জমিদার রবীন্দ্রনাথ: হিন্দু-মুসলিম প্রসঙ্গ আর মানুষের বিবেক । রাহমান চৌধুরী

Comments

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর পিতার নির্দেশে আঠারশো একানব্বই সালে পূর্ববঙ্গে আসেন জমিদারী দেখভাল করবার জন্য। পূর্ববঙ্গে ঠাকুর পরিবারের তিনটি জমিদারী ছিলো। দ্বারকানাথের ঠাকুরদা নীলমণি ইংরেজদের কর্মচারী ছিলেন, তিনি কিছু জমি খরিদ করেন উড়িশ্যায়। নীলমণির পুত্র রামলোচন কিছু ভূসম্পত্তি করেছিলেন। রামলোচন ঠাকুর ও রামলোচনের পালকপুত্র দ্বারকানাথ ঠাকুরের সময় বর্তমান কুষ্টিয়া জেলার শিলাইদহ যথা তৎকালীন নদীয়া জেলার বিরাহিমপুর পরগনা, পাবনা জেলার সাজাদপুর পরগনা, রাজশাহী জেলার কালীগ্রাম পরগনা বর্তমানের পতিসর এবং উড়িষ্যার কটক জেলায় জমিদারী কিনেছিলেন। সত্যিকার অর্থে রবীন্দ্রনাথের পূর্বপুরুষ রামলোচন জমিদারীর গোড়া পত্তন করলেও শ্রীবৃদ্ধি ঘটিয়েছিলেন দ্বারকানাথ। শিলাইদহ অঞ্চলের জমিদারী দ্বারকানাথ ঠাকুরের আগেই খরিদ করা হয়। বিরাহিমপুর, কালীগ্রাম, সাজাদপুর ও কটকের জমিদারী পরের। দ্বারকনাথের পুত্র দেবেন্দ্রনাথের আমলে জমিদারী আর বৃদ্ধি পায়নি। পিতার মৃত্যুর পর দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর নিজেই সব জমিদারী দেখাশুনা করতেন। কিছু তথ্য পাওয়া যায় দেবেন্দ্রনাথের নিজস্ব একটি খাতায়, তা থেকে জানা যায় বাংলাদেশের তিনটি পরগণা বাবদ সদর খাজনার পরিমাণ ছিলো ন্যূনতম পঞ্চাশ হাজার টাকা।

রবীন্দ্রনাথ জমিদারী পরিচালনার আগে ঠাকুর-এস্টেটের আমলাদের বিরুদ্ধে নানারকম অভিযোগ, নানারকম অসন্তোষ জমা হচ্ছিলো প্রজাদের পক্ষ থেকে। হরিনাথ মজুমদারের কাগজ ‘গ্রামবার্তা প্রকাশিকা’য় সেইসব অসন্তোষের সংবাদ প্রকাশিত হয়েছিলো। রবীন্দ্রনাথের পিতা দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর গ্রামবার্তা প্রকাশিকার গ্রাহক ছিলেন, স্বভাবতই তিনি সেইসব অসন্তোষ সম্পর্কে জানতে পারেন। রবীন্দ্রনাথকে সে কারণেই হয়তো জমিদারী দেখভাল করার দায়িত্ব দিয়ে পাঠান। রবীন্দ্রনাথ যখন দায়িত্বভার পেলেন তখন তাঁর বয়স ত্রিশ বছর। পিতা দেবেন্দ্রনাথ প্রথম রবীন্দ্রনাথকে সর্বময় কর্তৃত্ব দিয়ে পাঠাননি। প্রথমে তাঁকে দেওয়া হয় দেখভালের দায়িত্ব, ছয় বছর পরে রবীন্দ্রনাথের কাজে সন্তুষ্ট হয়ে তাঁকে সবগুলি জমিদারীর সর্বময় দায়িত্ব অর্পণ করেন।

জমিদার রবীন্দ্রনাথ প্রবন্ধে অমিতাভ চৌধুরী জানাচ্ছেন যে, লক্ষণীয় বেশকিছু বাঙালী বিশ্বাস করেন এবং সাড়ম্বরে প্রচার করেন, রবীন্দ্রনাথ নাকি জমিদার হিসাবে অত্যাচারী ছিলেন, প্রজাদের ভাতে মেরে নিজের পরিবারের ভাণ্ডার ভরাট করেছিলেন। রবীন্দ্রনাথের জমিদারী এলাকায় বসবাসকারী বহু লোকও এই মতে আস্থাবান। তাঁদের বেশিরভাগই হিন্দু। কিন্তু ঠাকুর-এস্টেটের মুসলমান প্রজাদের ধারণা সম্পূর্ণ বিপরীত। তাঁরা রবীন্দ্রনাথকে শ্রদ্ধা করতেন ভালোবাসতেন। তিনি আরো জানান যে, রবীন্দ্রনাথের কুৎসা রটনা করেন একদল অজ্ঞতা থেকে, অন্যদলের কারণ সঙ্গত। রবীন্দ্রনাথ জমিদারী পরিচালনা করতে গিয়ে কায়েমী স্বার্থের দুর্গে কামান দেগেছিলেন, সেই সব দুর্গের রক্ষক ছিলেন হয় হিন্দু গোমস্তা, নয় হিন্দু মহাজন বা জোতদার। রবীন্দ্রবিদ্বেষ প্রচার করা তাঁদের পক্ষে খুবই স্বাভাবিক। কারণ সেইসময় প্রথম তাঁরা রবীন্দ্রনাথের জেদ আর কল্যাণব্রতের সামনে অত্যন্ত বিপন্ন বোধ করেছিলেন। নিজেদের রক্ষা করার পথ খুঁজছিলেন। রবীন্দ্রনাথ নিজের জমিদারীতে প্রজাদের মঙ্গলের জন্য বিস্ময়কর বহু নিয়মের প্রবর্তন করেছিলেন। ঠাকুর এস্টেটের অধিকাংশ প্রজাই ছিলেন মুসলমান, তাই সবরকম কল্যাণকর্মে সর্বাধিক উপকৃত হয়েছিলেন মুসলমান প্রজারা। ফলে কিছু কিছু স্বার্থান্বেষী মানুষ গ্রামীণ অর্থনীতির মঙ্গলের দিকটি বাদ দিয়ে বলতে শুরু করছিলেন, রবীন্দ্রনাথ ব্রাহ্ম কিনা তাই এতো মুসলমান-প্রীতি।

জমিদার রবীন্দ্রনাথকে মূল্যায়নেরর কাজটা সহজ না হলেও নানাদিক দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ। রবীন্দ্রনাথের বিরুদ্ধে উদ্দেশ্যমূলক অপপ্রচারের মুখে সত্যকে হাজির করতে যেমন এ মূল্যায়ন দরকার তেমনি দরকার জমিদার রবীন্দ্রনাথের মানবিক চরিত্র বুঝে নেওয়ার জন্য। রবীন্দ্রনাথ শিলাইদহ-সাজাদপুর-পতিসর অঞ্চলের প্রজাসাধারণের কাছে ‘জমিদার বাবু’ তথা ‘বাবুমশায়’ নামে পরিচিত ছিলেন। বাবুমশায় জমিদারীতে বসে নিজেকে কীভাবে দেখেছেন আর প্রজাদের কী চোখে দেখেছেন প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ। রবীন্দ্রনাথ জমিদারীর পুরো ভার পেয়ে বহু চিরাচরিত প্রথা ভেঙে চুরমার করে দিয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথের আগে তাঁর বড়ো ভাই বা ভগ্নিপতিরা জমিদারের দায়িত্ব নিয়ে এসেছিলেন, কিন্তু আর দশজন জমিদারের মতোই পুরানো নিয়মকানুন মেনে চলেছেন। দ্বারকানাথ, দেবেন্দ্রনাথ যখন জমিদারী পরিচালনা করেছেন, ঠিক আর দশজন জমিদারের মতোই প্রজাবিচ্ছিন্ন ছিলেন। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ ছিলেন এই ক্ষেত্রে একমাত্র ব্যতিক্রম। পূর্বপুরুষদের সোজা রাস্তা ছেড়ে হাঁটতে শুরু করলেন ভিন্ন রাস্তায়, বলা যায় দুর্গম বা কঠিন পথে।

রবীন্দ্রনাথ জমিদারীর দায়িত্ব নিয়ে প্রথম গেলেন শিলাইদহ। পুণ্যাহ উৎসবের সময় সেটা। তিনি তখনো জানতেন না তাঁর জন্য কী ধরনের ঘটনা অপেক্ষা করছে। জমিদারের ভার নেবার প্রথম দিনেই সম্পূর্ণ নতুন পথে হাঁটলেন তিনি। পুণ্যাহের হুলুধ্বনি আর শঙ্খধ্বনিতে কাছারি মুখর। জমিদার রবীন্দ্রনাথ অর্থাৎ নতুন ‘বাবুমশায়’ কাছারিতে নেমে এলেন। ধূতি পাঞ্জাবী চাদরে শান্ত সৌম মূর্তি। প্রথামতো প্রারম্ভে আদি ব্রাহ্মসমাজের প্রার্থনা এবং পরে হিন্দুমতে পূজা। পুরোহিত বাবুমশায়ের কপালে পরিয়ে দিলেন চন্দনের তিলক। কিন্তু হঠাৎ রবীন্দ্রনাথ বিরক্ত। রবীন্দ্রনাথের চোখ এড়াতে পারেনি পুণ্যাহ উৎসবের জাতবর্ণের দিকটিতে। রবীন্দ্রনাথের চোখে যা দোষণীয় মনে হলো, বহুকাল ধরে সেটাই ছিলো রীতি। রবীন্দ্রনাথ মনে মনে সিদ্ধান্ত নিলেন, যা করবার প্রথম আঘাতেই সেরে ফেলতে হবে। বুঝতে পারলেন, তিনি সংঘাতের মাঝে এসে দাঁড়িয়েছেন। দ্বারকানাথের সময় থেকেই সম্ভ্রম ও জাতিবর্ণ-অনুযায়ী পুণ্যাহ অনুষ্ঠানে থাকে ভিন্ন ভিন্ন আসনের বন্দোবস্ত। হিন্দুরা চাদরঢাকা সতরঞ্চির উপর একধারে, তার মধ্যে ব্রাহ্মণের স্থান আলাদা এবং চাদর ছাড়া সতরঞ্চির উপর মুসলমান প্রজারা অন্য ধারে। সদর ও অন্য কাছারির কর্মচারীরাও নিজ নিজ পদমর্যাদামতো বসেন পৃথক আসনে। আর বাবুমশায়ের জন্য ভেলভেটমোড়া সিংহাসন।

স্বভাবতই এ থেকে বর্ণহিন্দুদের মুসলমান সম্পর্কে সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গিটি ধরা পড়ে। হিন্দু উচ্চবর্ণের চোখে মুসলমানরা যে হেয় প্রতিপন্ন ছিলো এ ঘটনা তার প্রমাণ। হিন্দু কৃষকদের থেকে মুসলমান কৃষকদের অবস্থা আরো নীচে, সতরঞ্চিতে বসবার উপযুক্ত নন তাঁরা। উচ্চকোটির দ্বারাই এই বিভেদ সৃষ্টি হয়েছিলো। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ জমিদার হয়েও উচ্চকোটির এই নিয়ম মানতে রাজী ছিলেন না। রবীন্দ্রনাথ দৃঢ়তার সাথে হঠাৎ ঘোষণা করলেন, পুণ্যাহ উৎসব এভাবে চলতে পারে না। পুণ্যাহ মিলনের দিন, পুণ্যাহ বিভেদ ভুলবার দিন। নায়েব গোমস্তারা চমকিত শঙ্কিত হলেন। কী ব্যাপার বাবুমশায় অসন্তুষ্ট কেন। সবিনয়ে জিজ্ঞাসা করতেই রবীন্দ্রনাথ জানালেন, পুণ্যাহের এই উৎসবে আসনের জাতিভেদ তিনি মানবেন না। বর্তমান ব্যবস্থার পরিবর্তন না ঘটলে তিনি পুণ্যাহ উৎসব করবেন না। চন্দনের তিলক দিয়ে বরণের পর রবীন্দ্রনাথের সিংহাসনে বসার কথা। কিন্তু তিনি বসলেন না। সদর নায়েবকে তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, ‘নায়ের মশায় পুণ্যাহ উৎসবে এমন পৃথক ব্যবস্থা কেন?’ বাবুমশায়ের প্রশ্নে বিস্মিত নায়েব জবাব দিলেন, ‘বরাবর এই নিয়মই চলে আসছে।’ রবীন্দ্রনাথ বললেন, না, শুভদিনে আর এসব চলবে না। সব ভিন্ন ভিন্ন আসন তুলে দিয়ে হিন্দু-মুসলমান, ব্রাহ্মণ চণ্ডাল সবাইকে একইভাবে, একই ধরনের আসনে বসতে হবে।

নায়েব মশায় প্রথার দাস। তিনি বললেন, দরবারের প্রাচীন রীতি বদলাবার অধিকার কারো নেই। রবীন্দ্রনাথ রুষ্ট হয়ে তৎক্ষণাৎ জানিয়ে দিলেন, নায়েবমশায় এ রাজ দরবার নয়; মিলনানুষ্ঠান। সব আসনের ফারাক তুলে দিতে হবে। সদর নায়েবের সেই একই জবাব, ‘অসম্ভব! নিয়ম ভাঙা চলবে না।’ অনুষ্ঠানে উপস্থিত সকলে স্তম্ভিত, বিস্মিত। নতুন বাবুমশায়ের হুকুমে সকলে চুপ, কারো মুখে টু শব্দটি নেই। সদর নায়েব রবীন্দ্রনাথকে অনুরোধ করলেন সিংহাসনে বসতে। কিন্তু তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দিলেন, আসনের জাতিভেদ দূর না হলে তিনি কিছুতেই বসবেন না, দরিদ্র প্রজার অপমান তিনি সহ্য করবেন না। তিনি সদর নায়েবকে চূড়ান্তভাবে জানিয়ে দিলেন, ‘প্রাচীন প্রথা আমি বুঝি না, সবার এক আসনে বসতে হবে। জমিদার হিসাবে এই আমার প্রথম হুকুম।’ জমিদারী সম্ভ্রম আর প্রাচীন প্রথায় বিশ্বাসী সদর নায়েব ও অন্যান্য হিন্দু আমলারা হঠাৎ ঘোষণা দিয়ে বসলেন, প্রথার পরিবর্তন ঘটালে তাঁরা একযোগে পদত্যাগ করবেন।

হিন্দু নায়েবদের এই আচরণে এ কথা স্পষ্ট হয়ে ওঠে, তাঁরা কতোটা কুসংস্কার আর ধর্মের নিয়মের বেড়াজালে বাঁধা ছিলেন। বুঝতে অসুবিধা হয় না, দরিদ্র নিম্নবর্ণকে কতোটা তাঁরা নীচু করে দেখতেন। আর মুসলমান কৃষকদের কীরকম অস্পৃশ্য ভাবতেন। বৃটিশ শাসনে প্রায় সারা বাংলার চিত্র এটা। মুসলমান কৃষকরা অনেক বেশি নিগৃহীত ছিলো শিক্ষিত হিন্দুদের দ্বারা। বৃটিশ শাসনে নায়েবরা জমিদারীতে অসম্ভব ক্ষমতাবান ছিলেন। জমিদারির কাগজপত্র তারাই বুঝতেন। নায়েবদের দিয়েই রবীন্দ্রনাথকে জমিদারী চালাতে হবে। ফলে নায়েবদের পদত্যাগ করার হুমকির মুখে রবীন্দ্রনাথকে হয়তো আপোষই করতে হবে মনে হয়েছিলো। সাধারণত যে-কোনো জমিদারই হয়তো তাই করতেন। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ অবিচলিত। তিনি উপস্থিত বিরাট প্রজামণ্ডলীকে উদ্দেশ্য করে বললেন, এই মিলন উৎসবে পরস্পরের ভেদ সৃষ্টি করে মধুর সম্পর্ক নষ্ট করে দেওয়া চলবে না। প্রিয় প্রজারা, তোমরা সব পৃথক আসন, পৃথক ব্যবস্থা সব সরিয়ে দিয়ে এক সঙ্গে বসো। আমিও তোমাদের সঙ্গেই বসবো। আমি তোমাদেরই লোক।

রবীন্দ্রনাথ যা করেছিলেন সেদিন সেটা কোনো ছোটখাটো কর্ম ছিলো না। বর্ণভেদ প্রথার উপর সেটা যেমন একটা কঠোর আক্রমণ ছিলো, একই সাথে মুসলমান কৃষকরাও যে ভূমিপুত্র এবং হিন্দু-কৃষকদের সমান মর্যাদা নিয়ে যে সমাজে বাঁচার অধিকার রাখে তা বুঝিয়ে দিলেন। রবীন্দ্রনাথের এই মনোভাব সেদিনকার দিনে তুলনাহীন। ভয়াবহভাবে অপমানিত নায়েব-গোমস্তারা দূরে দাঁড়িয়ে দেখলেন রবীন্দ্রনাথের আহ্বানে হিন্দু-মুসলমান প্রজারা প্রকাণ্ড মিলনায়তনে সব চাদর, সব চেয়ার সরিয়ে দিয়ে ঢালাফরাসের উপর বসে পড়লো। মাঝখানে বসলেন রবীন্দ্রনাথ। রবীন্দ্রনাথের সে এক অপরূপ দিব্যমূর্তি, ঘটনার অপূর্ব দৃশ্য। প্রজারা মুগ্ধ হয়ে দেখলেন তাঁদের নতুন বাবুমশায়কে। মিলন উৎসবে কারো মনে ব্যথা দেয়া অনুচিত। রবীন্দ্রনাথ তাই প্রজাদের বললেন, যাও, সদর নায়েব আর আমলাদের ডেকে আনো, সবাই একসঙ্গে বসে পুণ্যাহ উৎসব করি। রবীন্দ্রনাথ আমলাদের অনুরোধ করলেন, পদত্যাগপত্র প্রত্যাহার করতে। উৎসব শুরু হলো। দলে দলে আরো লোক এসে কাছারিবাড়িতে ভেঙে পড়লো। ঠাকুর-এস্টেটের পুণ্যাহ সভায় সেদিন থেকে শ্রেণীভেদের ব্যবস্থা উঠে গেল।

শিলাইদহে প্রথম জমিদারীর দিনে পুণ্যাহ উৎসবে রবীন্দ্রনাথ যে ঘটনাটি ঘটিয়েছিলেন, সেদিনের প্রেক্ষাপটে সেটা ছিলো খুবই সাহসী কাজ, জাতের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো। কিন্তু বহু রবীন্দ্রভক্তকে দেখতে পাই, যাঁরা নিজেদের প্রগতিশীল বলে দাবি করেন; তাঁদের কাছে মুসলমান মাত্রই ঘৃণ্য এবং জঙ্গী। স্বাধীনতাকামী মুসলমানরা পর্যন্ত তাঁদের কাছে অপরাধী। নির্যাতিত, শোষিত, নিষ্পেশিত স্বাধীনতাকামী মুসলমানদের উপর যদি সামরিক বাহিনীর কামান আর ট্যাঙ্ক চালিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে তারা উল্লসিত। নাৎসীরা যেভাবে ইহুদি নিধনে নেমেছিলো, এঁরা যেন নির্বিচারে মুসলমানদের নিশ্চিহ্ন করতে চায়। আর দাবি করে তাঁরা এক একটা মহৎ হৃদয়। বিবেকবান মানুষ কখনো, সাধারণ মানুষের উপর সামরিক বাহিনীর আগ্রাসনকে সমর্থন করে না। শাসক, বণিক আর তাদের দালাল ছাড়া পৃথিবীর কোথাও কখনো কোনো বিবেকবান মানুষরা এই ধরনের কাজকে সমর্থন দেয়নি।

বুঝলাম, মুসলমানরা অনেকে কট্টোর। কট্টোর পাওয়া যাবে না কোন ধর্মে? হিন্দু, খ্রিষ্টান, ইহুদি কোন ধর্মে কট্টোর মানুষ পাওয়া যাবে না? আবার কোন ধর্ম আছে যেখানে মহৎ মানুষ পাওয়া যাবে না? মানুষকে যাঁরা বিচার করতে শেখেনি, যাঁদের মানুষকে দেখার চোখ সৃষ্টি হয়নি, সকল সঙ্কটের তাঁরাই বড় কারণ, নিজেদের তাঁরা যতো প্রগতিশীল ভাবুক না কেন। সাম্প্রদায়িকতার তাঁরাই স্রষ্টা আর উস্কানীদাতা। আর কিছু না হোক, মহাভারতটা যদি তাঁরা ঠিকভাবে পাঠ করতেন, তাহলে দেখতে পেতেন সম্পূর্ণ খারাপ বা সম্পূর্ণ ভালো মানুষ বলে কিছু নেই। মানুষ তাঁর পরিবেশ আর ঘটনাবলীর শিকার। এটাই হচ্ছে ইতিহাসের শিক্ষা। নির্যাতিত মানুষরা যে লড়তে চাইবে সেটাও ইতিহাসের অনিবার্যতা। শোষিত মানুষের প্রতিটি লড়াই তার বাঁচার সংগ্রাম। জঙ্গী শব্দটা এসেছে জঙ্গম থেকে, যার অর্থ সংগ্রাম। বেঁচে থাকার লড়াই।

লেখক:
রাহমান চৌধুরী, লেখক, শিল্প সমালোচক
Raahman Chowdhury

*এই বিভাগে প্রকাশিত লেখার মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাঙালীয়ানার সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকা অস্বাভাবিক নয়। তাই এখানে প্রকাশিত লেখা বা লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা সংক্রান্ত আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় বাঙালীয়ানার নেই। – সম্পাদক

মন্তব্য করুন (Comments)

comments

Share.