। মিজানুর রহমান শাওন ।
এক ছিল রাজপুত্র আর তার বন্ধু। বন্ধুর উপাধি ছিল রাখাল, কিন্তু সে হালচাষ করা রাখাল ছিল না, যেমনটা রূপকথার গল্পে আছে। প্রশ্নই আসে না। রাখাল তার বংশগত উপাধি মাত্র, হয়তো বহু বছর আগে কেউ তাদের রাখাল ছিল, অথবা ছিল না। তবে হ্যাঁ, তাদের মধ্যেকার সম্পর্ক ছিল সত্যিই খুব ভালো।
আর এও সত্যি যে রাজার রাণী– নাম ছিল কাঞ্চনমালা। রাণী হিসেবে তিনি ততটুকুই সুখী ছিলেন যা রাজার প্রধান রাণীরা হয়ে থাকেন। রাজাদের এবং আরও সব রাজপুরুষদের জন্য আরও রমণীরা থাকে যারা দাসী গোত্রীয়। এমন এক দাসীর নাম ছিল যার নাম ছিল কাঁকনমালা– তার সঙ্গে রানীর শত্রুতা এই রূপকথার প্রাণ- অন্তত ঠাকুরমার ঝুলির গল্পকারের বয়ানে।

মহারাণী কাঞ্চনমালার মন ভাল নেই। তিনি কাউকে বলেননি। রাণীদের সব কথা বলতে নেই, বলার মানুষও নেই।
রাজার এক অসুখ হয়েছে। প্রথমে শুরু হয়েছিল সামান্য এক ফুসকুড়ি দিয়ে, এখন তা ধীরে ধীরে সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ছে। মহামন্ত্রী রাখাল চেষ্টা করছেন বিভিন্ন বদ্যি দেখিয়ে, কিন্তু ভাল হবার কোন লক্ষণ এখনও দেখা যাচ্ছে না। রাণী চিন্তিত। এমন না রাজার জন্য তার খুব ভালবাসা আছে। কিন্তু রাজা মারা গেলে তিনি বিপদে পড়বেন। তাদের কোনো সন্তান হয়নি এখনও। এ অবস্থায় রাজা মারা গেলে তার কি হবে কি জানে?
সন্তান হবেই বা কী করে? রাজার যে খুব দোষ আছে তাও নয়, রাজা আগ্রহ নিয়েই এসেছে তার কাছে। প্রথম যৌন মিলনের কষ্টর কথা তার জানা। প্রথমে ভেবেছিলেন তাই, কিন্তু কেন যেন তার শরীররই ওঠে না। রতিক্রিয়া শেষ হলে মনে হয় বেঁচে যান তিনি। তাই রাজাও ক্রমেই সরে গেছেন তার কাছ থেকে। কিন্তু তাতে তার মন খারাপ হয়নি। বরং হাপ ছেড়ে বেচেছেন। প্রতিবার মিথ্যে শীৎকার দেয়া সহজ কাজ নয়।
আজ একা এসে বসেছেন দিঘির পারে। প্রহরীদের বলা আছে একজন ছাড়া আর কেউ যেন তাকে বিরক্ত না করে। সব দাসীদের বিদায় করে দিয়েছেন। মন বড়ো বিষণ্ণ আজকাল। নিজেকেই বুঝতে পারেন না।
শরতের সাদা মেঘ আকশে। মৃদুমন্দ হালকা শীতল হাওয়া। শুধু তার সারা শরীর জুড়ে যেন এক বিষম জ্বালা– যা কাউকে বলাও যায় না– সওয়াও যায় না। গা ভেজাতে ভালো লাগছে। চোখ বন্ধ করে দিঘির ঠাণ্ডা পাথর ঘাটে বসে আছেন তিনি।
আজকের দিনটা তার নিজের জন্য। আজকে তিনি নিজের সঙ্গে হিসেব মেলাবেন।
একটু পরে এক পায়ের আওয়াজে চোখ মেললেন তিনি। সাগ্রহে, আশঙ্কায় মিলেমিশে অপেক্ষা করছেন তিনি এই সময়টুকুর জন্য। অনেক সময় পার করে, অনেক দ্বিধার পর আজ তিনি প্রস্তুত। আজকে তিনি মুখোমুখি হবেন একজনের যাকে তিনি সরিয়ে রেখেছেন নিজের কাছ থেকেই বহুদিন। কিন্তু আর এই ভার সহ্য করা যাচ্ছে না।
চোখ মেলে তাকালেন তিনি। কাঁকনমালা নামের এই দাসীটিকে ডেকে পাঠিয়েছেন তিনি। প্রতিদিন ওর সঙ্গে দেখা হয় তার। প্রাসাদের অগুন্তি দাসীর মাঝে তিনি ঠিক খুজে পান ওকে। আর জানেন যে ওর চোখও তাকে অনুসরণ করে সারাক্ষণ।
অল্প বয়স্কা, সুন্দরী দাসী নতমুখে দাঁড়িয়ে।
– তোমার নাম তো কাঁকনমালা
– জি, মহামান্যা রাণী।
– তোমাকে কেন ডেকেছি জানো?
– না মহারাণী।
– তোমাকে আমার খাস দাসী বানাবো, রাজি।
– আপনার আজ্ঞা হলে অবশ্যই মহারাণী।
– ঠিক আছে। আমি খুব ক্লান্ত। আমাকে ভাল করে স্নান করাও। আমাকে এত ভয় পেতে হবে না। আজ শুধু তুমি আর আমি। আর কেউ এখানে প্রবেশ করতে পারবে না। বুঝেছো?
– জি মহারাণী।
– তোমার কাপড় খুলে, ঐ ক্ষার আর খৈল দিয়ে আমার সারা শরীর আর মাথা মার্জনা কর।
কাঁকনমালা ধীরে ধীরে নিরাবরণ হল। অল্পবয়সী তরুণীর খাপখোলা নগ্ন সৌন্দর্য রাণী তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছিলেন কামার্ত চোখে। রাণীও খুলে ফেলেছেন তার বসন। তার ভরা দেহ কাঁকনমালার চাইতে কম আকর্ষণীয় নয়। কাঁকনমালা দুহাতে নিয়ে ক্ষার খৈল রাণীর মাথায় দিল। তার সারা শরীর কাঁপছিল কোনো এক বিচিত্র আবেশে। সে আস্তে আস্তে রাণীর মাথার চুল, ঘাড় আর কাধ মার্জনা করা শুরু করল। রাণী তার মাথা এলিয়ে দিল ওর গায়ের ওপর। তারপর একসময় নিজেই কাঁকনমালার হাতদুটোকে নিয়ে গেল তার সুগঠিত স্তনের ওপর। স্তনবৃন্ত শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে গেছে কাঙ্ক্ষিত স্পর্শে। কাঁকনমালা কিছুটা ভয়ে আর কিছুটা যৌনতায় থরথর করে কাপছে। সে ধীরে ধীরে রাণীর স্তন মর্দন শুরু করল– এটা দাসীর হাতে গায়ের ময়লা পরিষ্কারের স্পর্শ নয়, এ যৌনতার নিষ্পেষণ। রাণী আর সহ্য করেতে পারলেন না। দুহাতে কাকনমালার মুখ জাপটে ধরে নিজের দিকে টেনে আনলেন। জীবনে প্রথমবারের মত রাণী গভীর আশ্লেষে চুম্বন করলেন কাউকে। তারপর দুজনে মিলে একে অপরের গায়ে মত্ত আনন্দে ক্ষার দিয়ে মাখিয়ে দিয়ে গায়ে গায়ে পিষে দিতে চাইলনে নিজেদের। দীঘির পাড়ের বৃক্ষ আর কিছু পাখি অবাক হয়ে দেখল দুই রমণীর প্রথম রমণ আর ভালোবাসা।
সব উদ্দামতা শেষ হলে, ভেজা গায়ে কাঁপতে কাঁপতে রাণী আর দাসী চলল অন্দরমহলে– আজ কে দাসী আর কে রাণী তা বলা মুস্কিল।

মহামন্ত্রী রাখালের মাথায় অনেক চিন্তা। রাজার অসুখটা সারছেই না। এখন এক চীনা বৈদ্যর চিকিৎসায় মনে হচ্ছে কিছু কাজ হচ্ছে। চীনা বৈদ্যর সারা গায়ে শরীর জুড়ে সুঁই ফুটিয়ে অসুখটা সারিয়ে তুলছে। মাত্রই তাই তিনি কিছুটা নিশ্চিন্ত বোধ করা শুরু করছিলেন। কিন্তু এখন রাজ অন্তপুরের যে কাহিনি কানে এসেছে তা তার সর্বোচ্চ মনোযোগ দাবি করছে। সময় খুব কম। রাজা সুস্থ হবার আগেই এর সমাধান করতে হবে।
রাজঅন্তপুর।
মহারাণী আর মহামন্ত্রী মুখোমুখি বসে আছেন। আর কারও প্রবেশাধিকার নেই এখানে।
কুশল বিনিময়ের পর মহারাণী প্রথম শুরু করলেন।
– কেমন আছেন মহামন্ত্রী। আপনি মহারাজের সুস্থতার জন্য যা করছেন তার জন্য অনেক ধন্যবাদ।
– এ আমার কর্তব্য মহারাণী।
– অবশ্যই। কিন্তু আপনি না থাকলে এই রাজ্য সামলানো অসাধ্য হত মহামন্ত্রী।
– আবারও ধন্যবাদ মহারাণী।
– এবার বলুন আমি কি করতে পারি।
– আপনি জেনে খুশি হবেন মহারাণী যে মহারাজ ক্রমেই আরোগ্য লাভ করছেন।
– সে কৃতিত্ব আপনার মহামন্ত্রী। আপনি যে চৈনিক বৈদ্য এনেছেন তার সুঁই চিকিৎসায়ই মহারাজ সুস্থ হয়ে উঠছেন।
– জ্বি, মহারাণী। আমার সঙ্গে তার কথা হয়েছে। তাঁকে আমরা তার প্রাপ্য সম্মানী তো দিচ্ছিই, এবং কৃতজ্ঞতা হিসেবে আরও বেশি কিছু দিতে চাচ্ছি।
– খুবই ভালো কথা। তা আমি কি করতে পারি সেখানে।
– আমরা তার জন্য অর্থ ছাড়াও আরও কিছু উপঢৌকন দিতে চাচ্ছি। এর মধ্যে থাকবে কিছু শিল্পকর্ম আর দাস দাসী।
– খুবই ভালো কথা। আমি কি করতে পারি সেখনে।
– এই দাস দাসীদের মাঝে অন্তপুরের আপনার একজন ব্যক্তিগত দাসীও আছে, সে জন্য আপনার অনুমতি প্রার্থনা করছি।
এবার রানী একটু থমকালেন। গলা একটু উঁচু করে বললেন।
– আমাদের রাজ্যে কি দাসীর কম পরেছে যে আমার অন্তপুরের দাসীর প্রয়োজন হলো।
– না মহারাণী, কিন্তু এই দাসী নিয়ে ইদানীং অনেক কথা ভেসে আসছে। সে বড় দুর্বিনীত। সে রাজ আমত্য, সেনাপতির সঙ্গে উচু গলায় কথা বলেছে।
– আমি ঠিক বুঝতে পারছি না।
– আপনার খাস দাসী কাঁকনমালা, কদিন আগে আমাদের এক মন্ত্রী আর সহ-সেনাপতিয়ের সঙ্গে উদ্ধত আচরণ করেছে। এর আগেও সে বহু জায়গায় অনধিকার চর্চা করেছে যা মেনে নেয়া যায় না।
– আমার শকট আসতে দেরি হয়ে যাচ্ছিল, আর তাই আমি তাকে বলেছিলাম খোঁজ নেবার আর তাড়াতাড়ি করবার জন্য। সে অপরাধ করলে আমার জন্য করেছে।
– আমি জানি সেটা ছিল আপনার বাহন সম্পর্কিত। কিন্তু দাসীর উঁচু কণ্ঠ রাজপ্রাসাদের জন্য শোভন নয়। শাসনের ভিত্তি ভেঙ্গে পড়ে যখন দাস-দাসী উদ্ধত হয়।
– ঠিক আছে মহামন্ত্রী, আমি ওকে বলে দেব, আর ওরকম হবে না। ওর বয়েস কম। কিন্তু ওকে পাঠানো যাবে না। আপনি আর কাউকে দিয়ে দিন।
– মহারাণী আপনি বুদ্ধিমতি রমণী, আমার মনে হয় আপনি জানেন আরও কিছু না বলা কথা আছে, যা আমি সামনা সামনি আনতে চাইনা। আপনি রাজ্যের মহারাণী, আপনার সম্পর্কে কিছু রটুক তা রাজ্যের জন্য মঙ্গলকর নয়। রাজার অসুস্থতা আর এই সুচ চিকিৎসা নিয়ে ইতিমধ্যেই অশিক্ষিত প্রজাদের মাঝে অনেক গল্প ছড়িয়েছে, আমরা তাতে আরও মাল মশলা যোগান দিতে পারি না।
রাণীর কণ্ঠস্বর কঠিন হলো।
– কি গল্প মহামন্ত্রী।
মহামন্ত্রীর উঠে দাঁড়ালেন। রাণী এই রাজ্যের, রাজার এক প্রলম্বিত অংশ মাত্র। কিন্তু তাঁকে অনেক হিসেব করে কাজ করতে হয়। এবার তার স্বরও সমান কঠিন।
– সেটা আপনি ভাল করেই জানেন মহারাণী। সে আলোচনা কোন মঙ্গল বয়ে আনবে না। মহারাজা ভালো হয়ে উঠছেন। প্রজারা এখন আপনাদের পাশাপাশি দেখতে চাইবে। তারা চাইবে আপনার কাছ থেকে এক পুত্র সন্তান। আর সবচাইতে কম চাইবে আপনার শয্যায় অন্য কাউকে, বিশেষত কোনো অন্য রমণীকে।
রাণী থমকে গেলেন। সময় নিয়ে বললেন, যদিও কণ্ঠস্বর নিচু।
– আপনার রাজা যদি আরও রমণিতে উপগত হতে পারেন, আমার ক্ষেত্রে সমস্যা কোথায়। পুরাণে তো এ ধরনের সম্পর্ক মেনে নেয়া হয়েছে। আমি তো কোন পুরুষের কাছে যাইনি।
– সমস্যা হতো না মহারাণী, যদি আপনি রাণী না হতেন, যদি ওই অর্বাচীন নারী তার মুখ বন্ধ রাখতে পারত। আরেক ভগীরথের জন্মে কোন সমস্যা ছিল না। কিন্তু এখন কলিকাল মহারাণী, বেদের যুগ নয়। মহারাজের কানে এই কথা গেলে আপনার প্রাণ সংশয় পর্যন্ত হতে পারে। আমার কথা শুনুন, এতে সবার স্বার্থ সংরক্ষিত হবে। আপনি ভবি্য্যতে আবারও সঙ্গিনী পাবেন, শুধু তা বাইরে প্রকাশ করা চলবে না। আমাদের রাজ্যের একজন রাজপুত্রের প্রয়োজন। তার জন্য রাজার সঙ্গে আপনার মিলন প্রয়োজন। একবার সন্তান হয়ে গেলে আপনি যা ইচ্ছা তাই করতে পারবেন যদি তা রাজ অন্তপুরের ভেতরে সীমাবদ্ধ রাখতে পারেন। রাজ্য, রাজা এবং আপনি নিজেকে টিকিয়ে রাখতে চাইলে এর কোনো বিকল্প নেই, তা দয়া করে বোঝার চেষ্টা করুন।
রানী এবার চুপ করে রইলেন। মন্ত্রীর কথায় সারবত্তা আছে। এমনি এমনি তাঁকে মহামন্ত্রী করা হয়নি।
তিনই ধীরে মাথা নেড়ে সম্মতি দিলেন, যদিও হৃদয় বিদীর্ণ।
এর পরের কাহিনী আমার জানি। কিভাবে সূচ রাজা ভাল হলো রাখাল মন্ত্রী বন্ধুর কারণে, কিভাবে দাসী কাঁকনমালার ষড়যন্ত্র ছিন্ন করে রাণী কাঞ্চনমালাকে ফিরিয়ে দেয়া হলো তার রাজ্যপাট।

লেখক:
মিজানুর রহমান শাওন, গল্পকার, লেখক;
পেশায় চিকিৎসক। বিজ্ঞান আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বহু বছর। বাংলাদেশ অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল এসসসিয়েশনের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। মহাকাশ বার্তার সম্পাদক ছিলেন একসময়। বৃশ্চিক নামে জনপ্রিয় স্যাটায়ার লেখক ছিলেন সেখানে। সে সব লেখা নিয়ে “নিন্দুক পুরাণ” নামে একটি বই প্ছেরকাশ পেয়েছে (ফেব্রুয়ারী, ২০১২)। আর্থার সি ক্লার্কের একটি সায়েন্স ফিকশন অনুবাদ করেছেন, বেরিয়েছে সন্দেশ থেকে, “দূর পৃথিবীর ডাক” (ফেব্রুয়ারী, ২০০১)। বিতার্কিক হিসেবে বাংলাদেশ টেলিভিশন টিভি বিতর্কে কলেজের প্রতিনিধিত্ব করেছে। অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী।