ক্ষমতার দ্বন্দ্বই কি জঙ্গিদের সহায়ক হলো শ্রীলঙ্কায়?

Comments

শ্রীলঙ্কায় রোববার, ২১ এপ্রিল, ২০১৯, স্থানীয় সময় ৮টা ৪৫ মিনিটে তিনটি হোটেল ও গির্জায় চারটি বোমা হামলা হয়। দুপুরের দিকে চতুর্থ হোটেল ও একটি বাড়িতে বোমা বিস্ফোরণ ঘটে। হামলায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৩১০ জনে পৌঁছেছে। পুলিশ বলছে, সোমবার রাতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আহতদের বেশ কয়েকজন মারা যান। আহত ৫ শতাধিক।

নিহতদের মধ্যে ৩৭ জন বিদেশি রয়েছে। রবিবারের হামলায় চার মার্কিন নাগরিক নিহত হয়েছেন বলেও জানিয়েছে আমেরিকা। নিহতদের মাঝে আরও রয়েছে ৩জন যুক্তরাজ্য, ৩জন ভারত, ১জন পর্তুগাল, ৩ ডেনমার্ক, ২জন তুরস্ক এবং ১জন বাংলাদেশ, চীনের নাগরিক রয়েছে। বেশ কিছু অজ্ঞাত পরিচয় বিদেশীর মরদেহ এখনও হাসপাতালে রয়েছে।

সোমবারও কলম্বোর একটি চার্চের কাছে একটি গাড়িতে রাখা বোমা ফেটে যায়। কলম্বো সেন্ট্রাল বাসস্ট্যান্ডে পাওয়া গেছে অন্তত ৮৭টি ডিটোনেটর।  হামলার এ ঘটনায় আটক করা হয়েছে অন্তত ৪০ জনকে। কিন্তু এসব হামলার দায় এখনও কেউ স্বীকার করেনি।

দেশটির মন্ত্রিসভার মুখপাত্র রাজিথা সিনারত্নেবলেছেন, স্থানীয় উগ্রপন্থী ইসলামি দল “ন্যাশনাল তাওহিদ জামাত” (এনটিজে) এ হামলায় জড়িত। আমরা বিশ্বাস করি না যে দেশের ভেতরের কোনো গোষ্ঠী এই হামলা চালিয়েছে। হামলায় আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক জড়িত। আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক ছাড়া এ ধরনের হামলা সফল হতো না।’

শ্রীলঙ্কা সরকারের ফরেনসিক বিভাগের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা আরিয়ানন্দ ওয়েলিয়াঙ্গা বলেছেন, কলম্বোর সানগ্রি-লা হোটেলে দুই হামলাকারী আত্মঘাতী বোমা বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে। অন্য হামলাকারীরা তিনটি গির্জা ও অন্য দুটি হোটেল লক্ষ্য করে হামলা চালায়। দুপুরে কলম্বোর উপকণ্ঠে চতুর্থ হোটেল ও একটি বাড়িতে বোমা বিস্ফোরণ হয়। তবে সেসব জায়গায় কীভাবে হামলা হয়েছে, তা এখনো জানা যায়নি। ওয়েলিয়াঙ্গা বলেন, এ ঘটনায় এখনো তদন্ত চলছে।

শ্রীলঙ্কার পুলিশ প্রধান পুজুত জয়সুন্দর ১১ এপ্রিল বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার বরাত দিয়ে হামলার ব্যাপারে এক সতর্ক বার্তা দিয়েছিল যাতে বলা হয়েছিল, উগ্র ইসলামপন্থী দল এনটিজে গির্জাগুলো ও শ্রীলঙ্কায় অবস্থিত ভারতীয় হাইকমিশনে হামলার পরিকল্পনা করছে।

এই তথ্য হাতে আসা সত্ত্বেও প্রশাসনের গাফিলতি কেন হল? কেন তাদের তরফে কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি? সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের দাবি, এই হামলা আশঙ্কার এই গুরুত্বপূর্ণ গোয়েন্দা তথ্য তাদের হাতে এসে পৌঁছায়ইনি!

তবে কি প্রশাসনের বিরাট ব্যর্থতার মাসুল দিল ৩১০টি জীবন? প্রশ্ন উঠেছে রাষ্ট্রযন্ত্রের এই সমন্বনয়হীনতা কেন?

রবিবার প্রধানমন্ত্রী রনিল বিক্রমসিংহেও জানিয়েছিলেন, আগাম সতর্কবার্তা সম্পর্কে তাঁকে বা তাঁর মন্ত্রকের কাউকেই কিছু জানানো হয়নি। তাঁর কথায়, ‘‘কেন কোনও পদক্ষেপ করা হয়নি, আমরা অবশ্যই খতিয়ে দেখব।’’

আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম এর মাঝে ক্ষমতার দ্বন্দ্বই দেখতে পাচ্ছে। দেশের প্রেসিডেন্ট মৈত্রীপালা সিরিসেনা, যিনি একই সঙ্গে দেশের প্রতিরক্ষামন্ত্রীও বটে, তাঁর সঙ্গে বিক্রমসিংহের টানাপড়েন তৈরি হয়েছে ২০১৮ তে ক্ষমতা হস্তান্তরের সময় থেকেই। রাজনৈতিক অচলাবস্থা তৈরি হওয়ার পরে ২০১৮-র অক্টোবরে সিরিসেনা তাঁর ঘনিষ্ঠ প্রাক্তন প্রেসিডন্ট মাহিন্দা রাজাপাকসেকে প্রধানমন্ত্রীর আসনে বসিয়েছিলেন। কিন্তু পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়ায় নভেম্বরে পার্লামেন্ট ভেঙে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেও শ্রীলঙ্কার সুপ্রিম কোর্ট তা অসাংবিধানিক ঘোষণা করে। এর ফলে আইনি পথে বিক্রমসিংহেকে ২০২০ সালে দেশে সাধারণ নির্বাচন পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীর পদে মেনে নিতে বাধ্য হন সিরিসেনা। এই বিস্ফোরণের জেরে সরকারের অন্দরে রাজনৈতিক সঙ্কট ফের প্রকট হল বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

সরকারি স্তরে বিস্ফোরণের সতর্কবার্তা না পৌঁছনো নিয়ে এখন তাই পাল্টা দোষারোপের পালা চলছে। সোমবার স্বাস্থ্যমন্ত্রী রজিত সেনারত্নে জানিয়েছেন, দশ দিন আগে থেকে নয়, ৪ এপ্রিল থেকেই সতর্কবার্তা ছিল। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী আর তাঁর সঙ্গীরা পরিস্থিতি সম্পর্কে ‘এতটুকুও ওয়াকিবহাল ছিলেন না’। স্বাস্থ্যমন্ত্রীর দাবি, সরকারের মধ্যেই সমন্বয়ের চূড়ান্ত অভাব রয়েছে। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী জাতীয় নিরাপত্তা নিয়ে একটি বৈঠক ডাকার চেষ্টা করেছিলেন। মন্ত্রিসভার সদস্যরাই সেই বৈঠকে আসবেন না বলে জানিয়ে দেন। এদিকে, ৪ এপ্রিল সতর্কবার্তা আসা সত্ত্বেও তা দেরিতে কেন জানানো হল, আপাতত সেই অভিযোগে পুলিশপ্রধান পুজুত জয়সুন্দরের ইস্তফা দাবি করেছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী।

আন্তর্জাতিক একাধিক গোয়েন্দা সূত্র জানাচ্ছে, শ্রীলঙ্কার পুলিশপ্রধানের পাঠানো সতর্কবার্তায় শুধু এনটিজে-র নামই ছিল না, কয়েক জন সদস্যের নামও ছিল। মার্কিন বিদেশ দফতর সূত্রে আজ জানানো হয়েছে, শ্রীলঙ্কায় আরও হামলার ষড়যন্ত্র চলছে। পর্যটকদের জনপ্রিয় গন্তব্য, পরিবহণ কেন্দ্র, বাজার, শপিং মল, সরকারি দফতর, হোটেল এবং ধর্মীয় স্থানে ফের হামলার সম্ভাবনা রয়েছে বলে দাবি।

ছবি ও খবর: রয়টার্স

বাঙালীয়ানা/এসএল

মন্তব্য করুন (Comments)

comments

Share.