেশে আমার পাশে দাঁড়িয়ে বক্তৃতা করার সময় অজ্ঞান হয়ে ঠিক আমার কোলের ওপর ঢলে পড়ে গিয়েছিলেন। তাকে সুস্থ করতে দ্রুত বারডেমে নিয়ে চিকিৎসা করাতে হয়েছিল। তাঁর দৃষ্টিশক্তিও অচল হতে শুরু করে। তার পরেও তিনি চিকিৎসক, পুত্র-কন্যা, শুভাকাঙ্খীদের নিষেধমূলক পরামর্শ অগ্রাহ্য করে কাজ করে গেছেন। সভামঞ্চে দৃপ্তভাবে দাঁড়িয়ে কথা বলেছেন বলিষ্ঠ কণ্ঠে।

কমরেড কামাল লোহানীর সেই বলিষ্ঠ উচ্চারণ ও তাঁর সেই কণ্ঠধ্বনি অনুপ্রেরণার অনন্ত উৎস হয়ে থাকবে। লাল সালাম, কমরেড!!!

লেখক:
Mujahidul Islam Selim
মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম
সাবেক সভাপতি, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি-সিপিবি

মন্তব্য করুন (Comments)

comments

Share.

About Author

বাঙালীয়ানা স্টাফ করসপন্ডেন্ট