। আনোয়ার শাহাদাত ।
আমি বহুদিন বহুবছর বাংলাদেশের রাজনীতির তেমন কোন খবর রাখি না, মনে হয় যেখানে থাকি না সেখানকার রাজনীতির গভীর খবর রাখার কি অর্থ আমার কাছে? কিন্তু গত বছর হতে সাবেক সরকার প্রধান শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর অথবা পতনের আগ হতে আমি আগ্রহী হয়ে- ধরা যাক কুড়ি ভাগ হতে তিরিশ ভাগ অনুসরণ করেছি। তখন এবং এর পরে আবার বিরতি নিলেও আন্তর্জাতিকভাবে যতটুকু খোঁজ নেওয়া দরকার ততটুকু নিয়ে থাকি এর বেশি নয়।
এবং আমি স্বভাব অনুযায়ী প্রধান রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের অনুসরণ করে থাকি। মানে তাদের কথাবার্তা, তাদের অন্যান্য চলাফেরা… অর্থাৎ রাজনৈতিক ভাবগতি।
আমি কখনো তাকে [সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা] শুনিনি কারণ আমি যেনো জানতাম তিনি কী বলতে পারেন। অতএব তার ক্ষমতায় আসবার পর হতে আর কোন বক্তব্য না শুনলেও তার পতনের পর তিনি যেসব কথা বলেছেন ভারত হতে, তার অনেকই বা সবই শোনার চেষ্টা করেছি।
শেখ হাসিনার কথা শুনলে মনে হয় তিনি অসম্ভব রেগে আছেন। সঙ্গতই হয়তো। কিন্তু রেগে গিয়ে যে কথা বলছেন, আমার ধারণা তিনি তার কর্মীদের উদ্দেশ্য বলছেন, তাদের উজ্জীবিত করবার জন্যে, অনুপ্রাণিত করবার জন্য, সতেজ রাখবার জন্য। আমার মতে সেটা তার কর্মীদের ব্যাপার। তবে যারা তার কর্মী নন নিশ্চয় তারা আশা করেন হয়তো ভিন্ন।
আমি অন্তত ভিন্ন ভাবে মনে করে থাকি। আমি মনে করি তিনি যত শান্ত, যত ধীরস্থির, যত নির্ভরযোগ্যভাবে তাকে উপস্থাপন করেবেন ততই তার আলোচনা পদ্ধতিতে নৈতিকভাবে ইতিবাচক প্রভাব পরবে। এটা আমার অভিমত। সে একজন বাইরের লোক হিসাবের হিসাব, যে- তিনি ততই তখন ভাল করবেন। তার পরামর্শদাতা বা বুদ্ধিদাতারা তেমন মনে করেন না অবশ্যই। এই নিয়ে তিনি এবং তার পরামর্শদাতারা খুব ভালই জানেন বলে আমি ধরে নেই।
এবার আসি অধ্যাপক ইউনুস প্রসঙ্গে – মোটকথা আমার বিবেচনায় তাকে আমার সব সময় মনে হয়েছে একজন আগাগোড়া অনান্তরিক মানুষ, যিনি রাষ্ট্রের উচ্চপদে বসে গেছেন, কিন্তু মানুষ, রাষ্ট্র বা দেশের প্রতি কী দেশের মানুষের প্রতি কোথাও তেমন কোন ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা নেই। যা কিছু তার চৌদিকে সে যেনো বাণিজ্যেরই বর্ধিত প্রকল্প সমূহের সনে সম্পর্কিত। তিনি যেনো সেভাবেই করেছেন। অর্থাৎ রাষ্ট্রটিকে তিনি যেন বাণিজ্যের মতো করেই দেখেছেন (যেনো- আর একটি গ্রামীণ ব্যাঙ্ক কী গ্রামীন ফোন, কী গ্রামীন চেক প্রকল্প…! ) তারপরও তার যে ভাবমূর্তী বিশ্বব্যাপী আছে এবং তার যে আন্তর্জাতিক যা কিছু আছে তার প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই বলা যায় তিনি তার মতো করেই আছেন, ছিলেন কিন্তু কখনোই আমার মনে হয়নি যে তা আন্তরিক। তবে কদিন আগে বিজয় দিবসে (সম্ভবত রাতে) তিনি যে বক্তৃতাটি দিয়েছেন ১৭ মিনিটের, আমি যার ওই ১৭ মিনিটই শুনেছি।
এই প্রথমবারের মতন গত দীর্ঘ প্রায় দুই দশকের মধ্যে এই যেনো তার ভিন্ন কিছু বলার আছে বলেই তিনি বিজয় দিবস সন্ধ্যায় অমন কথা বলতে এসেছেন। এবং আমার মনে হওয়া ঠিকই ছিল- তিনি এই প্রথমবারের মতো “গণতন্ত্র” শব্দ উচ্চারণ করেছেন- কিন্তু তার সঙ্গে গণতন্ত্রের বিশ্বাস এবং তার আস্থার কোন সম্পর্ক আছে বা ছিল বলে আমার মনে হয়নি কখনো। কিন্তু এবারে লক্ষ্য করতে পেরেছি অর্থাৎ মনে হয়েছে যে গণতন্ত্রের পেছনের সূত্র হিসাবে তিনি নির্বাচনকে উল্লেখ করেছেন বা করতে বাধ্য হয়েছেন।
বিজয় দিবসের ভাষণ হতে বলা যায়- তিনি বিশ্বাস করুন না করুন প্রথমবারের মতো কোথাও না কোথাও এমন কোন কিছু তৈরি হয়েছে যার কারণে তিনি উচ্চারণ করেছেন যে গণতন্ত্র শব্দটি এবং আমি তা বিশ্বাস করেছি! আমি বিশ্বাস করেছি এর অর্থ এই নয় তিনি ভালোভাবে বলেছেন বলে আমি বিশ্বাস করেছি। আমি আসলে বিশ্বাস করেছি অন্যান্য অংকগুলো কোষে যে কোথাও না কোথাও হঠাৎ করে তার এমন একটি ‘অর্থ’ তৈরি হয়েছে যাতে তার আর কোন বিকল্প নেই। গণতন্ত্রের কথাই তাকে বলতে হয়। ঘটনার শুরু থেকে মানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর হতে আজ পর্যন্ত প্রতিদিন, বা যেখানে যখন যতবার আমার সুযোগ এবং সময় হয়েছে আমি এ কথাটি বলতে চেয়েছি – বাংলাদেশ গণতন্ত্র শব্দটি ভুলে গেছে অথচ ওই রাতে তিনি এমন ভাবে বলেছিলেন যে তার আর কোনো গত্যন্তর নেই অতএব তিনি গণতন্ত্রের পক্ষে এবং তিনি গণতন্ত্রের কথা বলেছেন, নির্বাচনকে সামনে রেখে।
এখন আমি আসি এ প্রসঙ্গে যে আমি এত দীর্ঘ ভূমিকা করে কথা বলছি কেন? কেনো এত দীর্ঘ ভূমিকা করে কথা বলছি- এ কারণে যে, আমি একই পথ অনুসরণ করেছি যেমন করে আমি শেখ হাসিনার বক্তৃতা গুলো শুনেছি, যেমন করে ড. ইউনুসের বক্তব্যগুলো শুনেছি ঠিক তেমন করে আজ আমি তারেক রহমানের বক্তৃতা শুনেছি। আগাগোড়া আমার মনে হয়েছে যে শান্তি এবং শৃঙ্খলা, নিরাপত্তা ও নিরাপদ বাংলাদেশের কথা তিনি যেভাবে যতবার, কতবার বলেছেন। এটি যারা গবেষণা করবেন তারা দেখাতে পারবেন কতবার। কিন্তু আমি অনুসরণ করেছি এবং আমার মনে হয়েছে তিনি ওই শান্তির কথা বহুবার বলেছেন। ঘৃনা, প্রতিহিংসা, প্রতিশোধ এসব বাদ দিয়ে।
এই যে তিনি ঘৃনা উৎসাহ দেননি তা যে কেবলমাত্র এক ধরনের কোন কিছু বিবেচনা না করেই করেছেন আমি তা মনে করছি না। বরং তিনি জেনেশুনেই ঘৃণা, প্রতিহিংসা, প্রতিশোধ, এসব উচ্চারণ করেননি এবং বারবার, বারবার এবং বারবার বহুবার তিনি উচ্চারণ করেছেন “শান্তি” “শৃঙ্খলা”, নিরাপত্তা”, এবং “নিরাপত্তা” তা প্রতিটি নাগরিক ও মানুষের জন্য তিনি আশা করেছেন, বাংলাদেশের জন্য আশা করেছেন।
আমি ব্যক্তিগতভাবে জীবনের সবকিছুকে গণতন্ত্রের চশমা হতে দেখে থাকি। ফলে গণতন্ত্রের কাচে দেখতে গিয়ে আমার কাছে মনে হয়েছে- দীর্ঘদিন, দীর্ঘদিন বাংলাদেশে আসলে গণতন্ত্র শব্দটির আর অস্তিত্ব নেই। সেই গণতন্ত্রের চশমাটা নেই যেমনটি শেখ হাসিনা একদা গণতন্ত্রপন্থী ছিলেন। কিন্তু তারেক রহমান আজ আমার মনে হয় এমন ভাবে কথা বলেছেন তাতে- একই রকম মনে হয়েছে।
এছাড়া তিনি ব্যক্তিগতও থাকেননি খুব। তার মায়ের প্রসঙ্গে তেমন কিছু বলেননি কোনো ব্যক্তিগত সুবিধা আদায়ের লক্ষ্যে। শুধু তার কষ্টের কথা বলেছেন বা যেসব কষ্টের ভেতর থেকে তাকে যেতে হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেছেন। তিনি তার বাবার কথাও বলেননি খুব যা দরকারী নয়।
পাশ্চাত্য সংস্কৃতিতে ‘পেছনে যাওয়ার’ রীতি নেই শুধু সামনে যাওয়া। ফলে এবারে স্বাধীনতার ঘোষণা কে দিয়েছে জাতীয় ওরস বা জেকের করা রোগীদের যে উন্মাদনা বাতিক তার হয়তো তেমন সুযোগ থাকবে না । ধন্যবাদ ও অভিনন্দন ও স্বাগতম যদি গণতন্ত্রের হয়ে আপনি এই জাতিটিকে কিছু দিতে চেষ্টা করে থাকেন।
ওইটুকুওই।
লেখক পরিচিতি:
আনোয়ার শাহাদাত
লেখক, গল্পকার, চলচ্চিত্র নির্মাতা; নিউইয়র্ক