ছড়ার রাজা সুকুমার রায়

Comments

আশ্চর্য

নিরীহ কলম, নিরীহ কালি,

নিরীহ কাগজে লিখিল গালি-

“বাঁদর বেকুব আজব হাঁদা

বকাট্‌ ফাজিল অকাট্‌ গাধা ।”

আবার লিখিল কলম ধরি

বচন মিষ্টি, যতন করি-

“শান্ত মানিক শিষ্ট সাধু

বাছারে ধনরে, লক্ষ্মী যাদু ।”

মনের কথাটি ছিল যে মনে,

রটিয়া উঠিল খাতার কোণে,

আঁচড়ে আঁকিতে আখর ক’টি

কেহ খুশি কেহ উঠিল চটি !

রকম রকম কালির টানে

কারো হাসি কারো অশ্রু আনে,

মারে না, ধরে না, হাঁকে না বুলি

লোকে হাসে কাঁদে কি দেখি ভুলি ?

সাদায় কালো কি খেলা জানে ?

ভাবিয়া ভাবিয়া না পাই মানে ।

 

বিষম চিন্তা

মাথায় কত প্রশ্ন আসে, দিচ্ছে না কেউ জবাব তার—

সবাই বলে, “মিথ্যে বাজে বকিস্‌নে আর খবরদার !”

অমন ধারা ধমক দিলে কেমন করে শিখব সব ?

বলবে সবাই, “মুখ্যু ছেলে”, বলবে আমায় “গো গর্ধভ !”

কেউ কি জানে দিনের বেলায় কোথায় পালায় ঘুমের ঘোর ?

বর্ষা হলেই ব্যাঙের গলায় কোত্থেকে হয় এমন জোর ?

গাধার কেন শিং থাকেনা, হাতির কেন পালক নেই ?

গরম তেলে ফোড়ন দিলে লাফায় কেন তাধেই ধেই ?

সোডার বোতল খুললে কেন ফঁসফঁসিয়ে রাগ করে ?

কেমন করে রাখবে টিকি মাথায় যাদের টাক পড়ে ?

ভূত যদি না থাকবে তবে কোত্থেকে হয় ভূতের ভয় ?

মাথায় যাদের গোল বেধেছে তাদের কেন “পাগোল” কয় ?

কতই ভাবি এসব কথা, জবাব দেবার মানুষ কই ?

বয়স হলে কেতাব খুলে জানতে পাব সমস্তই ।

 

আড়ি

কিসে কিসে ভাব নেই ? ভক্ষক ও ভক্ষ্যে-

বাঘে ছাগে মিল হলে আর নেই রক্ষে ।

শেয়ালের সাড়া পেলে কুকুরেরা তৈরি,

সাপে আর নেউলে ত চিরকাল বৈরী !

আদা আর কাঁচকলা মেলে কোনদিন্‌ সে ?

কোকিলের ডাক শুনে কাক জ্বলে হিংসেয় ।

তেলে দেওয়া বেগুনের ঝগড়াটা দেখনি ?

ছ্যাঁক্‌ ছ্যাঁক্‌ রাগ যেন খেতে আসে এখনি ।

তার চেয়ে বেশি আড়ি আমি পারি কহিতে-

তোমাদের কারো কারো কেতাবের সহিতে ।

 

আবোল তাবোল

মেঘ মুলুকে ঝাপ্‌সা রাতে,

রামধনুকের আব্‌ছায়াতে,

তাল বেতালে খেয়াল সুরে,

তান ধরেছি কণ্ঠ পুরে ।

হেথায় নিষেধ নাই রে দাদা,

নাই রে বাঁধন নাইরে বাধা ।

হেথায় রঙিন্‌ আকাশ তলে

স্বপন দোলা হাওয়ায় দোলে,

সুরের নেশায় ঝরনা ছোটে,

আকাশ কুসুম আপনি ফোটে,

রঙিয়ে আকাশ, রঙিয়ে মন

চমক জাগে ক্ষণে ক্ষণ !

আজকে দাদা যাবার আগে

বল্‌ব যা মোর চিত্তে লাগে-

নাই বা তাহার অর্থ হোক্‌

নাইবা বুঝুক বেবাক্‌ লোক ।

আপনাকে আজ আপন হতে

ভাসিয়ে দিলাম খেয়াল স্রোতে ।

ছুট্‌লে কথা থামায় কে ?

আজকে ঠেকায় আমায় কে ?

আজকে আমার মনের মাঝে

ধাঁই ধপাধপ্‌ তব্‌লা বাজে-

রাম-খটাখট্‌ ঘ্যাচাং ঘ্যাঁচ্‌

কথায় কাটে কথার প্যাঁচ্‌ ।

আলোয় ঢাকা অন্ধকার,

ঘণ্টা বাজে গন্ধে তার ।

গোপন প্রাণে স্বপন দূত,

মঞ্চে নাচেন পঞ্চ ভূত !

হ্যাংলা হাতি চ্যাং-দোলা,

শূন্যে তাদের ঠ্যাং তোলা ।

মক্ষি রাণী পক্ষীরাজ-

দস্যি ছেলে লক্ষী আজ ।

আদিম কালের চাঁদিম হিম

তোড়ায় বাঁধা ঘোড়ার ডিম ।

ঘনিয়ে এল ঘুমের ঘোর,

গানের পালা সাঙ্গ মোর ।

 

ছায়াবাজি

আজগুবি নয়, আজগুবি নয়, সত্যিকারের কথা-
ছায়ার সাথে কুস্তি ক’রে গাত্র হ’ল ব্যথা !
ছায়া ধরার ব্যাবসা করি তাও জানোনা বুঝি,
রোদের ছায়া, চাঁদের ছায়া, হরেক রকম পুঁজি !
শিশির ভেজা সদ্য ছায়া, সকাল বেলায় তাজা !
গ্রীষ্মকালে শুক্‌‌নো ছায়া ভীষন রোদে ভাজা,
চিলগুলো যায় দুপুর বেলায় আকাশ পথে ঘুরে
ফাঁদ ফেলে তার ছায়ার উপর খাঁচায় রাখি পুরে ।
কাগের ছায়া বগের ছায়া দেখ্‌‌ছি কত ঘেঁটে-
হাল্কা মেঘের পান্‌‌সে ছায়া তাও দেখেছি চেটে ।
কেউ জানেনা এসব কথা কেউ বোঝে না কিছু,
কেউ ঘোরে না আমার মত ছায়ার পিছুপিছু ।
তোমরা ভাব গাছের ছায়া অম্‌‌নি লুটায় ভূঁয়ে,
অম্‌‌নি শুধু ঘুমায় বুঝি শান্তা মতন শুয়ে ;
আসল ব্যাপার জান্‌‌বে যদি আমার কথা শোনো,
বলছি যা তা সত্যি কথা, সন্দেহ নাই কোনো ।
কেউ যবে তার রয় না কাছে, দেখতে নাহি পায় 
গাছের ছায়া ফুটফুটিয়ে এদিক ওদিক চায় ।
সেই সময়ে গুড়গুড়িয়ে পিছন হ’তে এসে
ধামায় চেপে ধপাস্‌ করে ধরবে তারে ঠেসে ।
পাৎলা ছায়া, ফোক্‌লা ছায়া, ছায়া গভীর কালো-
গাছের চেয়ে গাছের ছায়া সব রকমেই ভালো ।
গাছ গাছালি শেকড় বাকল মিথ্যে সবাই গেলে,
বাপ্‌রে বলে পালায় ব্যামো ছায়ার ওষুধ খেলে ।
নিমের ছায়া ঝিঙের ছায়া তিক্ত ছায়ার পাক,
যেই খাবে ভাই অঘোর ঘুমে ডাকবে তাহার নাক্‌ ।
চাঁদের আলোয় পেঁপের ছায়া ধরতে যদি পার,
শুঁকলে পরে সর্দিকাশি থাকবে না আর কারো ।
আম্‌ড়া গাছের নোংরা ছায়া কাম্‌‌ড়ে যদি খায়
ল্যাংড়া লোকের ঠ্যাং গজাবে সন্দেহ নাই তায় ।
আষাঢ় মাসের বাদ্‌লা দিনে বাঁচতে যদি চাও ,
তেঁতুল তলার তপ্ত ছায়া হপ্তা তিনেক খাও ।
মৌয়া গাছের মিষ্টি ছায়া ‘ব্লটিং’ দিয়ে শুষে
ধুয়ে মুছে সাবধানেতে রাখ্‌‌ছি ঘরে পুষে !
পাক্কা নতুন টাট্‌কা ওষুধ এক্কেবারে দিশি-
দাম রেখেছি সস্তা বড়, চোদ্দ আনা শিশি ।

 

ন্যাড়া বেল তলা যায় ক’বার

রোদে রাঙা ইটের পাঁজা       তার উপরে বস্‌ল রাজা-
      ঠোঙা ভরা বাদাম ভাজা খাচ্ছে কিন্তু গিল্‌ছে না ।
গায়ে আটা গরম জামা      পুড়ে পিঠ হচ্ছে ঝামা ;
      রাজা বলে “বৃষ্টি নামা- নইলে কিচ্ছু মিলছে না ।”
থাকে সারা দুপুর ধ’রে      ব’সে ব’সে চুপটি ক’রে,
      হাঁড়িপানা মুখটি ক’রে আঁক্‌ড়ে ধ’রে শ্লেটটুকু ;
ঘেমে ঘেমে উঠছে ভিজে      ভ্যাবাচ্যাকা একলা নিজে
      হিজিবিজি লিখছে কি যে বুঝ্‌ছে না কেউ একটুকু ।
ঝাঁঝাঁ রোদ আকাশ জুড়ে,      মাথাটার ঝাঁঝরা ফুঁড়ে,
      মগজেতে নাচ্‌ছে ঘুরে রক্তগুলো ঝনর্‌ ঝন্‌ ;
ঠাঠা-পড়া দুপুর দিনে,      রাজা বলে, “আর বাচিনে,
      ছুটে আন বরফ কিনে- করছে কেমন গা ছন্‌ছন্‌ ।”
সবে বলে, “হায় কি হ্ল !       রাজা বুঝি ভেবেই মোলো !
      ওগো রাজা মুখটি খোলো- কওনা ইহার কারণ কি ?
#

মন্তব্য করুন (Comments)

comments

Share.