।। অজুফা আখতার ।।

আমি ঋদ্ধ।ঋদ্ধ নামটি আমার একদম ভাল লাগে না। কারণ ঋদ্ধ মানে সমৃদ্ধ। কিন্তু আমি কোন কিছুতেই সমৃদ্ধ না। টিচাররা বলেন আমি নাকি গাধা। আমার কোন বুদ্ধি নেই। আমি পড়া মনে রাখতে পারি না। প্রতিদিনই ক্লাসে কান ধরে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়।দাঁড়িয়ে থাকতে আমার একদম খারাপ লাগে না। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আমি অনেক কিছু ভাবি। ভাবতে ভাবতেই ঘণ্টা পড়ে যায়। আমি যা ভাবি তা কাউকেই বলতে পারি না। কে শুনবে আমার কথা? ক্লাসের ভাল ছেলেগুলো আমাকে দেখতে পারে না, আর দুষ্টগুলো খালি মারামারি করে। আমি কিছু না করলেও আমাকে মারে। বড় আপার কাছে আমার নামেই সবাই বিচার দেয়। সেদিন বড় আপা আমাকে এমন ধমক দিলেন যে আমার বুকটা দুপুর পর্যন্ত ধ্বক ধ্বক করছিল। মনে হচ্ছিল বুকটা ফেটে যাবে।

আমার পৃথিবীটা চতুর্ভুজাকার। চারকোণা আকাশটাই আমার একমাত্র বন্ধু। আমার ঘরে খাট বরাবর সামনে একটা ছোট চারকোণা জানালা। আমি শুয়ে শুয়ে আকাশ দেখি। আকাশ থেকে রঙ নিয়ে মনে মনে ছবি আঁকি। এতো রঙ আকাশে! রাতে মা আর বাবা কাজ থেকে ফিরেন। আমরা একসাথে চারকোণা টেবিলে বসে রাতের খাবার খাই। তারা এতো ক্লান্ত থাকে যে খাওয়ার পরই ঘুমিয়ে পড়ে। আমি অনেক রাত পর্যন্ত জেগে থাকি, আকাশের তারা দেখি। মাঝে মাঝে মা এসে আমার ঘরে উঁকি দিয়ে দেখে যায় আমি ঘুমিয়েছি কি না। আলো না থাকায় বুঝতে পারে না আমি জেগে আছি। কখনো কখনো আমার গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। তখন আমার কি যে ভাল লাগে! আমি আসলে প্রতি রাতেই মায়ের জন্য অপেক্ষা করি। কিন্তু মা হঠাৎ দুয়েক দিন আসে। তাই বেশীরভাগ রাতেই মন খারাপ করে কখন যেন ঘুমিয়ে পড়ি!

 

আমাদের একজন নতুন টিচার এসেছেন। দেখতে খুবই রাগী। তিনিই এখন থেকে আমাদের গণিত করাবেন। বড় আপা তাঁকে পরিচয় করিয়ে দিয়ে গেলেন। নতুন টিচার বললেন, “আজ বৃহস্পতিবার। প্রতি বুধ আর বৃহস্পতিবার আমরা জ্যামিতি করবো। বাকি দিনগুলোতে অন্য গণিত। সবাই রুটিনটা লিখে রাখ”।

আমি খুব অবাক হলাম। এ কেমন টিচাররে বাবা! আমাদের কারো নাম ধাম জানতে চাইল না! নতুন টিচার এলেই দেখেছি সবার নাম জানতে জানতেই ঘণ্টা পড়ে যায়। একটা দিন অন্তত রেহাই পাওয়া যায়। আর তিনি এসেই মার্কার নিয়ে বোর্ডে লিখলেন ‘চতুর্ভুজ’। তারপর আমার দিকে ভুরু নাচিয়ে জানতে চাইলেন, “চতুর্ভুজ কী… জানা আছে?” আমি ভয়ে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলাম। টুপুল বাঁদরটা বলল, “মিস, ও কোন পড়াই পারে না”।

“তাই নাকি! তাহলে তো খুব ভাল কথা। পড়া তো পারার জিনিস না। পারতে হয় ডিম। যেমন ধরো…মুরগী ডিম পারে। আর পড়াটা করতে হয়”।

 

মিসের কথায় সবাই হেসে ফেলল। অনেকদিন পর ক্লাসে আমিও হাসলাম। আর এই কথাতেই কেন যেন মিসকে আমার ভাল লেগে গেল। রাগী রাগী চেহারাটাই কেমন দুষ্টু দুষ্টু আর আপন লাগল। এই প্রথম আমি গনিত ক্লাসে মন দিলাম। আর মিসের প্রতিটি কথাই বুঝতে পারলাম। মিস আমাদের চতুর্ভুজ পড়তেও দিলেন না, আঁকতেও দিলেন না। তিনি জ্যামিতি ক্লাসে সহজ একটি কাজ দিলেন। চতুর্ভুজ দিয়ে ইচ্ছেমত কিছু কথা লিখে আনতে বললেন। এটাই কাজ। এই প্রথম আমি হাসিমুখে ডায়েরীতে বাসার কাজ লিখলাম। পরের দিন কাজ জমাও দিলাম। গণিত টিচার একে একে সবার লেখা পড়ে শোনালেন, আমারটাও! আমার লেখার প্রশংসাও করলেন! বললেন, “কিরে চতুর্ভুজ! তুইতো বিরাট সাহিত্যিক!” আর এই প্রথম বুঝতে পারলাম আমি দাঁড়িয়ে থেকে থেকে ভাবা ছাড়াও আরও কিছু পারি।

 

এখন আমি প্রতিটি ক্লাসেই মন দিয়ে টিচারদের কথা শুনি। রাতে আকাশে তারা দেখার পাশাপাশি পড়ার বইগুলোও পড়ি। সবথেকে অবাক করা বিষয় হল, আমাদের ফার্স্ট বয় আসলে মুখস্ত পড়া ছাড়া আর কিছুই পারে না! সেকেন্ড বয়ও না! ওদের আমি এতদিন কত বুদ্ধিমান ভেবেছি! আসলে ওরা একেকটা গাইড বই ছাড়া আর কিছুই না। আমাদের গণিত মিস প্রতি বৃহস্পতিবার আমাকে একটি করে বাইরের বই পড়তে দেন। আমি এই দিনটার জন্য অপেক্ষা করি। প্রতি সপ্তায় একটি করে বই শেষ করা আমার অভ্যাস হয়ে গেছে। গনিত মিস আমাকে ‘চতুর্ভুজ’ নামেই ডাকেন। আমার একটুও খারাপ লাগে না।

আজ আমাদের স্কুলে বার্ষিক পরীক্ষার রেজাল্ট দিয়েছে। আমি প্রথম হইনি। এতে আমার দুঃখও নেই। আমি জানি প্রথম হওয়াটাই জীবনের সব কিছু না। এটা আমাদের গণিত টিচার বলেন। আমি তার কথা বিশ্বাস করি। তবে এবার আর বাবাকে অফিস কামাই করে পরের ক্লাসে প্রমোশনের জন্য প্রিন্সিপালকে অনুরোধ করতে হবে না।

এখন আমি আমার নামটা খুব পছন্দ করি। আমি জানি আমি সমৃদ্ধ হচ্ছি। আর গণিত মিস বলেছেন আমাদের সবার পৃথিবীই চতুর্ভুজাকার। সবাই চতুর্ভুজে বন্দী। তাই আমার আর আলাদা করে দুঃখ হয় না। গনিত মিসের নামটাই বলা হল না! থাক…কিছু মানুষের নাম বুকের ভিতরেই থাক।

মন্তব্য করুন (Comments)

comments

Share.