জ্ঞানতাপস ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ: প্রজন্মকথা । শান্তা মারিয়া

Comments

আমি ছোটবেলায় মনে করতাম ‘ডক্টর’ শব্দটি বোধহয় দাদার নামেরই অংশ। সত্যি সত্যি, মুহম্মদ শহীদুল্লাহর নামের সঙ্গে ডক্টর শব্দটি যেন জুড়ে গেছে। ঠিক একইভাবে তাঁর নামের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে বাংলা ভাষা ও ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস। তাঁর সম্পর্কে অজস্র গল্প, কাহিনি। সেসবের ভিড়ে অনেক সময় হারিয়ে যায় আসল মানুষটির অবদান, তাঁর গভীর মনীষার কথা। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম অনেক সময় জানেই না কে ছিলেন তিনি, আমাদের জাতীয় মুক্তি আন্দোলনে কী ছিল তাঁর ভূমিকা।

মুহম্মদ শহীদুল্লাহ দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম শ্রেষ্ঠ ভাষাবিদ ছিলেন। তিনি ১৮টি ভাষা নিয়ে গবেষণা করেছিলেন (এই ভাষাগুলোতে তিনি রীতিমতো পণ্ডিত ছিলেন), ২৭টি ভাষায় পারদর্শী ছিলেন (তার মানে ২৭টি ভাষায় কথা বলতে, পড়তে, লিখতে জানতেন) এবং ৪০টি ভাষা সম্পর্কে তাঁর পড়াশোনা ছিল। তিনি সংস্কৃত, প্রাচীন পাহ্লবী, আরবী, হিব্রু, খোতনি, তিব্বতি, পালি ইত্যাদি ভাষা নিয়ে গবেষণা করেছিলেন। তিনি বাংলা ভাষার উৎপত্তি নিয়ে এবং চর্যাপদ নিয়ে মূল গবেষণা করেছিলেন। তাঁর মতে বাংলাভাষার উৎপত্তি হলো গৌড়ীয় বা মাগধী প্রাকৃত থেকে। বাংলা ভাষা সংস্কৃতের কন্যা নয়, তবে নিকট আত্মীয়। তিনি মনে করেন- বাংলা ভাষার উৎপত্তি কাল সপ্তম শতাব্দী। তাঁর পাণ্ডিত্যের মূল বিষয় ছিল তুলনামূলক ভাষাতত্ত্ব। আঞ্চলিক ভাষার অভিধান, বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস, বাঙ্গালা ভাষার ইতিবৃত্ত ইত্যাদি তার অমর অবদান। তিনি উর্দু অভিধানও প্রণয়ন করেছেন এবং শ্রীলংকার ভাষার উৎপত্তিও নির্ধারণ করেছেন।

তিনি ১৮টি ভাষায় সুপণ্ডিত হলেও গভীরভাবে ভালোবাসতেন বাংলাভাষাকে। বাংলাভাষাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে তিনি পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্মলগ্ন থেকেই ছিলেন সোচ্চার। তিনি ১৯৪৭ সাল থেকেই এ বিষয়ে তীব্র দাবি উত্থাপন করছিলেন বিভিন্ন প্রবন্ধে ও ভাষণে। তিনি বলেছিলেন, পূর্ব পাকিস্তানে রাষ্ট্রভাষা বাংলা না হয়ে উর্দু বা আরবী হলে তা হবে গণহত্যার শামিল। তিনি পাকিস্তান সরকারের সকল প্রকার ভয়ভীতিকে উপেক্ষা করে বাংলা ভাষার পক্ষে তার সংগ্রাম চালিয়ে যান।  তিনি ভাষা আন্দোলনকারী ছাত্রনেতাদের জন্য ছিলেন প্রধান প্রেরণা। একুশে ফেব্রুয়ারি হত্যাকাণ্ডের পর তিনি প্রথম কালো ব্যাজ ধারণ করেন। তাঁর দুই পুত্র মুহম্মদ তকীয়ূল্লাহ (আমার বাবা) ও মুর্তজা বশীর দুজনেই ভাষা সৈনিক ছিলেন। কমরেড মুহম্মদ তকীয়ূল্লাহ ছিলেন ১৯৪৮ সালের ভাষা আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক ও কর্মী। আর মুর্তজা বশীর ছিলেন ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের (তকীয়ূল্লাহ তখন জেলখানায় রাজবন্দি ছিলেন) অন্যতম প্রধান কর্মী।

মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ছিলেন একইসঙ্গে অসাম্প্রদায়িক চেতনার মানুষ এবং ব্যক্তি জীবনে নিষ্ঠাবান ধার্মিক। তিনি বলেছিলেন ‘হিন্দু মুসলমান মিলিত বাঙালি জাতি গড়িয়া তুলিতে বহু অন্তরায় আছে কিন্তু তাহা যে করিতেই হইবে।’ তার আশা ছিল ভবিষ্যতে হিন্দু মুসলমান বৌদ্ধ খ্রিস্টান মিলিত বাঙালি জাতি বিশ্বসভায় ফরাসি, জার্মান জাতির মতো আপন সম্মানজনক স্থান অধিকার করবে। ‘আশা কানে কানে গুঞ্জন করিয়া বলে পারিবে’।

আরও বলেছিলেন, আমরা হিন্দু বা মুসলমান যেমন সত্য তার চেয়ে বেশি সত্য আমরা বাঙালি। মা প্রকৃতি নিজের হাতে আমাদের চেহারা ও ভাষায় বাঙালীত্বের এমন ছাপ এঁকে দিয়েছেন যে মালা তিলক টিকিতে বা টুপি লুঙ্গি দাঁড়িতে তা ঢাকবার জো নেই’।

১৯৫০ সালের যখন পাকিস্তান সরকারের মদদে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হয় তখন তিনি নিজের বাড়িতে হিন্দু সম্প্রদায়ের কযেকজন মানুষকে আশ্রয় দেন। শুধু তাই নয়, তিনি চক বাজারের জামে মসজিদে জুম্মার দিন বক্তৃতায় বলেন- ‘যদি কেউ কোরান শরীফ থেকে প্রমাণ করতে পারে যে, নিরাপরাধ হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষকে হত্যার বিধান রয়েছে তাহলে তিনি নিজের নাম পাল্টে ফেলবেন।’ তিনি তার বাড়িতে আশ্রয় কেন্দ্র খোলার ঘোষণা দিয়ে বলেন পারলে আমাকে প্রতিরোধ কর।  তাঁর এই বলিষ্ঠ বক্তব্যের পর চকবাজারে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা থেমে যায়।

ধার্মিক ব্যক্তি হিসেবেও কিন্তু তিনি ছিলেন প্রবাদপ্রতীম। জীবনে নামাজ কাজা করতেন না। আমৃত্যু রোজা রেখেছেন। হজ করেছেন। অনেক ধর্মীয় সম্মেলনে বক্তব্য রাখতেন। এখানে তাঁর পারিবারিক পরিচয় একটু দিই।

মুহম্মদ শহীদুল্লাহর ঊর্ধতন ১৪তম পুরুষের নাম শেখ দারা মালিক। শেখ পদবী দেখে বোঝা যায় তিনি এসেছিলেন আরব থেকে। সম্ভবত হজরত শাহ জালালের সঙ্গে যে তিনশ আউলিয়া আসেন তাদের অন্যতম শেখ আব্বাস মক্কী (মক্কাবাসী)-র শিষ্য হয়ে শেখ দারা মালিক ভারতবর্ষে আসেন। তিনি দিল্লিরর দরবার (শাহজাহান বা আওরঙ্গজেব) এর কাছ থেকে পরোয়ানা নিয়ে আসেন। সেটিতে তিনি চব্বিশ পরগণার বালান্ডা পরগণা লাখেরাজ (করবিহীন) পান। বসিরহাট মহকুমায় এখনও আব্বাস মক্কী (অন্য নাম পীর গোরাচাঁদ) এর কবর রয়েছে। পীরের খাদেম হিসেমে শেখ দারা মালিক সেখানে পীরের মাজারের খাদেম হন। এসবই কতটা মিথ আর কতটা সত্য তা বলা মুশকিল। যাহোক শেখ দারা মালিক বসিরহাটের পেয়ারা গ্রামে থিতু হন। তার পরবর্তী বংশধরেরা এ গ্রামে ও তার আশপাশের গ্রামে ছড়িয়ে পড়েন। শহীদুল্লাহর একজন পূর্ব পুরুষ ছিলেন মুন্সী শেখ গোলাম আবেদ। তিনি লর্ড অকল্যান্ডের মুন্সী ছিলেন। এ থেকে বোঝা যায়, এই পরিবারটিতে বিদ্যাচর্চা ছিল। কারণ না হলে মুন্সীর চাকরি পেতেন না। শহীদুল্লার বাবা মুন্সী মফিজুদ্দিনও ছিলেন আদলতের দলিল লেখক। পরে তিনি ইংরেজ জজের সঙ্গে মনোমালিন্যের ফলে চাকরি ছেড়ে দিয়ে আদালতের সামনে দলিল লেখকের বৃত্তি অবলম্বন করেন। মুন্সি মফিজুদ্দিন বাংলা, ইংরেজি, ফার্সি, আরবি, ও উর্দু (উর্দু হিন্দি মিশ্রিত হিন্দুস্থানি ভাষা) জানতেন। শহীদুল্লাহর নাম জন্মের সময় রাখা হয়েছিল শেখ মুহম্মদ ইব্রাহিম (মতান্তরে মুহম্মদ ইব্রাহিম)। কিন্তু তার মা হুরুন্নেসা ছেলের নাম রাখেন মুহম্মদ শহীদুল্লাহ। সেই নামেই তিনি সর্বত্র পরিচিত হন।

শহীদুল্লাহ গ্রামের মাদ্রাসায় লেখাপড়া শুরু করেন এবং পরে হাওড়া জেলা স্কুলের ভর্তি হন। তিনি ছোটবেলায় ঘরোয়া পরিবেশে বাংলা, উর্দু, ফারসি ও আরবি শেখেন এবং স্কুলে সংস্কৃত পড়েন। তিনি কলকাতায় হাওড়া জেলা স্কুল থেকে প্রবেশিকা (১৯০৪) এবং প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে এফএ (১৯০৬) পাশ করেন। কলকাতা সিটি কলেজ থেকে সংস্কৃতে অনার্স নিয়ে বিএ ডিগ্রির (১৯১০) পর সংস্কৃতে এমএ ক্লাসে ভর্তি হন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে। কিন্তু সেখানে বেদ পড়াতেন অধ্যাপক সত্যব্রত সামশ্রমী।

তিনি অব্রাহ্মণকে (তদুপরি মুসলমান) বেদ পড়াতে রাজি হন না। এ নিয়ে তখন প্রচুর বাদ, প্রতিবাদ ও পত্রপত্রিকায় লেখালেখি হয়। এরপর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায় বিষয়টির সুরাহা করেন। তাঁর নির্দেশে শহীদুল্লাহ তুলনামূলক ভাষাতত্ত্ব বিভাগের প্রথম ছাত্র হিসেবে ভর্তি হন এবং সেখান থেকেই এমএ ডিগ্রি পান (১৯১২)। দুবছর পর তিনি বিএল (১৯১৪) ডিগ্রিও অর্জন করেন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে দীনেশচন্দ্র সেনের তত্ত্বাবধানে শরৎচন্দ্র লাহিড়ী গবেষণা-সহকারী (১৯১৯-২১) হিসেবে কাজ করেন।

১৯২১ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সংস্কৃত ও বাংলা বিভাগের প্রভাষক পদে যোগ দেন।  ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে তিনি এতটাই ভালোবেসে ফেলেন যে পরে শান্তি নিকেতন থেকে শিক্ষক হওয়ার আমন্ত্রণও গ্রহণ করেননি। যদিও তিনি ছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পরম ভক্ত। তিনি কাজী নজরুল ইসলামকে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে প্রথম পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকেও প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দিয়ে শান্তি নিকেতনে গুরুদেবের কাছে নিয়ে গিয়েছিলেন। পাকিস্তান সরকারের রবীন্দ্র বিরোধিতার প্রবল প্রতিবাদীও ছিলেন মুহম্মদ শহীদুল্লাহ।

তিনি ১৯২৬ সালে প্যারিসের সোরবোন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডক্টরেট ও ডিপ্লোফোন ডিগ্রি পান। এটি ছিল দক্ষিণ এশিয়ায় মুসলিমদের মধ্যে প্রথম ডক্টরেট। তার গবেষণার বিষয় ছিল চর্যাপদ ও বৌদ্ধ দোহা গান। গবেষণাপত্রের নাম ছিল ‘Buddhist mystic song’। মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ছিলেন বাংলা একাডেমি প্রতিষ্ঠার প্রথম চিন্তক।

এবার কিছু পারিবারিক গল্প বলি।

আমি ছোটবেলা থেকেই বাবার মুখে দাদার গল্প শুনেছি। তাঁর ছিল ৯ সন্তান। দুই কন্যা এবং সাত পুত্র। আমার বাবা ছিলেন ষষ্ঠ সন্তান। সন্তানরা শহীদুল্লাহকে ডাকতেন ‘বাবু’ বলে। সন্তানদের প্রতি তিনি ছিলেন স্নেহশীল। নিজের ছাত্রদেরও তিনি সন্তানের মতোই স্নেহ করতেন। অনেক দরিদ্র ছাত্রের শিক্ষার ব্যয়ভারও বহন করতেন।

আমার বাবা কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃস্থানীয় কর্মী ছিলেন। তার এই রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কোন বিরোধিতা শহীদুল্লাহ করেননি। বরং তকীয়ূল্লাহ যখন জেলে কারাবন্দি তখন পাকিস্তান সরকার তাকে বলে, ‘দেশদ্রোহী পুত্রকে’ রাজনীতি ছাড়তে অনুরোধ জানাতে এবং মুচলেকা দিয়ে তার মুক্তির ব্যবস্থা করতে। জবাবে শহীদুল্লাহ বলেন, ‘আমার ছেলে দেশদ্রোহী নয়। দেশদ্রোহী হলে তাকে আমি নিজের হাতে গুলি করতাম। কিন্তু সে দেশপ্রেমিক। সে মানুষের মুক্তির জন্য কাজ করছে। তাকে আমি অন্যায় অনুরোধ করতে পারবো না।’ এই ঘটনায় তার রাজনৈতিক উদার মনোভাব বোঝা যায়। তিনি তার কনিষ্ঠ সন্তান মুর্তজা বশীরের শিল্প চর্চাকেও উৎসাহিত করেছেন। এমনকি তাঁকে ফ্রান্স থেকে আনা লুভরের ফরাসি শিল্পীদের ছবি সম্বলিত বই উপহার দেন।

তিনি তাঁর মাকে অত্যন্ত ভালোবাসতেন। মা হুরুন্নেসা নিজের গ্রাম ত্যাগ করে সারাজীবন তার এই ছেলের কাছেই ছিলেন।

শহীদুল্লাহ তাঁর স্ত্রীকে অত্যন্ত সম্মান করতেন। বাবার কাছে শুনেছি সংসারে আমার দাদীর মতামতই ছিল প্রধান। ব্যক্তি জীবনে ছিলেন খুব সুরসিক। প্রায়ই বলতেন বই এবং বউ তার সবচেয়ে প্রিয়।  স্ত্রীর প্রতি একনিষ্ঠ ছিলেন তিনি। নাতি-নাতনিদের খুব স্নেহ করতেন।

মুহম্মদ শহীদুল্লাহ তাঁর সন্তানদের সুশিক্ষায় শিক্ষিত করেছিলেন। তাঁর ৯ সন্তানের প্রথমজন মাহযূযা হক। তিনি স্বশিক্ষিত ছিলেন। কবিতা লিখতেন। মাহযূযা হকের স্বামী ড. সিরাজুল হক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর এমিরিটাস এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে খ্যাতিমান স্কলার ছিলেন। এই দম্পতির সন্তান জিয়াউল হক খ্যাতনামা আলোকচিত্রী ও বঙ্গবন্ধুর অন্যতম চিত্রগ্রাহক ছিলেন। অন্য সন্তানরাও স্বক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত। শহীদুল্লাহর ২য় সন্তান মুহম্মদ সফীয়ূল্লাহ ছিলেন লেখক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেটের সদস্য, ঢাকা ল’ কলেজের প্রিন্সিপাল এবং এদেশের বীমা শিল্পের অগ্রপথিক। তাঁর সন্তান গীতিআরা সাফিয়া চৌধুরী দেশের বিজ্ঞাপন শিল্পের অন্যতম পথিকৃৎ এবং অন্যতম প্রধান নারী উদ্যোক্তা।অন্য সন্তানরাও স্বক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত। শহীদুল্লাহর তৃতীয় সন্তান মাসরূরা খাতুন একজন সমাজকর্মী ছিলেন। তাঁর একমাত্র সন্তান ফরিদামনি এদেশের একজন প্রবীণ শিক্ষাবিদ। শহীদুল্লাহর চতুর্থ সন্তান মোস্তফা ওলিয়ূল্লাহ চল্লিশের দশকের শেষদিকে জার্মানি থেকে মেরিন ইঞ্জিনিয়ারিংযে শিক্ষালাভ করেন। তিনি নারায়ণগঞ্জ ডক ইয়ার্ডের অন্যতম নির্মাতা। তাঁর সন্তানরা সকলেই যুক্তরাষ্ট্রের বাসিন্দা এবং স্বক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত। শহীদুল্লাহর পঞ্চম সন্তান মাহমুদ যকীয়ূল্লাহ। তিনি ম্যানচেস্টার থেকে টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে শিক্ষালাভ করেন। তিনি ষাটের দশকে একজন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী ছিলেন। প্রবীণ হিতৈষী সংঘের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা এবং সমাজসেবক ছিলেন। তাঁর সন্তান চ্যামন আরা জাকিয়া শহীদুল্লাহ বিদ্যাপীঠের প্রতিষ্ঠাতা।অন্য সন্তানরাও স্বক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত। শহীদুল্লাহর ষষ্ঠ সন্তান মুহম্মদ তকীয়ূল্লাহ ভাষা আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক ও কর্মী। তিনি চল্লিশ ও পঞ্চাশের দশকে এদেশের কমিউনিস্ট আন্দোলনের অন্যতম নেতা ও কর্মী। তিনি ১৯৪৮ সালের ভাষা অন্দোলনের একমাত্র আলোকচিত্রী। বাংলা বর্ষপঞ্জীর সংস্কারক। ভাষা সংগ্রামী হিসেবে একুশে পদকপ্রাপ্ত। বেশ কয়েকটি বইয়ের লেখক। তাঁর সন্তান আহমদ ইয়ুসুফ আব্বাস একজন ব্যাংকার ও সমাজসেবক, কন্যা শান্তা মারিয়া সাংবাদিক, লেখক ও শিক্ষক। শহীদুল্লাহর সপ্তম সন্তান আবুল বায়ান নকীয়ূল্লাহ একজন চিকিৎসক। তিনি আমেরিকায় শিক্ষালাভ শেষে ষাটের দশক থেকে সৌদি আরবে চিকিৎসা পেশা গ্রহণ করেন। তিনি সৌদির প্রথম প্যাথলজিকাল ল্যাবরেটরির প্রতিষ্ঠাতা এবং সৌদি রাজপরিবারের অন্যতম চিকিৎসা পরামর্শদাতা ছিলেন। তাঁর সন্তানরা সবাই বিভিন্ন দেশে স্বক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত। শহীদুল্লাহর অষ্টম সন্তান আবুল ফজল রাযীয়ূল্লাহ ছিলেন বুলবুল ললিতকলা একাডেমির একজন আলোক নির্দেশক এবং এদেশের একজন প্রথম যুগের অলোক ব্যবস্থাপক ও প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী। তাঁর সন্তানরা সবাই যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী ও স্বক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত। শহীদুল্লাহর কনিষ্ঠ সন্তান মুর্তজা বশীর এদেশের স্বনামখ্যাত শিল্পী ও লেখক, ভাষাসংগ্রামী এবং প্রগতিশীল ব্যক্তিত্ব। তিনি একুশে ও স্বাধীনতা পদকপ্রাপ্ত বিশিষ্ট নাগরিক। তাঁর সন্তানরাও স্বক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত। শহীদুল্লাহর সন্তানদের মধ্যে একমাত্র মুর্তজা বশীরই এখনও জীবিত। অন্যরা সবাই পরিণত বয়সে প্রয়াত হয়েছেন।

তাঁর চকবাজারের বাড়িতে ছিল বিশাল লাইব্রেরি। বাড়িতে যতক্ষণ থাকতেন  এই ব্যক্তিগত গ্রন্থাগারেই পাঠে নিমগ্ন থাকতেন। পাণ্ডিত্যের জন্য তাঁকে বলা হতো চলন্ত অভিধান। তাঁকে জ্ঞানতাপস অভিধায় ভূষিত করেন তাঁর ছাত্র ও সহকর্মীরা।  তিনি অবশ্য নিজের নামকরণ করেছিলেন জ্ঞানানন্দ স্বামী। কারণ জ্ঞানলাভ ছিল তার জীবনের আনন্দের উৎস ও ব্রত।

১৮৮৫ সালের ১০ জুলাই চব্বিশ পরগণার বশিরহাটে তার জন্ম এবং ১৯৬৯ সালে ১৩ জুলাই ঢাকায় মৃত্যু। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলের কাছে মুসা খান মসজিদ সংলগ্ন প্রাঙ্গণে তার অন্তিম শয্যার স্থান। এর পাশের ছাত্রাবাসটির নামকরণও হয় তাঁর নামে। যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছিল তাঁর প্রিয় কর্মস্থল, যেখানে ছিলেন তাঁর প্রাণপ্রিয় শিক্ষার্থীরা, যার অদূরে রয়েছে তাঁর মানস প্রতিষ্ঠান বাংলা একাডেমি এবং যার কাছেই রয়েছে ভাষা আন্দোলনের প্রতীক শহীদ মিনার সেই প্রিয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাঙ্গণেই পরম শান্তিতে ঘুমিয়ে আছেন বাঙালি জাতির এই কৃতী সন্তান।

মুহম্মদ শহীদুল্লাহর অমর উক্তি, মাতা মাতৃভাষা মাতৃভূমি প্রত্যেক মানুষের পরম শ্রদ্ধার বস্তু। এই তিনের প্রতি যার শ্রদ্ধা নেই সে পশুবিশেষ। মাতৃভাষার প্রতি এই ভালোবাসাই তাঁকে অমর করেছে।

লেখক:
Shanta Maria
শান্তা মারিয়া, মুহম্মদ শহীদুল্লাহর পুত্র মুহম্মদ তকীউল্লাহর কন্যা

 

মন্তব্য করুন (Comments)

comments

Share.