কলিমুল্লাহ দরবেশ । নুসরাত সুলতানা

Comments

সেদিনও  জঙ্গলের গাছপালা পাতা,  তরু-লতা জোছনায় ভেসে যাচ্ছিল। পুকুরটাকে মনে হচ্ছে সারা অঙ্গে রূপার গয়না পরা এক ষোড়শী বউ। এমন রাত হলেই কলিমুল্লাহ দরবেশের স্বমেহনের তীব্র আকাঙ্খা জেঁকে বসে। কিছুতেই সে দুর্মর আকাঙ্খা তাকে মুক্তি দেয় না। স্বমেহনের সময় বের করে তার পছন্দের সেই বয়ামটা যাতে সংরক্ষিত আছে প্রিয়তমা নারীর দুটি বিশেষ অঙ্গ। স্বমেহন শেষে সে বুক ভাসিয়ে কাঁদে। তারপর জঙ্গলের পুকুরে গোসল করে আদায় করে নেয় দুই রাকাত তাহাজ্জুদ নামাজ। অতঃপর সে আয়েশ করে খায় একটা সিগারেট।  এরপর ঘুমায় বেলা এগারোটা অব্দি। ঘুম থেকে উঠে দেখে প্রায় পঁচিশজন রোগী হাজির। কারো পেটে ব্যথা, কারো মাথা ঘুরায়, কারো ঘুমে ভূত চেপে ধরে। নতুন বিবাহিতা আর কিশোরীদের সংখ্যাই বেশি। হাতে করে কেউ এনেছে ডাব, কেউ বা মুরগীর সালুন, কেউ এনেছে দই চিড়া।  প্রত্যেকেই দিয়ে যায় বিশ-ত্রিশ টাকা যার যার সাধ্যমতো।  টাকার ব্যাপারে কাউকেই জোর করে না কলিমুল্লাহ। কলিমুল্লাহ দরবেশ কাউকে তাবিজ দেয়, কাউকে ঝাড়ফুঁক দেয়, আবার কাউকে পানি পড়া দেয়।

কলিমুল্লাহ তিন ভাইবোনের ভেতর বড়। বাবা ছিল একটা কওমী মাদ্রাসার শিক্ষক। মাত্র পাঁচ বছর বয়সেই কলিমুল্লাহকে দিয়ে দিয়েছিল হাফেজী মাদ্রাসায়। কোরানে হাফেজ সে। খুব চমৎকার তার গলার সুর। তারপর এসে স্কুলে ভর্তি হয়েছিল কলিমুল্লাহ। এগারো বছর বয়সে সে পড়ত তৃতীয় শ্রেণীতে। একই ক্লাসে পড়ত রূপালি। শ্যাম বর্ণের কলিমুল্লাহর মাথা ভর্তি চুল, খাড়া নাক আর কালো যুগল ভ্রু চেহারায় একটা বাড়তি আকর্ষণ যোগ করেছে।

সেই তৃতীয় শ্রেণী থেকেই কলিমুল্লাহর মন পড়ে থাকত রূপালির চোখ, চিবুক আর টোল পড়া গালে। কিন্তু রূপালি যে অন্য ধর্মের। আর কলিমুল্লাহর বাবা একজন আলেম। যাহোক কলিমুল্লাহ আর রূপালি যখন সপ্তম শ্রেণীতে পড়ে তখন কলিমুল্লাহ প্রথম রূপালিকে একটা চিঠি লেখে, মাত্র তিন লাইনের চিঠিতে কলিমুল্লাহ লিখেছিল, রূপালি  আমার এই বুকটা তোমার ক্রিকেট খেলার মাঠ। তুমি সারাজীবন এইখানে ছক্কা পিটাইও।

চিঠি  হাতে পেয়ে রূপালি হাসাহাসি করেছিল বান্ধবীদের সাথে। তারপর কলিমুল্লাহকে সাবধান করে দিয়েছিল।

বলেছিল আবার এরকম কোনো চিঠি-পত্র দিলে বা বিরক্ত করলে স্কুলের হেড মাষ্টারের কাছে নালিশ ঠুকে দেবে। কলিমুল্লাহ আগে পড়ত পায়জামা-পাঞ্জাবী। নবম শ্রেণীতে ওঠার সাথে সাথেই কলিম নাম ধারণ করে  আর পরা শুরু করে প্যান্ট-শার্ট।

কলিমুল্লাহর বাবা তাকে বলে আলেমের ঘরে জালেম হইছে। বাবার কথায় কান দেয় না কলিমুল্লাহ।  সে নিজেকে আরও সুন্দরভাবে উপস্থাপন করার জন্য  সচেষ্ট থাকে দিনের পর দিন।

রূপালির বয়স তখন চৌদ্দ আর কলিমের সতেরো।

কলিম আবার একদিন রূপালিকে একান্তে দেখা করতে বলে। ছোট্ট একটা চিরকুট দিয়ে বলে, স্কুল ছুটি হলে যেন তার সাথে দুই মিনিট কথা বলে যায় আর কোনোদিন কিছুই বলবে না।ক্লাস শেষে কলিমুল্লাহর সাথে দেখা করতে যায় রূপালি। কলিমুল্লাহ তাকে বলে,

তোমাকে না পেলে আমি অন্যকোনো নারীকে আজীবন স্পর্শ করব না। কিন্তু অন্যকেউ তোমাকে বিয়ে করতে আসলে তাকে আমি খুন করে ফাঁসিতে চরব। রূপালির চোখে পানি এসে যায়। সে তখন বলে, আমার বাবা-মাকে একঘরে করবে সবাই। তুমি মুসলিম আর আমি হিন্দু। এ কখনো হবার না! কলিমুল্লাহ বলে আমার মন সেকথা মানে না। শুধু তোমার রূপের জন্যই আমি পাগল না তোমার গলার সুর, তোমার নম্র আচরণ সবকিছু আমাকে মারাত্মক অস্থির করে তোলে।

রূপালি কলিমের হাত ধরে বলে, কলিম ভাই তুমি এহুনি কোনো ঝামেলা কইরো না। তুমি আর আমি মেট্টিক পাস কইরা লই। হেরপর যা করনের করন যাইব। কিন্তু এহুনি তোমারে আমি কোনো কতা দেতে পারমু না। তুমি লেহাপড়া কর মন দিয়া। আর তুমি যে কী সুন্দর আরবী লেকতে পারো সেইসব গুন তুমি চর্চা রাহো। কলিম বলে রূপালি তোমার জন্য আমার মানুষ খুন করাও কোনো ব্যাপার না। আর তুমি যেইডা কইছ হেইডা খুবই সামান্য ঘটনা।

রূপালির দাঁত একটু উঁচু তাছাড়া তার হাসি খুব সরল এবং প্রাঞ্জল। চমৎকার গান গায় সে। বিশেষ করে লোকসংগীত এবং পল্লীগীতির সুর  তার গলায় খুব সুন্দর বসে। এলাকার চেয়ারম্যান লতিফ খানের ছেলে শামীম উত্যক্ত করে রূপালিকে বহুদিন ধরে। রূপালি একদিন স্কুল থেকে ফিরছিল। এমন সময় শামীম ওড়না ধরে টানাটানি শুরু করে রূপালির। অদূরেই ছিল কলিমুল্লাহ। এক পর্যায়ে রূপালির হাত ধরে টানাটানি শুরু করে শামীম। সামনে এগিয়ে যায় কলিম। গিয়ে বলে, শামীম  ভাই ওরে ছেড়ে দেন। সব নারীরই সম্মান আছে। শামীম বলে অই কলিমুল্লাহ তুই এইখান থিকা যা ভাগ। ইন্দু মাগীর আবার সম্মান কী? অর লগে আমার ইসাব আছে। তুই যা। কলিমুল্লাহ তখন বলে, তুই ওরে ছাড় নইলে তোর আড্ডি আমি গুড়া গুড়া কইরা দিমু। এরপর শামীম কলিমকে মারতে আসলে কলিমুল্লাহ তাকে উপুর্যুপরি ঘুষি এবং কিল মারতে থাকে আর রূপালিকে বলে রূপালি তুমি যাও।

এই ঘটনায় চেয়ারম্যান কলিমুল্লাহর সাথে রূপালিকে জড়িয়ে কলিমুল্লাহ এবং রূপালির নামে দুশ্চরিত্রের দুর্নাম রটিয়ে দেয়। তারপর কলিমুল্লাহর আর রূপালির নামে বিচার বসায়। বিচারে রূপালির বাবা দোকানদার সৌম্য কান্তি দেবকে এক ঘরে করে আর কলিমুল্লাহকে জোড়া বেত দিয়ে পঞ্চাশ বেত্রাঘাত করে। সেদিন ঘরের দরোজা বন্ধ করে রূপালি জন্মের কান্না কেঁদেছিল। সে কান্নার সাক্ষী কেবল রূপালির মন আর ঘরের  বন্ধ দরোজা ও জানালা। সেই কান্নার ভেতর হয়তো বা লেখা ছিল জীবনের কোনো গভীর পরিণতি। সেই থেকে রূপালির পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যায়। আর রূপালির বাবাও ভীষণ অভাবে পড়ে। কারণ সৌম্যর দোকান থেকে বাজার-সদাই খাওয়া গ্রামের সবার নিষেধ।

শামীমের মনের খেদ যায়নি চেয়ারম্যানের বিচারে। দেখতে দেখতে কলিমুল্লাহর মেট্টিক পরীক্ষা চলে আসে। এরই মধ্যে একদিন শামীম আর তার তিন বন্ধু মিলে কলিমুল্লাহকে এক সহপাঠীকে দিয়ে ডেকে পাঠায়। তারপর বেদম প্রহার করে। সমস্ত শরীর ছেঁচে দেয় শামীম আর তার অনুচররা। সমস্ত শরীরে ছোপ ছোপ কালো দাগ পড়ে যায় কলিমুল্লাহর। ভীষণ জ্বরে পড়ে সে। এরপর সুস্থ হয়ে কোনোরকম মেট্টিক পাস করে।

রূপালির বাবা মারা যায় যক্ষা আক্রান্ত হয়ে। কলিমুল্লাহ  আসে ঢাকায় মেডিকেল টেকনোলজিতে দুই বছরের ডিপ্লোমা কোর্স করতে। রূপালি আর তার বোন সোনালিকে নিয়ে ওর মা খুব বিপদে পড়ে যায়। এলাকার সব ছেলেরা ভীষণ উত্যক্ত করে। খুব অভাবে পড়ে যায় তারা। রূপালি মাঝে মাঝেই দোকানে গিয়ে কথা বলে কলিমুল্লাহর সাথে।  কলিমুল্লাহ আর চার মাস ধৈর্য ধরতে বলে। আর বলে সামনে আমাদের সুদিন আইবে দ্যাখবা।

ইতিমধ্যে রূপালির মা তার বাপের বাড়ি শায়েস্তাবাদ এলাকার এক পঞ্চম শ্রেণী পাস দোকানদারকে ঠিক করে বিয়ের জন্য। রূপালি সব জানায় কলিমুল্লাহকে।

কলিমুল্লাহ তাকে বলে, তুমি আগামীকাল সন্ধ্যার পর এলাকার রহিম চাচার চায়ের দোকানে আইতে পারবা? আমি অহানে তোমার লইগ্যা অপেক্ষা করমু। রূপালি বলে কিন্তু তুমি তো ঢাকা। কলিম বলে আমি কাইল সকালে বরিশাল পৌঁছামু কিন্তু বাড়ি যামু না। যামু আমার বন্ধু মুবাশ্বিরের বুইনের বাড়ি।

সেদিন সন্ধ্যায় রূপালিকে বোরকা পরিয়ে কলিমুল্লাহ ঢাকা নিয়ে আসে সুরভী-৭ লঞ্চে করে। আকাশে রূপোর থালার মতো চাঁদ উঠেছিল সেদিন। রপালি কলিমের কাঁধে মাথা রেখে বলেছিল, আমারে কলেমা পড়াও তুমি। আমার নাম কী দিবা? কলিম বলেছিল, কলেমা ক্যান পড়তে চাও? তুমি আল্লাহর একত্ববাদে বিশ্বাস কর? রূপালি বলেছিল, আমি আল্লাহ, একত্ববাদ এসব বুঝি না। তোমারে বুঝি, তোমারে চিনি।

আমি এটুকু বুঝি, আমারে গ্রহণ করা তোমার ধর্ম মানে না। কিন্তু তোমার ভালোবাসা, তোমার ধর্মকেও হার মানাইছে। তাই তুমি যাকে বিশ্বাস কর, আমিও তাকে বিশ্বাস করি। কলিম কপালে এঁকে দিয়েছিল ছোট একটা চুমু। তারপর বলেছিল, পল্লীগীতি গাও আস্তে আস্তে, আমি ছাড়া আর কেউ যেন শুনতে না পায়।

 আকাশে ষোড়শী চাঁদের বিয়ানো জোছনা পড়েছিল নদীর পানিতে আর বাতাস ছিল মৃদুমন্দ।

কলিমের মনে হয়েছিল সে আর রূপালি যেন হংসমিথুন হয়ে অনন্তকাল ধরে ভেসে বেড়াবে অমন রূপালি জলে।  লঞ্চে ভেসে যেতে যেতে কলিমের  আরও মনে হয়েছিল এর বেশি সুখও কী জীবনে পাবার আছে? সে সুখ কেমন! যেমনই হোক আমি খালি রূপালিরে আঁকড়াইয়া ধইরা বাঁচতে চাই।

মেডিকেল টেকনোলজিতে পড়ার সময় কলিমুল্লাহ এক দোকানে ক্যালিগ্রাফি করে দিত। তার ক্যালিগ্রাফির হাত খুব চমৎকার।  প্রতিটি ক্যালিগ্রাফিতে সে দুশো টাকা পেত। সেই দোকানের মালিক আব্দুল গফুর কলিমুল্লাহকে খুব স্নেহ করেন। কলিমুল্লাহ তাকে গফুর কাকু বলে ডাকে। আঃ গফুরের দুই মেয়ে কোনো ছেলে নেই। কলিমের বয়সী এক ছেলে মারা গেছে। তাই কলিমকে একটু বেশিই স্নেহ করে গফুর।  গতকাল ফোনে গফুরকে সবিস্তারে সব জানিয়েছে  কলিম। গফুর রূপালিকে নিয়ে কলিমকে তার অইখানেই যেতে বলেছে।

গফুর আয়োজন করেছে বিয়ের। গফুরই বাজার-সদাই করেছে। বরের জন্য পাঞ্জাবি-পাজামা আর বউয়ের জন্য শাড়ি-চুরি। তারপরও এক ফাঁকে বেরিয়েছে কলিমুল্লাহ। বাসর ঘরে সে রূপালিকে দেয় লাল অন্তর্বাস আর লাল পেন্টি। সব কাপড় খুলে সে এইদুটো বসন পরে আসতে বলে। আর এও বলে যে মুখ ধুয়ে আসবে মেকাপ যেন না থাকে। চোখে কাজল থাকতে পারে। তারপর রূপালির পায়ে আলতা পরিয়ে দেয় আর আর নাভির চারিপাশেও আলতা দিয়ে লাল করে দেয়। এরপর বলে রূপালি তোমার দেহ মন যেন সবসময় মসজিদের মতো পবিত্র থাকে। তুমি শুধু আমার। এরপর সারা শরীরে আঁকতে থাকে আদর আর চুম্বনের চিত্র। স্তনে আস্তে করে হাত বুলাতে বুলাতে বলে, তোমার স্তন আর ঠোঁট অসম্ভব সুন্দর।  তোমার স্তনগুলো যেন ডাসা পেয়ারা আর ঠোঁট যেন কমলার কোয়া। এগুলো আমাকে পাগল করে দেয়।

কলিমুল্লাহকে গফুর তার দোকানে নিয়োগ দেয় আপাতত। আর বেশি বেশি ক্যালিগ্রাফি করে দিতে বলে। আপাতত তাদের সাথে একটা রুমে থাকে দুজন।

বিভিন্ন হাসপাতালে মেডিকেল এসিস্ট্যান্ট পদে আবেদন করতে থাকে কলিমুল্লাহ।

মাসে পাঁচ হাজার টাকা পায় কলিমুল্লাহ। কিন্তু তার মনে কোনো আফসোস নেই। সে খুব সুখী রূপালিকে নিয়ে। রূপালি আরেকটু স্বচ্ছল জীবন চায়। নতুন হাড়ি-পাতিল, তৈজসপত্র, শাড়ি-গহনা সবকিছুর জন্যই রূপালি বড্ড লোভ হয়। সে মাঝেমধ্যেই কলিমুল্লাহকে বলে আমিও একটা চাকরি করি। তাইলে আমাগো অবস্থা ফিরব। কলিমুল্লাহর এক কথা, তোমার বাইরে নাইম্মা টাকা আয় কইররা আমারে খাওয়ান লাগবে না।

ইতিমধ্যে কলিমুল্লাহর চাকরি হয় সলিমুল্লা মেডিকেল কলেজে। এবার কলিমুল্লাহর নয়টা-পাঁচটা অফিস। হাঁপিয়ে ওঠে রূপালি একা থাকতে থাকতে। কলিমুল্লাহ খুব খুশি। সে ছোট একটা বাসা নিয়েছে একতালায় কামরাঙ্গীচর এলাকায়। একটা বেডরুম, একটা রান্নাঘর, ছোট একটা ডাইনিং স্পেস আর একটা বারান্দা। অফিস থেকে ফিরে রূপালির বানানো পেঁয়াজু, ছোলা, মুড়ি খেয়ে রূপালিকে দোয়া-দরুদ শেখায়, দুজন মিলে রান্না করে আর উপভোগ করে ভরপুর সঙ্গমময় রাত। সে রাত রূপালিকে যতটা আনন্দ দেয় তার দ্বিগুণ আনন্দ দেয় কলিমকে। প্রতিবার সঙ্গমের পর কলিম প্রাণ-প্রাচুর্যে ভরপুর হয়ে ওঠে।

রূপালিদের পাশের বাসায় প্রতিবেশী হয়ে আসে লিলি আর মিলি নামের দুই বোন। দুই বোনই চাকরি করে ডলফিন নামের গার্মেন্টস প্রতিষ্ঠানে। এক শুক্রবারে রূপালি যায় লিলি আর মিলিদের বাসায় গল্প করতে।। গিয়ে জানতে পারে লিলি পঞ্চম শ্রেণী পাস আর মিলি সপ্তম শ্রেণী অব্দি পড়েছে। গল্পে গল্পে জানতে পারে ওরা কোনো কোনো মাসে বিশ হাজার টাকা অব্দি বেতন পায়। রূপালির মনে চাকরি করার আকাঙ্খা জেঁকে বসে।

কলিমুল্লাহ সব সময়ই বেতন পেয়ে সবার আগে রূপালির জন্য পছন্দের অন্তর্বাস কেনে। বিভিন্ন রঙের অন্তর্বাস। লাল, নীল, সবুজ, গোলাপী, বেগুনি অন্তর্বাস। আর কেনে হাঁটুর ওপরে প্যান্ট। কখনো কখনো কলিমুল্লাহ রূপালিকে বলে লাল অন্তর্বাস, কালো হাফ প্যান্ট, চোখ লেপ্টে কাজল পরে চুল ছেড়ে ডিম লাইটের নীল আলোতে কলিমুল্লাহকে গান শোনাতে। কলিমুল্লাহ রূপালির কোলে শুয়ে  আস্তে আস্তে মৃদুভাবে স্তনযুগলে হাত বুলাতে থাকে।

একদিন  রাতে রূপালি কলিমুল্লাহর পছন্দের চিংড়ি মালাইকারি, গরু ভুনা, খিচুড়ি ইত্যাদি খাবার রান্না করে। খাওয়া শেষ করে রপালি আসে কলিমুল্লাহর পছন্দের সাজে। এসে কলিমের কোলে শুয়ে গান ধরে,

আমার বন্ধু বিনোদিয়ারে
প্রাণ বিনোদিয়া;
আমি আর কতকাল রইব আমার
মনেরে বুঝাইয়ারে;
প্রাণ বিনোদিয়া।
কি ছিলাম, কি হইলাম সইরে, কি রূপ হেরিয়া,
আমি নিজেই যাহা বুঝলাম না সই, কি কব বুঝাইয়ারে;
প্রাণ বিনোদিয়া।
চোখে তারে দেখলাম সইরে! পুড়ল তবু হিয়া,
আমার নয়নে লাগিলে আনল নিবাইতাম কাঁদিয়ারে;
প্রাণ বিনোদিয়া।
মরিব মরিব সইরে যাইব মরিয়া,
আমার সোনা বন্ধুর রূপ দিও গরলে গুলিয়ারে;
প্রাণ বিনোদিয়া।

রূপালির কন্ঠ যেন মোমের মতো গলে গলে পড়ে। আর কলিমের চোখ থেকে টপ টপ করে পড়ে নোনা জল। হঠাৎ আলো আঁধারিতে রূপালি বুঝতে পারে না নোনাজল কোথা থেকে এল? উঠে দেখে কলিম কাঁদছে। ঠিক তখনই রূপালি কলিমের গায়ের কাপড় খুলে ফেলে তাকে চুম্বনে চুম্বনে আহত করে। দুজন দুজনকে জড়িয়ে পেঁচিয়ে ধরে সাপের সঙ্গমের মতো। তারপর উপভোগ করে এক দারুণ অর্গাজম। সঙ্গম শেষে রূপালি কলিমকে বলে, একটা কতা হুনবা। কলিম রূপালিকে তখন বাহুতে জড়িয়ে রেখেছে। রূপালি বলেছিল, আমারে চাকরি করতে দেও। আমরা বড় বড় টিভি, ফ্রীজ কিনমু,  ওভেন কিনমু আর টাকা জমামু। কলিম বলে বেশি টাকায় সুখ নাই রূপালি। অফিস থেইকা আইয়া তোমারে আমি বাসায় দেহি তুমি ছোলা, পেঁয়াজু রান্দো আমি খাই এইডাই আমার কাছে সুখ। বড় বড় টিভিতে নায়িকাগো শরীল দ্যাকতে আমার ভালো লাগে না। আমার তোমার শরীল ভালো লাগে। তোমারে ন্যাংটা কইরা দেহি। তখন রূপালি বলে, সেইডাই ভালো। কিন্তু তোমারে আমি কতা দিতেছি যে, আমি বোরকা ছাড়া অফিসে যামু না আর কোনো সময় নাইট ডিউটিও করমু না। তুমি থাহো না বাসায় আমার সময় কাটে না। চাকরি কল্লে সংসারের অভাব ঘোচপে আর আমারও সময় ভালো কাডবে। কলিমুল্লাহ তখন ভেসে যাচ্ছিল সুখে, তৃপ্তিতে। তখন যদি রূপালি কলিমুল্লাহর একটা চোখ উপড়ে দিতে বলত তাও হয়তো দিতে পারত। চাকরির অনুমতি তো ছাই!

এভাবেই রূপালির চাকরির অনুমোদন মিলে যায় সেদিন।

প্রথম মাসের বেতন পেয়েই রূপালি ঘরে সুন্দর পর্দা কেনে, ডিনার সেট কিনে আনে আরও কেনে কলিমুল্লাহর জন্য সুন্দর দুটি শার্ট আর নিজের দুটি ড্রেস। সবসময়ই সন্ধ্যার ভেতর বাসায় ফিরতে চেষ্টা করে। তারপর দুজনে মিলে রান্না করে, খায়। এশার নামাযের সময় কলিমুল্লাহ রূপালিকে কিছু দোয়া-দরুদ শেখাতে চায় কিন্তু রূপালির এত আগ্রহ নেই। রূপালির সমস্ত আগ্রহ ঘর-সংসার  এবং জাগতিক উন্নতি। পরকাল, কবর এসবে তার মন অতটা সায় দেয় না।

এক শুক্রবারে রূপালি মিলি, লিলি আর গফুর চাচা ও তার স্ত্রীকে দাওয়াত দেয়। অনেককিছু রান্না করে রূপালি। সরিষা ইলিশ, চিংড়ি মালাইকারী, মুরগী ঝাল কারী, আচার, টক বেগুন,  পোলাও আর শেষ পাতে পাটালি গুড়ের পায়েস। নতুন ডিনার সেট, নতুন পর্দা দেখে সবাই খুব পছন্দ করে। খুব প্রশংসা করে সবাই। তখন কলিমের খুব ভালো লাগে। গফুর চাচাও বলে, সারাদিন একলা একলা ঘরে বইসা থাইকা কী অইব? তারচেয়ে পর্দার সাথে কাজ করা ভালা। কলিমও মনে মনে ভাবে, সন্ধ্যার ভেতরেই যদি বাসায় ফেরে আর পর্দায় থাইক্কা যদি চাকরি করে তয় পোলাপান অওয়ার আগ পযন্ত করুক।

কলিমের হাসপাতালে আজ এসেছে একটা কর্ড পেচিয়ে জন্মের আগেই মায়ের গর্ভে মরে যাওয়া শিশুর ডেডবডি। কলিম ফরেনসিক কেমিক্যাল দিয়ে তাকে সংরক্ষণ করে আর ভাবে আহারে কী সুন্দর পোলাডা!

কোন মায়ের কোল খালি অইল! কার দশ মাসের প্রচেষ্টার ফসল  জলে ভেসে গেল! আর তখনই তার মনে হল– আমাগো কী এমন সুন্দর একটা বাচ্চা অইবে! সেদিন রাতে ফিরে দেখে রূপালি বাসায় ফেরেনি! রূপালির কাছে ফোন করতেই রূপালি বলে, আমারে হঠাৎ কইরা স্যারে ওভারটাইম দিছে দুই ঘন্টা।

আমি রাইত আট্টার মদ্যে আইতে আছি। সেদিন রূপালি বাসায় ফেরে রাত নটায়। কলিম আগেই ভাত রান্না করে রেখেছিল আর রূপালি এসে ডিম রান্না করে ফেলে। রানা শেষ করে খেয়ে দুজনে বিছানায় যায়। কলিমের খুব ইচ্ছে আজ রূপালিকে সন্তানের কথা বলবে। কিন্তু রূপালি পাঁচ মিনিটেই ঘুমিয়ে কাদা। কলিমের আকাঙ্খার ঘন মেঘে আর বৃষ্টি হয় না সে উড়ে যায় উত্তরের বাতাসে।

একদিন ডলফিন  গার্মেন্টসের মেয়েরা দুপুরে খাওয়া শেষ করে রূপালিকে ধরেছে, তার গান শুনবে। রূপালি গেয়ে ওঠে–

মন নিলা, দেহ নিলা
প্রাণটা তুমি নিও বন্ধু,
ভুলিয়া না যাইও।
আধেক জনমে নইলে পরজনমে হইও,
ও তুমি ভুলিয়া না যাইও
আধেক জনমে নইলে পরজনমে হইও।
মরণেও চাই তোমারে, পরপারে গিয়া
নইলে আমার পাগল মনরে
বোঝাইমু কি দিয়া বন্ধু, স্মরণে রাখিও
অন্তিম কালে তুমি আমার শিয়রে থাকিও।
বন্ধু ভুলিয়া না যাইও,
আধেক জনমে নইলে পর জনমে হইও।

সবার চোখে জল, মুখে বিষাদের কালো মেঘের ছায়া। যেন ডলফিন গার্মেন্টসের সব মেয়েদের প্রেমিক তাদের রেখে অন্য কাউকে বিয়ে করে সুখী হয়েছে। এমন সময় শোনা যায় গমগমে এক পুরুষ কণ্ঠ। তোমার নাম কী? তুমি এত ভালো গান কর! এরপর ইন্ডিয়া থেকে বায়ার আসলে তুমি গান শোনাবে। আর আমরা মাঝে মাঝেই তোমার গান শুনব।

সেজন্য তুমি বকশিসও পাবে। ও তোমাদের সাথে পরিচিত হই। আমি তোমাদের আদি স্যার। ইংল্যান্ড থেকে এম.বি.এ করে এসেছি। এখন থেকে আমিই এমডির দায়িত্বে থাকব আর বাবা হবেন প্রধান উপদেষ্টা।

এরপর থেকে প্রায়ই দুপুরে লাঞ্চ শেষে রূপালির ডাক পড়ে আদি স্যারের রুম থেকে।  রূপালির জন্য মাঝে মাঝেই থাকে স্টার কাবাবের বিরিয়ানি কিম্বা নান, গ্রিল। রূপালি আজকাল ব্যবহার করে দামী লিপিষ্টিক, পারফিউম। পুরো গার্মেন্টস রটে যায় রূপালিকে কেউ কিছু বললে তার চাকরি চলে যাবে। কখনো কখনো দেখা যায় রূপালির ঠোঁট ফুলে আছে। আজকাল কলিম চাইলেও সঙ্গমে প্রতি রাতেই রূপালি আগ্রহ পায় না।

কোথায় যেন একটা বেহাগের  সুর বেজে চলেছে অলক্ষ্যে।

প্রমোশন হয়েছে রূপালির। সে এখন অপারেটর থেকে সুপারভাইজার। বেতন বেড়েছে একলাফে পাঁচ হাজার।

রূপালি ভাবে আর দুই বছর চাকরি করলে তার বেতন চল্লিশ হাজার অব্দি উঠবে। আর কলিম বাচ্চা নিতে চায়। একটু একটু করে সখের আকাশে বুঝি জমতে থাকে কালো মেঘ। চাকরির পাঁচ মাসের মাথায় রূপালির হঠাৎ নাইট ডিউটি পরে। কলিমকে ফোন করে জানায় রূপালি আদি স্যারের নির্দেশ নাইট ডিউটি করতেই হবে পরপর দুইরাত। তুমি কাইল অফিসে যাইও না আমি দুপুরে একবার বাসায় আমু। কিছু না বলে ফোন রেখে দেয় কলিম।

পরপর দুইরাত নাইট ডিউটি করে বাসায় ফেরে রূপালি। কলিম বাসায় ফিরে দেখে রূপালি সোনালী পাড়ের লাল শাড়ি পরেছে আর চোখ লেপ্টে কাজল পরেছে আর লাল লিপিষ্টিক পরেছে। প্রথমে রূপালিকে দেখেই কলিমের মন খুব ভালো হয়ে যায়। হঠাৎ চোখে পড়ে রূপালির গলায় স্বর্ণের চেইন, আছে সুন্দর একটা লকেটও। কলিম জিজ্ঞেস করে চেইন কই পাইলা? নাইট ডিউটির জন্য তোমার গার্মেন্টস থেইকা দেছে নাকি? রূপালি বলে, আরে এ আমি বানাইতে দিছিলাম তোমারে সারিপ্রাইজ দিমু তাই কইনাই। হঠাৎ করে কলিমের মাথায় কী এক ভূত চেপে বসে! সে একে একে খুলতে থাকে রূপালির সমস্ত বসন। আজ রূপালিকে কামড়ে, চুষে, শুষে নেবে সে। রূপালির স্তনে হাত বুলাতে বুলাতে দেখে স্তনের নীচে একটা কালচে দাগ। কিছু না বলে সন্তর্পণে কলিম পরীক্ষা করতে থাকে রূপালির শরীরের অন্যান্য স্থান। কালচে দাগ দেখে ঘাড়ে এবং পিঠেও। আদর থামিয়ে কলিম উঠে যায়। রূপালি জিজ্ঞেস করে কী অইল! কলিম নিরুত্তাপ উত্তর দেয়, কিছু না ভালো লাগছে না!

সেদিনের পর কলিম খুব আনমনে থাকে। রূপালির কাছে খুব একটা ঘেষে না। রূপালি চাইলেও কলিম অযুহাত দেয় যে তার শরীর খারাপ। আর নিজের সাথে যুদ্ধ করে যায় কলিম। এক মন বলে ছেড়ে দে এই বউ, অন্যমন বলে ওর তো যাওয়ার কোনো জায়গা নেই, ও যাবে কোথায়? শেষে ভাবে চাকরি ছাড়িয়ে আপাতত মায়ের কাছে রেখে আসবে রূপালিকে। বাবা মায়ের  হাতে-পায়ে ধরে রূপালিকে রেখে আসবে। সেদিন রাতে কলিম রূপালিকে বলে, তোমার ইচ্ছা ছিল চাকরি করার করছ ছয় মাস। এবার চাকরি ছেড়ে কিছুদিন তোমাকে বাবা-মায়ের ধারে থাকতে অইবে। রূপালির চোখ দুটো বড় বড় হয়ে যায়। বলে পাগল নাকি তুমি!

 আর এক বছর চাকরি করলে আমরা গ্রামে গিয়া জমি কিন্না বাড়ি বানাইতে পারমু। কোনো পাগলেও এই কাজ করবে না। আর তুমি কী মনে করে চাকরি ছাড়তে বলতেছ? কলিম বলে, পরপুরুষের মন জুগিয়ে তোমার টাকা আমি চাই না আর এত উন্নতিও চাই না! রূপালি খুব চিৎকার করে বলে, আজেবাজে কথা কইও না। অনেক মেয়েরাই নাইট ডিউটি করে তাদের স্বামীরা তো এত বাজে কথা বলে না। তোমার মন খুব ছোট! অমনি কলিম কষে থাপ্পড় মারে রূপালির গালে। তারপর কথা বন্ধ থাকে প্রায় দশদিন। রূপালির শরীর আর কিছুতেই কলিমকে টানে না। বরং সে সহজলভ্য নেশায় অভ্যস্ত হতে চায়। মাঝে মাঝেই ফেন্সিডিল খায়। আর কখনো কখনো গাঁজাও খায় সে।

প্রায় দশদিন পর রূপালি কলিমকে জোর করে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে বলে, আর ছয়মাস চাকরি করতে দাও আমারে। হেরপর বাচ্চা নিমু আর ঘরে থাকমু। কলিম বলে, তুমি আর কোনোদিন ঘরে ফিরতে পারবা না রূপালি। তুমি কী আর ঘরের আছ! রূপালি বলে পারমু লাখ খানেক টাকা জমাইয়া আমি চাকরি ছাড়মু কতা দিতেছি। তারপর দুজনে অনেকদিন পর সেদিন একসাথে রাতের খাবার খায়। কিন্তু নরকের আগুন জ্বলে কলিমের মনে আর মাথায়।

আবারো নাইট ডিউটি পরে রূপালির। কলিম সিদ্ধান্ত নেয় কোনো চিৎকার, চেঁচামেচি করবে না। খুব ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করবে রূপালিকে। সেদিন কলিম অফিসে যায় না। রূপালি দুপুরে বাসায় আসে। কলিম দরোজা খুলে দেয়। দেখে রূপালির ঠোঁট ফুলে আছে।

অমনি রূপালির চুল ধরে উপুর্যুপরি কিল, ঘুষি মারতে থাকে আর বলে তোর মতো বেশ্যার সাথে আমি সংসার করমু না। যা খানকি বেশ্যামি করে বেড়া। রূপালি শুধু বলে, আমার নিজের কামড় লাগছে ঠোঁটে তুমি এমন কর কেন?

এরপর একদিন হঠাৎ করেই কলিম বরিশাল গ্রামের বাড়ি যায়। সেদিনও চাঁদ অকৃপণ জোছনা বিলিয়েছে নদীর জলে। কলিমের মনে পড়ে যায় সেদিনের কথা যেদিন রূপালিকে নিয়ে সে ঢাকার উদ্দেশ্য লঞ্চে উঠেছিল। সেদিন কী স্বপ্নেও ভেবেছিল রূপালি  কোনোভাবে আর কারও  হতে পারে! কলিমের চোখ দিয়ে ঝরে পড়ে ফোঁটায় ফোঁটায় লাভা।

বাড়িতে গিয়ে ওঠার পর কলিমের মা বলে, কীরে বাজান কী অইছে তোর! সব ঠিক আছে?  বউ মা কই?

সব ঠিক আছে মা। তোমাগো খুব দ্যাকতে মন চাইছে মা। তুমি, বাবুনি আব্বা, ভাই সবাইরে। দুইদিন কলিম ঘুরেফিরে সবার সাথে দেখা করে। দেখা করে শামীমের সাথেও।  বলে ভাই মাফ করে দিয়েন। আর অতীত মনে রেখে লাভ কী বলেন!  তিনদিনের দিন কলিম মায়ের হাতে সাত হাজার টাকা দিয়ে বলে, মা তোমাগো লইগ্যা কিছু করতে পারলাম না। আমারে মাফ করে দিও। এই টাকাটা দিয়ে তোমাদের জন্য কাপড়চোপড় কিইনো।

ঢাকায় ফিরে কলিম রূপালির সাথে খুব স্বাভাবিক আচরণ করে। শুধু বলে, রূপালি আমার ফিরতে ইট্টু রাইত অইবে। তুই খাইয়া শুইয়া পরিস। আমি আইলে দরজাটা খুলে দিস। দুইদিন পর বলে, রূপালি শুনো, তোমারে নিয়া ঘোরতে যামু আমি। রূপালি হাসি দিয়ে বলে, এতদিনে বুজি ইচ্ছা অইল! তা কোনদিকে যাইবা হুনি! এই বলে রূপালি ঘেষতে চায় কলিমের বুকে। কলিম বলে, বেড়াইতে যাইয়া আদর করমু। এহন আমার শরীর খারাপ।

এর পাঁচদিন পর রূপালি আর কলিমুল্লাহ চারদিনের জন্য কক্সবাজার ঘুরতে যাওয়ার পরিকল্পনা করে। যাবার আগে বাসার সব কাঁচা সবজি আর মাছ কলিম গফুর চাচার বাসায় দিয়ে আসে। আর শুকনো খাবারও। রূপালি বলে, কী অবস্তা! আমরা কী আর বাসায় আমু না? মানুষরে দিয়া দেওনের কী দরকার। কলিম কোনো কথা বলে না।

সেদিন কলিম আর রূপালি উঠেছিল ময়মনসিংহের ট্রেনে। রূপালি কলিমকে জিজ্ঞেস করে তুমি না কইলা কক্সবাজার যাবা? এই ট্রেন নাকি ময়মনসিংহ যাইবে?

কলিম মৃদু হেসে বলে, ময়মনসিংহ অনেক সুন্দর জায়গা। আমরা কৃষি ইনভারসিটি দেকমু। জমিদার বাড়ি দেকমু, যাদুঘর দেকমু আর কুমিরের খামারও দেকমু। রূপালি খুব খুশি হতে পারে না। আদি স্যার তাকে কক্সবাজার গিয়ে ফাইভ স্টার হোটেলে থাকার অফার দিয়ে বসে আছে। রূপালি বলেছে দুইমাস পর নাইট ডিউটির কথা বলে একদিন, একরাতের জন্য যাবে। আর কলিম কিনা তাকে নিয়ে এসেছে ময়মনসিংহ বেড়াতে!

কলিম ট্রেনে উঠে ঢাকায় বসেই রূপালির মোবাইল ফোন নিজের কাছে নিয়ে নিয়েছিল। তারপর আর দেয়নি রূপালিকে। তারা দুইদিন কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, জমিদার বাড়ি, যাদুঘর সব ঘুরে শেষে গিয়ে হাজির হয় ভালুকা উপজেলার উথুরা ইউনিয়নে কুমির প্রজনন কেন্দ্রে। পৌঁছাতে প্রায় গোধূলি লেগে যায়। উথুরায় পৌঁছেই কলিম দুই বোতল ফেন্সিডিল খেয়ে ফেলে। ফেন্সিডিল খায় আর দুইচোখ থেকে টপটপ করে পানি পড়ে। কলিজা ছিঁড়ে বেরিয়ে আসতে চায় কলিমের। একমন বলে সব ভুলে যা, অন্যমন বলে না কিসের ভোলাভুলি! এমন সময় চোখে ভেসে ওঠে রূপালির স্তনের নীচের কালচে দাগ। মুহূর্তে নেকড়ে হয়ে ওঠে কলিমের পুরুষ সত্ত্বা।

এর কিছুক্ষণ পর রূপালিকে এনে দেয় একটা ফ্রুটিকা জুস।  তারপর কলিমুল্লাহ সেখান থেকে সরে যায়। এরপরের কাজ কলিমুল্লাহ সেরে ফেলে পঁয়তাল্লিশ মিনিটের ভেতর। সেদিন ছিল ঘুটঘুটে অমাবস্যার রাত।

কিছুক্ষণ পরেই শুরু হয়েছিল তুমুল বৃষ্টি। অই অন্ধকারেই কলিম ত্যাগ করেছিল উথুয়া ইউনিয়নের হাতিবেড় গ্রাম।

এরপর ছয়মাস কলিম প্রতিনিয়ত স্থান ত্যাগ করেছে কখনো ধীতপুর ইউনিয়নের কোনো গ্রাম আবার কখনো  মেদুয়ারী বা ভরাডোবা ইউনিয়নের কোনো গ্রাম। কোথাওই কলিমুল্লাহ এক রাতের বেশি থাকেনি। সাথে ছিল বিস্কিটের মিনি প্যাকেট আর অনেক ফেন্সিডিলের বোতল। সেসবই খেয়েছে ঘুরে বেড়িয়েছে জঙ্গলে জঙ্গলে।

ছয়মাস পর ভরাডোবা ইউনিয়নের কাইচান গ্রামের গভীর জঙ্গলে  প্রাচীন বটবৃক্ষের নীচে  ক্লান্ত, শ্রান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিল কলিমুল্লাহ। ততদিনে চুল লম্বা হয়ে জটা ধরেছে, দাঁড়ি বেশ বড় আর গালও ভেঙে গিয়েছে।

সন্ধ্যালগ্নে কয়েকজন পথচারী যাচ্ছিল তারাই রটিয়ে দিয়েছিল কাইচান গ্রামে দরবেশ বাবা আইছে। তারপর গ্রামবাসী নিজেরাই বাঁশ, ছন আর গোলপাতা দিয়ে ছোট্ট একটা ঘর উঠিয়ে দিয়েছে জঙ্গলের লোকালয়ের প্রান্তে। বেশকিছু দিন পর  প্রাকৃতিক প্রয়োজনেও গ্রামবাসী  গভীর জঙ্গলে একটা স্বাস্থ্যসম্মত টয়লেট বসিয়ে দিয়েছে। কারো বাচ্চা হলে ঝাড়ফুঁক দেয়া, কারো পরীক্ষা হলে পড়া মনে রাখার তাবিজ, নতুন বউদের শরীর বন্ধকের তাবিজ এসব করে দিব্যি বেশ আছে কলিমুল্লাহ। প্রায় ঘরে করে দিয়েছে আয়াতুল কুরসীর ক্যালিগ্রাফি। দরবেশ বাবা থাকে গ্রামের অধিকাংশ মানুষের ভালো-মন্দ আয়োজনে। এমনকি হিন্দুরাও বিভিন্ন সময়ে তার কাছে এসে নিয়ে যায় তাবিজ, পানিপড়া। সে হয়ে উঠেছে কাইচান গ্রামের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। এভাবেই কলিমুল্লাহ দরবেশ বাবা হয়ে উঠেছে কাইচান গ্রামে।

ঢাকা ছাড়ার পনেরো দিন পর গফুর এবং কলিমুল্লাহর বাড়িওয়ালা কামরাঙ্গীচর থানার পুলিশকে জানায় যে তারা নিখোঁজ। তারপর পুলিশ এসে জব্দ করে বাসা। কিন্তু ফোন ট্রাক করে দেখা যায় ঢাকাতেই সর্বশেষ ফোন চালু ছিল। কলিমুল্লাহ আর রূপালির বিয়ের ছবিটা পুলিশ নিয়ে যায়। পুলিশ ডলফিন  গার্মেন্টস এবং সলিমুল্লাহ মেডিকেলে গিয়ে দেখতে পায় একই সময়ে তারা ছুটি নিয়েছিল অফিস থেকে। কিন্তু তারপর আর কোনো কূলকিনারা খুঁজে পায় না। প্রায় আট বছর ধরে অমীমাংসিত রয়ে গেছে কলিমুল্লাহ আর রূপালির নিখোঁজ কেস।

ইন্সপেক্টর জাহেদ মল্লিকের খুব সুনাম দীর্ঘমেয়াদী অমীমাংসিত কেস সমাধানের জন্য। কামরাঙ্গিচর থানায় নতুন বদলি হয়ে এসেছে জাহেদ। আসার সাথে সাথেই রূপালি আর কলিমুল্লাহর ফাইল হস্তান্তর করে ওসি সাহেব। জাহেদের সামনে রয়েছে পদোন্নতি পরীক্ষা। এই কেসের সমাধান করতে পারলে পদোন্নতি সহজ হবে এমনই মনে করে জাহেদ।

জাহেদ প্রতিনিয়ত স্টাডি করে কেসটি। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান থেকে পাস করে একবার পরীক্ষা দিয়েই সাব ইন্সপেক্টর পদে চাকরি পেয়ে গিয়েছিল জাহেদ। তখন থেকেই পুলিশ বিভাগে জাহেদের মেধা, সততা এবং  নিষ্ঠা প্রশ্নাতীত। জাহেদ দিনরাত এক করে ফেলছে এই কেসের জন্য। রূপালির গার্মেন্টসে গিয়ে পেয়ে যায় এক পুরোনো অপারেটরকে। মুচলেকা দিয়ে তার কাছ থেকে সংগ্রহ করে আদি আর রূপালির সম্পর্কের তথ্য। জাহেদ এতটুকু নিশ্চিত হয় যে, রূপালি আর কলিমুল্লাহর ভেতর আদি ছিল তৃতীয় ব্যক্তি। রূপালি নিখোঁজ হওয়ার তিন মাসের মাথায় আদি চলে গেছে কানাডা। জাহেদ হাল ছাড়ে না কিন্তু কোন পথে হাঁটবে সেই পথটাও খুঁজে পায় না।

জাহেদের খালা এসেছে বেড়াতে কাইচান গ্রাম থেকে। জাহেদের সারা শরীরের আচিল দেখে বলে, দরবেশ বাবা ওষুধ দিলে একদম ভালো হয়ে যাবে। জাহেদ হেসে বলে, তাইলে দেশের ডাক্তাররা সব অবসরে চলে যাইত খালা। খালা উত্তর দেয় একবার গিয়ে দেখ বাবা।

কলিমুল্লাহ দরবেশ আসলেই অনেক ভালো। নাম শুনে জাহেদ একটু চমকিত হয়। সে দরবেশ বাবাকে দেখতে বেশ আগ্রহ বোধ করে।

পরের সপ্তাহে জাহেদ আসে কাইচান গ্রামে তার খালার সাথে। খালা তাকে নিয়ে যায় দরবেশ বাবার কাছে। দরবেশ এই গ্রামের বাইরে কাউকে চিকিৎসা দেয় না এবং  ভিনদেশী কারো সাথে কথা বলে না। রেহানা খুব অনুরোধ করে দরবেশ বাবাকে যে, বাবা আমার বোনের ছেলে খুব সৎ ছেলে এট্টু দেখে দাও। জাহেদ আগেই বলেছিল  রেহানাকে তার পুলিশের পরিচয় যেন না দেয়। এরপর কলিমুল্লাহ জাহেদকে তাবিজ দেয় আর পানিপড়া দেয় আর বলে দেয় রোগ ভালো হবে বিশ্বাসের ওপর। জাহেদকে দেখেই ঘেউ ঘেউ করে যাচ্ছে ভুলু। দরবেশের জীবনে ভুলুর অভিষেক ঘটেছে প্রায় চার বছর। তারপর ভুলু হয়ে উঠেছে তার একান্ত সহচর। কখনো দুইটা শুকনো রুটিও যদি থাকে কলিমুল্লাহ ভুলুর সাথে ভাগ করে খেয়ে নিয়েছে। অন্ধকার রাতে মাঝে মাঝেই ভুলুর সাথে মগ্ন হয়েছে গল্পে। আরও একজন আছে যে কিনা দরবেশ বাবাকে খুউব ভালোবাসে। সে হল হিন্দু বিধবা নন্দিতার প্রতিবন্ধী ছেলে বিভাস। বিভাস সারা গ্রামের ছেলে-বুড়ো সবার গায়ে থু থু ছিটায়, সবাইকে লাঠি দিয়ে পিটায়। কিন্তু দরবেশ বাবাকে সে খুব ভালোবাসে। দরবেশ বাবা তাকে খুব আদর করে। গ্রামের লোকজন ফল-ফলাদি যা খেতে দেয় দরবেশ রেখে দেয় বিভাসের জন্য। বিভাস দরবেশের গলা জড়িয়ে  মাঝে মাঝে রাতে ঘুমায়। আবার প্রায়শই দরবেশকে আদর করে দেয় মাথায় হাত বুলিয়ে।

দরবেশকে দেখে জাহেদ আবার ঢাকায় এসে কলিম আর রূপালির ফাইল নিয়ে বসে। ফেস এক্সপার্ট ডেকে কলিমের ছবির ওপর লম্বা দাড়ি আর লম্বা জটাযুক্ত চুল বসাতে বলে। চমকে ওঠে জাহেদ চেহারা প্রায় একইরকম দাঁড়ায়! শুধু কলিমুল্লাহ দরবেশের চোয়াল একটু বেশি ভাঙা। জাহেদ মনে মনে একটা রোডম্যাপ এঁকে ফেলে।

জাহেদ পনেরো দিনের মিশনে কাইচান গ্রামে আসে। এসে খালা রেহানাকে দুই হাজার টাকা দিয়ে খালাকে বলে, দেশি মুরগী, ইলিশ মাছ আর বেগুন দিয়ে শুটকি রান্না করতে।  আর বলে রাতের বেলা দরবেশকে দাওয়াত দিতে। দরবেশ প্রথমে অস্বীকার করলেও পরে রাতে আসে জাহেদের নিমন্ত্রণে। কিন্তু ভুলু পেছন পেছন আসে আর ঘেউ ঘেউ করে। খেতে বসে দেখা যায় কলিমুল্লাহ শুটকি সরাতে বলে। কারণ সে শুটকির গন্ধ সহ্য করতে পারে না। মুচকি হেসে জাহেদ রেহানাকে শুটকি সরিয়ে নিতে বলে। জাহেদ মনে মনে ভাবে আমি সঠিক পথেই এগুচ্ছি কলিমুল্লাহ। তার মানে রূপালিকে তুমি হাওয়া করে দিয়েছ। তোমার গফুর চাচা বলেছিল তুমি শুটকি পছন্দ কর না। তারপর খাওয়া দাওয়া শেষ করে জাহেদ, দরবেশকে সিগারেট অফার করে। দরবেশ জানায় আগে খেত সে এখন খায় না। কারণ তার তেমন টাকা-পয়সা নেই। আর সবসময় যোগাড় করাও মুশকিল। জাহেদ দরবেশকে বলে সে পনেরো দিনের জন্য গায়ে এসেছে বিশ্রাম নেবে আর পড়ালেখা করবে। কারণ জীবনের ভারে সে অতিষ্ঠ। এই সময় যখন যা দরকার হয় দরবেশ যেন তাকে বলে।

এরপর বিভিন্ন সময়ে জাহেদ  যাতায়াত করতে থাকে দরবেশের কাছে তাকে দেয় সিগারেট খেতে। অনেক সময় দীর্ঘ সময় নিয়ে জাহেদ গল্প করে বলে নিজের জীবনের বিভিন্ন কষ্টের কথা। জাহেদ বারবারই দরবেশকে বলে, তার একটা কষ্ট কাউকেই বলতে পারছে না। দরবেশ কী তাবিজ বা পানিপড়া দিয়ে তার কোনো সমাধান করে দিতে পারবে কী না! দরবেশ বলে আল্লাহর কালামে সব সমস্যার সমাধান আছে। কেবল খুঁইজা বাইর করা লাগবে। জাহেদ জানায় এক চাঁদনী রাতে দরবেশকে বলবে।

সেদিন আকাশে পূর্ণ তিথির চাঁদ। কলিমুল্লাহ সেদিন বড় স্মৃতি ভারাক্রান্ত। সে বড় চন্দ্রাহত সেদিন। তার বুকের ভেতর বাস করা হাহাকার সমুদ্রে জোয়ার এসেছে সেদিন। অন্য অনেকদিনের মতো ভুলুর কান আর গায়ে হাত বুলাতে বুলাতে গল্প করছিল কলিমুল্লাহ। যেন মনের সব কথা ভুলুকেই বলা যায়। কলিমুল্লাহ বলছে, ক তো ভুলু ক্যান রূপালির এত্ত লোভ দেখা দিল। ক্যান অন্য পুরুষকে শরীল দিতে অইল! আর আমিই ক্যান খুন করে দরবেশ অইলাম!  আমাগো মাইয়া অইত, পোলা অইত!  তিনবেলার জায়গায় দুইবেলা খাইতাম! কী অসুবিদা ছিল? ক তো দেহি ভুলু! মেয়ে মানুষ নষ্ট অইলে তার লগে ঘর করা যায়! ভুলু যেন সবই বুঝতে পেরেছে! ভুলুর চোখ গড়িয়ে জল পড়ে। এর ভেতরই আসে জাহেদ। এসে বলে আইজগো আপনেরে সেই জনম দুক্ষের কতা কমু দরবেশ বাবা।

দরবেশ শুধায় জাহেদকে, কী হইছে আপনের বাবা? জাহেদ বলে কইমু বাবা সব কইমু আগে দুজনে দুইডা সিগারেট খাইয়া লই। দরবেশের সিগারেট জাহেদ নিজ হাতে জ্বালিয়ে দেয়। তারপর জাহেদ ধরা গলায় বলে, বাবা-মায়ের  অমতে নিজের সুন্দরী হিন্দু বান্ধবীরে বিয়া করছিলাম বাবা। তার ছিল ভুবন ভুলানো রূপ, কন্ঠ ছিল কোকিলের মতো সুমধুর। বিয়ার আগে কতা দিছিল যে সে ধর্মমত চলাফেরা করবে। আর এখন!  সে হাতাকাটা ব্লাউজ পরে,  জিন্স আর স্কিন গেঞ্জি পরে, পরপুরুষের সাথে ঢলাঢলি করে। আর বসের সাথে শুয়ে বেড়ায়! এর কোনো তাবিজ আছে বাবা? জাহেদের দেয়া গাঁজায় কলিমুল্লাহর নেশা ততক্ষণে জমে গেছে।

কলিমুল্লাহর চোখ দিয়ে আগুন বেরুচ্ছে। কাঁদতে, কাঁদতে কলিমুল্লাহ বলে আহারে বেজন্মা মেয়েছেলে! এক পুরুষে অগো অয় না! ভালোবাসা অরা বোযে না, সংসার অগো সুখের জায়গা না। পরপুরুষের শরীরের গন্ধ না অইলে অগো অয় না। এমন মেয়েমানুষ কাইট্টা কুমিররে খাওয়াইতে অইবে! জাহেদ উস্কে দেয়। কী কন বাবা কেমনে! ভুলু ঘেউ ঘেউ করেই চলছে। বাগানের গাছগুলো বুঝি দীর্ঘশ্বাস ফেলছে! কলিম বলে এই একই কাহিনি বাবা আমার জীবনের!  রূপালিরে বিয়া করছিলাম বাবা-মার অমতে। সেও ছিল ইন্দুগো মাইয়া।

আমি কম খাইয়া কম কম পইরা তারে নিয়া সুখে থাকতে চাইছি। কিন্তু তার চাই টাকা। গেল সে গার্মেন্টসে। গার্মেন্টসে যাইয়াই ক্ষান্ত দিল না শরীর বিলানো শুরু করল। তার শরীরে আমি পরপুরুষের চেন্নক দ্যাকলাম। ভাবলাম ছাইড়া দিই। কিন্তু তার যাওয়ার জায়গা ছিল না। আর ছাইড়া দিলে সে পতিতা বৃত্তি করত। সেইডা আমি সইতে পারতাম না তাই বিষ খাওয়াইয়া মাইরা দেহডা দিছি কুমিরের খামারে। স্তন দুটো আর ঠোঁট আমার খুব প্রিয় সেই দুইডা কাইট্টা সংরক্ষণ করে রাখছি।  স্বমেহনের সময় অইগুলো এক হাত দিয়ে ধরি অন্য হাত দিয়ে শিস্ন ম্যাসেজ করি। এই জীবনে অন্যকোনো নারীকে আমি ছুঁই নাই আর খারাপ দৃষ্টিতে তাকাইও নাই। জাহেদ বলে, তোমার কষ্ট হয়নি বাবা রূপালির মৃত্যু দ্যাকতে! দরবেশ বলে, আমি বিষ মেশানো জুস খাইতে দিয়া দূরে সইরা গেছিলাম। আর নেশায় বুদ আছিলাম হেইদিন। জাহেদ বলে, সব তকদীর বাবা! ঠিক আছে, আমি এখন যাই। সকালবেলা দেখা হবে।

সকাল আটটা এসেছে দুই জীপ ভর্তি পুলিশ। জাহেদ পুলিশের ড্রেসে। জাহেদ যায়নি কলিমুল্লার সামনে। একজন কনেষ্টেবল পাঠিয়েছে। কলিমুল্লাহ জিজ্ঞেস করে পুলিশ ক্যান? কনেষ্টবল বলে, ভন্ডবাবা কলিমুল্লাহ তুমি জানো না, পুলিশ কেন? নিজের স্ত্রীকে খুন করে তুমি কুমিরের খামারে ছুঁড়ে দিয়েছ! তুমি ঘোল খাইয়েছ আমাদের! এবার চল শ্বশুরবাড়ি। কলিমুল্লাহ জিজ্ঞেস করে কোতায় পাইলেন এইসব কতা! জাহেদ পুলিশের কষ্টিউমে সামনে এসে দাঁড়ায়। কলিমুল্লাহ চমকে উঠে নিজেকে সামলে নেয় আর বলে এইজন্যি ভুলু ঘেউ ঘেউ করে আমারে সাবধান করতে চাইত! আচ্ছা আমারে বিশ মিনিট সময় দেওন লাগব। ইট্টু বাইরের ঘরে যামু। আর অই দুইডা অঙ্গের ব্যবস্থা করন লাগব। কাগজ দিয়ে অস্বচ্ছ পলিথিনে মুড়িয়ে রূপালির স্তনযুগল আর ঠোঁট রাখা বয়াম নিয়ে গভীর জঙ্গলে অইগুলো পুঁতে আসে। আর বলে, রূপালি শ্যাষম্যাশ জীবন আমারে মুক্তি দিতাছে। এইডারে জীবন কয় না, বাইচ্চা থাহন কয়। টয়লেট থেকে এসে কলিমুল্লাহ ভুলুরে বলে, ভুলু তুই আর গ্রামবাসী তোগো সবাইর ধারে আমি কৃতজ্ঞ আর তোগো অনেক ভালোওবাসি।

ভুলু আশেপাশের লোকালয়ে ছুটে ছুটে ঘেউ ঘেউ করে লোকজন জড়ো করতে চায়। ইতিমধ্যে গ্রামে চাউর হয়ে গেছে কলিমুল্লাহ দরবেশকে পুলিশ ধরতে আসছে। জড়ো হয়েছে হাজার হাজার লোক। অধিকাংশ নারী। সবার দাবী কলিমুল্লাহকে ছেড়ে দিতে হবে। কলিমুল্লাহ গত নয়-দশ বছরে তাদের সাথে কোনো দুর্ব্যবহার করেনি। জোর করে টাকা পয়সা নেয়নি। পুলিশ যতই বলছে কলিমুল্লাহ খুনি। এলাকাবাসী বলছে এইরকম দরবেশ মানুষ খুন করলেও তার কোনো কারণ আছে। আমরা তারে নিয়া যাইতে দিমু না। ভুলু গিয়ে কামড়ে ধরেছে জাহেদের পায়ের দিকের প্যান্ট। জাহেদ ভুলুকে দুইটা গুলি করে। কলিমুল্লাহ এই-বার বলে, ছদ্মবেশী গাদ্দার! তুমি ভুলুকে মারলে কেন? এই বলে জাহেদের পিস্তল কেড়ে নেয়। জাহেদের দিকে পিস্তল তাক করতেই জাহেদ কনেষ্টেবলদের চোখের ইশারায় গুলি ছুঁড়তে বলে। তিনটি গুলি লাগে কলিমুল্লাহর বুকে। ঢলে পড়ে মৃত্যু রাজের কোমল উরুতে। পাশাপাশি পড়ে থাকে কলিম আর ভুলুর লাশ। কাঁদতে কাঁদতে মৃত কলিমের বুকের ওপর এসে শুয়ে পড়ে বিভাস। কলিমের রক্তে ভেসে যাচ্ছে কাইচান গ্রাম। সব মানুষ লাঠিসোঁটা নিয়ে জড়ো হতে থাকে কারণ তারা দরবেশের লাশ দেবে না। পুলিশ বাধ্য হয়ে তিন রাউন্ড ফাঁকা গুলি ছোঁড়ে। একজন কনেষ্টেবল জোর করে সরিয়ে দেয় বিভাসকে কলিমের বুক থেকে। খুব দ্রুত লাশ উঠিয়ে দ্রুত গাড়ি ছেড়ে দেয় পুলিশের। বিভাস আ আ শব্দে কাঁদতে কাঁদতে দৌঁড়াতে থাকে গাড়ির পেছনে। সঙ্গমরত দুটি কুকুর সঙ্গম থামিয়ে ঘেউ ঘেউ শব্দে আরও ভারী করে তোলে পরিবেশ। সারা গ্রামে বুক চাপড়ে মহিলারা মাতম করতে থাকে আহারে বাবা কলিমুল্লাহ, বাবা কলিমুল্লাহ!

লেখক:
নুসরাত সুলতানা, গল্পকার

মন্তব্য করুন (Comments)

comments

Share.

About Author

বাঙালীয়ানা স্টাফ করসপন্ডেন্ট