যদি আমরা একমত হতে না পারি, আমরা যেন অন্তত ভিন্নমত পোষণ করার ব্যাপারে সহমত হতে পারি।
– মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ
জিন্নাহ উনিশশো আটাশ সালের ডিসেম্বর মাসে ভারতের সংবিধান প্রণয়নের লক্ষ্যে আহূত সর্বদলীয় সম্মেলনে উপরের বাক্যটি উচ্চারণ করেছিলেন। জিন্নাহ সেদিন হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের জন্য সংখ্যালঘু মুসলমানদের পক্ষে কংগ্রেস, হিন্দু মহাসভা এবং অন্যদের সামনে বক্তব্য রাখছিলেন যাতে পশ্চাদপদ সংখ্যালঘু মুসলমানদের জন্য কেন্দ্রে এবং প্রাদেশিক পরিষদে আসন সংরক্ষণ করা হয়। ইতিপূর্বে দিল্লিতে অনুষ্ঠিত মুসলিম লীগ সহ সর্বভারতীয় মুসলিম সম্মেলনে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষার জন্য ‘দিল্লি মুসলিম প্রস্তাব’ নামে যেসকল প্রস্তাব নেয়া হয়েছিলো, যা কংগ্রেস মেনে নেয় এবং কংগ্রেসের দু-দুটো অধিবেশনে অনুমোদন করা হয়। কিন্তু হিন্দু মহাসভার চাপে নতি স্বীকার করে কংগ্রেস যা আর শেষ পর্যন্ত মানতে রাজি ছিলো না। মূল কথা হলো, পূর্বের দেয়া প্রতিশ্রুতি পালন করতে কংগ্রেস রাজি হয়নি। বরং হিন্দু মহাসভার জয়াকর জিন্নাহকে যা বলেন তার অর্থ হলো, আপনি আগের প্রতিশ্রুতির কথা ভুলে গিয়ে আমাদের বর্তমান প্রস্তাবে সারা দিতে আপনার মুসলিম লীগকে রাজি করান। তখন জিন্নাহ যে কথাগুলি বলেন তার একটি বাক্য উপরে উল্লেখিত হয়েছে।
জিন্নাহকে গোখলে এবং সরোজিনি নাইডু বলেছিলেন হিন্দু মুসলিম মিলনের অগ্রদূত। জিন্নাহ ভারতের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষার স্বার্থে সম্মেলনে প্রতিনিধিদের কাছে ব্যাকুল মিনতি জানিয়ে বললেন, ‘আমরা যা চাই তা হলো, আমাদের লক্ষ্য সাধিত না হওয়া পর্যন্ত হিন্দু ও মুসলমানেরা সম্মিলিতভাবে পথ চলবে। সুতরাং দেখা জরুরি যে আপনারা কেবল মুসলিম লীগকেই সঙ্গে পাননি, ভারতবর্ষের সকল মুসলমানদেরকেও সহযোগীরূপে পেয়েছেন। আমি মুসলমান হিসেবে এ কথা বলছি না, বলছি একজন ভারতবাসী হিসেবে। আর আমি এটা দেখতে চাই যে, স্বাধীনতা সংগ্রামে আমাদের সঙ্গে সাত কোটি মুসলমান যেন সমান তালে পা ফেলে চলেন। আপনারা কি সামান্য কয়েকজনের সহযোগিতাতেই সন্তুষ্ট হবেন? আপনারা কি আমার এ জাতীয় কথা শুনে সন্তুষ্ট হতে পারেন যে কেবল আমি আপনাদের সঙ্গে আছি? ভারতবর্ষের সকল মুসলমান আপনাদের সঙ্গে চলুক সেটা কি আপনারা চান না? শিখ, খ্রিষ্টান, পার্শি সম্প্রদায় কাউকে বিন্দুমাত্র অসম্মান না করে আমি বলতে চাই যে, আপনাদের এ কথা মনে রাখতে হবে যে, ভারতবর্ষের দুটি প্রধান সম্প্রদায় হলো হিন্দু এবং মুসলমান। তাই এই দুই সম্প্রদায়কে পরস্পরের প্রতি সদ্ভাবসম্পন্ন ও ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। তাঁদের বুঝতে হবে যে তাঁদের মধ্যে কোনো স্বার্থের সংঘাত নেই এবং তাঁরা এক সার্বজনীন মঙ্গল অভিমুখে সম্মিলিতভাবে পদযাত্রা করে এগিয়ে চলেছেন।’
পৃথিবীর একাধিক দেশের সংবিধানের নজির উল্লেখ করে তিনি বলেন যে, সংখ্যালঘুরা সর্বদা সংখ্যাগুরুদের আতঙ্কে দিনযাপন করে। ধর্মীয় সংখ্যাগুরুরা তাঁর মতে সচরাচর নিপীড়ক ও অত্যাচারী হয়। সুতরাং সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা দাবি করার অধিকার সর্বদাই আছে। তিনি অতঃপর আরো বললেন, ‘এসব বড় বড় প্রশ্ন, যার সমাধান করতে হলে উচ্চকোটির রাষ্ট্রনায়ক সুলভ মানসিকতা ও রাজনৈতিক প্রজ্ঞার প্রয়োজন। আবার আমি তাই আপনাদের অনুরোধ জানাচ্ছি যে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবার পূর্বে আপনারা এ ব্যাপারে ভালো করে খুঁটিয়ে বিচার করুন। আমি যা বলেছি তাতে কোনো পক্ষকে কোনো রকম শাসানী দেওয়া হয়েছে বলে যেন দয়া করে মনে করবেন না এবং আমি আশা করি যে আমাকে ভুল বোঝা হবে না। আজ যদি আপনারা এ প্রশ্নের সমাধান না করেন, তবে আগামীকাল তা করতে হবে এবং ইতিমধ্যেই আমাদের জাতীয় স্বার্থ ব্যাহত হবে। আমরা সবাই এই দেশের সন্তান। আমাদের সম্মিলিতভাবে থাকতে হবে, মিলেমিশে কাজ করতে হবে। আমাদের মধ্যে যে বিষয়ে মতভেদ থাকুক না কেন, আমরা যেন তার অধিকন্তু আর পারস্পরিক দ্বেষ সৃষ্টি না করি। যদি আমরা একমত হতে না পারি, আমরা যেন অন্তত ভিন্নমত পোষণ করার ব্যাপারে সহমত হতে পারি এবং যেন বন্ধু হিসেবে থেকে যেতে পারি। আমার কথা বিশ্বাস করুন যে, হিন্দু-মুসলমানরা মিলিত হতে না পারলে ভারতবর্ষের অগ্রগতি হবে না। হিন্দু মুসলমানের মধ্যে তাই একটা নিষ্পত্তি করার ব্যাপারে কোনো রকম যুক্তি-তর্ক-দর্শন অথবা বাদ-বিবাদ যেন বাধা হয়ে না দাঁড়ায়।’
জিন্নাহ তার সাত আট বছর আগে কংগ্রেস ছেড়েছেন, যখন গান্ধী খিলাফত নামক ধর্মীয় আন্দোলন শুরু করেন। জিন্নাহ কট্টোর ধার্মিকদের কংগ্রেস বা মুসলিম লীগের রাজনীতিতে টেনে আনতে চাননি। কংগ্রেসের সঙ্গে গান্ধী যুক্ত হন উনিশশো পনেরো সালের পরে। গান্ধী তখনো কংগ্রেসের উল্লেখযোগ্য কেউ নন। জিন্নাহ তখন কংগ্রেসের রাজনীতিতে প্রায় বারো বছর পার করে দিয়েছেন এবং তিনি প্রথম সারির সবচেয়ে আলোচিত নেতাদের একজন। রাউলাট বিলের বিরুদ্ধে আন্দোলনকে ঘিরে গান্ধী উনিশশো উনিশ সালে জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। তিনি তারপর মুসলমানদের মধ্যে নিজের প্রভাব বিস্তারের জন্য খিলাফত নামক ধর্মীয় আন্দোলন শুরু করেন, যা জিন্নাহ সমথর্ন করতে পারেননি। কিন্তু ধর্মীয় উন্মাদনায় মুসলমানরা তখন গান্ধীর জয়ধ্বনি দিচ্ছে। গান্ধী আবার হিন্দুদের খুশি করবার জন্য, খিলাফত আন্দোলনে হিন্দুদের টেনে আনবার জন্যে মুসলমানদের কাছ থেকে শর্ত আদায় করে নিলেন তারা গো হত্যা করবে না। হিন্দুদের খিলাফত আন্দোলনে সঙ্গে পেতে কট্টোর মুসলমান ধার্মিকরা তা মেনে নিল। ভারতে গান্ধীর রাজনীতির অন্যতম দিক ছিলো রাম রাজত্ব প্রতিষ্ঠা আর গো মাতাকে রক্ষা। জিন্নাহ এসব আবেগে ভেসে বেড়াতে পছন্দ করেননি। মতিলাল নেহরু, চিত্তরঞ্জন দাশ, বিপানচন্দ্র প্রমুখ প্রথম গান্ধীর এসব কাজের বিরুদ্ধে ছিলেন। পরে গান্ধীর জনপ্রিয়তা দেখে পিছু হটলেন। জিন্নাহ কিন্তু ধর্মীয় উন্মাদনার কাছে মাথা নত করলেন না। সকলকে সতর্ক করে দিয়ে বললেন ভবিষ্যতে এর পরিণতি খারাপ হবে। জিন্নাহর কথা কেউ পাত্তা দিল না। জিন্নাহ অপমানিত হয়ে কংগ্রেস ছাড়লেন। জিন্নার বানী সত্যে পরিণত হলো। খিলাফত আন্দোলনকে ঘিরে স্বল্প সময়ের মধ্যে শুরু হলো হিন্দু মুসলিম দাঙ্গা। অথচ জিন্নাহ চাইতেন ইংরেজদের বিরুদ্ধে লড়বার জন্য হিন্দু মুসলমানের ঐক্য।
** এবিষয়ে লেখকের একটি দীর্ঘ বিস্তারিত লেখা থেকে সারসংক্ষেপ এখানে দেয়া হয়েছে। – সম্পাদক
লেখক পরিচিতি:
রাহমান চৌধুরী, লেখক, শিল্প সমালোচক

*এই লেখার মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাঙালীয়ানার সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকা অস্বাভাবিক নয়। তাই এখানে প্রকাশিত লেখা বা লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা সংক্রান্ত আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় বাঙালীয়ানার নেই।
রাহমান চৌধুরী, লেখক, শিল্প সমালোচক

*এই লেখার মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাঙালীয়ানার সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকা অস্বাভাবিক নয়। তাই এখানে প্রকাশিত লেখা বা লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা সংক্রান্ত আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় বাঙালীয়ানার নেই।