কলকাতায় বিদ্যাসাগরের মূর্তি ভাঙার দায় কার?

Comments
বিজেপি’র নির্বাচনী প্রচার গড়ালো সংঘর্ষে। ভাঙল ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের মূর্তি। বিজেপি আর তৃণমূল কংগ্রেসের মদতপুষ্ট দুষ্কৃতকারীদের মাঝে তাণ্ডবে মঙ্গলবার, ১৪ মে, ২০১৯, বিকেলে আতঙ্ক ছড়ালো বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে।

কলকাতার বিদগ্ধ মহল মনে করেন যে দু’পক্ষ যেভাবে তাণ্ডব চালিয়েছে, তাতে স্পষ্ট দু’পক্ষের প্রস্তুতি ছিল আগেই। সংঘর্ষের সময় শোনা গেছে সাম্প্রদায়িক শ্লোগান, উসকানি ও প্ররোচনামূলক শ্লোগান। তারা মনে করেন তৃণমূল ও বিজেপির এ ধরনের কর্মকান্ড রাজনৈতিক মেরুকরণে মানুষকে বিভক্ত করছে।

গণমাধ্যমে জানা যায় যে তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী, মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় রাতে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। গণমাধ্যমে আরও জানা যায়, বিধান সরণিতে বিদ্যাসাগর কলেজের সামনে বিজেপি’র রোড শো চলাকালীন পুলিশ অনুপস্থিত ছিল। কেন পুলিশ সেখানে ছিল না তার জবাব মেলেনি। তবে কলকাতা পুলিশের পক্ষ থেকে সন্ধ্যায় এক বিবৃতিতে বলা হয়, সেখানে বিজেপি এবং তৃণমূল কংগ্রেস দুই দলের কর্মীদের তাণ্ডব চালাবার জন্যে দায়ী করা হয়।

অবশ্য রাতে বিদ্যাসাগর কলেজে মুখ্যমন্ত্রী মমতা দাবি করেন যে, কলকাতা পুলিশের ওই বিবৃতি ‘ফেক’। পুলিশ ঐ ঘটনায় ১৬জনকে গ্রেফতারের কথাও জানায় বিবৃতিতে। রাজনৈতিক মহলে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে ‘ভুয়ো’ বিবৃতিতে গ্রেপ্তারের সংখ্যা লেখা কি করে সম্ভব?

এদিন ধর্মতলা থেকে রোড শো শুরু করে বিজেপি দলীয় সভাপতি অমিত শাহকে সাথে নিয়ে। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে প্রথম বাধা পায় রোড শো। বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে অমিত শাহ’র রোড শো আটকে তৃণমূল ছাত্র পরিষদের (টিএমসিপি) সদস্যদের বিক্ষোভ দেখায়। টিএমসিপির সদস্যরা কালো পতাকা দেখাতে থাকে আর ‘গো ব্যাক’ শ্লোগান লেখা পোস্টার নিয়ে কলেজ স্ট্রিটে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের গেটে বসে অবস্থান করে। প্রত্যক্ষদর্শীরা বলেছেন, ভিন রাজ্যের অনেকে মানুষ রোড শোতে ছিলেন যাদের কলকাতা, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়, বিদ্যাসাগর বিষয়ে কোনও ধারণাই নেই। কালো পতাকা দেখা থেকে অমিত শাহকে  ‘রক্ষা করতে’ বড় বড় ফেস্টুন রাস্তার ধার দিয়ে ধরে ধরে এগোতে থাকে বিজেপি কর্মীরা। বিজেপি’র এই রোড শো থেকে ‘এসএফআই মুর্দাবাদ’ শ্লোগান দিতে শোনা যায়। মিছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে এলে মিছিলে থাকা বিজেপি কর্মী-সমর্থকদের সঙ্গে টিএমসিপি সদস্যদের হাতাহাতি বেধে যায়।

কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের গন্ডগোল যখন চলছে তখন রোড শো’র অগ্রভাগ অমিত শাহকে নিয়ে আরও খানিকটা এগিয়ে বিধান সরণিতে বিদ্যাসাগর কলেজের সামনে পৌঁছে আটকে যায়। রোড শো মিছিলের অগ্রভাগে থাকা বিজেপি’র কর্মী-সমর্থকরা উন্মত্তের মতো ছুটে যায় বিদ্যাসাগর কলেজের সামনে। কলেজের সামনে টিএমসিপি এবং বিজেপি কর্মীদের সংঘর্ষ হয়। কলেজের বাইরে থাকা একটি মোটরবাইকে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। শুরু হয় দুই পক্ষের মধ্যে ইট ছোঁড়াছুঁড়ি। এদিন সন্ধ্যায় যখন এই গন্ডগোল সংঘর্ষের চেহারা নিয়েছে তখন বিদ্যাসাগর কলেজের চলছিল সান্ধ্যকালীন ক্লাস। কলেজের বাইরে সংঘর্ষের খবর পেয়ে ছুটে আসে বিজেপি’র ছাত্র সংগঠনের (এবিভিপি) সদস্যরা। দু’পক্ষের তান্ডবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় কলেজ ক্যাম্পাস। ভাঙচুর চলে যত্রতত্র। আসবাব, গেট ভাঙচুর হয়। ঠিক সেসময়েই কলেজের সামনে থাকা ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের মূর্তি ভেঙে দেওয়া হয়।

এসময় পুলিশকে দেখা যায় মগ নিয়ে আগুন নেভাতে ছুটোছুটি করতে। দুই পক্ষের হাঙ্গামায় আহত হয় ছ’জন। মাথা ফেটে যায় চার শিক্ষার্থীর। আর্মহাস্ট স্ট্রিট থানার পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে লাঠিচার্জ করে।

এ ঘটনায় রোড শো বন্ধ করেননি অমিত শাহ। সংঘর্ষের পরেও অমিত শাহ খোলা গাড়ী ছেড়ে গাড়ির মধ্যে অবস্থান নেন। আগেই তাঁকে ঘিরে ফেলেছিল কমান্ডোরা। এদিন শাহর পূর্ব ঘোষিত পরিকল্পনা ছিল বিবেকানন্দের বাসভবনের স্মারকে যাওয়া। সেখানে তিনি শেষ পর্যন্ত যাননি।

রোড  শোকে ঘিরে সংঘর্ষ প্রশমিত হতেই  বিজেপিিত শাহ-তৃণমূলের মধ্যে  শুরু হয় পাল্টাপাল্টি ঘটনার দায় চাপানো। অমিত শাহ অভিযোগ করে বলেন, পুলিশের ভূমিকা এদিন ছিল নিন্দনীয়। ইচ্ছাকৃতভাবে এদিনের রোড শো’কে ভুল পথে চালিত করেছে পুলিশ। বিজেপি এই ঘটনার পর ঘটনা নয়াদিল্লিতে নির্বাচন কমিশনের দপ্তরে যায় এবং অভিযোগ করে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পালটা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন,‘‘ওরা বাংলাকে চেনে না। শেষ দফায় ওদের যোগ্য জবাব দিতে হবে।’’ বিজেপি’র বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দায়ের করতে তিনি শিক্ষামন্ত্রী পার্থ চ্যাটার্জিকে নির্দেশ দিয়েছেন।

এই পালটাপালটির মাঝে বিজেপি-তৃণমূলের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ বাম দলগুলো এবং সুশিল সমাজ বলছেন বিদ্যাসাগরের মূর্তি ও বিদ্যাসাগর কলেজে হামলা ও ভাঙচুরের দায় দুদলকেই নিতে হবে।

বাঙালীয়ানা/এসএল

মন্তব্য করুন (Comments)

comments

Share.