কমরেড রনো: এক  আদর্শনিষ্ঠ কমিউনিস্ট

Comments

সন্দীপ দে 

মাও-সে-তুঙ তাঁর একটি লেখায় চীনের প্রাচীন লেখক জুমা চিয়েনকে উদ্ধৃত করে বলেছিলেন, “যদিও সব মানুষ মরণশীল, তবুও কোনো কোনো মৃত্যু ‘তাই’ পাহাড়ের চেয়ে ভারি, আবার কোনো কোনো মৃত্যু পাখির পালকের চেয়েও হালকা।”

বর্ষীয়ান কমিউনিস্ট নেতা শ্রদ্ধেয় কমরেড হায়দার আকবর খান রনোর জীবনাবসানে কমরেড মাও-এর উপরোক্ত উদ্ধৃতিটি  অগোচরেই মনের গভীরে নাড়া দিয়ে গেল । ৮১ বছরের দীর্ঘ জীবনের প্রায় ছয় দশকেরও বেশি সময়কাল জুড়ে তাঁর বিস্তৃত সংগ্রামী অভিযাত্রায় লড়াই-আন্দোলনের অঙ্গনে এবং সাহিত্য-সৃজনভূমিতে তিনি যে অনন্য কীর্তি রেখে গেছেন, তা নিঃসন্দেহে অটুট থাকবে অনন্তকাল। কমরেড রনোর প্রয়াণ শুধুমাত্র বাংলাদেশে কমিউনিস্ট ও বামপন্থী সহ রাজনীতির অঙ্গন এবং এই পরিবৃত্তের বাইরে তাঁর প্রিয়জন,গুণগ্রাহী এবং শিক্ষা-সংস্কৃতি জগৎকে ভারাক্রান্ত করেনি,বাংলাদেশের সীমানা পেরিয়ে পশ্চিমবঙ্গেও তাঁর বিদায়-বেদনা আচ্ছন্ন করেছে কমিউনিস্ট আন্দোলনের শরিক ও রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের।

কমরেড হায়দার আকবর খান রনো  ছিলেন বাংলাদেশের কমিউনিস্ট আন্দোলনের অন্যতম অগ্রগণ্য নেতা, বিশিষ্ট মার্কসবাদী তাত্ত্বিক, মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক, স্বনামধন্য লেখক এবং বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)’র অন্যতম উপদেষ্টা।  ১১ মে, শুক্রবার রাত দুটো নাগাদ ঢাকার হেলথ অ্যান্ড হোপ হাসপাতালে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।  দীর্ঘদিন ধরেই তিনি শ্বাসকষ্ট সহ বার্ধক্যজনিত অসুস্থতায় ভুগছিলেন। তাঁর প্রয়াণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ ও অন্যান্য অংশের মানুষ শোক জ্ঞাপন করেছেন। 

কমরেড হায়দার আকবর খান রনোর প্রয়াণে গভীর শোক প্রকাশ করে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) এক  বিবৃতিতে বলেছে, “হায়দার আকবর খান রনোর মৃত্যুতে দেশ একজন দেশপ্রেমিক, আজীবন সংগ্রামী, দেশের মানুষের শোষণ মুক্তির সংগ্রামের প্রিয় মানুষকে হারালো।  ১৩ মে তাঁর অন্তেষ্ট্যিক্রিয়া সম্পন্ন হয়। ঢাকার কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারে বিউগলের ধ্বনির সঙ্গে তাঁকে রাষ্ট্রীয়  সম্মাননা ‘গার্ড অব অনার’ দেওয়া হয়। ফুলে, মালায়, স্লোগানে এবং আন্তর্জাতিক সংগীতের মধ্য দিয়ে প্রয়াত নেতাকে অন্তিম শ্রদ্ধা জানান অগণিত মানুষ। বনানী কবরস্থানে তাঁর বাবা, মা এবং ভাইয়ের সমাধির পাশে তাঁকে সমাহিত করা হয়।  এই প্রবীণ  কমিউনিস্ট নেতার চলে যাওয়ায় বাংলাদেশের কমিউনিস্ট আন্দোলন এবং মুক্তিযুদ্ধের একটি বিশেষ অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি ঘটলো। বাংলাদেশ তথা এই উপমহাদেশের কমিউনিস্ট আন্দোলনের এক উজ্জ্বল পদাতিকের অভিযাত্রাও থেমে গেল।

 সংগ্রামদৃপ্ত  জীবন

কমরেড হায়দার আকবর খান রনোর জীবন ছিল লড়াই-সংগ্রামের প্রবাহে বর্ণময়। তিনি কলকাতায় ১৯৪২ সালের ৩১ আগস্ট জন্মগ্রহণ করেন। মা কানিজ ফাতেমা মহসিনা ও পিতা হাতেম আলি খান। তাঁর দাদু (মাতামহ) সৈয়দ নওশের আলি ছিলেন ব্রিটিশ ভারতের প্রখ্যাত রাজনীতিবিদ, যুক্তবঙ্গের প্রধানমন্ত্রী এ কে ফজলুল হক জোট মন্ত্রীসভার (১৯৩৭) সদস্য এবং পরবর্তীকালে বাংলার আইনসভার অধ্যক্ষ (১৯৪৩-১৯৪৬)। তিনি পরে কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে যুক্ত হন। দেশভাগের আগে তাঁর তিনতলা বাড়ির একতলায় ছিল অবিভক্ত কমিউনিস্ট পার্টির অফিস। কলকাতার বৈঠকখানা রোডের এই বাড়িতেই জন্ম কমরেড রনো এবং তাঁর ছোটো ভাই মুক্তিযোদ্ধা হায়দার আনোয়ার খান জুনোর। কমরেড রনো এই লেখককে ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় একবার বলেছিলেন, ছেলেবেলায় এই বাড়িতেই তিনি কাকাবাবু (মুজফফর আহমদ), জ্যোতি বসু এবং এস এ ডাঙ্গের মতো কমিউনিস্ট নেতাদের দেখেছেন।  কমরেড রনো অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র ছিলেন। ১৯৫৮ সালে তিনি ঢাকার  সেন্ট গ্রেগরি স্কুল থেকে তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্থানের মেধা তালিকায় দ্বাদশ স্থান অধিকার করে ম্যাট্রিক পাশ করেন। নটরডেম কলেজ থেকে আইএসসি পাশ করে ১৯৬০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিদ্যা বিভাগে ভর্তি হন । তবে কারাবাসের কারণে তিনি অনার্স কোর্স শেষ করতে পারেননি। পাসকোর্সে কৃতিত্বের সঙ্গেই বিএসসি পাশ করেন। জেলখানায় বসে পরীক্ষা দিয়ে তিনি এলএলবি ডিগ্রি অর্জন করেন। পরে হাইকোর্টের সনদও লাভ করেছিলেন, কিন্তু কোনোদিন আইন পেশায় যাননি। এ প্রসঙ্গে তিনি এক সাক্ষাৎকারে রসিকতা করে বলেছিলেন, ‘একমাত্র আসামি হয়ে কোর্টে যাওয়া ছাড়া উকিল হয়ে কখনো কোর্টে যাইনি।’

Rono01

সদা হাস্যোজ্জ্বল কমরেড হায়দার আকবর খান রনো।

১৯৬১ সালে তিনি তদানীন্তন গোপন কমিউনিস্ট পার্টির সভ্যপদ অর্জন করেন। পরবর্তী দীর্ঘ জীবনে তিনি কমিউনিস্ট আন্দোলনের বিভিন্ন পর্যায়, বাঁক ও মোড়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। একই সঙ্গে ধ্রুপদি মার্কসবাদী সাহিত্য চর্চা করেছেন এবং বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে তাত্ত্বিক অবদান রেখেছেন। তিনি ছিলেন কমিউনিস্ট পার্টির চীনপন্থী অংশে। পরবর্তীকালে সেই অংশ বহুদা বিভক্ত হয়। পরে  তিনি নিজেই অকপটে বলেছেন,‘তখন চীন ও রাশিয়ার যে বক্তব্য তাতে ভুল ছিল। কিন্তু সেই ভুল আমরা বুঝতে পারিনি। কিন্তু এই ভুল সত্ত্বেও আত্মত্যাগ করার যে স্পৃহা, লড়াই করার যে মনোবৃত্তি, বুকে বল বাহুতে শক্তি, দৃঢ় বিশ্বাস নিয়ে চলার যে উদ্যম ছিল, তা এখন আর সেভাবে দেখা যায় না।’  এই চীনপন্থীদের একটা বড়ো অংশ মুক্তিযুদ্ধে বিরাট ভূমিকা পালন করে। নেতৃত্বে ছিলেন কমরেড রনোসহ আরো অনেকে। তাঁরা  বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী অংশের সাথে আরো কয়েকটি কমিউনিস্ট গ্রুপকে একত্রিত করে ওয়ার্কার্স পার্টি গঠন করেন। ১৯৮৪ সাল পর্যন্ত তিনি ছিলেন বাংলাদেশ ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক। ২০১০ সালে রাজনৈতিক মতপার্থক্যের কারণে তিনি ওয়ার্কার্স পার্টি থেকে সরে আসেন এবং পরে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)-তে যোগদান করেন। তখন থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত তিনি সিপিবি’র প্রেসিডিয়াম সদস্য ছিলেন। জীবনের শেষ পর্বে তিনি সিপিবি’র কেন্দ্রীয় কমিটির উপদেষ্টা ছিলেন।

কমরেড রনো ১৯৬২ সালে শিক্ষা কমিশনের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে শিক্ষা আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন। এই আন্দোলন ব্যাপক আকার নিয়ে গ্রাম-গ্রামান্তরে ছড়িয়ে পড়েছিল। তার আগে  সামরিক শাসন বিরোধী রাজনৈতিক আন্দোলনের সূচনা হয়। তিনি ছিলেন এই আন্দোলনের অন্যতম নেতা। ১ ফেব্রুয়ারি থেকে এই আন্দোলন শুরু হয়। তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ধর্মঘটের ডাক দেওয়া হয়েছিল। বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে আয়োজিত একটি সভায় তিনিই ছিলেন একমাত্র বক্তা। সভায় কোনো মাইক ছিল না। তিনি একটি টেবিলের উপর দাঁড়িয়ে বক্তৃতা করেন। এভাবে আন্দোলন চলতে থাকে। ১৭ সেপ্টেম্বর ১৯৬২, আন্দোলনের তরঙ্গশীর্ষে শিক্ষা দিবস পালনের আহ্বান জানানো হয়েছিল। সেদিন তাঁর নেতৃত্বে এক মিছিলের উপর গুলি চলেছিল। সেই মুহূর্তে তিনি পিছনের দিকে থাকায় তাঁর গায়ে গুলি লাগেনি। এই সময়েই তিনি গ্রেপ্তার হন।  প্রথমে তাকে চোখ বেঁধে নিয়ে যাওয়া হয় ক্যান্টনমেন্টে। সেখানে তাঁর উপর কোনো শারীরিক অত্যাচার না হলেও চূড়ান্ত মানসিক চাপ সৃষ্টি করা হয়েছিল। ঘুমোতে না দিয়ে রাতভর প্রশ্নের পর প্রশ্ন করা হয়েছে তাঁকে।   সপ্তাহখানেক পর সেখান থেকে তাঁকে নিয়ে আসা হয় ঢাকা সেন্ট্রাল জেলের ২৬ নম্বর সেলে। তখন একই সেলে ছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান, কমিউনিস্ট বিপ্লবী ও কবি-লেখক রণেশ দাশগুপ্ত এবং তাজউদ্দীন আহমেদ প্রমুখ। জেলে তরুণ বয়সে শেখ মুজিবের স্নেহ-সান্নিধ্যে থাকা এবং একসঙ্গে ভলিবল খেলার স্মৃতি তিনি নিজেই বিভিন্ন সময়ে ব্যক্ত করেছেন।  কমরেড রানোর কথায়, ” সেখানে আমিই ছিলাম সবচেয়ে ছোটো। বঙ্গবন্ধু তখন মধ্যবয়স্ক, তিনি তখনও ‘বঙ্গবন্ধু’ হয়ে ওঠেননি, আওয়ামী লিগের সাধারণ সম্পাদক।  বঙ্গবন্ধু আমাকে খুব স্নেহ করতেন, হরলিক্স, আপেল ইত্যাদি খাওয়াতেন। তাঁদের সঙ্গে বিভিন্ন আলাপ-আলোচনা ছাড়াও বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে একসাথে ভলিবল খেলেছি। তিনি লম্বা ছিলেন বলে খুব ভালো চাপ মারতে পারতেন। ”  এরপর তিনি আবারো জেলে যান ১৯৬৪ সালে। পাকিস্তান আমলে তিনি চারবার জেল জীবন কাটিয়েছেন। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর এরশাদের আমলে বাংলাদেশ পুলিশ। লড়াই আন্দোলনের সূত্রই তিনি মওলানা ভাসানীর সংস্পর্শে এসেছিলেন।

১৯৬৩ থেকে ১৯৬৫ সাল পর্যন্ত তিনি ছিলেন তদানীন্তন সর্ববৃহৎ ছাত্র সংগঠন অবিভক্ত পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক। ছাত্রজীবন শেষে তিনি শ্রমিক আন্দোলনে যোগদান করেন এবং টঙ্গি অঞ্চলে শ্রমিক বস্তিতে বাস করে গড়ে তোলেন এক নতুন ধারার সংগ্রামী শ্রমিক আন্দোলন। তিনি এ প্রসঙ্গে বলেছেন, “আমি ছাত্র আন্দোলন শেষ করে টঙ্গিতে শ্রমিক বস্তিতে গিয়ে বাস করেছি একনাগাড়ে চার বছর। মাসে এক দু’দিন বাড়িতে আসতাম। তবে সেখানে আমি সব সময় এক জায়গায় থাকিনি। আমার নামে ওয়ারেন্ট থাকায় ধরা পড়ার সম্ভাবনা ছিল। মাঝরাতে এক জায়গায় থেকে আরেক জায়গায় চলে যেতাম।” শ্রমিক আন্দোলন গড়ে তোলার জন্য শ্রমিক বস্তিতে বসবাসের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে তিনি নিজেই বলেছেন, ‘ঢাকা থেকে গিয়ে একটা বক্তৃতা দিয়ে চলে আসা যায়, কিন্তু তাতে শ্রমিক আন্দোলন গড়ে ওঠা সম্ভব  রোজ গেলাম বা সপ্তাহে একদিন গেলাম তার মধ্য দিয়ে শ্রমিকদের সঙ্গে একাত্মতা গড়ে ওঠে না। এছাড়া যে আদর্শের ভিত্তিতে শ্রমিক আন্দোলন গড়ে তুলতে চেয়েছিলাম, তাও সম্ভব হতো না।   তিনি বলেছেন, ‘শ্রমিকদের আমি নেতৃত্ব দিয়েছি ঠিকই, কিন্তু শ্রমিকদের কাছ থেকে শিখেছি অনেক।’ ১৯৭০ সালে তিনি তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের সর্ববৃহৎ শ্রমিক সংগঠন পূর্ব বাংলা শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৬৯-এর গণ অভ্যুত্থানে তিনি ছিলেন অন্যতম সংগঠক। সেইসময়ে মওলানা ভাসানী সুবিশাল গণ আন্দোলনের অভ্যুত্থান ঘটান। তিনি পল্টন ময়দানে সভা করে গভর্নর হাউস ঘেরাওয়ের ডাক দেন। তখন অনেকের মধ্যে রনোও ছিলেন। সেই সময় আন্দোলন, হরতাল, সভা, সমাবেশে পূর্ব পাকিস্তান উত্তাল। এই আন্দোলনের স্রোত ধারায় জড়িয়ে ছিলেন কমরেড রনো।

একাত্তরে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে কমরেড রনো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিলেন। মার্চ মাসে বাংলাদেশ অগ্নিগর্ভ উত্তাল হয়ে ওঠে। মানুষের আবেগ তখন স্বাধীনতার পক্ষে। ২৫ মার্চ কমিউনিস্ট বিপ্লবীদের পূর্ববাংলা সমন্বয় কমিটির ডাকে পল্টন ময়দানে প্রায় দু’লক্ষ মানুষের সমাবেশ হয়। ভাষণ দেন কমরেড রনো ছাড়াও রাশেদ খান মেনন, কাজী জাফর এবং তাঁর ছোটো ভাই জুনো । পরে তিনি বলেছিলেন, ‘আমাদের ডাকে ঠিক নয়, তখনকার পরিবেশ পরিস্থিতির জন্যই এত লোকের জমায়েত হয়েছিল।’ সেই রাত থেকেই শুরু হয় পাক সেনাবাহিনীর গোলাগুলি। এই পরিস্থিতিতে ২৭ মার্চ মেনন, কাজী জাফর ও ভাই জুনোকে নিয়ে তিনি চলে যান নরসিংদির শিবপুরে। তাঁদের এই অভিযাত্রায় নিজের গাড়ি এবং অর্থ দিয়ে সাহায্য করেছিলেন তাঁদেরই কমরেড বিশিষ্ট চলচ্চিত্র পরিচালক জহির রায়হান। এই শিবপুরকে হেডকোয়ার্টার করে তাঁরা মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করেছেন। সেই সময় ভারতীয় সাহায্য ছাড়াই পশ্চাদপসরণকারী পাকিস্তানি হানাদারদের অস্ত্র কেড়ে নিয়ে ১৪ টি সশস্র ঘাঁটি গড়ে তোলেন। এছাড়া সিপিআই (এম)’র সাহায্যে কলকাতা ও আগরতলায় ছিল তাঁদের ঘাঁটি। কমরেড রনোর সঙ্গে রাশেদ খান মেনন এবং মান্নান ভূঁইয়া এই সব ঘাঁটির সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন এবং রাজনৈতিক নির্দেশ দিতেন। এই সংগঠনের প্রায় ৩০ হাজার মুক্তিযোদ্ধা এই অঞ্চলগুলিতে সশস্ত্র যুদ্ধ করেছিলেন এবং অসংখ্য শহিদ হয়েছিলেন। মুক্তিযুদ্ধে ভারতের অবদান বিশেষকরে সিপিআই (এম)’র ভূমিকা তিনি কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করেছেন।

বিজয় দিবসে শোকের ছায়া

১৬ ডিসেম্বর, ১৯৭১ পাকবাহিনী আত্মসমর্পণ করে। ওইদিন কমরেড রনো ছিলেন কলকাতায়। এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছেন, ওই দিনসকাল ১০ টা নাগাদ তিনি দাঁড়িয়েছিলেন পার্ক সার্কাস মোড়ে।  সেখানে জিল্লুর রহমান (পরবর্তীকালে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি )-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ হলে তিনি বিজয়ের বার্তা দেন। এই সংবাদে স্বাভাবিকভাবেই উল্লসিত হয়েছিলেন রনো। কিন্তু সেই দিনই তাঁর পরিবারে নেমে আসে মর্মান্তিক শোকের ছায়া। রনো নিজেই বলেছেন, ১৬ ডিসেম্বর পাক বাহিনী আত্মসমর্পণ করছে এবং এবং বন্দুক নিচে নামিয়ে রেস কোর্সের দিকে যাচ্ছে — এই খবর পেয়ে তাঁর বাবা, মা এবং পরিবারের অন্যান্যরা একটা গাড়িতে করে ১৮ নম্বর রোডে যায়। সেখানে ছিল বঙ্গবন্ধুর পরিবার। তাঁরা কেমন আছেন তা সবাই মিলে দেখতে যাচ্ছিলেন।  যাবার সময় তাঁর বোন আনন্দে উচ্ছ্বসিত হয়ে ‘জয় বাংলা’, ‘জয় বাংলা’ বলে স্লোগান দিতে থাকেন। সেখানে যে পাকিস্থানি আর্ম গার্ডরা ছিল তারা তখনো আত্মসমর্পণ করেনি। সেখানে যেতেই পাকিস্তান বাহিনী গুলি চালায় ছাদ থেকে। সেই গুলিতেই মৃত্যু হয় মাসতুতো বোনের, আহত হন মা এবং ভ্রাতৃবধূ। তাঁদের গাড়ির চালকের গায়েও গুলি লাগে, তিনি কিছুক্ষণ বেঁচে ছিলেন এবং দ্রুত সবাইকে গাড়িতে করে ওই এলাকা পার করে তিনি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। নিজের জীবন বিপন্ন করে তাঁর এই সাহসী উদ্যোগে বাকিদের জীবন রক্ষা পেয়েছিল। না হলে পরিবারের কেউই আর সেদিন বেঁচে ফিরতেন না। পরে বঙ্গবন্ধু জায়ার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে গেলে তিনি রনোকে বলেছিলেন, উনি  আহত মা এবং গুলিবিদ্ধ বোনকে জল দিয়ে শুশ্রূষা করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু নিষ্ঠুর পাক বাহিনী বন্দুক উঁচিয়ে বাধা দেয়। দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের পর বিজয়ের দিনে পারিবারিক এই মর্মন্তুদ কাহিনি তাঁর জীবনের শেষদিন পর্যন্ত শোকগাথা হয়ে ছিল।

স্বাধীন বাংলাদেশে এরশাদ বিরোধী আন্দোলনের অন্যতম নেতা এবং ১৯৯০ সালের গণ অভ্যুত্থানেরও অন্যতম রূপকার ছিলেন কমরেড রনো।

 অনুপম সান্নিধ্যে

 এই লেখকের অত্যন্ত গর্ব ও শ্লাঘার বিষয় যে, কমরেড রনোর মতো একজন  বিশিষ্ট কমিউনিস্ট নেতার সান্নিধ্যে আসার সু্যোগ হয়েছিল কয়েকবার। দীর্ঘ সময়ধরে তাঁর সঙ্গে একান্ত আলাপচারিতায় অনুভূত হয়েছে, জ্ঞানে-মেধায়-আদর্শে এবং ব্যক্তিত্বে দীপ্র, অথচ মৃদুকণ্ঠে সুললিত ও স্পষ্ট বক্তব্যে, বিনীত আচরণে, সর্বোপরি আতিথেয়তায় তিনি একজন প্রকৃত অর্থেই  কমিউনিস্ট আদর্শে উজ্জ্বল এক অনন্যসাধারণ ব্যক্তিত্ব । বাংলাদেশে কমিউনিস্ট পার্টিগুলির বহুধাবিভক্তি এবং অনেকের আদর্শচ্যুতিতে তাঁর মনের মধ্যে ছিল গভীর বেদনা। তিনি একবার (২০১৭ সালে)কথায় কথায় বলেছিলেন, “এখন পিছন ফিরে তাকিয়ে মনে হয় আমাদের মধ্যে পেটি বুর্জোয়া নেতৃত্বের আকাঙ্ক্ষা, সাংগঠনিক কোন্দল ইত্যাদিও এই বহুধা বিভক্তির জন্য দায়ী। “ এছাড়া বাংলাদেশের পরিস্থিতি নিয়ে কথাপ্রসঙ্গে তিনি খেদের সঙ্গে বলেছিলেন,“আমরা একটা অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ চেয়েছিলাম, কিন্তু তা হলো না। অসাম্প্রদায়িকতার সঙ্গে গণতন্ত্রের একটা সম্পর্ক রয়েছে। যদি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি না থাকে, সাম্প্রদায়িক জঙ্গিবাদ মাথাচাড়া দেয় তবে সে দেশে গণতন্ত্র থাকতে পারে না। আমাদের দেশে বারবার ঘুরেফিরে সাম্প্রদায়িক জঙ্গিবাদ মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। মৌলবাদ এখন জাতির সামনে সবচেয়ে বড়ো বিপদ হিসেবে দেখা দিয়েছে। অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে মৌলবাদের উত্থানের কারণ, জাতীয়তাবাদী শক্তির ব্যর্থতা এবং হতাশা। অন্যদিকে সেই শূন্যস্থান পূরণ করতে পারেনি কমিউনিস্ট ও বামপন্থীশক্তি। আমরা মনে করি বাম, গণতান্ত্রিক, জাতীয়তাবাদী, উদারনৈতিক সমস্ত রাজনৈতিক দল, সংস্থা ও ব্যক্তিকে ঐক্যবদ্ধ করে প্রশাসনিক পদক্ষেপের পাশাপাশি  সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক মতাদর্শ, সামাজিক আন্দোলন ও নারী আন্দোলনের মাধ্যমে এই মৌলবাদী শক্তিকে পর্যুদস্ত  করা সম্ভব।”

এই কথার সূত্র ধরেই তিনি বলেছেন, কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় এখানকার বুর্জোয়া দলগুলির একটি অন্যতম  রাজনৈতিক দল সরাসরি মৌলবাদী শক্তির সঙ্গে জোটে আবদ্ধ হয়েছে। অন্যদিকে স্বাধীনতা যুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী আওয়ামী লীগও নির্বাচনকে মাথায় রেখে মৌলবাদের সঙ্গে আপোশ করছে। জামাতকে আঁকড়ে ধরছে বিএনপি, অন্যদিকে আওয়ামী লীগ হেফাজতে ইসলামের মতো মৌলবাদী সংগঠনের সঙ্গে মিতালি করছে। বর্তমান সরকার হেফাজতে ইসলামের সঙ্গে বোঝাপড়া করে তাদের দাবি মতো ক্লাস ওয়ান থেকে  ক্লাস টেন পর্যন্ত পাঠ্যপুস্তকে কোন লেখক বা কবির কোন গল্প, প্রবন্ধ বা কবিতা থাকবে সেই সংক্রান্ত ১৭ টি দাবি মেনে নেয়। সেই দাবি অনুযায়ী পাঠ্যপুস্তক থেকে রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্রের মতো বিখ্যাত লেখকদের রচনা বাদ দেওয়া হলোএটা কিছুতেই মেনে নেওয়া যায় না।”

 এই প্রবীণ কমিউনিস্ট নেতার সঙ্গে প্রথম সাক্ষাতের স্মৃতি মনের কোনে আজও সজীব। তাঁর নামের সঙ্গে পরিচয় দীর্ঘদিনের। দেশহিতৈষী ও গণশক্তির পাতায় তাঁর লেখাপড়া ছিল। ধারণা ছিল তাঁর মতো একজন কমিউনিস্ট নেতা নিশ্চয়ই রাশভারি ও গম্ভীর প্রকৃতির হবেন। তাই কিছু দ্বিধা কিছুটা ভীতি নিয়ে এক সন্ধ্যায় তাঁর কাছে ফোন করে পরিচয় দিয়ে সাক্ষাতের বাসনা জানালাম। অবাক করে একজন বয়োজ্যেষ্ঠ অভিভাবকের মতো বলে উঠলেন, ‘কাল বিকেলে চলে আসুন, রাতে কিন্তু এখানেই খেয়ে যাবেন।’ আরও বিস্ময় যেন অপেক্ষা করছিল। সেদিন তাঁর সঙ্গে সাক্ষাতের আগে গিয়েছিলাম অগ্রগণ্য সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব শ্রদ্ধেয় কামাল লোহানীর কাছে। তাঁর বাড়ি কমরেড রনোর বাড়ির কাছাকাছি। ধানমণ্ডির ১৩ নম্বর রোডে মধুরিমা অ্যাপার্টমেন্ট। আর কমরেড রনোর বাসা বঙ্গবন্ধুর বাড়ির কাছে ৩২ নম্বর রোডের ২৪ নম্বরে। দু’জনেরই বাসস্থান কাছাকাছি হওয়ায় একইদিনে দু’জনের কাছে যাওয়া স্থির করেছিলাম। সেদিন লোহানী ভাইয়ের বাড়িতে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ বেতারে তাঁর এক সময়ের সহকর্মী, শব্দসৈনিক ও কবি মঞ্জুলা দাশগুপ্ত। তাঁর কন্যা এই লেখকের বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধু সোমশুক্লা মাকে নিয়ে এসেছিল সাক্ষাৎ করাতে। স্বভাবতই সেখানে আনন্দের পরিবেশে বেশ কিছুটা সময় পেরিয়ে যায়। এদিকে এই দেরির জন্য পর পর ফোন আসতে থাকে রনো ভাইয়ের। বন্ধু সোমশুক্লা অবস্থাটা বুঝতে পেরে তার গাড়িতে আমাকে পৌঁছে দেয় এবং রনোভাইয়ের বাড়ির সামনে যেতেই নজরে আসে অ্যাপার্টমেন্টের নিচে ফুটপাতে দাঁড়িয়ে আছেন তিনি, বাংলাদেশের সর্বজন শ্রদ্ধেয় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, বিশিষ্ট কমিউনিস্ট নেতা কমরেড হায়দার আকবর খান রনো। তখন লজ্জায় সঙ্কোচে চরম বিব্রতকর অবস্থা, নিজেকে কেমন যেন অপরাধী মনে হচ্ছিল। অবস্থা সামাল দিতে বললাম কষ্ট করে কেন রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছেন। সাবলীল উত্তর এলো–“আপনি ঠিকমতো বাড়ি চিনে আসতে পারবেন কিনা সে চিন্তা করে এখানে অপেক্ষা করছিলাম। ” তখন যেন একরাশ লজ্জা চেপে ধরেছিল। ঘরে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গেই তিনি রাতের খাওয়া নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন, জানতে চাইলেন কোন খাবার পছন্দ। বললেন, সামনেই একটা ভালো রেস্টুরেন্ট আছে, ইচ্ছে করলে সেখানে গিয়েও খাওয়া যেতে পারে। সেখানে গেলে তাঁর সঙ্গে একান্তে আলাপচারিতার সুযোগ হয়ত খুব একটা মিলবে না, এই ভেবে তাঁর বাড়িতে থাকাই স্থির হলো। দীর্ঘক্ষণ কথা হলো তাঁর সঙ্গে। একে একে উঠে এলো তাঁর শৈশব, পড়াশোনা, ছাত্র আন্দোলন, বৃহত্তর রাজনীতি, কমিউনিস্ট পার্টি, মুক্তিযুদ্ধ ইত্যাদি নানা বিষয়। বাংলাদেশের সমসাময়িক পরিস্থিতি নিয়ে তাঁর উদ্বেগ, ক্ষোভ, দুশ্চিন্তা সেইসঙ্গে কিছু ভাবনার কথা বলে গেলেন। জানতে চাইলেন আমাদের এখানকার পরিস্থিতি সম্পর্কে। ভারতের শাসনভার চরম দক্ষিণপন্থী সাম্প্রদায়িক শক্তির হাতে চলে যাওয়া এবং পশ্চিমবঙ্গে বামপন্থীদের বিপর্যয়ে যে তিনি কতটা ব্যথিত, তা অনুভব করা গেল তাঁর কথায়। আলাপচারিতার ফাঁকে ফাঁকে তিনি একবার করে উঠে যাচ্ছিলেন এবং নিয়ে আসছিলেন তাঁর লেখা বই। প্রায় ছ’সাতটা বই সেদিন উপহার হিসেবে দিয়েছিলেন এবং প্রতিটিতেই ছিল তাঁর স্বাক্ষর। এই সুন্দর মুহূর্তগুলো ক্যামেরাবন্দি করছিল সেদিনের সঙ্গী কস্তুরী, প্রয়াত বন্ধু মারুফের ভাইঝি। একবার বললেন, ‘ঢাকায় যে ক’দিন থাকবেন আমার বাড়িতেও আপনি থাকতে পারেন, আপনার কোনো অসুবিধা হবে না।’  তাঁর কথায় বিস্ময়ে অভিভূত হয়েছিলাম। কথায় কথায় রাত বাড়ছিল। রনোভাই নানা পদের খাবার আনিয়েছিলেন। খেতে খেতে একটা মজার কথা শোনালেন, বললেন “আপনাকে যে রেস্টুরেন্টে খাওয়াতে নিয়ে যাওয়ার কথা বলছিলাম, সেখানে একবার আমার এক গেস্টকে  নিয়ে গেছি । হঠাৎ করেই একজন আমাদের টেবিলের সামনে এসে আমায় জিজ্ঞাসা করলেন, আপনি কি বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য? তারপর আমার পরিচয় পেয়ে বললেন, আপনারও প্রায় একই রকম হাইট এবং মাথার চুলও সাদা, দেখতেও অনেকটা সেরকমই, তাই ভেবেছিলাম আপনি হয়ত বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য।”

Rono02

লেখকের সঙ্গে কমরেড রনো।

 ফেরার সময় মনে হলো বিচ্ছিন্নভাবে তো অনেক কথা হলো, এসব কথা সংরক্ষণ করা প্রয়োজন, আগামী প্রজন্মের স্বার্থেই। তাই আরেকদিন সাক্ষাতের আরজি জানালে তিনি সানন্দে রাজি হলেন। রাত তখন প্রায় দশটা। তিনি নিচে নেমে এসে আমাদের গন্তব্য পুরোনো ঢাকার কায়েতটুলির যাবার রিকশা ঠিক করে দিলেন। অদ্ভুত এক ভালোলাগায় যেন সিক্ত হয়েছিলাম সেদিন। তাঁর স্নেহ-সান্নিধ্যে অনেকগুলো সুন্দর মুহূর্ত কাটিয়ে মনোরম অভিজ্ঞতার সঞ্চয় নিয়ে ফিরে আসার সময় মনে হচ্ছিল, তিনি প্রকৃত অর্থেই একজন ব্যতিক্রমী কমিউনিস্ট।

এই বছরেরই ১৯ ফেব্রুয়ারি তাঁর সঙ্গে শেষবারের মতো সাক্ষাতের সুযোগ হয়েছিল। তখন তিনি প্রায় চলৎশক্তিহীন। তাঁর এই অবস্থার কথা জেনে কিছুটা সঙ্কোচ ও সংশয়  নিয়ে তাঁকে ফোন করলাম। তিনি যে নিজেই ফোন ধরবেন তা ছিল কল্পনার বাইরে । তাঁর সঙ্গে দেখা করা সম্ভব কিনা এই প্রস্তাব শুনেই বলে উঠলেন,‘ নিশ্চয়ই, কখন আসবেন? দুপুরবেলা যখন আসবেন তখন এখানেই খেয়ে যাবেন।’  অনেক বলে কয়ে এবারে খাওয়ানো থেকে তাঁকে নিরস্ত করা গেল।  নাকে অক্সিজেনের নল লাগানো, ঘরময় চিকিৎসার সরঞ্জাম, নেবুলাইজার। দৃষ্টিশক্তি নেই বললেই চলে। এবারে সঙ্গী বন্ধু ফরিদভাই। এই প্রবল শারীরিক অসুস্থতা সত্ত্বেও তিনি ছিলেন একবারেই নিরুদ্বিগ্ন ভাবলেশহীন। এই অবস্থায় চেয়ারে বসে আলাপে মগ্ন হয়েছেন, বলেছেন কত কথা। বলছিলেন এই অবস্থার মধ্যেও কীভাবে অনুলেখকের সাহায্য নিয়ে প্রবন্ধ লিখেছেন, এমনকী গ্রন্থ রচনাও করেছেন। শুনে স্বাভাবিকভাবেই বিস্ময় জেগেছিল। প্রতিভাত হয়েছে তাঁর কী অফুরান জীবনীশক্তি! এবারেও ভারতের রাজনীতির গতি প্রগতি ও বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের পরিস্থিতি নিয়ে তাঁর বিপুল অনুসন্ধিৎসা ছিল। তিনি গভীর আগ্রহের সাথে জানতে চেয়েছিলেন আগামী নির্বাচনে পরিস্থিতির কিছুটা পরিবর্তন হবে কিনা এবং বামপন্থীদের ফল আগের চেয়ে ভালো হবে কিনা ইত্যাদি। উপলব্ধি করেছিলাম এখানকার রাজনীতি সম্পর্কে তাঁর কৌতূহল এবং ধারণা কতটা গভীরে।  দেশহিতৈষী’র সম্পাদক পলাশ দাশ রচিত বই ‘প্যালেস্তাইন-প্রতিরোধের বর্ণমালা’ তাঁর হাতে তুলে দেওয়ার মুহূর্তে তাঁর মুখাবয়ব উজ্জ্বল হয়ে উঠেছিল। বলেছিলেন, এই সময়ের অত্যন্ত জরুরি বই, সহায়িকার সাহায্য নিয়ে তিনি অবশ্যই পড়বেন। ফরিদভাইকে বোধহয় তাঁর ভালো লেগেছিল। তাঁর কাছ থেকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে অনেক কথা জানার পর জিজ্ঞাসা করলেন,’আপনি কি অভিনয় করেন?’ উত্তর এলো- না, শুনে বললেন,’আপনি নিশ্চয় আবৃত্তি করেন,আপনার কণ্ঠস্বর খুব সুন্দর।’  অবাক লাগলো এই কথা ভেবে যে, এই প্রবল শারীরিক অসুস্থতার মধ্যেও এই অশীতিপর মানুষটি প্রথম কয়েক মুহূর্তের সাক্ষাতেই একজনকে কতটা গুরুত্বের সাথে পর্যবেক্ষণ করতে পারেন! তাঁর শরীর অশক্ত, কিন্তু মস্তিষ্ক সজীব এবং যথারীতি আতিথেয়তায় কোনো খামতি নেই। অনুরোধ করলেন কয়েকবার দুপুরের খাবারের জন্য, আমাদের বারণ শুনে গৃহ সহায়িকাকে বলে চা ও অন্যান্য খাবারের আয়োজন করলেন। তাঁর শরীরের কথা বিবেচনা করে স্বল্প সময়ের মধ্যেই চলে আসার ইচ্ছে প্রকাশ করা সত্ত্বেও তিনিই পরম মমতায় কথার বাঁধনে আমাদের বেঁধে রেখেছিলেন দীর্ঘক্ষণ। বইও উপহার দিয়েছেন। তাঁর হাত দু’টি ছুঁয়ে শ্রদ্ধা জানিয়ে চলে আসার সময়ে বলেছিলাম, ভালো থাকবেন। ঢাকা এলে আবারও দেখা হবে। সেদিন বুঝিনি এ দেখাই হবে শেষ দেখা!

একবার আলাপচারিতায় বলেছিলেন, নেপালে রাজতন্ত্রের অবসানের পর প্রচণ্ড প্রধানমন্ত্রী হলে তাঁর  আমন্ত্রণে সে দেশে গিয়েছিলেন। সেজন্য ভারতের বিজেপি শাসিত সরকার ‘মাওবাদীদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার’ অভিযোগ এনে তাঁর ভিসা দেওয়া বন্ধ করে দেয়। এজন্য চিকিৎসার প্রয়োজনে ভারতে আসার ইচ্ছে থাকলেও তা আর হয়ে ওঠেনি। জানতে চেয়েছিলাম প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শ্রদ্ধাভাজন হওয়া সত্ত্বেও কেন তিনি তাঁকে এবিষয়টি জানাচ্ছেন না। তাৎক্ষণিক উত্তরে বলেছিলেন, নীতিগতভাবেই ব্যক্তিগত বিষয়ে কোনো কিছু তিনি বলতে আগ্রহী নন। সেদিন এই কথার মধ্য দিয়ে সুস্পষ্ট হয়েছিল তাঁর নীতিনিষ্ঠ অনন্য অবস্থান।

সাহিত্য সৃজন

কমরেড হায়দার আকবর খান রনো তাঁর দীর্ঘ সংগ্রামী জীবন পরিচালনার পাশাপাশি মার্কসবাদ, রাজনীতি, ইতিহাস, দর্শন, অর্থনীতি, সাহিত্য ও বিজ্ঞান সংক্রান্ত নানা বিষয়ে গ্রন্থ রচনা করেছেন ও অসংখ্য প্রবন্ধ লিখেছেন। তিনি নিয়মিত কলাম লিখতেন। ২৪ বছর বয়সে তিনি প্রথম যে বইটি লেখেন তার নাম ‘সাম্রাজ্যবাদের রূপরেখা’। এই বইটিই ছিল পাকিস্তান আমলে মার্কসীয় দৃষ্টিকোণ থেকে সাম্রাজ্যবাদ সংক্রান্ত বিশ্লেষণমূলক প্রথম তাত্ত্বিক গ্রন্থ। তিনি অসংখ্য বই লিখেছেন। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য— শতাব্দী পেরিয়ে, ফরাসি বিপ্লব থেকে অক্টোবর বিপ্লব, পুঁজিবাদের মৃত্যুঘণ্টা, মার্কসবাদের প্রথম পাঠ, মার্কসীয় অর্থনীতি, গ্রাম শহরের গরিব মানুষ জোট বাঁধো, মার্কসবাদ ও সশস্ত্র সংগ্রাম, উত্তাল ষার্টের দশক, কোয়ান্টাম জগৎ—  কিছু বৈজ্ঞানিক ও দার্শনিক প্রশ্ন, রবীন্দ্রনাথ শ্রেণি দৃষ্টিকোণ থেকে, মানুষের কবি রবীন্দ্রনাথ, বাংলা সাহিত্যে প্রগতির ধারা (দুই খণ্ড), পলাশী থেকে মুক্তিযুদ্ধ ( দুই খণ্ড)। দুটি পুস্তিকা লিখেছেন- স্তালিন প্রসঙ্গে এবং অক্টোবর বিপ্লবের তাৎপর্য ও বর্তমান প্রেক্ষাপট। মুক্তিযুদ্ধে বামপন্থীরা, নারী ও নারীমুক্তিসহ কয়েকটি বই সম্পাদনা করেছেন। তাঁর এই অসামান্য সৃজনী প্রতিভার জন্য ২০২২ সালে তিনি বাংলা একাডেমির  সাহিত্য পুরস্কার অর্জন করেন। এছাড়া শতাব্দী পেরিয়ে বইটি বর্ষ সেরা বই হিসেবে ২০০৫ সালে প্রথম আলো পুরস্কার লাভ করে। এই ধরনের পুরস্কার প্রাপ্তিতে তাঁর যে অভিব্যক্তি তা ব্যক্ত করেছিলেন এক সাক্ষাৎকারে। তিনি বলেছিলেন,“পুরস্কার হলো একটা মানসিক ব্যাপার, আমাকে জনগণ কীভাবে নিল সেটাই হচ্ছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এই ধরনের পুরস্কার যে খুব একটা মূল্য বহন করে তা আমি মনে করি না, যদি না মানুষ গ্রহণ করে।”

গর্বের মুক্তিযুদ্ধ

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে কমিউনিস্টদের বীরত্বপূর্ণ অংশগ্রহণের জন্য তিনি গর্ববোধ করতেন। তিনি নিজেও মুক্তিযুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। কিন্তু তারজন্য নিজেকে জাহির করার এতটুকু প্রবণতা ছিল না কোনো দিন। মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে তাঁর নিজের একটা বিশ্লেষণ ছিল, যা তিনি বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে উল্লেখ করেছেন। বলেছেন-“মুক্তিযুদ্ধ মানে শুধু একটা রাজনৈতিক স্বাধীনতা নয়, একটা পতাকা শুধু নয়, অবশ্যই এসবের গুরুত্ব রয়েছে, কিন্তু আমার কাছে তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ একটা স্বাধীন দেশের পতাকা, পৃথিবীর মানচিত্রে স্বাধীন দেশ হিসেবে আমাদের অস্তিত্বকে প্রতিষ্ঠা করা এবং পাকিস্তানিরা যে আমাদের উপরে  নির্যাতন করেছে, নিপীড়ন করেছে তার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো, অবশেষে বিজয় অর্জন-এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এটাও সব না। মুক্তি কথাটা অনেক বড়ো, তার ব্যাপ্তি অনেক। বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম – এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম।’ প্রথমটি হলো, পাকিস্তানের অধীনতা ও শোষণ থেকে স্বাধীনতা। দ্বিতীয়টি হচ্ছে, সামগ্রিক মুক্তি। সামাজিক-অর্থনৈতিক শোষণ থেকে মুক্তি, শ্রেণি শোষণ থেকে মুক্তি, নারী মুক্তি এবং সাম্প্রদায়িকতার কবল থেকে মুক্তি। আমাদের অত্যন্ত গর্বের বিষয় যে, আমরা এই মুক্তি সংগ্রামের সঙ্গে জড়িয়ে ছিলাম। আমাদের দেশের জন্য একটা পতাকা আদায় করেছি। এটা আমাদের প্রজন্মের গর্বের বিষয়, সেই সঙ্গে আমাদের ইতিহাসেরও একটি গৌরবজ্জ্বল অধ্যায়।”

তাঁর উপলব্ধি ছিল–“আজকের নতুন প্রজন্ম কিন্তু এ নিয়ে পূর্ণ সন্তুষ্ট নয়। তাদের নতুন করে সত্যিকারের মুক্তি অর্জন করতে হবে। নতুন প্রজন্মকে প্রয়োজন হলে আরেকটি মুক্তি সংগ্রামের জন্য প্রস্তুতি নিতে হবে। এজন্য সর্বাগ্রে প্রয়োজন কমিউনিস্ট আদর্শ, কমিউনিস্ট পার্টি এবং শ্রেণি সংগ্রাম। “

 একটি প্রশ্ন ও সংশয়

কমরেড হায়দার আকবর খান রনোর জীবন ছিল মার্কসবাদের আলোয় দীপ্ত। তিনি চিন্তায় মননে ছিলেন যুক্তিবাদী ও বিজ্ঞানমনস্ক। শারীরিকভাবে অচল হলেও তিনি জীবনের শেষদিন পর্যন্ত মানসিক ও বৌদ্ধিকভাবে গরিব শ্রমজীবী সাধারণ মানুষের জীবন সংগ্রামের সাথে নিজেকে সম্পৃক্ত রেখেছিলেন। মানুষের স্বার্থে নিজের জীবনকে উৎসর্গ করাই ছিল তাঁর আন্তরিক  বাসনা। তাই যতদূর জানা যায়, তিনি মানুষের স্বার্থেই দেহদানের অঙ্গীকার করতে চেয়েছিলেন। প্রয়াণের পর তাঁর চোখ দু’টি দান করা হয়েছিল। কিন্তু তাঁর মতো একজন আদর্শনিষ্ঠ কমিউনিস্ট নেতার দেহদানের পরিবর্তে অন্তিম যাত্রায় ধর্মীয় রীতি ও আচার মেনে কেন জানাজা ও দাফন-কাফন হলো, তা নিয়ে এই লেখকের মনের মধ্যে সংশয় ঘুরপাক খাচ্ছে! প্রশ্ন জাগছে এভাবে কি প্রয়াত এই বিশিষ্ট কমিউনিস্ট নেতার প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করা হলো? কমরেড রনো যে নতুন সমাজ গঠনের স্বপ্ন দেখতেন, তার সঙ্গে কি এই আচার অনুষ্ঠান সঙ্গতিপূর্ণ হলো?

কমরেড রনো বলেছেন, “জীবনে তেমন সার্থকতা লাভ করিনি, কিন্তু যে লক্ষ্য ও আদর্শ নিয়ে একদিন রাজনৈতিক সংগ্রামে জড়িয়ে পড়েছিলাম, এতটুকু দাবি করতে পারি যে, তার থেকে সরে আসিনি। ” (শতাব্দী পেরিয়ে)।

উজ্জ্বল বাতিঘর

তিনি দেশ ও দেশের সামগ্রিক কল্যাণের জন্য আরেকটি মুক্তিযুদ্ধের প্রত্যয় জীবনের অন্তিম কাল পর্যন্ত ধারণ করে গেছেন। হতাশা-যন্ত্রণার ধূসর আবহের মধ্যেও তিনি মনের গভীরে লালন করেছেন উজ্জ্বল আশাবাদ। এমনই একজন আদর্শে অবিচল কমিউনিস্ট নেতার জীবনাবসানে তাঁর অগণিত সহযাত্রী ও প্রিয়জনদের মতো এই লেখকও ব্যথিত। তাই মনের মধ্যে অনুরণিত হচ্ছে ‘জীবনস্মৃতি’-তে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথের সেই উক্তি, “শিশুবয়সের লঘু জীবন বড়ো বড়ো মৃত্যুকেও অনায়াসেই পাশ কাটাইয়া ছুটিয়া যায়, কিন্তু অধিক বয়সে মৃত্যুকে অত সহজে ফাঁকি দিয়া এড়াইয়া চলিবার পথ নাই। ” তাঁর মতো একজন মহিরুহের সান্নিধ্য আর মিলবে না, এটা ভেবে একটা শূন্যতা যেন আচ্ছন্ন করছে। চারপাশের নানা দ্বিধা-দ্বন্দ্ব, আশাহীনতা, আদর্শচ্যুতি, মূল্যবোধের অবক্ষয়, হিংসা হানাহানি ইত্যাদি যাবতীয় অপহ্নবের ধূসর আবহের মধ্যেও তিনি উজ্জ্বল বাতিঘরের মতো নতুন প্রজন্মের পথ আলোকিত করবেন এবং আমাদের প্রাণিত করে যাবেন – তাঁর মতো একজন নির্ভীক মুক্তিযোদ্ধা ও আদর্শদৃপ্ত কমিউনিস্টের সংগ্রামী জীবন থেকে এই প্রত্যয়ই বাঙ্ময় হচ্ছে। 

পরিশেষে এই নিবন্ধের মাধ্যমে বিশিষ্ট কমিউনিস্ট নেতা কমরেড হায়দার আকবর খান রনোর স্মৃতির প্রতি রইল বিনম্র শ্রদ্ধা ও সংগ্রামী অভিবাদন ।

তথ্যসূত্র:
* ব্যক্তিগত আলাপচারিতা, বিভিন্ন বৈদ্যুতিন মাধ্যমে প্রদত্ত সাক্ষাৎকার ও প্রয়াণ সংবাদ, বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় প্রকাশিত নিবন্ধ ও সিপিবি’র শোক বিবৃতি ।
* উত্তাল ষাটের দশক, হায়দার আকবর খান রনো, পুঁথি নিলয়, বাংলাবাজার, ঢাকা-১১০০।

লেখক:
Sandeep Dey
সন্দীপ দে, সাংবাদিক, প্রাবন্ধিক।

  • বানানরীতি লেখকের নিজস্ব – সম্পাদক

মন্তব্য করুন (Comments)

comments

Share.

About Author

বাঙালীয়ানা স্টাফ করসপন্ডেন্ট