জায়ান্ট বিশ্বকাপ ও লিলিপুট বিশ্বজন

Comments

। লুৎফুল হোসেন ।

ফুটবল বিশ্বকাপের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি, ৪৮টি, দেশের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত হচ্ছে ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬। স্বাগতিকের তালিকায়ও আছে এবার সর্বাধিক তিন দেশ। ৯৬ বছর আগে শুরু হওয়া এই বৈশ্বিক উদযাপন উন্মাদনার ২৩তম আসর, এবারের বিশ্বকাপ চূড়ান্ত পর্বে অনুষ্ঠিত হচ্ছে সর্বাধিক ১০৪ টি খেলা (ম্যাচ)। স্বাগতিক দেশের সংখ্যা তিন হলেও ১০৪ ম্যাচের ৭৮টিই অনুষ্ঠিত হচ্ছে আমেরিকার এগারো শহরে। সহ-স্বাগতিক বাকি দুই দেশে, মেক্সিকোর তিনটি এবং কানাডার দুটি মিলিয়ে মোট পাঁচটি শহরে, অনুষ্ঠিত হচ্ছে মাত্র ১৩টি করে মোট ২৬টি খেলা।

মাঠের খেলা ফুটবল হলেও ফিফা ছাড়া আয়োজনের মূল খেলিয়েরা (স্পন্সর) হলো এডিডাস, আরামকো, কোকা-কোলা, হুন্দাই/কিয়া, লেনোভো, কাতার এয়ারওয়েজ ও ভিসা। প্রথম বৃত্তের এই পৃষ্ঠপোষকরা প্রত্যেকে ১৫০ থেকে ২০০ মিলিয়ন বা তারও বেশি মার্কিন ডলার দেবে ফিফাকে, বিনিময়ে পাবে বিশ্বব্যাপী ফিফার সকল আয়োজনে প্রচারণা। দ্বিতীয় ও তৃতীয় বৃত্তের এলাকাভিত্তিক পৃষ্ঠপোষকরা চুক্তি অনুযায়ী দেবে ৩৫ থেকে ১০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার করে, বিনিময়ে পাবে এলাকাভিত্তিক আয়োজনসমূহে প্রচারণা বা সম্প্রচারসত্ত্ব কিংবা প্রচারণা অধিকার।

এবারের বিশ্বকাপের প্রাক্কলিত পরিচালন ব্যয় ৩.৭৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এর মধ্যে ৮৭১ মিলিয়ন ব্যয় হচ্ছে অংশগ্রহণকারী ৪৮ দলের জন্য পুরষ্কারে, যার মধ্যে ৫০ মিলিয়ন ডলার পুরষ্কার বরাদ্দ বিশ্বকাপজয়ী দলের জন্য। ষোলো শহরে ফিফার খেলা পরিচালনা ব্যয় ১.১২ বিলিয়ন ডলার, অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর থাকা-খাওয়া ও পরিবহন ব্যয় ৮১৩ মিলিয়ন ডলার। বিপরীতে ফিফার প্রাক্কলিত বানিজ্যিক আয় আনুমানিক ১০.৯ বিলিয়ন ডলার। এছাড়া ফিফার প্রাক্কলিত ব্যয়ের বাইরে তিন স্বাগতিক দেশের আয়োজন ও প্রস্তুতি ব্যয় ৮ বিলিয়ন ডলার। এর বিপরীতে তাদের আয়ের সূত্র বিবিধ, আর তার হিসাবও বিস্তর আলাপের বিষয়।

শুরু থেকে নানান অভাবনীয় কাণ্ড বিশ্বজনে নাড়া দিলেও প্রচারমাধ্যমে এবং কর্তামণ্ডলীর মাঝে তার উত্তাপ যৎসামান্য। ভিসা কড়াকড়ি, বিমানবন্দর থেকে ফিরিয়ে দেয়া, কোনো দলের খেলা থাকলেও মার্কিন মুলুকে কেবলমাত্র খেলার দিন প্রবেশ করে খেলা শেষে মাঠ থেকেই সোজা অন্য দেশের ডেরায় ফিরে যাওয়া — এমন নজির মিললো এবারই প্রথম। এরকম নির্দয় সিদ্ধান্তের বিপরীতে কোনো উচ্চবাচ্য নেই কোথাও। কর্তার ইচ্ছায় কর্ম, স্বতঃসিদ্ধ; এমনকি বাদ সাধছে না কোনো মানবাধিকার ও বিবেক সংস্থা বা প্রচারমাধ্যমও।

আয়োজক ও পৃষ্ঠপোষকদের স্বার্থ বিবেচনা যৌক্তিক, তবে তা খেলোয়াড়ি মানসিকতা ও নিরপেক্ষতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করবে হামেশা — এমনটা অনাকাঙ্ক্ষিত। তথাপি ঘটে চলেছে নিয়মিতভাবে। খেলার গতি ত্বরান্বিত করতে, আরো আক্রমণাত্মক করতে, গোলসংখ্যা বাড়াতে ভূমিকা রাখবে এমন যুক্তি ও আশাবাদে থ্রো-ইন, গোল কিক, ফ্রি কিক, কর্ণার এবং ভিএআর প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়ে এবার আরোপ করা হয় নতুন কিছু নিয়ম। এর সুবিধার্থে বলে যুক্ত হয় মাইক্রোচিপ। তবে ভিএআর প্রযুক্তির প্রয়োগ খেলায় কাঙ্ক্ষিত সুবিধা ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করার বদলে নৈমিত্তিক ভাবে সৃষ্টি করছে বিতর্ক।

শুরু থেকে এবারের বিশ্বকাপ পূর্বের বিশ্বকাপগুলোর তুলনায় বিশ্বব্যাপী ফুটবল উত্তেজনা-উন্মাদনা তৈরি করাতেও পিছিয়ে ছিল। তবু ফুটবল প্রেমীদের বৃহদাংশ গত দুই দশকের সেরা কিছু ফুটবল তারকার শেষ বিশ্বকাপ ঘিরে শেষবার তাদের ফুটবল জাদু দেখার জন্য উদগ্রীব হয়ে ছিল। ফলাফল যা-ই হোক; নন্দিত ফুটবল বিশ্ব-তারকা মেসি, রোনালদো, মদ্রিচ, নেইমার, হ্যারি কেইন, সালাহ, হাকিমি, নয়ার, কর্তোয়া — যারা প্রায় নিশ্চিতভাবে এবারই শেষ বিশ্বকাপ খেলছে; এদের পাশাপাশি এমবাপে, হালান্ড, ভিনিসিয়াস, ইয়ামাল, দেম্বেলে, গ্রিজম্যান, ডি-ব্রুইনা, আলভারেজ, ভালভার্দে, জামাল এদের খেলা দেখার জন্য উদগ্রীব হয়ে ছিল গোটা বিশ্ব। সেই উদগ্রীব আকাঙ্ক্ষা কাউকে ঘিরে মিটছে, কাউকে ঘিরে অপূর্ণ থাকছে। এমনটাই হবার, তবু আক্ষেপ তৈরি হচ্ছে নানান বিতর্কিত সিদ্ধান্ত ঘিরে। তবে আকাঙ্ক্ষা তালিকায় না থাকা অনেক খেলোয়াড় ও অনেক দল ফুটবল প্রেমীদের উপহার দিচ্ছে দুর্দান্ত সব পারফরম্যান্স।

গোড়া থেকে নাক উঁচু মিডিয়া ও বাঘা ব্যক্তিরা বলছিল এতগুলো নতুন দুর্বল দল বিশ্বকাপে খেলতে এনে খেলার মানটাই নষ্ট করছে ফিফা। আঙুল ছিল আফ্রিকার দেশগুলোর দিকে। তাদের এই চোখা সমালোচনা ভোঁতা করে দিয়ে দুর্দান্ত সব খেলা উপহার দিচ্ছে এশিয়ান কয়টি এবং আফ্রিকান অনেকগুলো দেশ। প্রথম রাউন্ডের খেলাগুলোয় অনুমিত এইসব দুর্বল দলের কাছে ধরাশায়ী হয়েছে জায়ান্ট জায়ান্ট ফুটবল দল। তথাপি বিতর্কিত কিছু সিদ্ধান্তের কারণে নির্মম ভাগ্যও বরণ করতে হয়েছে চমক দেখানো খেলা উপহার দেয়া কোনো কোনো দলকে।

নকআউট পর্বের প্রথম ধাপে, রাউন্ড অব থার্টি-টু পর্বে ফিরে যেতে হয়েছে জার্মানি, নেদারল্যান্ডস, ক্রোয়েশিয়া, সুইডেন, সেনেগাল, ঘানার মতো দলকে। এই যাওয়া কাউকে না কাউকে যেতে হতোই। শুধু টাইব্রেকারে হেরে বিদায় নেয়াটা বেশি হৃদয়বিদারক। এর চেয়ে হৃদয়বিদারক হয়েছে ভুল সিদ্ধান্তের বলি হয়ে বিদায় নেয়া দলগুলোর নিয়তি। এ বিষয়ে বেশি কচলে তেতো না করে ফুটবলবোদ্ধা সবার কাছে প্রিয় খেলোয়াড় লুকা মদ্রিচের কিছু উক্তিই এবারের বিশ্বকাপের চেহারা মেলে ধরে।

বিশ্বকাপে তার শেষ ম্যাচ শেষে লুকা যা বলেছেন সেই কথাগুলোই তুলে ধরা যাক সোজাসুজি। লুকা বলেছেন, “যদি পরিস্থিতি উল্টো হতো, তাহলে ভিএআর কখনও হস্তক্ষেপ করতো না।” তার কথার মধ্যে সবচেয়ে দুর্দান্ত যেটা তিনি বলেছেন, “আমরা এটাকে অজুহাত বানাতে চাই না।” তার সোজাসাপটা কথায় তিনি অনেকগুলো প্রসঙ্গ এনেছেন। কয়েকটা ঘটনায় ভিএআর ব্যবহারের প্রশ্নে বলেছেন, “ভিএআর তখনই হস্তক্ষেপ করা উচিত যখন ভুলটি ২০০ শতাংশ নিশ্চিত। কিন্তু বাস্তবে সেটি বেছে বেছে ব্যবহার করা হচ্ছে।” সবচেয়ে মর্মান্তিক তার শেষ কথাগুলো। লুকা বলেছেন, “এই সিদ্ধান্তগুলো মানুষের ভাগ্য বদলে দেয়। বছরের পর বছর যে ত্যাগ, পরিশ্রম আর স্বপ্ন নিয়ে একজন ফুটবলার বাঁচে, একটি সিদ্ধান্তেই সব শেষ হয়ে যেতে পারে।” ফুটবল ইতিহাসে ভুল নতুন কিছু নয়, কিন্তু সেই ভুলকে নির্ভুলের দিকে ধাবিত করার জন্য যে প্রযুক্তি, সেই প্রযুক্তিই যদি বিতর্কের কেন্দ্রে চলে আসে, তাহলে ফুটবল আসলে কতখানি বেঁচে থাকে!

ভালোমন্দ যত কিছুই ঘটুক, এবারের বিশ্বকাপের যে দলটিকে মানুষ হৃদয়ে স্থান দিয়েছে, তার নাম কেপ ভার্দে। এই ছোট্ট দেশটার গোলরক্ষক ভোজিনহা বিশ্বকাপ ২০২৬ এর সেরা আবিষ্কার, শ্রেষ্ঠ প্রাপ্তি। তার অসাধারণ নৈপুণ্য মুগ্ধ করেছে গোটা ফুটবল বিশ্বকে। তাদের ফুটবল কৌশল, অকুতোভয় প্রতিরক্ষা ও নজরকাড়া আক্রমণ সমূহ প্রশংসার দাবিদার। কেপ ভার্দের তরুণ খেলোয়াড় লোপেস কাব্রাল যে দুর্দান্ত গোলটি দিয়েছে খেলার ১০৩ মিনিটে, তা অভাবনীয়! তাদের রক্ষণভাগের লোপেস, আক্রমণ ভাগের দুয়ার্তে দুর্দান্ত। গ্রুপ পর্বে অপরাজিত থাকা দলটি অজেয় থেকেছে স্পেন ও উরুগুয়ের মতো শক্তিশালী দলের বিপক্ষেও।

এমন অভাবনীয় প্রাপ্তিগুলো সব বিতর্ক, সব সমালোচনা ঢেকে দিয়ে এই বিশ্বকাপের দুর্দান্ত স্মৃতি নির্মাণে সময়ের বুকে যে উজ্জ্বল আঁচড় কেটেছে-কাটছে, সেটাই আলোকিত করবে আগামীর বিশ্ব-ফুটবলকে। এটাই আশাবাদ। আর শেষ আশা বিদায়ী সব তারকা ফুটবলাররাই দারুণ কিছু শেষ উপহার দিয়ে শেষ করুক এবারের বিশ্বকাপ, তাদের শেষ বিশ্বকাপ। দিনশেষে জায়ান্ট বিশ্বকাপ থেকে বিশ্বজনেরা সঞ্চয়ে রাখতে পারুক নিখাদ কিছু ফুটবল বিস্ময়-স্মৃতি।

০৪ জুলাই ২০২৬

লেখক:
Lutful Hossain03
লুৎফুল হোসেন
কবি, গল্পকার ও প্রাবন্ধিক, সাহিত্য সম্পাদক, বাঙালীয়ানা, ঢাকা

মন্তব্য করুন (Comments)

comments

Share.

About Author

বাঙালীয়ানা স্টাফ করসপন্ডেন্ট