ছাত্র ইউনিয়নের উজ্জ্বল দিনগুলো । সারওয়ার আলী

Comments

ছাত্র ইউনিয়নের কাছে আমার প্রচুর ঋণ রয়েছে। তারুণ্যের সূচনায় জীবন, সমাজ ও পারিপার্শ্বিক জগৎ সম্পর্কে প্রায় সবার চিন্তাধারা ও দৃষ্টিভঙ্গি নির্ধারিত হয়। সাধারণভাবে এ কাজে বড় ভূমিকা রাখে অভিভাবক ও বন্ধুরা। আমার ক্ষেত্রে এ দায়িত্ব পালন করেছেন ব্যক্তি কমিউনিস্ট নেতা মোহাম্মদ ফরহাদ ও কর্মক্ষেত্রে ছাত্র ইউনিয়ন। ধর্ম ও বিত্ত ভেদে সমাজে যে বিভাজনরেখা বিস্তৃত রয়েছে, ছাত্র ইউনিয়ন তাকে অতিক্রম করার শিক্ষা দিয়েছে। আমার বিশ্বাস, ষাটের দশকে কেন্দ্রীয় ও জেলা পর্যায়ে ছাত্র আন্দোলনে যাঁরা নেতৃত্ব দিয়েছেন বা যুক্ত হয়েছেন, তাঁদের অনেকের ক্ষেত্রে এটি সত্য। ছাত্র ইউনিয়নের সাবেক সদস্যরা পরিণত বয়সে ক্ষমতা কিংবা ক্ষমতাবহির্ভূত রাজনীতিতে যুক্ত হয়েছেন; প্রশাসন, শিল্প-বাণিজ্য ও বিভিন্ন পেশায় সিদ্ধান্তগ্রহণকারী অবস্থানে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। তাঁদের কেউ কেউ নীতিভ্রষ্ট হয়েছেন, প্রলোভনের কাছে আত্মসমর্পণ করেছেন; কিন্তু ব্যাপক অংশ ছাত্র ইউনিয়নের সময়কালে অর্জিত দেশ ও সমাজের প্রতি তাঁদের অঙ্গীকার থেকে বিচ্যুত হননি। এটি দেশের জন্য পরম প্রাপ্তি।

ষাটের দশকে ছাত্র আন্দোলন মূলধারার জাতীয় সংগ্রামে অগ্রবাহিনীর ভূমিকা পালন করেছে, অনেকটা বর্ষাফলকের মতো। এ সংগ্রাম ’৬২-এর সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলনে শুরু হয়ে ’৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থানের জন্ম দিয়ে দেশকে মুক্তিযুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে দিয়েছে। অবশ্য ১৯৬৬ সালে বঙ্গবন্ধুর ছয় দফা দাবি জাতীয় আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করে মূলধারার রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। তবে সমান্তরালভাবে ছাত্রসমাজের ১১ দফা দাবির আন্দোলন কার্যকর অবদান রেখেছে। উল্লেখ্য, ষাটের দশকে উন্নয়নশীল বিভিন্ন দেশে উদীয়মান শিক্ষিত সমাজ অগ্রগণ্য ভূমিকা রেখেছে।

এদের মধ্যে ছাত্রসমাজ ছিল সবচেয়ে সংগঠিত শক্তি। সাম্প্রদায়িক বিভাজনের ভাবাদর্শ এবং স্বৈরতান্ত্রিক শাসনের বিরুদ্ধে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের গণ-আন্দোলন হয়ে ওঠে গণতান্ত্রিক ও জাতীয়তাবাদী চরিত্রের। এই ধারায় ছাত্র ইউনিয়ন সমাজে বৈষম্য দূর করা ও সাম্রাজ্যবাদবিরোধী উপাদান যুক্ত করতে চেষ্টা করে। একদিকে ষাটের দশকে দুই পরাশক্তি বিভক্ত বিশ্বে আমেরিকান সামরিক বলয়ে আবদ্ধ পাকিস্তান, অন্যদিকে সমাজতান্ত্রিক বিশ্বে শোষণ ও বঞ্চনার অবসান ঘটেছে—এ ধারণা তাদের নাড়া দেয়। ছাত্র ইউনিয়নের সব কর্মী সমাজতন্ত্রী হয়ে ওঠেনি। কিন্তু সংগঠন এ ধারার প্রগতিশীল রাজনীতিতে বিশ্বাসী, অপেক্ষাকৃত সৎ ও একনিষ্ঠ বিধায় ছাত্রসমাজের বিরাট অংশ সংগঠনটির প্রতি আকৃষ্ট হয়েছে।

অন্যদিকে জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের প্রাথমিক সূত্র হচ্ছে আপন জাতিসত্তায় নিজেকে চিহ্নিত করা এবং কোনো জাতিগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য তার জাতি পরিচয়ের প্রধান নির্ধারক। সুতরাং, ছাত্র ইউনিয়ন প্রতিপক্ষের কৌতুক উপেক্ষা করে সাংস্কৃতিক কার্যক্রমে মনোযোগী হয়েছে। ফলে সারা দেশের মেধাবী, চৌকস ও সংস্কৃতিমনা ছাত্ররা ছাত্র ইউনিয়নে যোগ দিয়েছে। উল্লেখ্য, ষাটের দশকের সব ছাত্রনেতার উপলব্ধি ছিল যে জাতীয় রাজনীতির বিষয়ে সাধারণ ছাত্রছাত্রীর আগ্রহ থাকলেও স্থানীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও শিক্ষাবিষয়ক সমস্যা সমাধানে লক্ষণীয়ভাবে উদ্যোগী না হলে জনপ্রিয়তা অর্জন করা যায় না। এ কারণেই সারা দেশে ছাত্র ইউনিয়নের ছাত্র গণভিত্তি সুদৃঢ় হয়েছে।

ষাটের দশকে ছাত্র আন্দোলনের মূল চালিকাশক্তি ছিল ছাত্র ইউনিয়ন ও ছাত্রলীগের ঐক্যবদ্ধ সিদ্ধান্ত গ্রহণের যোগ্যতা ও দক্ষতা। সারা দেশে উভয় সংগঠনের প্রভাব ছিল। সর্বত্র ছাত্রসংসদের নির্বাচনে প্রায় পালাক্রমে ছাত্রলীগ বা ছাত্র ইউনিয়ন জয়যুক্ত হয়েছে। তবে এই প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদে প্রচুর বাদানুবাদ সত্ত্বেও জাতীয় রাজনীতির বাস্তবতা ও বাধ্যবাধকতা ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনে তাদের শামিল করেছে। ষাটের দশকের আন্দোলনে মৌলিক রাজনৈতিক বিষয়ে বঙ্গবন্ধু ও কমিউনিস্ট নেতৃত্বের ঐক্যসূত্র অর্জিত হওয়ার ফলে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদে ঐক্যবদ্ধ সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং আন্দোলন গড়ে তুলতে বেগ পেতে হয়নি। বিশেষত, মোহাম্মদ ফরহাদের ছাত্র আন্দোলনের প্রায় দৈনন্দিন কৌশল এবং কর্মক্ষেত্রে সাইফুদ্দিন মানিক ও তৎকালীন ছাত্রলীগ নেতাদের সাধারণ ছাত্রদের কাছে গ্রহণযোগ্যতা এই আন্দোলনকে চূড়ান্ত পর্যায়ে নিতে সহায়ক হয়েছে। তবে ছয় দফা দাবির আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বঙ্গবন্ধু দেশবাসীর কাছে মহানায়কে পরিণত হওয়ার পর ছাত্রলীগের একা চলার নীতি গ্রহণের প্রবণতা লক্ষ করা যায়। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট রাজনীতির মতপার্থক্যের সূত্র ধরে ছাত্র ইউনিয়নে বিভক্তির ফলে ছাত্র ইউনিয়ন সাময়িকভাবে থমকে দাঁড়ায়। অবশ্য পরবর্তী সাংগঠনিক তৎপরতার ফলে ছাত্র ইউনিয়নে গতিবেগ সঞ্চারিত হয়েছে। কেবল সাংগঠনিক কার্যক্রম নয়, মূলধারার রাজনৈতিক বিষয়ে যথাযথ ভূমিকা ছাড়া এটি সম্ভব হতো না। ছাত্র ইউনিয়ন (মতিয়া গ্রুপ) ছয় দফা সমর্থনের অবস্থান গ্রহণ করে, তবে মনে করে যে আওয়ামী লীগের বিবেচনা অনুযায়ী এটি মুক্তির সনদ নয়, সমাজতন্ত্রই মুক্তির একমাত্র পথ। অন্যদিকে মেনন গ্রুপের নানা উপদলে বিভক্তির ফলে আমরা মূলধারার ছাত্র ইউনিয়নে পরিণত হই।

ষাটের দশকের ছাত্রনেতারা ছাত্রসমাজ ও দেশবাসীর যথেষ্ট সম্মানের পাত্র ছিল। আমার ১৯৬২-এর সামরিক শাসনবিরোধী ছাত্র আন্দোলন থেকে ১৯৬৭ সাল অবধি কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ছাত্র ইউনিয়নের সঙ্গে যুক্ত থাকার সূত্রে সারা দেশের প্রায় প্রতিটি জেলায় যাওয়ার সৌভাগ্য হয়েছে। লক্ষ করেছি প্রতিটি জেলা শহর কিংবা তৎকালীন মহকুমায় ছাত্রনেতারা সফরে গেলে সাজ সাজ রব পড়ে যেত এবং সর্বত্র বিপুল জনসমাগমের জনসভা করতে হয়েছে ও জনসভা শেষে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান স্বাভাবিক অনুষঙ্গ ছিল। রাজধানী ঢাকায় বেশ কয়েকটি ছাত্র জনসভা করতে হয়েছে।

বর্তমান ছাত্ররাজনীতি

ষাটের দশকের ছাত্রসংগঠন ও ছাত্রনেতাদের জনপ্রিয়তা, কার্যক্রম ও আচরণের সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতির আকাশ-পাতাল পার্থক্য রয়েছে। পরিস্থিতিটি হতাশাব্যঞ্জক ও উদ্বেগজনক। এর মূল কারণ ছাত্র নেতৃত্বের সঙ্গে ক্ষমতার সংশ্লিষ্টতা ও পরিবর্তিত বিশ্ব ও জাতীয় রাজনৈতিক পরিস্থিতি।

স্বাধীনতার পর থেকেই ছাত্রসংগঠন ও ছাত্র নেতৃত্বের অধোগতি ঘটেছে। সাধারণ মানুষের কাছে তাদের ভাবমূর্তি নষ্ট হয়েছে এবং তাদের কার্যকলাপ সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দলের ভাবমূর্তি বিনষ্ট করছে। সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে তাদের বিচ্ছিন্নতা বহুলাংশে বৃদ্ধি পেয়েছে।

এ জন্য ছাত্রসংগঠন কিংবা তাদের নেতাদের কেবল দোষারোপ করা সংগত নয়। স্বাধীনতার আগে ছাত্রসংগঠন ও ছাত্র আন্দোলন নিপীড়নমূলক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে জাতীয় আন্দোলনের মূলধারার অগ্রসেনানী থাকায় তাদের ত্যাগী ও বিপ্লবী ভাবমূর্তি ছিল। স্বাধীনতার পর ক্ষমতায় অধিষ্ঠান ও ক্ষমতা ব্যবহার করে অর্থ উপার্জনের অফুরন্ত সম্ভাবনা পরিস্থিতির গুণগত পরিবর্তন সাধন করেছে। এখন ক্ষমতাসীন ছাত্রনেতারা ক্যাম্পাসে বা এলাকায় চাঁদাবাজি ও মাস্তানি করলে কিংবা এ কারণে অন্তর্দলীয় হানাহানিতে লিপ্ত হলে প্রশাসন সেটি উপেক্ষা করে কিংবা প্রশ্রয় দেয়। ছাত্র নেতৃত্বের সুবাদে সহজে তারা ঠিকাদারে পরিণত হয়ে দ্রুত বিত্তশালী হতে পারে এবং সমাজের নানা সুবিধা ভোগ করে। ছাত্র নেতাদের পক্ষে এ প্রলোভন উপেক্ষা করা কঠিন। আবার রাজনৈতিক নেতাদের নেতৃত্ব বজায় রাখার জন্য এ ধরনের নির্ভরযোগ্য সহযোগী বা ক্যাডারের প্রয়োজন। এ দুষ্টচক্রের কারণে ছাত্র ও রাজনৈতিক নেতারা পরস্পরের জিম্মিতে পরিণত হয়েছে। সাধারণ ছাত্রদের এবং শিক্ষাজীবনের সমস্যা সমাধানের চেয়ে রাজনৈতিক নেতার সান্নিধ্য ও তাঁর প্রচার তাঁদের কাছে অনেক বেশি আকর্ষণীয়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অবৈধ অস্ত্রের চালান বেড়েছে এবং কিছু ছাত্রনেতা দেশের অপরাধচক্র বিশেষত মাদক ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েছে। দেশে নানা চেহারার সামরিক সরকার ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ায় পরিকল্পিতভাবে ছাত্রদের ব্যবহার করা হয়েছে এবং এ কারণে পরিস্থিতির চরম অবনতি লক্ষ করা গেছে। গণতান্ত্রিক সরকার ক্ষমতায় আসার পরও এর ধারাবাহিকতা লক্ষ করা যাচ্ছে। সাময়িক ব্যতিক্রম ঘটেছিল ১৯৯১ সালে এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময়।

দেশের সর্বত্র সাধারণ ছাত্ররা ছাত্রসংগঠনের দলাদলিতে লিপ্ত হয় না, তবে হল-হোস্টেলে সিটপ্রত্যাশী অসহায় ছাত্রদের ক্ষমতাসীন দলের লেবাস পরতে বাধ্য হতে হয় এবং তাদের কেউ কেউ এ প্রলোভন অতিক্রম করতে সক্ষম হয় না। সাধারণ ছাত্ররা ক্যাম্পাস বেশি অশান্ত হলে নিরাপদ আশ্রয় নেয় এবং আবার দৈনন্দিন রুটিনে ফিরে আসে। সে সব সময় উপলব্ধি করে যে নিয়মিত পাঠাভ্যাস না থাকলে ডিগ্রি পেতে সমস্যা হবে এবং প্রতিযোগিতামূলক বাজারে চাকরি পাওয়া সম্ভব হবে না, বিশেষ করে, যখন তাদের উচ্চপর্যায়ে তদবির করার লোক নেই। দৈনন্দিন জীবনে তার বেশি সময় কাটে কম্পিউটারের সামনে, সে তার সৃজনশীল ক্ষমতায় আয়ত্ত করে তথ্যপ্রযুক্তির সর্বশ্রেষ্ঠ উদ্ভাবন। ছাত্র ইউনিয়ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক কারণে ক্ষয়িষ্ণু শক্তিতে পরিণত হয়েছে, আর বড় ছাত্রসংগঠনগুলোর সঙ্গে সাধারণ ছাত্রদের শিক্ষাজীবন আকাঙ্ক্ষা ও প্রত্যাশার বিশেষ সম্পর্ক নেই।

আধুনিক সমৃদ্ধ সমাজ ও রাষ্ট্র বিনির্মাণে সাধারণ ছাত্র তথা তরুণ সমাজের ভূমিকা অত্যন্ত সম্ভাবনায়, তার কিছু আলামত ইতিমধ্যে দেখা যায়। এ শক্তিটি অসংগঠিত রয়ে গেছে। মনে রাখা দরকার, মধ্যপ্রাচ্যে আরব বসন্তে এ তরুণসমাজ তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে বিশ্বকে চমকে দিয়েছে, অথচ সংগঠিত যথাযথ রাজনৈতিক শক্তির অভাবে এই প্রায় বিপ্লবের ফসল দেশবাসী ঘরে তুলতে সক্ষম হচ্ছে না। অন্যদিকে কোনো রাজনৈতিক দলের প্রকাশ্য কিংবা অপ্রকাশ্য অঙ্গসংগঠনের পক্ষে সাধারণ ছাত্রদের সংগঠিত করা সম্ভব নয়।

লেখক:
Sarwar Ali
ডা. সারওয়ার আলী, ট্রাস্টি – মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর

*প্রকাশিত এ লেখার মতামত ও বানানরীতি লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাঙালীয়ানার সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকা অস্বাভাবিক নয়। তাই এখানে প্রকাশিত লেখা বা লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা সংক্রান্ত আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় বাঙালীয়ানার নেই। – সম্পাদক

মন্তব্য করুন (Comments)

comments

Share.