করোনা ভাইরাস: সঙ্কটের ভয়াবহতা এবং উত্তরণ । রাহমান চৌধুরী

Comments

বিশ্বের সবচেয়ে আলোচিত নাট্যকার উইলিয়াম শেক্সপিয়ার তাঁর ‘জুলিয়াস সীজার’ নাটকে দেখান, সীজার নিজের মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। সিনেট ভবনের দিকে যাচ্ছেন তিনি সিনেটরদের সঙ্গে, যারা সামান্য পরে তাকে হত্যা করবে। সিনেট ভবনে যাবার পথে সাধারণ নাগরিক আর্তেমিডোরাস রাস্তায় দাঁড়িয়ে জুলিয়াস সীজারকে সাবধান করতে চায়। সীজারকে যে হত্যার ষড়যন্ত্র চলছে সেকথা জানিয়ে সে সীজারের হাতে একটি পত্র দিতে চায় কিন্তু সীজার তাকে পাত্তা দেয় না। ঘটনার কিছু পরে সিনেট ভবনে সীজারের হত্যাকাণ্ডটি ঘটে। হয়তো নাটকের আর্তেমিডোরাস কিছুটা কাল্পনিক, কিন্তু সীজার যে ষড়যন্ত্র সম্পর্কে নিজে সচেতন না হয়ে দুর্ভাগ্যজনকভাবে প্রাণ দেন, ইতিহাসের সত্যি ঘটনা এটা। পৃথিবীর ইতিহাসে বারবার দেখা গেছে সতর্ক বাণীর প্রতি অনেকেই গা করেন না। খামখেয়ালীপূর্ণ আচরণ করে থাকেন। সেগুলি প্রায় সময় ভয়াবহ বিপদ ডেকে আনতে পারে। পৃথিবীর অন্যতম ধনী বিল গেটস ভাইরাস দ্বারা ভয়াবহভাবে সংক্রমণ সম্পর্কে ২০১৫ সালে বিশ্বকে সতর্ক করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন আনবিক শক্তি বা অস্ত্র নয়, ভবিষ্যতে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বিপদ আসবে ভাইরাস দ্বারা সংক্রামিত হওয়ার মাধ্যমে, যার পরিণতিতে দশ মিলিয়ন মানুষ মারা পড়তে পারে। তিনি ভবিষ্যত বাণী করেছিলেন জ্যোতিষিদের মতো নয়, বিজ্ঞানমনস্কভাবে বিশ্বের অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে।

বিভিন্ন ভাইরাসের সঙ্গে ইবোলার আক্রমণ তিনি প্রত্যক্ষ করেছিলেন। তিনি দেখিয়েছেন, ইবোলা দ্বারা ভয়াবহ মহামারী ছড়িয়ে পড়ার হাত থেকে পৃথিবী রক্ষা পেয়েছে কাকতালীয়ভাবে কয়েকটি সুবিধাজনক কারণে। নতুন ভাইরাসের আক্রমণে ভবিষ্যতে তেমনটা নাও ঘটতে পারে। কিন্তু বিশ্ব নেতৃত্ববৃন্দ ব্যাপারটাকে গুরুত্ব দেয়নি এমনকি বিশ্ব সাহায্য সংস্থা। বিল গেটস ভাইরাসের আক্রমণ সম্পর্কে পরেও কয়েকবার তাঁর আশঙ্কার কথা স্মরণ করিয়ে দেবার চেষ্টা করেছেন, লাভ হয়নি। রাষ্ট্রনায়করা, রাষ্ট্রের মহাশক্তিধর পরিচালকরা সহ চিকিৎসাজগতের মহারথীরা থোড়াই কেয়ার করেছে। যখন চীনে গত ডিসেম্বরে করোনা ভাইরাসের আক্রমণ আরম্ভ হলো, চীন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাকে তা সঙ্গে সঙ্গে অবগত করে। কিন্তু বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সেটাকে নতুন একটা খবর ছাড়া খুব বেশি ভয়াবহ মনে করেনি। বিশ্বকে এ ব্যাপারে বা নতুন করোনা ভাইরাসের মহামারী সম্পর্কে প্রথম দুমাসে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সেইভাবে সতর্ক করেনি। বড় ছোট বিভিন্ন রাষ্ট্রের কর্ণধার সহ সংশ্লিষ্টরা ব্যাপারটাকে পাত্তা দেয়নি। ফল যা হবার হয়েছে। বিরাট বিরাট দেশ বলে যাদের লোকে সমীহ করতো, তারাই এখন ভয়াবহভাবে করোনা ভাইরাসের শিকার। বিশ্বের বহু রাষ্ট্রই এ ব্যাপারে সঠিক সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে নিজেদের অযোগ্যতা প্রমাণ করেছে। যুক্তরাষ্ট্রই এখন সবচেয়ে ভয়াবহরকম করোনা ভাইরাসে সংক্রামিত, মৃতের সংখ্যাও সবচেয়ে বেশি সেখানে। কারণ রাষ্ট্রপতি ট্রাম্প প্রথমে কিছুতেই চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ এবং চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের কথা শুনতে চাননি। ট্রাম্পের জেদই যুক্তরাষ্ট্রকে ভয়াবহ বিপদের সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রেই শুধু করোনায় আক্রান্তদের সংখ্যা সারা পৃথিবীর আক্রান্তদের প্রায় এক তৃতীয়াংশ।

বাংলাদেশ ঠিক একইভাবে যথাসময়ে সতর্ক হতে পারেনি। যথাযথ ব্যবস্থা নেয়ার জন্য যেসময় হাতে পাওয়া গিয়েছিল তা কাজে লাগানো যায়নি। মনে করা হয়েছিল বাংলাদেশে সেরকমভাবে আক্রমণ হবে না। কয়েকজন মনীষী বলেছেন, করোনার সঙ্গে লড়তে করোনার আগে হাঁটতে হবে, পিছনে নয়। কিন্তু প্রায় সকলেই করোনার পিছনে হেঁটেছে। করোনা ভাইরাস আক্রমণের আগে সেভাবে সতর্কতা বা প্রস্তুতি নেয়নি। কিন্তু দরকার ছিল করোনার আক্রমণের আগে প্রস্তুত থাকা। করোনার আক্রমণ ভয়াবহ হতে পারে ধরে নিয়ে যারা প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছিল, সেসব দেশ যথেষ্ট নিয়ন্ত্রণে রাখতে পেরেছে নিজের দেশের পরিস্থিতিকে। দক্ষিণ কোরিয়া, ভিয়েতনাম যেমন তার উদাহরণ। ভিয়েতনামে মৃত্যুর ঘটনা নেই আর আক্রান্তের সংখ্যা তিনশোর কম। দক্ষিণ কোরিয়া ‘লক ডাউন’ না করে ভিন্নভাবে তাকে নিয়ন্ত্রণ করেছে পূর্ব প্রস্তুতির জন্য। বাংলাদেশ যে প্রস্তুত ছিল না সেটা নিদ্বির্ধায় যেমন সত্য, ঠিক তার চেয়ে বেশি সত্য করোনা ভাইরাসের সংক্রমণের বিরুদ্ধে প্রস্তুতি বলতে কী বোঝায়, সেটাই স্পষ্টভাবে সংশ্লিষ্টদের ধারণায় ছিল না। মন্ত্রী থেকে সংশ্লিষ্ট পদাধিকারীরা তবুও বলেছিলেন, যে তাদের যথেষ্ট প্রস্তুতি আছে এমনকি বড় বড় অনেক দেশের চেয়েও। দুর্ভাগ্যজনকভাবে স্বাস্থ্যমন্ত্রী কদিন আগে পর্যন্ত বলেছেন, জানুয়ারি মাস থেকেই নাকি তাঁরা যথাযথ প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। নিজেদের দোষ স্বীকার করতে শিখিনি আমরা, বিনয় শিখেনি, মহাবিপর্যয়ের মুখে দাঁড়িয়ে পর্যন্ত সত্য বলতে শিখিনি। জীবনের সবটাই আমাদের লুকোচুরি।

বিষয়টার গুরুত্ব অনুধাবন করতে দেখা যায়নি দায়িত্বশীল বেশিরভাগ মানুষকে। সাধারণ নাগরিকদের কথা বাদ দেই। যাঁরা সমাজের অগ্রগামী ছিলেন, যাঁরা বিভিন্ন পেশার কর্ণধার ছিলেন সকলেই চরম দায়িত্বহীনতার পরিচয় দিয়েছেন। যখন ইতালী, স্পেন, যুক্তরাষ্ট্র ভয়াবহ সংক্রমণের শিকার, যখন সৌদি আরব কাবাঘর বন্ধ করে দিয়েছে তখন সব দেখেও গা না করাটা খুব লজ্জার। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলির কর্ণধাররা চরম অযোগ্যতার পরিচয় দিয়েছেন তা এখন পদে পদে প্রমাণিত। সারা বিশ্বে করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার পরেও তাদের নির্বিকার থাকার পরিণতি রাষ্ট্র এখন টের পাচ্ছে। চরম দায়িত্বহীনতা দেখিয়েছেন আইইডিসিআর এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্তারা; করোনা ভাইরাস সংক্রমণের মতো ভয়াবহ বিষয়টাতে যেন তারা হেসেখেলে আর বড় বড় কথা বলে সামাল দিতে চেয়েছেন। যা তাঁরা বড় মুখ করে বলেছিলেন, কিছুই কার্যক্ষেত্রে প্রমাণ করতে পারেননি। বরং নিজেদের পুরানো দোষ আর অযোগ্যতা চাপা দেয়ার জন্য, বর্তমানেও নানারকম সব কৌশল নিচ্ছেন যা দিনে দিনে বিপদ বাড়িয়েই তুলছে। নিজেদের সকল দোষ ‘জনগণের অসচেতনতার নামে’ ম্লান করে দিতে চাইছেন। সত্যি বলতে তাঁদের ভুলের মাশুল দিয়ে গিয়ে চিকিৎসকরা অনেক বেশি সংখ্যায় করোনা ভাইরাস দ্বারা আক্রান্ত হয়েছেন।

করোনা ভাইরাসের আক্রমণের প্রস্তুতি মানে শুধু চিকিৎসাসেবা দান নয়। ইতালী আর স্পেনের দিকে তাকিয়ে মাথায় রাখা দরকার ছিল, চিকিৎসকরা আর চিকিৎসাকর্মীরা সেবা দিতে গিয়ে আক্রান্ত হলে কী করতে হবে। মাথায় রাখা দরকার ছিল, যখন সংক্রমণের সংখ্যা বাড়বে, বহু চিকিৎসক আর হাসপাতালগুলি ভয় পেয়ে সাধারণ রোগীদেরকেও আর চিকিৎসা দিতে চাইবে না। সকলের মৃত্যু ভয় আছে আর নিজ হাসপাতালে কেউ রোগ ছড়াতে চাইবে না। ফলে করোনা আক্রমণের বিরুদ্ধে প্রস্তুতি মানে সবকিছু মাথায় রেখে সামগ্রিকভাবে প্রস্তুতি। কিছুতেই যেন সারাদেশের চিকিৎসাসেবা বন্ধ না হয় তার প্রস্তুতি। কিন্তু সেরকম প্রস্তুতি মাথায় রাখা হয়নি, ফলে করোনায় আক্রান্ত না হয়েও বিভিন্ন রোগে বিনা চিকিৎসায় বহু মানুষ মারা পড়ছে। করোনার প্রস্তুতি মানে, করোনায় আক্রান্তদের জন্য হাসপাতাল সংখ্যা বাড়ানো, চীন রাতারাতি সে উদাহরণ রেখে গেছে। ফলে শুধুমাত্র করোনা ভাইরাসে আক্রান্তদের সেবা দেয়ার জন্য হাসপাতাল বাড়ানো দরকার ছিল আর রোগনির্ণয় কেন্দ্র আর তার সুবিধা বাড়ানো। কিছুই করা হয়নি, কিন্তু বলা হয়েছে প্রস্তুতি আছে। চীৎকার করে এখনো যেন সেকথাটাই বলার চেষ্টা করছে। দেশের প্রধানমন্ত্রী চিকিৎসক না হয়েও করোনা ভাইরাসের চিকিৎসা সংক্রান্ত ব্যাপারে যতোটা দিকনির্দেশনা দিতে পারলেন, তারা কেউই তা পারলেন না!

রাষ্ট্রের প্রস্তুতি মানে শুধু রোগ নির্ণয় আর চিকিৎসা দানের প্রস্ততি নয়। করোনার আক্রমণের ফলে সমাজে রাষ্ট্রে আর যা যা ঘটবে তার সুবকিছুর প্রস্তুতি। বিশেষ কোনো মন্ত্রণালয় নয়, সকল মন্ত্রণলয়ের সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করা দরকার ছিল এরজন্য। যুক্তরাষ্ট্র, ইতালী, স্পেন যেসব সুযোগ পায়নি, সে সুযোগগুলিও আমরা পেয়েছিলাম; কারণ এখানে আক্রমণ হয়েছে অনেক পরে। রাতারাতি মানুষকে ঘরে ঢুকতে বললেই যে তাঁরা ঘরে ঢুকে যাবে না, সেটাই তো বাস্তবসম্মত। বিশেষ করে বাংলাদেশ জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্র নয় যে, দুর্দিনে রাষ্ট্র তাঁর খাওয়াপরার সব দায়িত্ব নেবে আর মানুষ নিশ্চিন্তে ঘরে গিয়ে বসে থাকবে। বাংলাদেশের রাষ্ট্র কি তার বিরাট সংখ্যক বেকার, অনিয়মিত উপার্জনকারী আর পুষ্টিহীন নাগরিকদেরকে চেনে না, তাদের বাস্তব অবস্থা জানে না? সমাজে যারা ধনী চাইলেই তারা তিনচার মাসের হাটবাজার করে ঘরে ঢুকে যেতে পারে? সকল মানুষের কি সেই সুবিধা আছে? বাংলাদেশের সকল মানুষের কি ঘর আছে? যাদের সামান্য থাকার ব্যবস্থা আছে, তাদের ঘরের পরিবেশ কী? বাংলাদেশে কজন মানুষ নিজ ঘরে আলাদাভাবে থাকার সুবিধা ভোগ করে? কতজন রাস্তায় আর স্টেশনে ঘুমায় দিনের পর দিন মাসের পর মাস, রাষ্ট্র কি তা জানে না?

বাংলাদেশের জন্য লক-ডাউন না করার সিদ্ধান্ত হতে পারতো সবচেয়ে সঠিক যদি অন্যান্য বিষয়গুলির দিকে সঠিকভাবে নজর দেবার ক্ষমতা রাখতো। বাংলাদেশের পক্ষে সেটা সম্ভব ছিল, যদি পূর্ব থেকেই সব পরিকল্পনা নেয়া হতো। কারণ বাংলাদেশ হাতে যথেষ্ট সময় পেয়েছিল। সাত লক্ষ মানুষকে লক-ডাউন করে রাখলে, সতেরো কোটি মানুষকে লক-ডাউন বা গৃহবন্দী না করলেই চলতো। পরিকল্পিতভাবে পদক্ষেপ নিয়ে বাইরে থেকে আসা এবং প্রবাসী বাংলাদেশীদের কয়েকটি শহরের মধ্যে বিশদিনের জন্য আটকে দেয়া যেতো। মানুষকে গৃহবন্দী করার ফলে ইতিমধ্যেই যে পরিমাণ আর্থিক ক্ষতি হয়েছে, তার চেয়ে কম খরচে এটা করা যেতো। কিন্তু সেরকম পরিকল্পনা বা প্রস্তুতি নিতে ব্যর্থ হয়েছি আমরা। কার ক্ষতি হলো এখন, অর্থনীতি ভেঙে পড়ার ফল পুরো জাতিকে ভোগ করতে হবে। বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান ভিত্তি হচ্ছে গ্রাম এবং চাষাবাদ। গ্রামগুলিতে যাতে করোনার আক্রমণ না ছড়িয়ে পড়ে, চাষাবাদ বাধাগ্রস্থ না হয় তা নিয়ে কি কোনো ধরনের পরিকল্পনা ছিল? সবার আগে দেশের অর্থনীতিকে বাঁচাতে হয়। গ্রামগুলিতে সন্দেহজনক সংক্রামিতদেরকে প্রবেশ না করতে দেয়ার পরিকল্পনা নেয়া হয়েছিল কি? ভিয়েতনাম সেটা করেছে। হয়তো আরো দেশ করেছে, যাদের খবর জানি না। নিশ্চয় বাংলাদেশের জন্য এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেয়া কঠিন। কিন্তু সেই কঠিন সিদ্ধান্তটা নেয়ার মতো সময় আমাদের হাতে ছিল।

লক ডাউন দরকার সন্দেহ নেই, কিন্তু দক্ষিণ কোরিয়া আবার লক ডাউন ছাড়াই সংকট কাটিয়ে উঠেছে। চীন যেমন একটা শহরকে বন্দী করে রেখেছিল সেটার যেমন যুক্তি ছিল, দক্ষিণ কোরিয়া যে আবার লক ডাউন করেনি এই চিন্তারও গুরুত্ব আছে। চীন একটা শহরকে লক ডাউন করে বাকি শহরের জীবনযাত্রা স্বাভাবিক রেখেছিল। চীন প্রথমেই বুঝেছিল, সারা চীনকে লক ডাউন করতে হলে সারাদেশের অর্থনীতি আর উন্নয়ন ধ্বসে যাবে। করোনার হাত থেকে তাতে মুক্তি আসলেও মানুষ মারা যাবে না খেয়ে, জীবন ধারণের বস্তুগত সুবিধা হারিয়ে। সারাদেশ জুড়ে দেখা যাবে বিশৃঙ্খলা আর হতাশা। সুদূর প্রসারী চিন্তা ছিল সেটা। ফলে একটা শহরের মধ্যে করোনাকে প্রবলভাবে আটকে রেখে ছাড়া দেশকে বাঁচাতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ ছিল তারা। চীন সেটা করেই খুব স্বল্প সময়ে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলতে পেরেছে। যদি কেউ লক্ষ্য করেন দেখতে পাবেন, সাধারণভাবে যারা মঙ্গলয়েড ঘরানার তারা যেন কেমন করে করোনাকে ঠেকিয়ে দিয়েছে। চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর, ভিয়েতনাম। লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, সকলেই নিজেদের চিন্তাশক্তিকে কাজে লাগিয়েছে। সকলেই প্রথমে সর্বশক্তি নিয়োগ করেছে এটা রুখতে, স্বাভাবিক জীবন যাপনে খুব একটা ব্যহত না করে। মিথ্যা অহঙ্কার না করে আমাদের শেখা উচিৎ, তা‌দের অভিজ্ঞতা নেয়া উচিত নিজেদের ভালোভাবে বেঁচে থাকার স্বার্থেই।

করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ প্রতিরোধের প্রস্তুতি কোনো ছেলেখেলা নয়। প্রথম মাথায় রাখা দরকার ছিল, লক-ডাউন করা হবে কি হবে না। যদি তা করা হয় তবে কারা স্বেচ্ছায় গৃহবন্দী থাকবেন আর কারা নয়। খুব সহজ কথা, সকলে গৃহবন্দী হলেতো রাষ্ট্র অচল হয়ে যাবে। সবকিছুর শুরু থেকেই এসব নিয়ে ভাবনাচিন্তা, হিসাব আর পরিসংখ্যান করা দরকার ছিল। চাষাবাদের মানুষজনকে কি সত্যিই গৃহবন্দী করে রাখা যাবে? রাখা গেলে কতদিন? দোকানদারদের কী গৃহবন্দী করে রাখা যাবে? বিভিন্ন প্রয়োজনীয় সামগ্রি উৎপাদকদের কি গৃহবন্দী থাকতে বলা যাবে? যাঁদের গৃহবন্দী করা যাবে না, রাষ্ট্র সম্পূর্ণ অচল না করে যাঁদের মাধমে রাষ্ট্র সচল রাখতে হবে তাঁদের ব্যাপারে কী উদ্যোগ নেওয়া হবে? ভিন্ন দিকে যাঁরা গৃহবন্দী হবেন তাঁদের মধ্যে যাঁরা দিনে আনে দিনে খান বা যাঁরা মাসের সামান্য বেতনে চলেন, তাঁদের কী হবে; কী পদ্ধতিতে তাঁরা গৃহবন্দী থাকবেন, তাঁদের খাবার দাবারের ব্যবস্থা কী হবে; রাষ্ট্র কি তা ভেবে রেখেছিলো? বাংলাদেশে বিচ্ছিন্নভাবে বিশেষ কোনো জেলায় বা দু-একটা অঞ্চলে বন্যা বা প্রাকৃতিক দুর্যোগ হলে যেখানে মানুষের কাছে ত্রাণ সামগ্রি ঠিকমতো পৌঁছায় না, সারা দেশের বিরাট সংখ্যক মানুষকে সেখানে যদি ত্রাণ দিতেই হয়, ত্রাণসামগ্রি পৌঁছাবার উপায় কী হবে? নিশ্চিতভাবে তা জনগণের হাতে যাবে কিনা সে নিয়ে কি উৎকণ্ঠা ছিল কর্ণধার আর উপদেষ্টাদের? সাধারণ মানুষকে এত কিছু না বুঝলেও চলে, কিন্তু রাষ্ট্রের কর্ণধারদের, রাষ্ট্রের উপদেষ্টাদের এসব বুঝতে হয়।

বাংলাদেশ তখনো সংক্রামিত হয়নি, ফেব্রুয়ারি মাসে। ফলে মানুষের তখন আতঙ্কিত হবার কিছুই ছিল না। যদি তখন মানুষকে বলা যেতো যে, “সামনে একটা ভয়াবহ বিপদ আসবার সম্ভবনা রয়েছে। যদি আমরা সতর্ক হই তাহলেই রক্ষা পাবো। দু-একজন করোনা ভাইরাস আক্রান্ত ধরা পড়লেই আমাদের অনেককে গৃহবন্দী হতে হবে। সেটা হলে বিপদ আর বেশি বাড়বে না। যদি গৃহবন্দী হতে হয়, যাদের খাবার দাবার থাকবে না, সরকার তাদের খাবার পৌঁছে দেবে।” সরকারের তাহলে প্রস্তুতি থাকতো, মানুষও প্রস্তুতি নিয়ে রাখতো। মানুষ আগে থেকেই একটা পরিকল্পনা নিতে পারতো, সেরকম পরিস্থিতি হলে কী করবে। যারা গ্রামে যেতো, রাতারাতি হৈ হুল্লোর করে যেতে হতো না। সংক্রামণ ছড়াতে পারতো না। যদি বহু আগে থেকে সে পরিকল্পনা থাকতো, তাহলে বিদেশ থেকে যাঁরা আসছেন, তাঁদের ব্যাপারেও কীভাবে কী করা হবে সে পরিকল্পনাটাও থাকতো। কিন্তু কারো কোনো পরিকল্পনা ছিল না। যখন করোনা ভাইরাসের আক্রমণে চীনের পর ইতালী, স্পেন দিশেহারা হয়েছিল, বাংলাদেশের সকল টেলিভিশনগুলিকে কাজে লাগানো যেতো সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য। দিনের পর দিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে মানুষকে সচেতন করলে মানুষ সচেতন হবে না, সেটা কি বিশ্বাস করতে হবে? কিন্তু সেটা আমরা করেছি কি না? না করেই জোর দিয়ে বলছি কী করে যে, “মানুষ সচেতন নয়”? যাঁরা দেশের কর্ণধার, তারাই তো বিশ্বাস করেননি করোনার ভয়াবহ রূপটা কী হতে পারে। ফলে জনগণকে বিশ্বাস করানো প্রচেষ্টাও ছিল না।

ইতিমধ্যেই বাংলাদেশ মহামারীর দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গেছে, বিভিন্ন দেশের দিকে তাকালে দেখা যাচ্ছে বাংলাদেশে সংক্রমণের হার বিভিন্ন বিপর্যস্ত দেশের চেয়ে বেশি। মৃতের হারও অন্যদের চেয়ে বেশি। গরম আবহাওয়া আমাদের রক্ষা করতে পারছে না। নানারকম গুজব কোনো কাজে লাগছে না। বিজ্ঞানমনস্কতার অভাবে সকলেই আমরা সংক্ষিপ্ত রাস্তা খুঁজি, সর্টকাটে সব সেরে ফেলতে চাই। কিন্তু কেউ আর এখন ঘটনায় দায় স্বীকার করছে না। ছুটি দেয়ার লক্ষ্য কী, বা ‘লক-ডাউন’ আর ‘ছুটি’তে পার্থক্য কী কেউ বুঝে উঠতে পারছে না। যাঁরা গৃহবন্দী না থাকার জন্য সাধারণ মানুষের উপর ক্ষেপে যাচ্ছেন, তাঁদের বলতে চাই বিভিন্ন ক্ষমতাবান ব্যক্তিরা যে ত্রাণ দেয়ার নামে, দলবল নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন, তাঁরা কি সংক্রামিত করছেন না? বহুজন প্রশাসন চালাবার নামে দলবল নিয়ে দেখেছি আসর জমাচ্ছেন, সেটা কি সংক্রমণের কারণ নয়? এঁরা তো লেখাপড়া জানা, তথাকথিত শিক্ষিত ক্ষমতাবান মানুষ। মনে রাখতে হবে সাধারণ মানুষরা ক্ষমতাবানদের স্বভাবের বহুকিছু নিজের অজান্তে রপ্ত করে, সে দোষটা তাঁদের নয়। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, পোষাকশিল্পের মালিকদের উদাহরণটা টানতেই হয়। প্রধানমন্ত্রী নিজে এপ্রিলের এগারো পর্যন্ত ছুটি ঘোষণাার পর তাঁরা কী করেছেন? লক্ষ লক্ষ শ্রমিককে বিপদে ফেলেছেন। সত্যিই কি তারপর বলতে হবে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার দায় সাধারণ শ্রমিকদের?

নিজে আমি বিশ্বাস করি, সকল কিছুর পরে বাংলাদেশকে যদি কেউ করোনা সংক্রমণের বিপদ থেকে রক্ষা করে তা হলো ঐ নিম্নবর্গের সাধারণ মানুষ “ছোটলোকরা”। সত্যি বলতে ঐ মানুষগুলির উপর আমার অনেক বেশি আস্থা। বাংলাদেশের এই দুর্দিনে, করোনা ভাইরাসের সংক্রামণ ছড়াবার এই দিনগুলিতে আপনার মতো আমিও বিশ্বাস করি, সবচেয়ে প্রয়োজন এখন গৃহবন্দী থাকা। কিন্তু সেই সঙ্গে এটাও বিশ্বাস করি, এর জন্য কিছু শর্ত রয়েছে, সেটা পালিত না হলে মানুষকে গৃহবন্দী করা যাবে না। কর্মকর্তাদের একজন দেখলাম প্রস্তাব করেছেন, টেলিভিশনের অনুষ্ঠানে আরো বিনোদন দিতে হবে, যাতে মানুষ ঘরে আটকে থাকে। তিনি বিনোদন বলতে যে কী বোঝেন সেটা একটা দুর্বোধ্য বিষয় হয়ে রইলো। টেলিভিশনে বিনোদন দেয়ার আগে গৃহবন্দী অসহায় মানুষকে খাবার পৌঁছে দিতে হবে। যেসকল দরিদ্র কর্মজীবী মানুষ এ মুহূর্তে গৃহেবন্দী আছেন, মনে রাখতে হবে চিকিৎসকদের জায়গায় আগামী দিনে তাঁরাই হবেন সার্বিক অর্থনীতির বড় সৈনিক। চিকিৎসকদের দায়িত্ব তখন অনেক কমে যাবে, কর্মজীবী মানুষের দায়িত্ব বাড়বে। ফলে তাঁরা যেন সুস্থ থাকেন, সুগঠিত থাকেন সেটা নিশ্চিত করতে হবে। কর্মক্লান্ত মানুষ যাঁরা কোনোদিন বিশ্রাম পায় না, বিশ্রাম কী জানে না; খাবার পেলে নিশ্চিন্তে তাঁরা খুশি মনে ঘরে কিছুদিন বিশ্রাম নেবে। টেলিভিশন শুধু তাঁদের সজাগ করে দেবে, তাদের দায়িত্ব সম্পর্কে। খাবার না পেলে মানুষের মস্তিস্ক যে ঠিকভাবে কাজ করে না, মহাভারত থেকে আধুনিক বিজ্ঞান তা স্বীকার করে থাকে।

চিকিৎসকরা লড়ছেন করোনা ভাইরাস সংক্রমণের প্রতিরোধে। সামান্য কিছু দোষত্রুটি বাদ দিলে চিকিৎসকরা সাহসী ভূমিকা রাখছেন। কিন্তু চিকিৎসকের যথাযথভাবে কাজ করবার সুযোগ কম। চিকিৎসকরা এখন পর্যন্ত সঠিক সুরক্ষা পাচ্ছেন না। করোনা ভাইরাস সংক্রমণ প্রতিরোধে এখন পর্যন্ত একটা ল্যাজেগোবরে অবস্থা চলছে। নানা ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনায় প্রতিদিন আতঙ্কের নানা কারণ বাড়ছে। মাহফুজ আনাম তাঁর এক লেখাতে বলেন, করোনা ভাইরাসের চেয়ে বড় বিপদ আমাদের মহারথীদের অযোগ্যতা যা বহুদিন ধরে বিপজজ্জনক হয়ে আছে। তিনি দেখিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রী করোনা ভাইরাস সম্পর্কে চমৎকার দিকনির্দেশনা দিলেও, এই অযোগ্য মানুষদের জন্য তা কিছুতেই আগাচ্ছে না। বিভিন্ন কর্তাব্যক্তির, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের গাফেলতি, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দায় দায়িত্বহীনতায় বহু অঘটন ঘটে যাবার পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়ে বসে আছে। সত্যিকার অর্থে এসবের জন্য কে দায়ী তা নিশ্চিতভাবে বলা কঠিন। সেরকম অনুসন্ধানের সুযোগ এই মূহূর্তে কম। কিন্তু যিনি যে আসনে বসে রয়েছেন, কর্তব্য অবহেলার দায় তাঁকে নিতেই হবে। যদি দায় শুধু এর ওর ঘাড়ে চাপানো হয় তাহলে কাজই আগাবে না। যিনি দায় নেবেন না, তিনি কর্তাব্যক্তি সেজে চেয়ারে বসে থাকবেন কেন, দায়িত্বশীল পদ ছেড়ে দেবেন।

যা আজকের প্রধান সঙ্কট তা ঘটেছে পূর্ব থেকেই পরিকল্পনা না নেয়ার কারণে। করোনা ভাইরাস ছড়ানোর পাশাপাশি দেখা যাচ্ছে বিরাট অর্থনৈতিক বিপর্যয়। প্রস্তুতি না থাকার কারণে বহু ধরনের অঘটন ঘটছে। মানুষ প্রতিদিন টনকে টন দুধ ফেলে দিচ্ছে। দুধ কেনার গ্রাহক নেই, মিষ্টির দোকান সব বন্ধ। রাজধানীতে যে দুধ পাঠানো হতো সেটা আর পাঠানোর সুযোগ নেই। প্রচুর খাবার কেনার লোক নেই, মাছ মাংস পচন ধরেছে, তা ফেলে দিতে হচ্ছে। কিন্তু প্রথম থেকে যদি একটা পরিকল্পনা থাকতো, তাহলে এরকম ঘটতো না। বাংলাদেশে যেখানে খাবারের অভাব, মানুষের পুষ্টির অভাব; সেখানে আগে থেকে প্রস্তুতি নেয়া থাকলে এসব খাবারের সরবরাহ চালু রাখা যেতো ভিন্নভাবে। পূর্ব প্রস্ততি থাকলে বিভিন্ন খাবারের অনেকটা স্থানীয়ভাবে দরিদ্র মানুষকে দেয়া যেতো। খাবার নেই কিন্তু টনকে টন খাবার ফেলে দিতে হচ্ছে। যারা এসব খাবারের ক্ষুদ্র উৎপাদক তারা কপর্দকহীন হয়ে পড়ছে। পূর্বে প্রস্তুতি থাকলে খাবারের এসব চেইন বজায় রাখা যেতো আগে থেকে পরিকল্পনা করে। কী কী বন্ধ করতে হবে, আর কী কী বন্ধ করলে বিপদ হবে আগে থেকে জানা থাকলে এমনটা হতো না। রাস্তায় নামা মানেই করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ নয়, সংক্রামিত হতে হলে করোনা ভাইরাস বহনকারীর সংস্পর্শে আসতে হবে। যদি পূর্ব থেকে পরিকল্পনা নেয়া হতো, তাহলে কী করা যেতে পারতো? যাদের সেভাবে কাজ চালিয়ে যাওয়ার প্রয়োজন নেই তারা ঘরে থাকবে। যাদের প্রয়োজন রয়েছে, যারা কাজ না করলে রাষ্ট্র একেবারে অচল হয়ে যাবে তারা সুরক্ষা গ্রহণের মধ্য দিয়ে কাজ চালিয়ে যাবে। যদি বিরাট সংখ্যক মানুষ গৃহবন্দী থাকে রাস্তাঘাট ফাঁকা হয়ে যাবে, তখন অন্যদের নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রেখে পরিকল্পিতভাবে পথ চলা কঠিন কিছু ছিল না। সেরকম পরিকল্পনা নিতে না পারার জন্য, উৎপাদিত বহু পণ্য আর কাজে আসছে না। যদি প্রথম থেকে ভয়াবহতা মাথায় থাকতো, সবকিছু গুছিয়ে আরো সুন্দরভাবে করা যেতো।

পূর্ব প্রস্তুতি নিলে বহুকিছু যেমন এড়ানো যেতো না ঠিক বহু সঙ্কটই এড়ানো যেতো। করোনা ভাইরাসের ব্যাপারটা ভূমিকম্পের মতো ছিলো না যে, প্রস্তুতি নেয়া বা সঙ্কটকে মোকাবেলা করার সুযোগ ছিল না। যদি পূর্ব প্রস্তুতি থাকতো বহুকিছুই নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখা যেতো। পূর্ব প্রস্তুতি নিয়ে জনগণকে সচেতন করা যেতো। ডাঃ ইকবাল আরসালান বলেছেন, যা আমরা শুরু করেছি সেটা অনেক দেরিতে শুরু করেছি। যদি ঠিক সময়ে শুরু করা যেতো, তাহলে বহুকিছুর সমাধান সম্ভব ছিল। তিনি মনে করেন, সমন্বয়হীনতা ছিল আর একটি সঙ্কট। প্রথম থেকে বলা হয়েছিল, সব ঠিক আছে, সবকিছু হয়ে যাবে। তিনি মনে করেন, এইরকম কথা বলে মানুষকে সচেতন করা সম্ভব ছিল না। তিনি যুক্তিসঙ্গত কথা বলেছেন। তিনি বারবার বললেন, বহু দেরিতে সব কিছু আরম্ভ করা হয়েছে এবং করোনার বর্তমান ভয়াবহতার মধ্যেও দায়িত্বশীলরা জাতীয় কমিটির দেয়া পরামর্শ অনুযায়ী কাজগুলি ঠিকমতো করছেন না।

কার্যকর যে হচ্ছে না, সেটা বোঝা যাচ্ছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী একটা দিকনির্দেশনা দিয়েছেন লিখিতভাবে, সেখানে প্রায় সবগুলি বিষয়কে আলোচনায় রাখা হয়েছে। যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ দিক নির্দেশনা সেটা। কিন্তু তারপরেও নানারকম অভিযোগ আসছে। দূরে বসে আমাদের পক্ষে জানা সম্ভব হচ্ছে না, কাদের গাফেলতির কারণে সেগুলি পালিত হচ্ছে না। ইতিমধ্যেই নানারকম সময়ে বলা হচ্ছে, করোনার অষুধ আবিষ্কার হয়েছে। কিন্তু সারা পৃথিবী যখন বলছে করোনার চিকিৎসার জন্য সুনির্দিষ্ট অষুধ নেই, তখন বাংলাদেশ কী করে অষুধ আবিষ্কার হয়েছে সে কথা বলছে। জাপান থেকে আবিষ্কৃত যে অষুধকে জাপান নিজে করোনার অষুধ বলছে না, বাংলাদেশের অষুধ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান সেগুলিকে কীভাবে করোনা অষুধ হিসেবে প্রচার চালাচ্ছে? বাংলাদেশের সুবিধাভোগী একটি গোষ্ঠী এখনো করোনার ভয়াবহতাকে আমলে নিচ্ছে না, নিজেদের সুযোগ সুবিধাকে বড় করে দেখছে। খুব স্বাভাবিক, সেক্ষেত্রে সাধারণ মানুষ কী করে করোনার ভয়াবহতা হৃদঙ্গম করবে?

যদি এখনো সামনের সবচেয়ে ভয়াবহ বিপর্যয় থেকে বাঁচতে চাই, কৃষির দিকে নজর দিতে হবে। গ্রামের লোকসংখ্যা কম, সেখানে দূরত্ব বাঁচিয়ে কাজ করা সম্ভব। ফলে কৃষিকর্মে যুক্ত মানুষদের সহযোগিতা দিয়ে যেতে হবে। কিছু কিছু প্রয়োজনীয় উৎপাদন চালু রাখতে হবে। হাস-মুরগি গবাদি পশু পালন বা চাষ যেন বন্ধ না হয়ে তার জন্য সকল অপ্রয়োজনীয় খাত বাদ দিয়ে সেখানে টাকা ঢালতে হবে, বেঁচে থাকার জন্য ন্যূনতম নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যসামগ্রি উৎপাদনে মনোযোগ দিতে হবে। সকলকে উৎসাহ জোগাতে হবে নিজের বাড়ির সঙ্গে চাষযোগ্য জমিতে কিছু একটা চাষ করার জন্য। যারা এই উৎপাদন প্রক্রিয়া সচল রাখার সঙ্গে যুক্ত থাকবেন, তাদেরকে সচেতন করতে হবে নিজেদের সুরক্ষা সম্পর্কে। যতোটা সম্ভব বয়স্কদের বাদ দিয়ে কমবয়স্কদের যুক্ত রাখতে হবে। সঙ্গে সঙ্গে সঙ্গে যোগাযোগ, বিদুৎ, পানি, গ্যাস, প্রয়োজনীয় দ্রব্যের সরবরাহ সচল রাখতে যাঁরা কাজ করছেন তাঁদের কথা আলাদাভাবে ভাবতে হবে। পুলিশ সহ সবকিছু সচল রাখতে যাঁরা সংশ্লিষ্ট সকলে যেন সংক্রমণের শিকার না হন, যেন সুরক্ষা পান সেদিকে বিশেষ নজর দিতে হবে। মানুষজন গৃহবন্দী থাকছে যতদিন, তাঁদের সুরক্ষা লাভের সুযোগ বাড়ছে।

করোনার আক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আনার পর যদি সকল রকম বিপর্যয় থেকে প্রাথমিকভাবে বাঁচতে চাই, কৃষিই আমাদের বাঁচাবে। মনে রাখতে হবে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের পর যখন কিছু ছিল না, প্রথম সুরক্ষা দিয়েছিল কৃষি অর্থনীতি। যুদ্ধের সময় কৃষিকাজ বন্ধ ছিল না। সারা পৃথিবীর অর্থনীতির মূল হচ্ছে কৃষি বা খাদ্য। মানব সভ্যতার প্রথম অর্থনীতি কৃষি বা চাষাবাদ। করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ রোধ করার পাশাপাশি সবচেয়ে গুরুত্ব দিয়ে যা করতে হবে, চাষাবাদ চালু রাখা আর খাদ্য সংকট থেকে রক্ষা পাওয়া। চাষাবাদের ব্যাপারে কৃষকদের সঙ্গে কথা বলা ভালো। বাংলাদেশে আগে যেমন কৃষকরা বীজ উৎপাদন করতো এখন আর তা নয়। বীজ কিনে চাষাবাদ করা হয়। বীজ যদি ঠিকমতো না পাওয়া বিপদ আরো বাড়বে। ফলে কৃষকরা আগের মতো করে বীজ তৈরি করবার পদক্ষেপ নেবেন কিনা তা নিয়ে তাদের সঙ্গে মতবিনিময় করতে হবে। নিশ্চয় এ ব্যাপারে টেলিভিশনের বিরাট ভূমিকা রাখবার সুযোগ রয়েছে। টেলিভিশন এ মুহূর্তে একটা বড় অস্ত্র যদি সেটাকে সফলভাবে প্রয়োগ করা যায়।

চাষাবাদের সঙ্গে যুক্ত মানুষরা করোনা ভাইরাসের আক্রমণের শিকার হলে পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ হবে। ফলে গ্রামগুলিকে যতোটা সম্ভব এই আক্রমণের হাত থেকে রক্ষা করতে হবে। সংকট এড়াবার পথ যখন নেই, খুব ঠাণ্ডা মাথায় বিবেচকের মতো পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। সকলে মিলে আতঙ্ক না ছড়িয়ে বাস্তবতা মেনে নিয়ে আগাতে হবে। সকল বিপদে উদ্ধারের একটা না একটা পথ থাকবেই। পথটা খুঁজতে হবে, সেজন্য সবচেয়ে বেশি দরকার গুজবে কান না দেয়া আর সমন্বিতভাবে এবং পুরো জাতি ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করে যাওয়া। সকলে আমরা একটা ভয়াবহ যুদ্ধে অবতীর্ণ হচ্ছি। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো, যার বিরুদ্ধে লড়াই সে আমাদের কোনো সচেতন শত্রু নয়। নিজে কিছু না বুঝেই আমাদের আক্রমণ করে বসছে। কথাটা তো ঠিক আমাদের নিজেদের অসতর্কতার জন্য সে বিরাট হয়ে উঠেছে। যদি পাশ্চাত্য আগে সচেতন হতো, তাহলে ইতালী, স্পেন, ফ্রান্স, যুক্তরাষ্ট্র, অষ্ট্রেলিয়া এইরকম দেশগুলি বিপদে পড়তো না। যদি তারা বিপজ্জনক পরিস্থিতির শিকার না হতো আমরা অনেক বেশি নিরাপদ থাকতে পারতাম। কিন্তু যা ঘটে গেছে তা ফেরানো যাবে না। যেখানে দাঁড়িয়ে আছি সেখান থেকেই কাজ আরম্ভ করতে হবে। প্রধান কাজটাই হচ্ছে, রাষ্ট্রের সকল সামর্থ্য, সকল সম্পদ এই লড়াইয়ে নিয়োজিত করা।

লড়াইয়ের জায়গা প্রধানত তিনটা। যাতে রোগ না ছড়ায় তার জন্য যতোবেশি মানুষকে গৃহবন্দী করে রাখা। যারা গৃহবন্দী থাকবে তাদের জন্য ন্যূনতম খাবার নিশ্চিত করা। না খেয়ে যেন কাউকে মরতে না হয়। মানুষ বেঁচে থাকলে আবার সম্পদ তৈরি করা যাবে। প্রধানমন্ত্রী এ ব্যাপারে ইতিমধ্যেই যথাযথ দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। গরীবদের খাদ্য চুরি করলে তিনি ক্ষমা করবেন না তাও বলেছেন। কিন্তু তারপরেও খাদ্য চুরি হয়ে গেছে, সাধারণ মানুষের কাছে ঠিকভাবে খাবার পৌঁছাচ্ছে না। মানুষের কাছে ত্রাণ সামগ্রি ঠিক মতো পৌঁছাতে হলে বিভিন্ন সমাজকল্যাণ সংগঠন, সাংস্কৃতিক সংগঠন, বাম সংগঠনের তরুণ কর্মীদের কাজে লাগাতে হবে। ইতিমধ্যেই তাঁরা অনেকে নিজ উদ্যোগে স্বল্প সামর্থ্য নিয়ে কাজ আরম্ভ করেছেন। প্রথম ত্রাণ নিয়ে তাঁরাই গেছেন মানুষের কাছে। ইতিপূর্বে প্রতিটি বড় বড় দুর্যোগে তাঁদের ইতিবাচক ভূমিকা প্রমাণিত। যখন সংশ্লিষ্টরা চুরি করেছে, তাঁরা নিঃস্বার্থভাবে বিপদের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করেছে। বঙ্গবন্ধুর বিভিন্ন ভাষণ মনে রাখলে দেখা যাবে, তিনি কাদের জন্য আগাতে পারেননি। তিনি যথেষ্ট ভদ্রভাষায় কাদেরকে বারবার চোর বলেছেন। প্রধানমন্ত্রী যে লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছেন, প্রধানমন্ত্রীকে সহযোগিতা করার জন্য সঙ্গে থাকতে হবে সকল গণমাধ্যমগুলিকে। গণমাধ্যম এ সময়ে মানুষকে সাহস জোগাতে বিরাট শক্তি। বিশেষ করে দেশের গণমাধ্যমের প্রধান ব্যক্তিত্বরা পরামর্শদাতা হিসেবে কাজ করতে পারেন।

নতুন অস্থায়ী হাসপাতাল করতে হবে, বন্ধ থাকা বিভিন্ন বিদ্যালয়গুলিকে সেজন্য কাজে লাগানো যেতে পারে। মুক্তিযুদ্ধে মেলাঘর হাসাপাতালের অভিজ্ঞতা ডাঃ জাফরুল্লাহ চৌধুরী সহ অনেকের রয়েছে। তিনি একাজে সহযোগিতা দিতে পারবেন। ডাঃ ইকবাল আরসালান সেক্ষেত্রে আরো একজন যোগ্য ব্যক্তি। চিকিৎসাসেবা দেয়ার সঙ্গে সঙ্গে সকল মানুষকে করোনা ভাইরাস সম্পর্কে আর তা প্রতিরোধ সম্পর্কে সচেতন করা আর একটা বড় কাজ। সেজন্য টেলিভিশনের মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে বোধগম্য ভাষায় করোনা ভাইরাস সম্পর্কে বলা, সুরক্ষিত থাকার পথ দেখানো। সাধারণ মানুষরা বিজ্ঞানের কথা সহজভাবে বললে গ্রহণ করবে না, হতেই পারে না। কারণ তাদের জীবন সংগ্রাম বিজ্ঞানসম্মতভাবেই পরিচালিত হয়ে থাকে। নাহলে বিজ্ঞানসম্মত ভাবে তাঁরা ফসল ফলাতে পারতেন না। ঋতুর নিয়ম মেনে তারা চাষ আবাদ করেন, পুরোহিতের কথা শুনে নয়। বিজ্ঞানের কথা সকলের আগে তারা গ্রহণ করবে যদি তাদেরকে সঠিকভাবে বোঝানো যায়।

যতদূর মনে হচ্ছে বাংলাদেশ একা এই বিপদ সামলে উঠতে পারবে না। কিন্তু ভিন্ন কোনো দেশের সাহায্য পাওয়া কঠিন এখন। কিন্তু তারপরেও মনে হয়, তিনটা দেশকে বাংলাদেশ হয়তো পাশে পাবে। তিনটা দেশ হলো চীন, জাপান আর দক্ষিণ কোরিয়া। জাপান নিজে বিপদে পড়লেও এখনো বেশ সুরক্ষিত। চীন চাইলে একাই বিরাট সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিতে পারে। চীন এবং দক্ষিণ কোরিয়া ইতিমধ্যে বাংলাদেশের সহযোগিতা করার কথা বলেছে। বাংলাদেশকে তাদের কাছ থেকে সব ধরনের সহযোগিতা আর পরামর্শ নিতে হবে। চীন আর দক্ষিণ কোরিয়া নিঃসন্দেহে করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ প্রতিরোধে সবচেয়ে ভালোভাবে নির্দেশনা রাখতে পারবে। কঠোরভাবে খেয়াল রাখতে হবে, বাংলাদেশের কিছু কর্তৃত্বকামী পদাধিকারীরা নিজেদের ক্ষমতা প্রয়োগ করে যেন সেসব পরামর্শকে গুলিয়ে না দেয়। বাংলাদেশের কৃষি এবং সামগ্রিক অর্থনীতি সচল রাখার জন্যও চীন, জাপান আর কোরিয়ার পরামর্শ নিতে হবে। মালয়েশিয়ার দীর্ঘকালীন প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মুহাম্মদ তাঁর ‘আত্মজীবনী’ গ্রন্থে বারবার বলেছেন, জাপান আর দক্ষিণ কোরিয়া মালয়েশিয়ার অর্থনীতি আর বিভিন্নরকম উন্নয়নে কীভাবে পরামর্শ দিয়ে আর প্রশিক্ষণ দিয়ে সাহায্য করেছিল। মাহাথিরের শ্লোগানই ছিল পশ্চিম থেকে ‘পূবের দিকে দৃষ্টি ফেরাও’।

লেখক পরিচিতি:
রাহমান চৌধুরী, লেখক, শিল্প সমালোচক
Raahman Chowdhury

*এই বিভাগে প্রকাশিত লেখার মতামত ও বানানরীতি লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাঙালীয়ানার সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকা অস্বাভাবিক নয়। তাই এখানে প্রকাশিত লেখা বা লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা সংক্রান্ত আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় বাঙালীয়ানার নেই। – সম্পাদক

মন্তব্য করুন (Comments)

comments

Share.