ক্যাম্প
সেনাছাউনির মতো দেবদারু পাশে
গাঢ় ছায়া ঘিরে আছে। এখন মধ্যযাম
ফোঁটায় ফোঁটায় ওস পাহাড়ের নতমূলে
সাদাটে গাভীর গায়ে মাতাল হাওয়া
উবু হওয়া তাঁবুদের অন্দরে অন্দরে
হ্রেষা-কলরব, বল্লমের ধার,
বহুযুদ্ধ পার হয়ে ক্যাম্পে ঘুমায়।
খাদহীন ঘুমের মাঝেও
সব আলো এক হয়ে যায়,
মধ্যরাতের স্বাদ দুলে ওঠে বাইরে ভেতরে।
এইসব হিমমাখা ঘাস ছুঁয়ে ছুঁয়ে
তৃতীয় প্রহরে জাগে সকালের তৃষা–
আগাছার হেরে যাওয়া নক্ষত্রফুলের কাছে।
ঠিক এ হৃদয় ঝরে গেলে
সেনাদল চলে যায় গাঙের ওপারে।

অস্ফুট
চন্দ্রমা, ফিরে যাও আজ তুমি–
কালিন্দীর কালো জলে মুছে গেছে ছায়া
গভীর আঁধার শুধু মুখ ঢেকে
পথ চলে সময়ের সাথে।
ছিল না তো সঞ্চয়ের দিনে–
ইচ্ছে, আশা ছোটো ছোটো ক্ষণ–
ভেসে যায় শুধু
চেনা পথ তারার আলোয়।
যদি কোনোদিন আবার দাঁড়াই এসে
এসব অরণ্য পথে–
মেঠো জলে লেগে থাকা
ভরন্ত জলের ক্ষেতে
রিক্ত ঝিঁঝিঁ–
আদুরি পৃথিবী তবু
পিছু ডাকে কেন–
চলে যাবো বহু যুগ পরে
ডাইনে বাঁয়ে ধূ ধূ সীমানায়–
এক ঝাঁক রোদ তবু খেলা করে আমার জানালায়।

দ্বিধা
এলোমেলো চুলে ছিল দিনশেষ অনিশ্চয়
হেমলক স্বাদ
ক্লান্ত অরুণবাবু ডেকে বলেছিল
অসময়ে– এপথে কোথায়?
আদিম ব্যাঙের ডাকে কিছু পল কিছু অনুপল
পাশে ছিল– জেগে ছিল সেপথে সেদিন
নির্জনতার স্বাদ
ম্যাকেনা’স গোল্ড বুকে অস্ফুট ত্রাসের নীলে
ফুটেছিল আবছা আঁধার
নির্বিকার হয়ে গেছে দূর পৃথিবীর চাঁদ
এই অসময়ে কেউ কি বলবে ডেকে
কেমন আছে তোমার জামির বাগান?
বহুদিন পরে আজ এলে তুমি,
এপথে– কোথায়?

ক্যামেলিয়া
আজও বেঁচে আছি ক্যামেলিয়া, তোমারই জন্য,
লিখিনি কবিতা কোনোদিন
মাঝে মাঝে এক উৎকট ঘুণপোকা
মাথায় ঘুরপাক খায়,
আর ঠিক তখনই নীরব আকাশ বেয়ে
খোলা হ্রদে ঝরে পড়ে শব্দের ঝাঁক–
তোমার গ্রীবার আলো লিখে রাখে
আমাদের পূর্ব জন্মকথা।
কবিতা ফুটে উঠলে দূর দূর মেঠোপথে
কৃষ্ণ হরিণীর মতো ঝুঝকো আঁধার নামে
একা বক উড়ে যায়
আমার চোখের পাতা
লিখে রাখে রাত সমাচার।
একা বসে আছি,
জামরুল অরণ্যের মতো
আমাদের সংলাপ ক্ষয়ে ক্ষয়ে আসে,
একা বক ডানা মেলে উড়ে যায় অনন্ত অঘ্রানে
শেষবিন্দু জল শুধু আমাকে শুধায়
কোথা থেকে এলে, ঠিকানা রেখেছো কোনো?
আমার দুচোখে নেভে বাতি,
নক্ষত্র থেকে নক্ষত্রে ছোটে আদি সুর।
তবু জেগে আছি,
নিভেছে বিকেলের আলো–
সেইসব ঝরাপাতা, পর্ণমোচী বন
ফুটেছিল কবিতা যেখানে
শেষ নক্ষত্রের মতো মিশে গেছে তারা
লিখিনি কবিতা কোনোদিন
শব্দের নিঝুম দ্বীপে ভেসে ওঠে মুখ,
লিখছি সে ক্যামেলিয়া।
কবিতা লিখিনি কোনোদিন,
শুধু তার জন্ম আঁতুড়ঘরে
লিখেছি সে এক নাম
ক্যামেলিয়া–

কালিন্দী তোমাকে
আঁধার ছুঁয়ে ছুঁয়ে চিনেছি তোমায়–
দুরন্ত গতিতে ছুটে চলে জীবনের মেল ট্রেন
পিছু হটে ক্ষয়া চাঁদ, আলো আঁধারির ঝোপঝাপ,
ছোটো ছোটো প্ল্যাটফর্ম দ্রুত যায় স’রে;
মাঝে ত্রিশঙ্কুর আমি।
তবু কোনদিন যদি
দাঁড়াই তোমারই পাশে খোলা আঙিনায়–
মুঠিভরা সজনেফুল দিও ছড়িয়ে রাতের গভীরে
কালোয় আলোর মতো
তারা হয়ে সংবদ্ধ আলাপে
মুষ্টিবদ্ধ হাত থেকে খসে পড়া ইচ্ছেরাশি
ঝুরু ঝুরু ঝরে পড়ে
ইরানি বালিকা বুঝি হারিয়েছে পথ
সুদূর সে কোন মরুদেশে ঘুরে ঘুরে ফিরে যায়
বিষণ্ণ হেমলক
আবার কখনো কোন আবির সকালে
ঝিলিমিলি কালিন্দীর জলে
লক্ষমানিক জ্বলে,
আমিও তাদের মতো
হেসে উঠে, চোখ চেয়ে দেখি
কী অকারণ আয়াস তোমার
আলো জ্বালাবার।

ভ্রম
প্রতিটি বৃত্তের মাঝে জন্ম নেয় অন্য পৃথিবী
অনন্ত এ বিকেলের ক্যালিগ্রাফি,
জেনে নিয়ে লিপি কুশলতা
একফালি রোদ স্রোতে ভেসে যায়
আমার কার্নিশে,
হে মোহময় বিষাদ, জন্ম দাও বিদর্ভ নগরী
আরো একবার
তীব্র হেমলক নেশা
ছুঁয়ে যাক ভূর্জপত্র পাইনের বন
ঝলমলে তীব্র বাতাস
একফালি গম্বুজের বাঁকা চাঁদ হয়ে
নিরম্বু ঝুলে থাক আজ।
এ বিষাদফাগুন
কাজরী নদীর তীরে বড়ো মায়াময়
দূর থেকে দেখি তবু কারা যেন
ভেসে যায়
অবোধতরণী বেয়ে,
এসো এসো বন জ্যোৎস্নার মতো
দগ্ধ সলিল ধারা
ধুয়ে দাও প্রাচীন আঁধার।
মাতাল হাওয়ার কারুকাজ
জন্ম দেয় পরাবৃত্ত যতো
আদিম আকাশে।
ঘষা আলো নক্ষত্রের নেমে আসে সগর্জনে
হিরণ্ময় দেশে,
শ্রাবণ অপরাহ্নে আমি একা
চেয়ে নিই মরু আলো মেঘে
আরও একটি গোলবৃত্ত
গন্তব্যহীন পরিবর্তিত পথে।

ভিসুভিয়াস
নক্ষত্রফুলের মতো ঝ’রে পড়ে স্নিগ্ধ কুয়াশা
বিষাদের খোলা খামে দগ্ধ শব্দের দল
ভিসুভিয়াস ঠাঁই নেয় শ্রাবণের নীলাভ বিকেলে
চোখ খোলো আরো একবার, বৃষ্টি হয়নি বহুকাল।
তবুও সে শালবন, একফালি চাঁদ
সৈন্ধব লবণের স্বাদে–
ঘসা কাচে ফিরে ফিরে যায়,
পাতায় পাতায় লেখা বিকেলের রোদ।
হলুদ রঙের প্রেম ঠাঁই নিলে ঘুমন্ত বাতাসে
এক আলোপাখি থিতু হয়
অস্পষ্ট ঠিকানা লেখা খোলা খামে
অক্ষরেরা উড়ে যায়
ছায়ায় ছায়ায় জমে অবরুদ্ধ ধূন।
উত্তমাশা অন্তরীপে স্বপ্নের ভেজা মেঘ ভেসে গেছে বহুদিন হলো
ময়নামতির ক্ষেতে অযথা ফাগুন
ধূপছায়া বিকেলের সাথে জ্বলে জ্বলে নিভে গেলে
লোহিত অস্তরাগ,
সানশেডে জমা হয় ভাবনার দল,
শ্রাবণ বাতাস এলোমেলো–
এখানে ট্রাফিক শেডে
আমার শীতের দিন।

পরিত্যক্ত
বিরসা মুন্ডা স্টেশনের গায়ে নির্জনতা থেমে গেছে
আদিম রাক্ষসদাঁত ভাঙ্গা প্লাটফর্মে
এখানে কি কোনোদিন এসেছিল কেউ?
শালবন নীচু হয়ে আঁধার কুড়ায়
এখানের মেহফিলে ঝমঝম মেইলট্রেইন
থেমেছিল কোনো একদিন
বিপজ্জনক ঢালুপথে ক্ষুব্ধ শ্বাপদদল নীরবে দাঁড়ায়
ঈশ্বরী নক্ষত্র সব ফিরে গেছে বহুচাঁদ পরে
এখানে সম্ভাব্য রাতে
থকথকে ভেজা জোৎস্নায়
ছায়া ছায়া মানুষের দল
হেঁটে গেছে মৃত বালুচরে।

এসো ক্যামেলিয়া
হাকুসাই চাঁদ একফালি
উঠেছে আবার,
বনঝাউ মাথা পেতে আছে,
কতদিন দাঁড়িয়েছি এইসব পাতলা জ্যোৎস্নায়
ছড়ানো ছিটানো যতো বুনোহাঁস
সমুদ্র জ্যোৎস্নার সাথে ধুয়ে ফেলি,
এক পা এক পা করে চলে যায়
গুঁড়ো চাঁদ,
কোনোদিন বলেছি কি কথা
ওদের সাথে–
হরিণশাবকদল ছুটে যায়
নির্লিপ্ত আলোর মতো
পাহাড়ের খাঁজে,
আশা জাগে, মুছে যায়
আজও যেন রাত জেগে চলে গেছে
গেঁয়ো হাটুরের দল,
এসো ক্যামেলিয়া,
পৌষপাবনের শেষে আবার জাগবে তুষু
উলুধান খেলা করা
মাঠে প্রান্তরে।

লেখক:
জয়শ্রী গাঙ্গুলি
কবি, গল্পকার ও অনুবাদক; কলকাতা