কিছু মৌ-লোভী মোল্লা ও তাদের হিংসাত্মক পলিটিক্স । ফারদিন ফেরদৌস

Comments
বঙ্গজ ফেসবুক দুনিয়ায় মাওলানা মামুনুল হককে নিয়ে দেখলাম ব্যাপক মাতামাতি চলতেছে। এরমধ্যে আমাদের ক্রিকেট ক্যাপ্টেন ম্যাশও জড়ায়ে গেছেন। তার আগে বলি কে এই মামুনুল হক?
¶ মাইক পেলে যার গলাতে কখনো প্রেম ভক্তি শ্রদ্ধা সবর ঈমান আমলের কথা বের হয় না, বের হয় কেবল চিৎকার চেঁচামেচিতে ভরা ধর মার কাটো টাইপ যুদ্ধংদেহী বক্রোক্তি।
¶ ২০১৩ সালের ৫ মে তে শাপলা চত্বর ঘেরাওয়ে রাষ্ট্রব্যবস্থা হুমকিতে ফেলা দেয়ার পর তৎকালীন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল হককে উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন, সাবধান হয়ে যাও, রাতের মধ্যে এমন আগুন জ্বালুম পালাবার পথ পাইবা না। দেশপ্রেমিক ও খাঁটি রাজনীতিক সৈয়দ আশরাফও দেখিয়ে দিয়েছিলেন। উল্টো এই দাম্ভিক মাওলানারাই কান ধরে পালাবার পথ খুঁজে পায় নাই।
¶ এই লোকটা দেখতেছি বিজ্ঞান লেখক ও বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. জাফর ইকবালকে বলে বলদ ষাঁড়। কতটা হীনমন্য হলে মানুষের নাম এভাবে বিকৃত করতে পারে।
¶ কবি শামসুর রাহমানকে উদ্দেশ্য করে এই চিল্লাবাজ হুজুর দেখি বলতেছে, এই নাস্তিক কবিকে যেখানে পাওয়া যাবে সেখানে জুতাপেটা করা হবে।
কবি শামসুর রাহমানের প্রতি একশ্রেণীর মৌলভী ও তাদের অন্ধ অনুবর্তী শিষ্যরা কেন এত বিদ্বেষ পোষণ করে?
শেরে বাংলার প্রোগ্রেসিভ রাজনীতির সাথে জড়িত বাবা মুখলেসুর রহমান চৌধুরীর অসাম্প্রদায়িক চেতনা ও জনমানুষের প্রতি অপরিসীম দরদ কবির চেতনায়ও প্রবাহিত ছিল। শামসুর রাহমানের বিরুদ্ধে বারবার বিতর্ক তুলেছে কূপমন্ডুকরা। তারা শুধু বিতর্ক তুলেই থেমে থাকেনি। বর্বরতার চূড়ান্ত পর্যায় পর্যন্ত গিয়েছে। কবির মৃত্যু পরোয়ানা জারি করেছে। তাঁকে হত্যার জন্য বাসায় হামলা করেছে। এতকিছুর পরও কবি তাঁর বিশ্বাসের জায়গায় ছিলেন অনড়। নানামুখী চাপ সত্ত্বেও সামাজিক অবক্ষয়ের বিরুদ্ধে সকল প্রগতিশীল আন্দোলনে নিজেকে সোৎসাহে সম্পৃক্ত রেখেছিলেন।
আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামও মোল্লাতন্ত্রের কাছে এমন ভয়াল উৎপীড়নের শিকার হয়েছেন। সর্বপ্রাণবাদী কবি, দার্শনিক ও বিজ্ঞান চিন্তকদের এ এক অমোঘ নিয়তি ও দুর্মর যন্ত্রণা এই যে, তারা উদারনৈতিকভাবে সর্বমানবের কথা সমান্তরালে ভাবেন বলে বিশেষ একটি গোষ্ঠীর রোষানলে পড়েন। মহামতি সক্রেটিস, কোপার্নিকাস, গ্যালিলিও বা কবি জালাল উদ্দিন রুমী কেউই রেহাই পাননি রুষ্ট ধর্মান্ধদের কাছ থেকে।
কবি শামসুর বড় দুঃখবোধ নিয়েই সেই সময়ে লিখেছিলেন—
মোল্লাগুলো যখন-তখন
ফতোয়া জারি করে—
পাড়াগাঁয়ের দুলালিরা
দোর্রা খেয়ে মরে।
দুখিনী সব মেয়েগুলো
বড় অসহায়
কী করে এই দুলালিদের
রক্ষা করা যায়?
মোল্লাগুলোর জুলুমবাজি
খতম করার তরে
দেশের মানুষ সবাই মিলে
যেতে হবে ল’ড়ে।
¶ অধ্যাপক আহমদ শরীফকেও এই গালিবাজ মৌলভী দেখলাম জুতাপেটার কথা বলেছে এবং মুরিদানরাও উনার সুরে হৈহৈ করছে।
¶ ইদানিং এই মোল্লা চরমোনাইয়ের লম্ফবাজ পীর ফয়জুল করিমের সাথে গলা মিলিয়ে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাস্কর্যের পেছনে লেগেছে। ঘোষণা দিচ্ছে যেখানে বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য পাওয়া যাবে সেটা উপ্রে ফেলে বুড়িগঙ্গায় নিক্ষেপ করা হবে‌।
¶ ফাইনালি‌ এই লোকটা নড়াইলের সংসদ সদস্য ও জনপ্রিয় ক্রিকেট ক্যাপ্টেন মাশরাফি বিন মুর্তজাকে নিয়ে চূড়ান্ত মিথ্যাচার করেছে। নড়াইলের প্রোগ্রেসিভদের বিরোধিতার মুখে ধর্ম নিয়ে রাজনীতি করা এই মাওলানা ওয়াজ মাহফিল করতে পারে নাই। মাথা হেট করে ঢাকার সাত মসজিদ রোডে নিজের দখলে রাখা মাদ্রাসায় ফেরত আসতে বাধ্য হয়েছে।
পরে নিজের ও সাগরেদদের ফেসবুক আইডি থেকে ঘোষণা দিয়েছে মাশরাফি এই ঘটনায় তার কাছে মাফ চেয়েছে। সত্যিটা হলো, ম্যাশের সাথে এই লোকের কোনো কথাই হয়নি। পরে ম্যাশ উল্টো এই মৌলভীকে উদ্দেশ্য করে বলেছেন, আপনাদেরকে এতটা সম্মান করি আর আপনি এইরকম মিথ্যা কথা বলতে পারলেন?
এমন ধৃষ্টতা, এই যে রাষ্ট্রদ্রোহিতা এবং এতটা মিথ্যাচার সত্ত্বেও বর্তমান সরকার এইসব লোকদেরকেই তোয়াজ করে চলছে। অথচ বঙ্গবন্ধুকে অসম্মানকারীদের বিরুদ্ধে দেশে শক্ত আইন বলবৎ আছে। আমরা মনে করি, এইসব একশ্রেণীর মৌলভীদের উদ্ভট আস্ফালনের জায়গাটিতে এই আইন প্রয়োগের যথোচিত জরুরত আছে। আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক ভাস্কর্যের পক্ষে ফেসবুকে আজ দুই লাইন লিখেছেন। বেশিরভাগ ফলোয়ার দেখলাম মামুনুল হক ও চরমোনাই পীরকেই সমর্থন করেছেন। মন্ত্রীকে হাদিস শিখাইছেন। এমন কি উগ্রবাদী সমর্থকদের কেউ কেউ মামুনুল হককে বাংলার দ্বিতীয় বঙ্গবন্ধু বলেও সাব্যস্ত করছে।
দেশটা যে উগ্র ডানপন্থায় তার বাঁক বদল করে ফেলেছে তা কি অসাম্প্রদায়িক ও ধর্মনিরপেক্ষ আওয়ামী লীগ সরকার টের পাচ্ছে?
মামুনুলদের অশালীন হুংকার সত্ত্বেও সরকারের এই বিস্ময়কর নির্লিপ্ততার কোনো জবাব আমাদের কাছে নাই। হয় তালেবান বা আল কায়েদা টাইপের এইসব এক্সট্রিমিস্ট মিসোজিনিস্ট মোল্লাতন্ত্রের কাছে দেশটা ছেড়ে দেন -আমরা ঘরের জায়া জননী, কন্যা ও ভগ্নিদের নিয়ে একযোগে আত্মহত্যা করি; নচেৎ এর একটা বিহিত করেন। ধর্মকে মানুষের অন্তরে নিরবে নিভৃতে ধারণ করবার বন্দোবস্ত করেন।
ধর্মের রাজনীতি বা ধর্ম নিয়ে বাণিজ্য গোটা পৃথিবীর জন্যই সবচে’ বিপজ্জনক অভিসন্ধি। একাত্তরে আমরা দেখেছি ধর্মের নাম নিয়ে লাখো মুক্তিযোদ্ধার প্রাণ কেড়েছে, লাখো মা বোনের সম্ভ্রম বিনষ্ট করেছে জামায়াত, রাজাকার, আলবদর, আল শামস।
দেশদ্রোহী তাদের উত্তরসূরীদের আস্ফালনেওই পরিস্থিতি আরেকবার তৈরি হলে এদেশে শুভবোধসম্পন্ন একটা মানুষকেও আর টিকিয়ে রাখা যাবে না।
পবিত্র কুরআনের ৩১তম সুরা লুকমান তথা একজন জ্ঞানী ব্যক্তির ১৯ নাম্বার ভার্সে আল্লাহ্ সুবহানাহুতায়ালা বলেন…

وَ اقۡصِدۡ فِیۡ  مَشۡیِکَ وَ اغۡضُضۡ مِنۡ صَوۡتِکَ ؕ اِنَّ  اَنۡکَرَ  الۡاَصۡوَاتِ لَصَوۡتُ الۡحَمِیۡرِ ﴿٪۱۹﴾

ওয়াকসিদ ফী মাশইকা ওয়াগদুদমিন সাওতিকা ইন্না আনকারাল আসওয়া-তি লাসাওতুল হামীর।
পদচারণায় মধ্যপন্থা অবলম্বন করবে এবং তোমার কন্ঠস্বর করবে নীচু; স্বরের মধ্যে গাধার স্বরই সর্বাপেক্ষা অপ্রীতিকর।
And be moderate (or show no insolence) in your walking, and lower your voice. Verily, the harshest of all voices is the voice (braying) of the ass.
মুমিনুল বা চরমোনাইয়ের স্বঘোষিত পালোয়ানরা মহাগ্রন্থের এই অমোঘ বাণী জানে? অথবা জানলেও ওরা কি ধর্মের ছিটেফোঁটাও মানে?
ফুটনোট:
ইউটিউব/ফেসবুকে মাওলানা মামুনুল হকের একটা ওয়াজ ভাসে। যেখানে এই মৌলভী আমাদের প্রিয় নবী করিম(সা.) এর লিপ্সিং তথা কথা বলবার সময় ঠোঁট নাড়াচাড়ার অনুকরণ করে দেখাচ্ছে। নাউজুবিল্লাহ্। মামুনুল দাবি করছে, ঠোঁট নাড়ানোর এই বিদ্যাটি সে তার স্বাধীনতাবিরোধী ও পাকিস্তান অনুবর্তী প্রয়াত বাবা মাওলানা আজিজুল হকের কাছ থেকে বংশ পরম্পরায় পেয়েছে। মাওলানা আজিজ সেটা তার ওস্তাদদের কাছ থেকে পেয়েছেন। ওস্তাদরা তাদের পূর্বপুরুষ ১৪ শ বছর আগের সাহাবি বা তাবে তাবেয়িনদের নিকট থেকে পেয়েছেন। মাওলানা মামুনুল ১৪ শ বছর আগে থেকে এখন পর্যন্ত এই ঠোঁট নাড়ানোর রক্ষকদের নাম পর্যন্ত উল্লেখ করেছে ওই ওয়াজে।
মুরিদানেরাও ওই ওয়াজের মোহাবিষ্টতায় বিস্মিত হয়ে গিয়ে চিল্লায়ে আলহামদুলিল্লাহ, সুবহানাল্লাহ্, মারহাবা পড়ছে।
মানবতার পথপ্রদর্শক আমাদের মুসলিমদের নবী(সা.) কথা বলবার সময় কেমন করে ঠোঁট নাড়াতেন -এই ব্যাপারটা দেখাতে পারেন একমাত্র মাওলানা মামুনুল হক! এটা সম্ভব? ব্যাপারটা সত্যি আপনারা বিশ্বাস করেন?
লেখক:


ফারদিন ফেরদৌস, লেখক, সংবাদকর্মী, মাছরাঙা টেলিভিশন

*প্রকাশিত এ লেখার মতামত, ভাষা ও বানানরীতি লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাঙালীয়ানার সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকা অস্বাভাবিক নয়। তাই প্রকাশিত এ লেখা বা লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা সংক্রান্ত আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় বাঙালীয়ানার নেই। – সম্পাদক

মন্তব্য করুন (Comments)

comments

Share.